রাস্তা বন্ধ করে, ভাঙচুর করে, আতঙ্ক আর জনদুর্ভোগ তৈরি করে যে গার্মেন্টস শ্রমিকেরা ক্ষোভ জানাচ্ছেন তারা বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৬ শতাংশেরও কম। বাকী যারা অন্য খাতে কাজ করেন? অনানুষ্ঠানিক খাতের যে ৮৬ শতাংশ চাষের জমিতে, গাড়ি সারানোর গ্যারেজে, নির্মাণস্থলে কিংবা বাসাবাড়িতে কাজ করেন তাদের জীবনমান নিয়ে কে ভাবেন?
জিয়াদ মুবাশ্বির ইসলাম
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৩ পিএমআপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের তৃতীয় দিনে এসে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৬৯০টি। ছবি: ইউএনবি
পহেলা নভেম্বর, রবিবার। ঢাকার মিরপুর ও আশুলিয়ায় এবং গাজীপুরের রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক। সেদিন চলেছে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সাথে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, সংঘর্ষ-ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া। দাবি একটাই, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। ঠিক সেদিনই সরকার ঘোষণা দিলো মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। শ্রমমন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরতে আহ্বান জানালেন। কিন্তু অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে পড়লো। চলেছে মঙ্গলবারেও।
মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ রবিবার জানিয়েছিল ৫২৯টি কারখানা বন্ধ আর প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজে যাচ্ছেন না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের তৃতীয় দিনে এসে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৬৯০টি।
পোশাক খাতের শ্রমিকদের দাবি শুনে সরকার যেমনই হোক একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু অন্য খাতের যেসব শ্রমিকের কথা কেউ শুনছে না, তাদের কী হবে?
ষড়যন্ত্র নাকি বাস্তব দাবি?
সরকারের মুখপাত্র এবং পুলিশের দাবি এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ‘তৃতীয় পক্ষ’, ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ এবং ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র’। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রী মনে করছেন কিছু রাজনৈতিক সংগঠন ইচ্ছে করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সোমবারের প্রতিবেদনে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশের কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি তৌহিদুল হক উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের আন্দোলনকে কাজে লাগাতে পারে।
গেল ৮ই সেপ্টেম্বরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিবিএস-এর মজুরি সূচক এক বছর ধরে ৮ শতাংশের আশেপাশে ঘুরছে, আর মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির পেছনে পড়ে রয়েছে গত সাড়ে চার বছর ধরে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৫৬ মাস প্রকৃত মজুরি কমে চলছে।
এই সময়ের মধ্যে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে। প্রথম আলো মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তখন প্রতি ডলারের দাম ছিল ১১০ টাকা ৫০ পয়সা অর্থাৎ ১১৩ ডলার মজুরি। এখন ডলারের দর ১২৪ টাকা, যার মানে মজুরি নেমেছে ১০১ ডলারে।
এর উপর এসেছে, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো। এই বছরের ১লা জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে, অর্থাৎ ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অবশ্য এই নতুন কাঠামো কার্যকর হচ্ছে ধাপে ধাপে। বাড়িভাড়াসহ এই গ্রেডে ন্যূনতম বেতন প্রায় ৩৩ হাজার টাকা।
