এলপিজির দামের চাপ কীভাবে সামলাবে ভোক্তা?

সীমিত আয়ের একটি পরিবারের বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ চলে যাচ্ছে শুধুই রান্নার জ্বালানিতে। বৈশ্বিক সংকট, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং দুর্বল বাজার তদারকিতে এলপিজির দাম এখন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য বড় এক অভিঘাত। কিন্তু তাদের এই চাপ কমবে কীভাবে?

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ এএম

বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের মাসে গড় আয় কত? এই তথ্য হয়ত আপনার জানা আছে। তারপরও আরেকবার মনে করিয়ে দিই। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ এবং শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক খাতের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কর্মক্ষম মানুষের মাসে গড় আয় ২৫ হাজার টাকার নিচে।

মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি হলে, ৫ কোটিরও বেশি মানুষের ব্যক্তিগত মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। 

এবার ভাবুন, তিন সদস্যের একটি পরিবার ঢাকা শহরে বসবাস করে, যাদের উপার্জনক্ষম একজন মানুষের আয় ২৫ হাজার টাকা, বা তারও কম। মাসে লাগে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার, যার দাম খোলা বাজারে কমবেশি প্রায় আড়াই হাজার টাকার মতো। 

তার মানে রোজগারের ১০ শতাংশ স্রেফ রান্নার জ্বালানিতেই শেষ। এর সঙ্গে বাজার করা, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, পোশাক কেনা, যাতায়াতসহ আরও নানা ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচতো আছেই। 

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সেই প্রভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনে যখন নাভিশ্বাস, তখন আরও এক বড় সংকট হিসাবে- লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে এলপিজির দাম।

সাম্প্রতিক সময়ে এলপি গ্যাসের উপর্যুপরি দাম বৃদ্ধি ভোক্তা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ তৈরি করছে করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

নভেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম একবারে ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২,০৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

তার মানে কী দাঁড়ালো? ওই পরিবারের জ্বালানির খরচ এক মাসে এক লাফে বাড়লো ১২ শতাংশ।

“উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। অলরেডি, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এই অভিঘাতে নিম্নবিত্ততো বটেই, মধ্যবিত্ত পর্যন্ত তটস্থ। সেইখানে জ্বালানি একটা ভূমিকা পালন করে,” আলাপ-কে বলেন ঢাকাভিত্তিক থিংকট্যাংক পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ। 

“গৃহস্থালির রান্নার জ্বালানি যদি একবারে ১০ শতাংশ বেড়ে যায়, তাহলে এটা মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন আয়ের জন্য আরও বেশি চাপের,” যোগ করেন তিনি। 

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? কীভাবে চাপ কমবে নির্দিষ্ট ও সীমিত আয়ের মানুষদের? 

যেসব কারণে বেড়েই চলেছে এলপিজির দাম 

গত জানুয়ারি মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। ১০ মাসের ব্যবধানে সেই দাম বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। 

তবে এই ৯ মাসে এলপিজির দাম প্রতি মাসে বাড়েনি। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম কখনো বাড়িয়েছে, আবার কমিয়েছে কখনো। 

কিন্তু এখানেই শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মূল্যে কখনই পাওয়া যায় না এলপিজি। দুর্বল বাজার তদারকি এবং কৃত্রিম সংকটের কারণে খুচরা মূল্যের তুলনায় ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি দিয়ে এলপিজি সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হয় ভোক্তাদের। 

সর্বশেষ দাম বাড়িয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২০৬০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও ইতোমধ্যে বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকার আশেপাশে। আর এই বাড়তি দামের মাশুল গুনতে খালি হয়ে যাচ্ছে ভোক্তাদের পকেট।  

বাংলাদেশে এলপিজির ভোক্তা কম নয়, বর্তমানে এলপিজি গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই রান্নার গ্যাসের গ্রাহক। 

পাইপলাইনে সরকারি কোম্পানির মাধ্যমে গ্যাস পাওয়া আবাসিক বা গৃহস্থালি গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪৩ থেকে ৪৫ লাখের মধ্যে।

