ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুবকে সব ধরনের ক্লাস থেকে অব্যাহতি দেওয়ার খবর প্রকাশ ও এ নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষাপটে তিনি আলাপ-কে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ তাকে যে চিঠি দিয়েছে, তাতে ‘অব্যহতি’র কথা উল্লেখ নেই।
নেকাব পরা এক ছাত্রীকে ‘মৌলবাদী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ বলে কটাক্ষ করার অভিযোগ ওঠার প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর জরুরি একাডেমিক কমিটির সভায় তাকে অব্যহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে এর আগে খবরে বেরিয়েছে।
তাসনিম সিরাজ মাহবুব আলাপ-কে জানিয়েছেন তাকে যে চিঠি দেয়া হয়েছে তাতে লেখা আছে, “আমার কোর্সগুলো অন্য টিচারকে দিয়েছে পড়ানোর জন্য। অর্থাৎ আমার কোর্সগুলো অন্য শিক্ষককে রিঅ্যাসাইন করা হয়েছে। যেটাকে পুনর্বন্টন বলা যায়।” অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা জানান, মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যার নজির নেই। শিক্ষার্থীরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছে পরদিন।
ঘটনার বিবরণ
৭ই অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের ক্লাসে এক ঘটনা ঘটে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বিভাগীয় চেয়ারম্যানকে জানানোর পর তাসনিম সিরাজকে ক্লাস করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভাগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী গণমাধ্যমে বৃহস্পতিবার বলেন, শিক্ষার্থীদের একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে জরুরি একাডেমিক কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও সাম্প্রতিক ঘটনা র পরিপ্রেক্ষিতে একটি রেজুলেশন নেওয়া হয়। সেই রেজুলেশনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে বর্তমানে তার কোর্সগুলো থেকে পুনর্বণ্টন করা হয়েছে এবং কোর্সগুলো অন্য শিক্ষকদের দেওয়া হয়েছে।
এদিকে তাসনিম সিরাজ আলাপ-কে জানান ঘটনা সম্পর্কে বিভাগ থেকে তার কাছে কিছুই জানতে চাওয়া হয়নি। তার কোনো বক্তব্য নেওয়া ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্তে তিনি কষ্ট পেয়েছেন।
ঘটনার মূল অভিযোগকারী মল্লিকা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি সেখানে দাবি করেন শিক্ষক তাসনিম সিরাজ তাকে দেখে ‘আনকমফোর্টেবল ফিল’ করছেন বলে জানান।
এছাড়াও হিজাব নিকাব নিয়েও কথা বলেছেন। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, “আমি কেন এভাবে ড্রেসআপ করলাম, এটা কোন ফিকহে আছে, এটা ইসলামের কোথায় আছে। উনি বারবার রেফারেন্স দেন যে উনি হজ করে আসছেন, উনি সব জানেন এবং হজ করে যেহেতু আসছেন, ওখানে তো মুখ খুলে রাখাই যায়।”
অভিযোগকারী মল্লিকার অভিযোগ তাসনিম সিরাজ এর আগেও এ ধরনের কথা বলেছেন।
“আমি ওনাকে রিকোয়েস্ট করেছি, ‘ম্যাম, আমি আপনার অফিস আওয়ারে আপনার সাথে দেখা করি, কথা বলি এবং আমি এটলিস্ট ফেস দেখাই, সমস্যা নাই তো। আমার কার্ড আছে আপনি দেখেন। রিকগনাইজ করেন। আমার ক্লাসমেটরাও আমাকে চেনে, ভাইভা বোর্ডেও আমাকে কোনো প্রবলেম করে না, সবাই আমাকে চেনে। তাহলে আপনার কিসের প্রবলেম? উনি তখন রেগে গিয়ে বলছেন যে, ‘না, এটা সম্ভব না, আমি প্রতিদিন তোমাকে চেক করতে পারব না।”
৩৪ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন জানিয়ে তাসনিম সিরাজ আলাপ-কে বলেন, “আমার অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা বোরখা পরে, হিজাব পরে। এসবে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