সিপিডি’র ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদ খাতুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে সোমবার বলছেন, সরকারি পে স্কেল ঘোষণার আগেই পোশাক খাতের মজুরি পর্যালোচনা করা উচিৎ ছিল। তার ভাষ্যে, শ্রমিককে ‘রাস্তায় নামার জন্য অপেক্ষা করানো’ ঠিক নয়।
শ্রমিক নেতারাও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, মজুরি বোর্ড আরও আগে গঠন হলে এই অশান্তি এড়ানো যেতো। আইন সংশোধন করে, মজুরি পর্যালোচনার সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে, সংসদে যে বিল পাস হয়েছে গেল এপ্রিলে। নতুন মজুরি কার্যকর হওয়ার কথা আসছে ডিসেম্বর থেকে অথচ বোর্ড গঠন হয়েছে ১লা নভেম্বরে। আর সেই বোর্ড কবে সুপারিশ দিবে তা স্পষ্ট নয়।
রাস্তার বাইরের বাংলাদেশ
সায়ত্ত্বশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিআইডিএস-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে পোশাক খাতে শ্রমিকের সংখ্যা ৪২ লাখ ২০ হাজারের মতো। যা দেশের মোট শ্রমশক্তির তুলনায় একটা ছোট অংশ।
বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-কে উদ্ধৃত করে ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ কোটি ৯১ লাখ শ্রমশক্তির মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখের বেশি, অর্থাৎ ৮৪ শতাংশ কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। কৃষিখাতে এই হার ৯৭ শতাংশ, শিল্পে ৮৯ শতাংশ ও সেবা খাতে ৬৭ শতাংশ।
বিবিএস ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলও-কে উদ্ধৃত করে বণিক বার্তা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতের ৯৫ শতাংশ শ্রমিকের কোনো নিয়োগপত্র নেই। নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা পেনশনও।
কৃষিখাতে ন্যূনতম মজুরি বলে কিছু নেই। দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের এই খাতে মজুরি নির্ধারণ হয় চাহিদা এবং জোগানের উপর ভিত্তি করে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বিবিএস-এর একটি পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষ কৃষি শ্রমিকের গড় দৈনিক মজুরি ৬২৫ টাকা আর নারীর ক্ষেত্রে তা ৪৬২ টাকা।
এই বছরের মে দিবসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক সাময়িকী আইস বিজনেস টাইমস জানিয়েছে, প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মী শ্রম আইনের আওতার বাইরে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ, বিলস-এর হিসাবমতে, ২০২৪ সালে অন্তত ৯১ জন নির্মাণশ্রমিক কর্মস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন।
আর সামাজিক নিরাপত্তা? বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানিয়েছে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে এই বছরের ৩০এ এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৫ জন নাগরিক। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এডিবি-এর প্রকল্প নথি মতে, এই স্কিমটি এখনও স্বেচ্ছাভিত্তিক। সেই হিসাবে, এই সংখ্যাটি অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের এক শতাংশেরও কম। তবে এই স্কিমে নিবন্ধিতদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক খাতের মানুষও রয়েছেন, তাই প্রকৃত সংখ্যাটা আরও কম হবে।
তবে, পুরো গল্পটা সাদা-কালো নয়
এই পর্যায়ে এসে একটা কথা বলেই ফেলা যায়, পোশাক শ্রমিকরা অন্যান্য খাতের থেকে অনেক ভালো আছে। তবে হিসাবটা আবার এতটা সরলও নয়।
প্রথমত, ‘অন্য খাতের জন্য মজুরি বোর্ড নেই’ কথাটা ঠিক না। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বোর্ড ৪২টি খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে, কিন্তু পোশাক খাত ছাড়া তা আর কোথাও তেমনভাবে কার্যকর হয় না। সমস্যা হলো, বহু খাতে ঘোষিত মজুরি অনেক পুরানো, আর দারিদ্র্যসীমার বেশ খানিকটা নিচে।
