মন্তব্য প্রতিবেদন

জাতীয় স্বার্থ পররাষ্ট্রনীতির ‘রেড লাইন’

“বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। দেশের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করে পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড চলবে। পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডে জাতীয় স্বার্থ পই পই করে বুঝে নেওয়া হবে।”

আপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

“ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট ইজ দ্য রেড লাইন। উই উইল নেভার কম্প্রোমাইজ অন ইট।”

বেশ দৃঢ় কণ্ঠেই বলছিলেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবনের নিচে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ সিনিয়র কর্মকর্তারা। বৃহস্পতিবার সকাল। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল দশটা ছুঁই ছুঁই।

ঠিক দশটার দিকেই ঢুকলেন ড. খলিলুর রহমান। হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতেই করমর্দন আর কুশল বিনিময় করে নিজ কক্ষে গেলেন।

তার মিনিটে দশেক পরেই কার্যালয়ে ঢুকলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাকেও শুভেচ্ছা জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তারা।

শপথ নেওয়ার পরদিন নানা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকায় ওইদিন মন্ত্রণালয়ে যেতে পারেননি পররাষ্ট্রনীতির এই নতুন দুই কাণ্ডারি। নিজ কার্যালয়ে অফিস শুরু করলেন বৃহস্পতিবার।

ঘণ্টাখানেক পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করতে গেলাম কয়েকজন সংবাদকর্মী। মূলত ডিপ্লোমেটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ ডিক্যাবের কার্যনির্বাহী কমিটি।

শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বসে কথাও হলো কিছুক্ষণ। তখনই বললেন তার পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা।

গত দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পররাষ্ট্রনীতির উত্থান পতন দেখেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে কোনো দেশের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন, আবার কোনো দেশের সাথে শীতল হয়েছে সম্পর্ক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদ্য সাবেক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন তার বিদায়ী মত বিনিময়ের দিন খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, ভারতের সাথে সম্পর্কটা অনেক চেষ্টার পরও মসৃণ করতে পারলেন না।

মো. তৌহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের নিজস্ব স্বার্থের ধারণার মধ্যে তফাত থাকায় দুই দেশের সম্পর্ক থমকে গেছে।

তিনি অবশ্য রাজনৈতিক সরকারের ওপর প্রত্যাশা করে বলেছিলেন, “‘আমি আশা করব যে আমার উত্তরাধিকারী যিনি আসবেন এবং এই সরকারের উত্তরাধিকারী যে সরকার হবে, তাদের সময়ে আবার মসৃণ একটা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে।”

শুধু ভারত নয়, সব দেশের সাথে সম্পর্কের ভিত্তি হবে জাতীয় স্বার্থ তা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, “সব দেশের সাথেই সম্পর্ক রাখবো। আর অগ্রাধিকার থাকবে জাতীয় স্বার্থই।”

সংবাদমাধ্যমের প্রতিও বেশ ইতিবাচক তিনি। বললেন, “সবাই মিলেই একটা টিম হয়ে কাজ করবো বাংলাদেশের জন্য। প্রয়োজনে অবশ্যই সমালোচনা করবেন।”

আগেরদিন অর্থাৎ বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ঢাকা সফররত নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ডিক্যাবের কার্যনির্বাহী কমিটি

সেখানেই সাংবাদিকদের সাথে প্রথমবার কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। দেশের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করে পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ড চলবে। পররাষ্ট্র কর্মকাণ্ডে জাতীয় স্বার্থ পই পই করে বুঝে নেওয়া হবে।”

পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি প্রশ্নে তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে যে প্রিন্সিপালগুলো থাকবে, তা হলো সার্বভৌমত্ব, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, কারও অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা, জাতীয় মর্যাদা এবং পারস্পরিক সুবিধা।”

ড. খলিলুর রহমান ক্যারিয়ারজুড়েই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সামলেছেন। ১৯৭৯ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। কর্মজীবন শুরু হয় পররাষ্ট্রে।

১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯১ সালে ড. রহমান যোগ দেন জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলন আঙ্কটাডের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে। এরপর নিউইয়র্ক-জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

অন্তর্বর্তীকালীনর সরকার খলিলুল রহমানের ওপরই ভরসা করেছিল রোহিঙ্গা আর জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে। নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে তার ওপরই ভরসা রাখলেন।

ড. খলিলুর রহমানের রানিংমেট হয়েছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম। বিএনপির চেয়ারপারসনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক সহায়ক কমিটিতেও ছিলেন তিনি।

নির্বাচনে ফরিদপুর-২ সংসদীয় আসনে (সালথা ও নগরকান্দা উপজেলা) প্রার্থী হয়ে ১ লাখ ২১ হাজার ৯৯৪ ভোট পেয়ে তিনি জয়ী হন।

বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর সৌজন্য সাক্ষাত হয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাথেও। শামা ওবায়েদ ইসলামও বললেন প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিই তার নীতি।

দুপুরের দিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আনুষ্ঠানিক কথাও বলেছেন। দিয়েছেন কিছু প্রশ্নের উত্তর।

শামা ওবায়েদ বললেন, “বাংলাদেশকে ভিন্ন নজরে দেখতে বহির্বিশ্বকে। মেরুদণ্ড সোজা রেখে অন‍্য সব সরকারের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব থাকবে।”

যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত সব দেশের সাথেই সম্পর্কের ইস্যু আছে, চ্যালেঞ্জও আছে বলেই মনে করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

শামা ওবায়েদ ইসলাম বলছিলেন, “দেশ ও জণগণের স্বার্থ রক্ষা করেই সম্পর্ক বজায় রাখবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি ছিলো তা পালন করেই কাজ করা হবে।”

কথা হচ্ছিলো সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলছিলেন, স্বাধীনতাত্তোর সময়ে, হাল বাস্তবতায় সবচেয়ে ‘ডাইফার্সিফায়েড’ চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

পেশাদার এই কূটনীতিক বলছেন, “জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের মনোজগতে যে চিন্তা তৈরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে যে আত্মসম্মানবোধটা তৈরি হয়েছে, এটাকে ধারণ করে প্রাথমিকভাবে ভারতের সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিকরণের প্রশ্ন আসবে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ট্যারিফ এগ্রিমেন্ট আছে। এই বিষয়গুলো এখন ডিল করতে হবে।”

সাবেক এই রাষ্ট্রদূত মনে করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি সাজানোর প্রক্রিয়ায় ধারণাগত, কাঠামোগত এবং সক্ষমতাগত পরিবর্তন দরকার। এটাই নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেনি তিনি।

বাংলাদেশে পররাষ্ট্রনীতির যে মূল বক্তব্য ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণ বিবেচনায় এই ভারসাম্য রেখে নীতি সাজানো চ্যালেঞ্জই বটে। তবে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভরসা রাখতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই কাণ্ডারি ড. খলিলুর রহমান আর শামা ওবায়েদ ইসলামের ওপর।