ঘটনার বিষয়ে বলতে গিয়ে তাসনিম সিরাজ জানান, তিনি ক্লাসে শিক্ষার্থীর চোখ দেখতে চেয়েছেন। কারণ একজন শিক্ষার্থী তার পড়ানো বুঝতে পারছেন কিনা সেটা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সে আলোচনা থেকেই এর সূত্রপাত হয়।
“আমি হলাম এমন শিক্ষক যার কাছে এটা জানা খুব জরুরি যে আমি যা পড়াচ্ছি বা আলোচনা করছি সেটা আমার ক্লাসে সবাই বুঝতে পেরেছে কিনা। সেটাই তাকে বলেছি। চোখটা তো দেখা যেতে হবে। চোখ না দেখলে তো আমি অস্বস্তিবোধ করছি।”
তাসনিম সিরাজ প্রশ্ন রেখে বলেন, “আমার কি অধিকার নেই যে আমি আমার স্টুডেন্টকে আইডেন্টিফাই করতে পারবো? হিজাব আর নিকাব তো ইস্যু না।”
“আমি চোখ দেখতে পাবো না? আমি তো পড়িয়ে তৃপ্তি পাচ্ছি না। আমি এমন শিক্ষক না যে বুঝলো কী বুঝলো না তাতে আমার কিছু আসে যায় না।”
বিভাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাসনিম সিরাজের অভিযোগ
তাসনিম সিরাজ বলছেন, ক্লাসের ঘটনার পরই বিভাগীয় চেয়ারম্যানের কক্ষে বিষয়টি অবগত করতে যান। কিন্তু তাকে তিনি পাননি। তখন তিনি ধরে নিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা বিষয়টা নিয়ে বিভাগকে অবগত করে তখন নিশ্চয়ই তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। তাসনিম সিরাজ আলাপ-কে বলেন, রাতের বেলা ইমেইলে এবং এসএমএসের মাধ্যমে ইমার্জেন্সি মিটিং কল করা হয়।
মিটিংয়ের এজান্ডায় তার নাম ছিল না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
“রাত ৮টার কিছু আগে ইমেইলটা এসেছিল। ওই সময়টায় আমি হাসপাতালে আত্মীয়ের জরুরি চিকিৎসায় হাসপাতালে ছিলাম। তখনও ভেবেছি আমার বিষয়ে যদি কিছু হয় তাহলে আমাকে তো নিশ্চয়ই জানাবে। হাসপাতালে থাকায় মিটিংয়ে অংশ নিতে পারিনি।”
তিনি যে মিটিংয়ে অংশ নিতে পারছেন না এ বিষয়ে বিভাগকে জানানো হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন - তিনি জানিয়েছেন। কিন্তু ওনার ক্লাস পুনর্বন্টনের বিষয়ে তার সঙ্গে মিটিং থেকে যোগাযোগ করা হয়নি।
তিনি বিভাগের রাজনীতির শিকার বলে আলাপের কাছে দাবি করেন।
চিঠির বিষয়ে তাসনিম সিরাজ বলেন, “আমাকে রিটেন কমপ্লেইনের সফট কপি-হার্ড কপি দুটোই পাঠানো হয়েছে। তবে চিঠিতে লেখা ছিল শিক্ষার্থীদের স্বাক্ষর সম্বলিত কাগজ এটাচমেন্টে আছে। কিন্তু সফট কপি এবং হার্ড কপি দুটোতেই শিক্ষার্থীদের সইয়ের কাগজটি দেওয়া নেই।”
এ বিষয়টিকেই তাসনিম সিরাজ গুরুতর হিসাবে বিবেচনা করছেন। তিনি মনে করেন, স্বাক্ষরের কাগজ না থাকায় তিনি জানতে পারছেন না কতজন শিক্ষার্থী অভিযোগটি করেছে। কারণ এ ধরনের একটা সাদা কাগজে যে কেউ টাইপ করে দিতে পারে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘অব্যহতি’ শব্দটি নিয়েও কথা বলেছেন তাসনিম সিরাজ। তিনি দাবি করেন, চিঠির কোথাও ‘অব্যহতি’ শব্দটি লেখা নেই। অসুস্থ থাকায় গণমাধ্যমের ফোন রিসিভ করতে না পারায় এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে বলেও তিনি বলেন।
এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না জানিয়ে তার কথা অন্যায়ভাবে রেকর্ড করেছে। একইসঙ্গে রেকর্ডিংয়ের বেশ কিছু জায়গায় কেটে ডিসটর্ট করা হয়েছে বলেও বিতর্ক বেশি হচ্ছে।
তিনি একটি উদাহরণ টেনে বলেন, “সুরা নিসাতে বর্ণনা আছে মেয়েরা কীভাবে নিকাব পরবে। তো, ওখানে আরবিতে লেখা। যার অর্থ হলো, তুমি এমন ঢিলেঢালা পোশাক পরবে যাতে তোমার শরীরে আকৃতি বোঝা না যায়। শিক্ষার্থীর এই কথার রেকর্ড থেকে ‘না’ শব্দটা কেটে দিয়েছে। ওটা দিয়ে ফটোকার্ড বানিয়েছে। যেখানে লেখা ‘তোমাদের শরীরের অকৃতি বোঝা যায়’।”