অন্তবর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে গত বছরের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ৩৯টি খাতের অর্ধেকেরও বেশিতে ন্যূনতম মজুরি দারিদ্র্যসীমার নিচে অর্থাৎ মাসে ৭ হাজার ৬৮৯ টাকার কম। ওই প্রতিবেদনে টাইপ ফাউন্ড্রিতে ঘোষিত মজুরি ৫২১ টাকা (শেষবার ঠিক হয়েছিল ১৯৮৩ সালে), পেট্রোল পাম্পে ৭৯২ টাকা (১৯৮৭), হোটেল-রেস্তোরাঁয় ৩ হাজার ৭১০ টাকা (২০১৬)।
বাসস-এর খবরে বলা হয়েছে, গেলো জুলাই মাসে শ্রমমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছিলেন, চা-শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনা হবে অগাস্টে। স্থায়ী চা-শ্রমিকদের বর্তমান দৈনিক মজুরি ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা, মাসের হিসাবে যা ৪ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৫ হাজার ৪০০ টাকার মতো। তবে চা-শ্রমিকেরা ভর্তুকির রেশন আর বাগানের বাসস্থানও পান, যা তাদের বাগান ছেড়ে যাওয়ার পথও কঠিন করে। ডেইলি অবজারভারের ৮ই অগাস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চা-শ্রমিক ইউনিয়ন নতুন মজুরি বোর্ড চেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পোশাক খাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি আসলে সর্বোচ্চ নয়। ২০২৫ সালের দ্য ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্যানারিতে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৮০০ টাকা এবং করাতকলে ১৭ হাজার ৯০০ টাকা। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজভাঙ্গা শিল্পে তা ১৬ হাজার টাকা।
তবে পোশাক খাতের সুবিধাটা কাগজের অঙ্কে নয়, বাস্তবে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিতে বিআইডিস-এর একটি জরিপভিত্তিক গবেষণা বলছে, গার্মেন্টস শ্রমিকরা অন্যান্য উৎপাদন খাতের শ্রমিকদের চেয়ে ১৯ থেকে ২২ শতাংশ বেশি আয় করেন। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে কড়া কমপ্লায়েন্স, আনুষ্ঠানিক কাঠামো এবং দক্ষতা। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং অর্থাৎ উৎপাদন খাতে ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিক ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
তবে পোশাক খাতে সব কারখানার অবস্থা একরকম নয়। সিপিডি’র একজন গবেষককে উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড গত বছর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৮ সালের মজুরি ঘোষণার তিন বছর পরেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পাননি।
ওই একই প্রতিবেদন বলা হয়েছে ৬৯ শতাংশ ট্যানারি সরকারি গ্রেড কাঠামো মানে না। আর ন্যূনতম মজুরি না দিলে শাস্তি ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা এক বছর কারাদণ্ড!
গার্মেন্টস মালিকরা যা বলছেন
রবিবার রয়টার্সকে বিজিএমইএ-এর প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেছেন, ৩০ হাজার টাকার দাবির যৌক্তিক বা গাণিতিক কোনো ভিত্তি নেই। বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে সোমবার বলেছেন, গত কয়েক বছর তারা বছরে ৯ শতাংশ করে ইনক্রিমেন্ট দিয়েছেন; ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমছে, জ্বালানি ও তুলার দাম বাড়ছে, প্রফিট মার্জিন কমছে।
একই দিনে প্রথম আলোতে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মেশিন অপারেটরেরা ওভারটাইম ছাড়া মাসে ১৮ হাজার টাকা পান, অভিজ্ঞরা ২৫ হাজার পর্যন্ত; ১২ হাজার ৫০০ টাকা কেবল হেলপারের জন্য।
