ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল থেকে চলা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। মেট্রোরেল চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
আলাপ রিপোর্ট
প্রকাশ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৩ পিএমআপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৭ পিএম
বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকেরা সড়কে বেঞ্চ ও কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালান।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিরপুরে এক পুলিশ সদস্যকে মারধর করে তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে দেশের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
সকাল থেকে চলা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। মেট্রোরেল চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিকেরা মিরপুর-১১ নাম্বার মেট্রোস্টেশনের নিচে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। মিরপুর-১০, নান্না মার্কেট এলাকার বিভিন্ন গলি ও মিরপুর-১২ নাম্বারের দিক থেকে দলে দলে শ্রমিকেরা এসে আন্দোলনে যোগ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রথম আলো বলছে, মিরপুর-১১ নাম্বার মেট্রোস্টেশনের পশ্চিম পাশে পুলিশ অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা তিন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকেরা সড়কে বেঞ্চ ও কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। পাশাপাশি শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পিওএম-দক্ষিণ) মো. তৌহিদুল আরিফ বলেন, “সকালে কিছু ব্যক্তি মিরপুর-১১ নাম্বার সড়কে অবরোধ ও ব্যারিকেড দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পুলিশ তাদের কঠোর হাতে দমন করে।”
তার দাবি, আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রকৃত পোশাকশ্রমিকের বাইরে অন্য ব্যক্তিরাও ছিলেন এবং তাদের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে তাদের পরিচয় তদন্তের পর জানা যাবে বলে তিনি জানান।
কালশীতে পুলিশ সদস্যকে মারধর, অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
মিরপুরের কালশী সড়কে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের হাতে এক পুলিশ সদস্য মারধরের শিকার হন ও তার অস্ত্রও ছিনিয়ে নেয়া হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে মিরপুর-১১ নাম্বার মেট্রোস্টেশন থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে কালশী সড়কে একটি সুপারশপের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
ওই এলাকার একটি বাসার বারান্দা থেকে ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন এক নারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করছিল। একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আন্দোলনকারীদের মাঝখানে পড়ে যান।”
“বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ এক পুলিশ সদস্যকে মাটিতে ফেলে মারধর করে। তাদের একজন তার বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেন। পরে কয়েকজন ব্যক্তি ওই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশনের দিকে পাঠিয়ে দেন”, ওই নারী বলেন।
ঘটনাস্থলের একটি সুপারশপের কর্মীও পুলিশ সদস্যকে মারধরের বিষয়টি দেখেছেন বলে জানান। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার তৌহিদুল আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, “তারা তখনো ঘটনাটি সম্পর্কে জানতেন না। খোঁজ নিয়ে পরে কথা বলতে পারবেন।”
আশুলিয়ার নরসিংহপুরেও সংঘর্ষ, দোকান ভাঙচুর
রাজধানীর বাইরে সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে কয়েকটি স্থানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে বের হয়ে সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় বাইপাইলে একাধিক দোকান ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের পর আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।
শ্রমিক অসন্তোষে ৩০৬ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
শ্রমিকেরা কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকেরা। এসব কারখানায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বিজিএমইএর তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল গাজীপুর ও ময়মনসিংহে। এ দুই এলাকায় ১৬১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, যেখানে প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৯৩টি এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে মঙ্গলবার ১ হাজার ৮২৮টি চালু ছিল। অর্থাৎ সদস্যভুক্ত প্রায় ১৪ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
গ্রেপ্তার ৩৩ জন
পোশাকশ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৩ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ মঙ্গলবার সকালে এক বার্তায় জানিয়েছিল, “আগের ২৪ ঘণ্টায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এসব সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানানো হয়নি।
নাশকতা ঠেকাতে মাঠে যুবদল-ছাত্রদল
মিরপুর-১১ নাম্বার এলাকায় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।
পল্লবী থানা যুবদলের আহ্বায়ক নূর সালাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “পোশাকশ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছেন, এটা তাদের অধিকার। এ নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে তার অভিযোগ, আন্দোলনে ঢুকে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভাঙচুর ও নাশকতা চালাচ্ছেন।”
“এই নাশকতা ঠেকাতে আমরা মাঠে নেমেছি। গতকালও আমরা তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি”, বলেন তিনি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলছে, মিরপুর-১০ নাম্বার গোলচত্বরে পৌনে ১২টার পর যুবদলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। তাদের হাতে স্টাম্প ও লাঠিসোঁটা দেখা যায়।
পল্লবী থানার সাবেক সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ মল্লিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এই আন্দোলন করা হয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের রুখতে থানা বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছেন।”
শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ি এলাকায় ১০ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় ২ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন ছিলেন। আশুলিয়া ও মিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে লাইভ মনিটরিং চালু করা হয়। বিজিবি সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল থেকে এসব ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টার কথা বললেন তথ্য উপদেষ্টা