বিশাল এই এলপিজির বাজারে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো আমদানির মাধ্যমে চাহিদা মেটাচ্ছে প্রায় ৯৯ শতাংশ। 

সম্প্রতি দাম বৃদ্ধির পেছনে ইরান যুদ্ধকে কারণ দেখাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি। গত জানুয়ারি মাসে ১২ কেরি সিলিন্ডার ছিল ১,২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা করে আমেরিকা-ইসরায়েল। 

এরপর এপ্রিলে বাংলাদেশে ১২ কেজির এলপি গ্যাসের সিলিন্ডারে দাম বেড়ে হয় ১,৯৪০ টাকা। এরপর ওঠানামার পর অক্টোবর ও নভেম্বরে টানা বেড়ে এখন ২০৬০ টাকায়। 

বিইআরসি ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসের শুরুতে নির্দিষ্ট ফর্মুলা বা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে দাম সমন্বয় করে আসছে। যেহেতু ৯৯ শতাংশই আমদানি, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের দামই বড় ভূমিকা রাখে মূল্য নির্ধারণে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির প্রধান দুটি উপাদান, প্রোপেন ও বিউটেনের দাম প্রতি মাসে নির্ধারণ করে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি 'সৌদি আরামকো'। একে বলা হয় সৌদি সিপি। 

বিইআরসি এলপিজির মূল্য গণনার ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশ প্রোপেন এবং ৬৫ শতাংশ বিউটেন-এর একটি মিশ্রণ অনুপাত ব্যবহার করে গড় আন্তর্জাতিক মূল্য হিসাব করে। সেই অনুপাত অনুযায়ী, জানুয়ারিতে যেখানে গড় আমদানি মূল্য ছিল টনপ্রতি ৫২১ দশমিক ৭৫ ডলার, নভেম্বরে এসে সেই গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৭৫৯ ডলারে। 

ফলে বিশ্ববাজারে গড় কাঁচামালের দামই টনপ্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে ২৩৭ দশমিক ২৫ ডলার বা ৪৫ শতাংশের বেশি। এটাকেই কারণ দেখিয়ে দেশের বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে ৫৪ শতাংশ। 

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আলাপ-কে বলেন, “সৌদি সিপি অনুযায়ী আমরা মূল্য নির্ধারণ করছি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল্য আরও বেশি।” 

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে আমদানির উৎসে। বাংলাদেশের সিংহভাগ এলপিজি এখন আমদানি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। 

বিইআরসির হিসাবে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫ শতাংশ। 

অন্যদিকে এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে ওমান, ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। 

আমদানির উৎসের গন্তব্য দূরে হওয়ায়, জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়া এবং সেখানকার দাম বেশি হওয়ায় বাংলাদেশে এসে সেই এলপিজির দামও যাচ্ছে বেড়ে। এর ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এলপিজির দাম সবচেয়ে বেশি এখন বাংলাদেশে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ আলাপ-কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র দূরের পথ হওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এটা প্রভাব ফেলছে দামের ওপর। 

এই প্রভাব কতটা, তা ব্যাখ্যা করেছেন ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী। ডেইলি স্টারকে তিনি বলেছেন, সংঘাতের আগে প্রতি টনে পরিবহন ব্যয় ছিল প্রায় ৮২ ডলার। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলার হয়েছে।

সীমিত ও নিম্নআয়ের মানুষের কী উপায়? 

জ্বালানির দাম মানুষের জীবনেকে কতটা প্রভাবিত করবে, সেই প্রসঙ্গ তুলেছেন থিংকট্যাংক পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ। 

আলাপ-কে বলেন, “অলরেডি মধ্যবিত্ত পর্যন্ত উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে পিষ্ট। সেই জায়গায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে এলপিজির দাম। সেই জায়গায় তাদের অন্যান্য কনজাম্পশন কমিয়ে দিতে হবে।” 

“যেমন- মাছ, মাংস, ডিম, দুধের মতো প্রোটিন কেনা কমিয়ে দিতে হতে পারে। কারণ এই টাকাটা কোনো না কোনো জায়গা থেকে তো ম্যানেজ করতে হবে। হেলথ বা এডুকেশনের স্পেন্ডিং কমিয়ে দিতে হতে পারে।” 