বাংলা দৈনিকটি সেদিনেরই আরেকটি প্রতিবেদনে এনবিআর-এর রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পোশাক ও টেক্সটাইল খাত ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কর ছাড় পেয়েছে। এই খাতে কর্পোরেট করহার ১২ শতাংশ, অন্য খাতে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সুবিধাও আছে। সুবিধাটা ঠিক না ভুল, সেটা আলাদা বিতর্ক। কিন্তু ‘সামর্থ্যের’ আলোচনায় সেই হিসাবটাও আসে।
এদিকে শ্রমিকপক্ষের দাবিও এক জায়গায় নেই। বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল বলছে ৩২ হাজার টাকা। আর আর ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন চায় ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা। নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের গোলাম মোয়াজ্জেম মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেছেন, তিন বছর আগেই তারা হিসাব করে দেখেছিলেন বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫০০ টাকা হওয়া দরকার।
তাই পোশাক খাতের মজুরি নির্ধারণ হয়ে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের এপ্রিলে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, তাতে ছিল সব শ্রমিকের জন্য একটা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, গৃহকর্মী-কৃষি শ্রমিকসহ সবার আইনি স্বীকৃতি, আর ডিজিটাল শ্রমিক পরিচয়পত্রের সুপারিশ।
গণমাধ্যমে সেসময়কার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন প্রস্তাব করেছিল খাতভিত্তিক মজুরি কখনও জাতীয় ন্যূনতম মজুরির নিচে থাকবে না। দুই ধরনের মজুরিই তিন বছর পরপর পর্যালোচনা হবে, যা শ্রম আইন সংশোধন হওয়ার পর এখন কার্যকর। তবে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এখনও আইনে পরিণত হয় নাই।
তাই বলা যায়, সংকটটা মূলত মনোযোগের। রাস্তা বন্ধ হলে রাষ্ট্র নড়ে, কারণ তখন সেটা অর্থনীতির সমস্যা। কিন্তু যে শ্রমিক চুপচাপ গ্যারেজ, নির্মাণস্থলে বা কারও বাসায় কাজ করছেন, তার ক্ষোভের কথা কোনো প্রতিবেদনে আসে না।
পোশাক শ্রমিকদের দাবির সুরাহা হোক। কিন্তু সেই শ্রমিকদের কথাও ভাবতে হবে যাদের দাবি জানানোর রাস্তাই নাই। কারণ রাস্তায় নামার সামর্থ্য থাকাও একটা সুবিধা।
অন্য খাতের শ্রমিকের কথাও একটু মনে রাখুন
রাস্তা বন্ধ করে, ভাঙচুর করে, আতঙ্ক আর জনদুর্ভোগ তৈরি করে যে গার্মেন্টস শ্রমিকেরা ক্ষোভ জানাচ্ছেন তারা বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৬ শতাংশেরও কম। বাকী যারা অন্য খাতে কাজ করেন? অনানুষ্ঠানিক খাতের যে ৮৬ শতাংশ চাষের জমিতে, গাড়ি সারানোর গ্যারেজে, নির্মাণস্থলে কিংবা বাসাবাড়িতে কাজ করেন তাদের জীবনমান নিয়ে কে ভাবেন?
পহেলা নভেম্বর, রবিবার। ঢাকার মিরপুর ও আশুলিয়ায় এবং গাজীপুরের রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিক। সেদিন চলেছে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সাথে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া, সংঘর্ষ-ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া। দাবি একটাই, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। ঠিক সেদিনই সরকার ঘোষণা দিলো মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। শ্রমমন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরতে আহ্বান জানালেন। কিন্তু অস্থিরতা আরও ছড়িয়ে পড়লো। চলেছে মঙ্গলবারেও।
মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ রবিবার জানিয়েছিল ৫২৯টি কারখানা বন্ধ আর প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক কাজে যাচ্ছেন না। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের তৃতীয় দিনে এসে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ৬৯০টি।
পোশাক খাতের শ্রমিকদের দাবি শুনে সরকার যেমনই হোক একটা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু অন্য খাতের যেসব শ্রমিকের কথা কেউ শুনছে না, তাদের কী হবে?
ষড়যন্ত্র নাকি বাস্তব দাবি?