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ ধরনের নাশকতার চেষ্টা শুধু ডিসেম্বরকে ঘিরে নয়, শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন চলতে পারে। তবে সরকার এসব চেষ্টা প্রতিহত করবে।”
জাহেদ উর রহমান বলেন, “শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার আগেভাগে মজুরি কমিশন গঠন করেছে। ফলে আন্দোলনের মূল দাবির সমাধান হওয়ার কথা।”
তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পাঁচ বছর পরপর পর্যালোচনার কথা। ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে মজুরি পর্যালোচনা হয়েছে। সে হিসাবে ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি কমিশন গঠনের কথা ছিল না। এরপরও সরকার শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় কমিশন করেছে।
আন্দোলনে সহিংস আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই প্রকৃত পোশাকশ্রমিকদের হতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার অধীনস্থ বাহিনীগুলোর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, এসব ঘটনার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন রয়েছে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন কোনো কিছু করতে পারবে বলে সরকার বিশ্বাস করে না। তবে দলটির কাছে বিপুল অর্থ রয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। এর সঙ্গে ডিসেম্বরের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত নন। তবে শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।
শ্রমিক আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের বাইরে অন্যদের অংশগ্রহণ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার আগের মতো বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমাতে চায় না। এসব তরুণও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করছে সরকার। অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির অবসান হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উসকানি কঠোর হাতে দমনের হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করতে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে পোশাক কারখানার মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে, যেন গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যাহত হয়। এটা আমরা কঠোর হাতে দমন করব।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ পোশাক কারখানা বন্ধ করার জন্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাংবাদিকেরা অনেক কারখানা বন্ধ থাকার বিষয়টি জানালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আশা করা যায়, এগুলো খুব শিগগিরই খোলার ব্যবস্থা করা হবে।”
সোমবার প্রায় সব শ্রমিক সংগঠনের নেতা, পোশাক কারখানার মালিক এবং ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, আলোচনায় সবাই সন্তুষ্ট হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু দুষ্কৃতকারী হামলার চেষ্টা করতে পারে। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া পূরণ করা হয়েছে এবং মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন মজুরি বোর্ডে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ নিয়ে দর-কষাকষি হবে।
তিনি বলেন, এখন অস্থিরতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং রাজনৈতিক হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কোনো মহল অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করা হবে।
নারায়ণগঞ্জে দ্বিতীয় দিনেও সড়ক অবরোধ, যানজট
মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। সোমবারও একই এলাকায় অবরোধ করেছিলেন তারা।
সকাল ১১টা থেকে শ্রমিকেরা দফায় দফায় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। পরে বেলা তিনটার দিকে আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে সড়কে নামেন এবং অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে সড়কের দুই পাশে বহু যানবাহন আটকে পড়ে।
পুলিশ ১৫ মিনিটের মধ্যে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। তবে কিছুক্ষণ পর শ্রমিকেরা আবারও অবরোধ করেন।
অবরোধ প্রতিহত করতে পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য।
দুপুরের পর পরিস্থিতি শান্ত, মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক
মিরপুরে সকাল থেকে সংঘর্ষ ও অবরোধ চললেও বেলা পৌনে ১২টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ এলাকায় যানবাহন চলাচল এবং জনজীবন স্বাভাবিক হতে থাকে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করে।
সকাল থেকে বন্ধ থাকা মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনও বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলে দেওয়া হয়। শুরুতে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ স্টেশনে ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হলেও দুপুরের পর মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক হয়।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল এবং অন্য স্টেশনগুলোতে যাত্রী ওঠানামা স্বাভাবিক ছিল। ডিএমটিসিএল এ ধরনের ব্যবস্থাকে ‘স্টেশন স্কিপ’ বলে। অর্থাৎ মেট্রোরেল চলাচল করে, কিন্তু নির্দিষ্ট স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকে।
এর আগে গত রবিবার কাজীপাড়া, মিরপুর-১০ ও পল্লবী মেট্রোস্টেশন দুই ঘণ্টার বেশি সময় বন্ধ রাখা হয়েছিল।
মজুরি বাড়ানোর দাবিতে টানা তিনদিন উত্তপ্ত রাজপথ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সকাল থেকে চলা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। মেট্রোরেল চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার সকালে ঢাকার মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মিরপুরে এক পুলিশ সদস্যকে মারধর করে তার অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাবে দেশের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
সকাল থেকে চলা বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে দুপুরের পর পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। মেট্রোরেল চলাচলও স্বাভাবিক হয়।
মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শ্রমিকেরা মিরপুর-১১ নাম্বার মেট্রোস্টেশনের নিচে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। মিরপুর-১০, নান্না মার্কেট এলাকার বিভিন্ন গলি ও মিরপুর-১২ নাম্বারের দিক থেকে দলে দলে শ্রমিকেরা এসে আন্দোলনে যোগ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রথম আলো বলছে, মিরপুর-১১ নাম্বার মেট্রোস্টেশনের পশ্চিম পাশে পুলিশ অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা তিন দিক থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