এলপিজির দামবৃদ্ধির ‘সুদূরপ্রসারী’ প্রভাব আছে বলে মনে করেন মাশরুর রিয়াজ। তার কথা, “বছর চারেক ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির ক্রমাগত অভিঘাতের মধ্যে এটা আবার বড় ধাক্কা।” 

এলপিজির মূল কাঁচামাল প্রোপেন ও বিউটেনের বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি, গন্তব্য দূরে হওয়ায় বেড়েছে জাহাজ ভাড়া। আর সেই প্রভাবে পিষ্ট হচ্ছে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তরা।

এখন তাহলে এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? সীমিত ও নিম্নআয়ের মানুষেরা খরচ জোগাবেন কীভাবে? 

অনেকেই বলছেন ভর্তুকির কথা। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ঠেকাতে কি ভর্তুকির ব্যবস্থা করা যেতে পারে? 

“করা সম্ভব। তবে ভর্তুকিও খুব বেশিদিন বা বড় আকারে সরকারের পক্ষে চালানো সম্ভব হবে না। কারণ, ট্যাক্স কম, সরকারের হাতে টাকাও নাই,” বলেন মাশরুর রিয়াজ।  

দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ‘গৃহিণী এলপিজি কার্ড’ নামে একটি বিশেষ স্মার্ট কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বলা হচ্ছে, মূলত রান্নার জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দামের চাপ থেকে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে ‘মা-বোনদের স্বস্তি দিতে’ এবং তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বিশেষ এই ভর্তুকি কর্মসূচি। কার্ডের আওতায় নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য বাজারের থেকে কম মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত কার্ডধারীরা প্রতি ৩ মাস পর পর ১টি করে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে পারবেন ১ হাজার টাকায়। একজন কার্ডধারী পরিবার বছরে বিশেষ এই সরকারি ভর্তুকি মূল্যে পাবেন সর্বোচ্চ ৪টি সিলিন্ডার।

সরকার প্রাথমিকভাবে দেশের ১ লাখ অসচ্ছল ও প্রান্তিক পরিবারকে বাছাই করে এই পাইলট প্রোগ্রামটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার প্রস্তুতি নিয়েছে। তবে এটা এখনও বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। 

ভোক্তারা কম মূল্যে কীভাবে এলপিজি পাবেন এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সরকার কার্ডের মাধ্যমে ভর্তুকি দেওয়ার চিন্তা করছেন। সেটা হতে পারে। 

কিন্তু ভর্তুকি দিতে গেলে চ্যালেঞ্জের দিকটাও কম নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থসংস্থানের বিষয় ছাড়াও রয়েছে, ভোক্তাদের তালিকা বের করা।  

“এখানে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বেশি। আপনার কাছে যদি আনুষ্ঠানিক যাচাইযোগ্য তথ্য থাকত যে, এদের ইনকাম এই লেভেলের। তাহলে আপনি বলতে পারতেন, যার ইনকাম ১৫ হাজার টাকার নিচে, সেই ওই দোকান থেকে কম দামে নিতে পারবে। দোকানদারকে সরকার অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দিল,” বলেন মাশরুর রিয়াজ।

কিন্তু কম আয়ের মানুষেরা করের আওতায় না থাকায় ভর্তুকি দেওয়ার জন্য যোগ্যদের তালিকা করার চ্যালেঞ্জটাও মনে করিয়ে দেন তিনি। তবে সরকার কোনো না কোনো ‘মেকানিজম’ বের করতে পারে বলেও মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। 

“চাপটা বেশি হচ্ছে মূলত শহর এবং উপশহর এলাকাতে। শহর এলাকাতে আরেকটু সুলভ মূল্যে এটা অ্যাভেইলেবল করা। যারা ওএমএস নেয় তাদেরকে কিছু সাপোর্ট বাড়িয়ে দিল, মানে জ্বালানির জন্য কিছু ক্যাশ দিয়ে দিল (সরকার)।”