সরকারের মুখপাত্র এবং পুলিশের দাবি এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ‘তৃতীয় পক্ষ’, ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ এবং ‘দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র’। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রী মনে করছেন কিছু রাজনৈতিক সংগঠন ইচ্ছে করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সোমবারের প্রতিবেদনে ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশের কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি তৌহিদুল হক উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের আন্দোলনকে কাজে লাগাতে পারে।
গেল ৮ই সেপ্টেম্বরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বিবিএস-এর মজুরি সূচক এক বছর ধরে ৮ শতাংশের আশেপাশে ঘুরছে, আর মজুরি বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির পেছনে পড়ে রয়েছে গত সাড়ে চার বছর ধরে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৫৬ মাস প্রকৃত মজুরি কমে চলছে।
এই সময়ের মধ্যে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ১২ হাজার ৫০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হয়েছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে। প্রথম আলো মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তখন প্রতি ডলারের দাম ছিল ১১০ টাকা ৫০ পয়সা অর্থাৎ ১১৩ ডলার মজুরি। এখন ডলারের দর ১২৪ টাকা, যার মানে মজুরি নেমেছে ১০১ ডলারে।
এর উপর এসেছে, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো। এই বছরের ১লা জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া এই কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে, অর্থাৎ ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। অবশ্য এই নতুন কাঠামো কার্যকর হচ্ছে ধাপে ধাপে। বাড়িভাড়াসহ এই গ্রেডে ন্যূনতম বেতন প্রায় ৩৩ হাজার টাকা।
সিপিডি’র ডিস্টিংগুইশড ফেলো ফাহমিদ খাতুন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে সোমবার বলছেন, সরকারি পে স্কেল ঘোষণার আগেই পোশাক খাতের মজুরি পর্যালোচনা করা উচিৎ ছিল। তার ভাষ্যে, শ্রমিককে ‘রাস্তায় নামার জন্য অপেক্ষা করানো’ ঠিক নয়।
শ্রমিক নেতারাও সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, মজুরি বোর্ড আরও আগে গঠন হলে এই অশান্তি এড়ানো যেতো। আইন সংশোধন করে, মজুরি পর্যালোচনার সময় পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে, সংসদে যে বিল পাস হয়েছে গেল এপ্রিলে। নতুন মজুরি কার্যকর হওয়ার কথা আসছে ডিসেম্বর থেকে অথচ বোর্ড গঠন হয়েছে ১লা নভেম্বরে। আর সেই বোর্ড কবে সুপারিশ দিবে তা স্পষ্ট নয়।
রাস্তার বাইরের বাংলাদেশ
সায়ত্ত্বশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিআইডিএস-এর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে পোশাক খাতে শ্রমিকের সংখ্যা ৪২ লাখ ২০ হাজারের মতো। যা দেশের মোট শ্রমশক্তির তুলনায় একটা ছোট অংশ।
বিবিএস-এর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-কে উদ্ধৃত করে ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ কোটি ৯১ লাখ শ্রমশক্তির মধ্যে ৫ কোটি ৮০ লাখের বেশি, অর্থাৎ ৮৪ শতাংশ কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে। কৃষিখাতে এই হার ৯৭ শতাংশ, শিল্পে ৮৯ শতাংশ ও সেবা খাতে ৬৭ শতাংশ।
বিবিএস ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলও-কে উদ্ধৃত করে বণিক বার্তা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অনানুষ্ঠানিক খাতের ৯৫ শতাংশ শ্রমিকের কোনো নিয়োগপত্র নেই। নেই নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যবিমা কিংবা পেনশনও।
কৃষিখাতে ন্যূনতম মজুরি বলে কিছু নেই। দ্য ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের এই খাতে মজুরি নির্ধারণ হয় চাহিদা এবং জোগানের উপর ভিত্তি করে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বিবিএস-এর একটি পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষ কৃষি শ্রমিকের গড় দৈনিক মজুরি ৬২৫ টাকা আর নারীর ক্ষেত্রে তা ৪৬২ টাকা।