তাসনিম সিরাজ দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কথা বলে আসছিলেন। আর এসব কারণেই মৌলবাদীগোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল বলে জানান। তিনি মনে করেন এ অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তারা তিলকে তাল বানিয়ে কথা ডিসটর্ট করে আমার বিরুদ্ধে কথা বলার সুযোগ পেয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগের পক্ষ থেকে সাধারণত কীভাবে শিক্ষকদের ক্লাস পুনর্বন্টন হয়, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, অতীতেও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে তিনি ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর শিক্ষকদের ক্লাস থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে জানান, তখনও আমি দেখেছি কীভাবে শিক্ষকদের ক্লাস থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
“আমার ডিপার্টমেন্টের একজনকেও করা হয়েছিল। আমি তো দেখেছি এটা কীভাবে ডিল করা হয়েছিল। মিটিংয়ের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছিল- তোমার ক্যাম্পাসে আসার দরকার নেই। আমরা অনলাইনে তোমার সঙ্গে কথা বলবো। অনলাইনে তার অভিযোগ সম্পর্কে জানানো হয়েছে। এবং তার বক্তব্যও শোনা হয়েছিল।”
ক্লাস পুনর্বন্টনের প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধান অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াটি যথাযথ হয়নি।
তিনি জানান, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে অবশ্যই তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। তাসনিম সিরাজের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিকেও সামনে আনেন। আর এখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলেও তিনি মনে করেন।
“লিখিত অভিযোগ এসেছে ৮ই অক্টোবর। জরুরি মিটিং ডাকা হয়েছে ৭ই অক্টোবর সন্ধ্যায়। সামাজিক মাধ্যমসহ যেভাবে অডিওকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়েছে বলে পরিষ্কার হয়।”
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর তর্ক-বিতর্ক স্বাভাবিক। তবে এক্ষেত্রে সেই তর্কটা শ্রেণিকক্ষেই শেষ হওয়া উচিত ছিল বলে জানান অধ্যাপক সামিনা।
এক্ষেত্রে অভিযোগকারীদের শ্রেণিকক্ষে অধিকার এবং পোশাকের অধিকার আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
“প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষকেরও স্বাধীনতা আছে।”
এক্ষেত্রে অধ্যাপক সামিনা অনুমতি ছাড়া শিক্ষকের বক্তব্য রেকর্ড করা এবং সেটা কিছু অংশ বাদ দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টাকেও অপরাধ হিসাবে দেখতে চান, এবং এর জন্য শাস্তিও দাবি করেন।
তিনি বলেন, কোনো শিক্ষকের এমন কথা বলা উচিত নয়, যা শিক্ষার্থীর জন্য কষ্টকর হতে পারে। এক্ষেত্রে শিক্ষক হিসাবে অধিকার কী হবে, এবং শিক্ষার্থী হিসাবে অধিকার কী এবং দায়িত্ব কী হবে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মে সেটা স্পষ্ট করা জরুরি।
অডিও রেকর্ড মেন্যুপুলেট করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে ধর্মীয় রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও জানান অধ্যাপক সামিনা।
“এখানে দুইজনই একই ধর্মের অনুসারী। এখানে প্র্যাকটিস নিয়ে তর্ক হয়েছে।”