এই বছরের মে দিবসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ক সাময়িকী আইস বিজনেস টাইমস জানিয়েছে, প্রায় ২০ লাখ গৃহকর্মী শ্রম আইনের আওতার বাইরে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ, বিলস-এর হিসাবমতে, ২০২৪ সালে অন্তত ৯১ জন নির্মাণশ্রমিক কর্মস্থলে প্রাণ হারিয়েছেন।
আর সামাজিক নিরাপত্তা? বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানিয়েছে, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে এই বছরের ৩০এ এপ্রিল পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৫ জন নাগরিক। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এডিবি-এর প্রকল্প নথি মতে, এই স্কিমটি এখনও স্বেচ্ছাভিত্তিক। সেই হিসাবে, এই সংখ্যাটি অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকের এক শতাংশেরও কম। তবে এই স্কিমে নিবন্ধিতদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক খাতের মানুষও রয়েছেন, তাই প্রকৃত সংখ্যাটা আরও কম হবে।
তবে, পুরো গল্পটা সাদা-কালো নয়
এই পর্যায়ে এসে একটা কথা বলেই ফেলা যায়, পোশাক শ্রমিকরা অন্যান্য খাতের থেকে অনেক ভালো আছে। তবে হিসাবটা আবার এতটা সরলও নয়।
প্রথমত, ‘অন্য খাতের জন্য মজুরি বোর্ড নেই’ কথাটা ঠিক না। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই বোর্ড ৪২টি খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে, কিন্তু পোশাক খাত ছাড়া তা আর কোথাও তেমনভাবে কার্যকর হয় না। সমস্যা হলো, বহু খাতে ঘোষিত মজুরি অনেক পুরানো, আর দারিদ্র্যসীমার বেশ খানিকটা নিচে।
অন্তবর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে গত বছরের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ৩৯টি খাতের অর্ধেকেরও বেশিতে ন্যূনতম মজুরি দারিদ্র্যসীমার নিচে অর্থাৎ মাসে ৭ হাজার ৬৮৯ টাকার কম। ওই প্রতিবেদনে টাইপ ফাউন্ড্রিতে ঘোষিত মজুরি ৫২১ টাকা (শেষবার ঠিক হয়েছিল ১৯৮৩ সালে), পেট্রোল পাম্পে ৭৯২ টাকা (১৯৮৭), হোটেল-রেস্তোরাঁয় ৩ হাজার ৭১০ টাকা (২০১৬)।
বাসস-এর খবরে বলা হয়েছে, গেলো জুলাই মাসে শ্রমমন্ত্রী সংসদকে জানিয়েছিলেন, চা-শ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনা হবে অগাস্টে। স্থায়ী চা-শ্রমিকদের বর্তমান দৈনিক মজুরি ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা, মাসের হিসাবে যা ৪ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৫ হাজার ৪০০ টাকার মতো। তবে চা-শ্রমিকেরা ভর্তুকির রেশন আর বাগানের বাসস্থানও পান, যা তাদের বাগান ছেড়ে যাওয়ার পথও কঠিন করে। ডেইলি অবজারভারের ৮ই অগাস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চা-শ্রমিক ইউনিয়ন নতুন মজুরি বোর্ড চেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পোশাক খাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি আসলে সর্বোচ্চ নয়। ২০২৫ সালের দ্য ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্যানারিতে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৮০০ টাকা এবং করাতকলে ১৭ হাজার ৯০০ টাকা। বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজভাঙ্গা শিল্পে তা ১৬ হাজার টাকা।
তবে পোশাক খাতের সুবিধাটা কাগজের অঙ্কে নয়, বাস্তবে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিতে বিআইডিস-এর একটি জরিপভিত্তিক গবেষণা বলছে, গার্মেন্টস শ্রমিকরা অন্যান্য উৎপাদন খাতের শ্রমিকদের চেয়ে ১৯ থেকে ২২ শতাংশ বেশি আয় করেন। কারণ হিসাবে বলা হয়েছে কড়া কমপ্লায়েন্স, আনুষ্ঠানিক কাঠামো এবং দক্ষতা। একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ম্যানুফ্যাকচারিং অর্থাৎ উৎপাদন খাতে ইউনিয়নভুক্ত শ্রমিক ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
তবে পোশাক খাতে সব কারখানার অবস্থা একরকম নয়। সিপিডি’র একজন গবেষককে উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড গত বছর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৮ সালের মজুরি ঘোষণার তিন বছর পরেও ৪০ শতাংশ শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি পাননি।
ওই একই প্রতিবেদন বলা হয়েছে ৬৯ শতাংশ ট্যানারি সরকারি গ্রেড কাঠামো মানে না। আর ন্যূনতম মজুরি না দিলে শাস্তি ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা এক বছর কারাদণ্ড!
গার্মেন্টস মালিকরা যা বলছেন
রবিবার রয়টার্সকে বিজিএমইএ-এর প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেছেন, ৩০ হাজার টাকার দাবির যৌক্তিক বা গাণিতিক কোনো ভিত্তি নেই। বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে সোমবার বলেছেন, গত কয়েক বছর তারা বছরে ৯ শতাংশ করে ইনক্রিমেন্ট দিয়েছেন; ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমছে, জ্বালানি ও তুলার দাম বাড়ছে, প্রফিট মার্জিন কমছে।
একই দিনে প্রথম আলোতে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, মেশিন অপারেটরেরা ওভারটাইম ছাড়া মাসে ১৮ হাজার টাকা পান, অভিজ্ঞরা ২৫ হাজার পর্যন্ত; ১২ হাজার ৫০০ টাকা কেবল হেলপারের জন্য।
বাংলা দৈনিকটি সেদিনেরই আরেকটি প্রতিবেদনে এনবিআর-এর রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পোশাক ও টেক্সটাইল খাত ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকার কর ছাড় পেয়েছে। এই খাতে কর্পোরেট করহার ১২ শতাংশ, অন্য খাতে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সুবিধাও আছে। সুবিধাটা ঠিক না ভুল, সেটা আলাদা বিতর্ক। কিন্তু ‘সামর্থ্যের’ আলোচনায় সেই হিসাবটাও আসে।
এদিকে শ্রমিকপক্ষের দাবিও এক জায়গায় নেই। বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল বলছে ৩২ হাজার টাকা। আর আর ৩৫টি শ্রমিক ফেডারেশন চায় ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা। নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের গোলাম মোয়াজ্জেম মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেছেন, তিন বছর আগেই তারা হিসাব করে দেখেছিলেন বেঁচে থাকার মতো ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫০০ টাকা হওয়া দরকার।
তাই পোশাক খাতের মজুরি নির্ধারণ হয়ে গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের এপ্রিলে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, তাতে ছিল সব শ্রমিকের জন্য একটা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, গৃহকর্মী-কৃষি শ্রমিকসহ সবার আইনি স্বীকৃতি, আর ডিজিটাল শ্রমিক পরিচয়পত্রের সুপারিশ।
গণমাধ্যমে সেসময়কার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন প্রস্তাব করেছিল খাতভিত্তিক মজুরি কখনও জাতীয় ন্যূনতম মজুরির নিচে থাকবে না। দুই ধরনের মজুরিই তিন বছর পরপর পর্যালোচনা হবে, যা শ্রম আইন সংশোধন হওয়ার পর এখন কার্যকর। তবে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এখনও আইনে পরিণত হয় নাই।
তাই বলা যায়, সংকটটা মূলত মনোযোগের। রাস্তা বন্ধ হলে রাষ্ট্র নড়ে, কারণ তখন সেটা অর্থনীতির সমস্যা। কিন্তু যে শ্রমিক চুপচাপ গ্যারেজ, নির্মাণস্থলে বা কারও বাসায় কাজ করছেন, তার ক্ষোভের কথা কোনো প্রতিবেদনে আসে না।
পোশাক শ্রমিকদের দাবির সুরাহা হোক। কিন্তু সেই শ্রমিকদের কথাও ভাবতে হবে যাদের দাবি জানানোর রাস্তাই নাই। কারণ রাস্তায় নামার সামর্থ্য থাকাও একটা সুবিধা।