বিক্ষোভ চলাকালে শ্রমিকেরা সড়কে বেঞ্চ ও কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বালান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। পাশাপাশি শ্রমিকদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (পিওএম-দক্ষিণ) মো. তৌহিদুল আরিফ বলেন, “সকালে কিছু ব্যক্তি মিরপুর-১১ নাম্বার সড়কে অবরোধ ও ব্যারিকেড দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পুলিশ তাদের কঠোর হাতে দমন করে।”
তার দাবি, আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রকৃত পোশাকশ্রমিকের বাইরে অন্য ব্যক্তিরাও ছিলেন এবং তাদের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে তাদের পরিচয় তদন্তের পর জানা যাবে বলে তিনি জানান।
কালশীতে পুলিশ সদস্যকে মারধর, অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
মিরপুরের কালশী সড়কে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের হাতে এক পুলিশ সদস্য মারধরের শিকার হন ও তার অস্ত্রও ছিনিয়ে নেয়া হয়।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে মিরপুর-১১ নাম্বার মেট্রোস্টেশন থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে কালশী সড়কে একটি সুপারশপের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
ওই এলাকার একটি বাসার বারান্দা থেকে ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন এক নারী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করছিল। একপর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আন্দোলনকারীদের মাঝখানে পড়ে যান।”
“বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ এক পুলিশ সদস্যকে মাটিতে ফেলে মারধর করে। তাদের একজন তার বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে রাস্তায় ফেলে দেন। পরে কয়েকজন ব্যক্তি ওই পুলিশ সদস্যকে উদ্ধার করে মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশনের দিকে পাঠিয়ে দেন”, ওই নারী বলেন।
ঘটনাস্থলের একটি সুপারশপের কর্মীও পুলিশ সদস্যকে মারধরের বিষয়টি দেখেছেন বলে জানান। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার তৌহিদুল আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, “তারা তখনো ঘটনাটি সম্পর্কে জানতেন না। খোঁজ নিয়ে পরে কথা বলতে পারবেন।”
আশুলিয়ার নরসিংহপুরেও সংঘর্ষ, দোকান ভাঙচুর
রাজধানীর বাইরে সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে কয়েকটি স্থানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়।
সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে বের হয়ে সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় বাইপাইলে একাধিক দোকান ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের পর আশপাশের বেশ কয়েকটি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।
শ্রমিক অসন্তোষে ৩০৬ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ
শ্রমিকেরা কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকেরা। এসব কারখানায় প্রায় সাত লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বিজিএমইএর তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল গাজীপুর ও ময়মনসিংহে। এ দুই এলাকায় ১৬১টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, যেখানে প্রায় ৪ লাখ ২৯ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন।
এ ছাড়া সাভারের আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৯৩টি এবং রাজধানীর মিরপুরে ৫২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে মঙ্গলবার ১ হাজার ৮২৮টি চালু ছিল। অর্থাৎ সদস্যভুক্ত প্রায় ১৪ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
গ্রেপ্তার ৩৩ জন
পোশাকশ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৩৩ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ মঙ্গলবার সকালে এক বার্তায় জানিয়েছিল, “আগের ২৪ ঘণ্টায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এসব সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় প্রাথমিকভাবে জানানো হয়নি।
নাশকতা ঠেকাতে মাঠে যুবদল-ছাত্রদল
মিরপুর-১১ নাম্বার এলাকায় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।
পল্লবী থানা যুবদলের আহ্বায়ক নূর সালাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, “পোশাকশ্রমিকেরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করছেন, এটা তাদের অধিকার। এ নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা নেই। তবে তার অভিযোগ, আন্দোলনে ঢুকে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা ভাঙচুর ও নাশকতা চালাচ্ছেন।”
“এই নাশকতা ঠেকাতে আমরা মাঠে নেমেছি। গতকালও আমরা তিনজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি”, বলেন তিনি।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলছে, মিরপুর-১০ নাম্বার গোলচত্বরে পৌনে ১২টার পর যুবদলের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। তাদের হাতে স্টাম্প ও লাঠিসোঁটা দেখা যায়।
পল্লবী থানার সাবেক সাধারণ সম্পাদক বুলবুল আহমেদ মল্লিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এই আন্দোলন করা হয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত আন্দোলন। আন্দোলনকারীদের রুখতে থানা বিএনপিসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে নেমেছেন।”
শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন
শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর ও কোনাবাড়ি এলাকায় ১০ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় ২ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন ছিলেন। আশুলিয়া ও মিরপুরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ও বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে লাইভ মনিটরিং চালু করা হয়। বিজিবি সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল থেকে এসব ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টার কথা বললেন তথ্য উপদেষ্টা
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ ধরনের নাশকতার চেষ্টা শুধু ডিসেম্বরকে ঘিরে নয়, শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন চলতে পারে। তবে সরকার এসব চেষ্টা প্রতিহত করবে।”
জাহেদ উর রহমান বলেন, “শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার আগেভাগে মজুরি কমিশন গঠন করেছে। ফলে আন্দোলনের মূল দাবির সমাধান হওয়ার কথা।”
তিনি বলেন, পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পাঁচ বছর পরপর পর্যালোচনার কথা। ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে মজুরি পর্যালোচনা হয়েছে। সে হিসাবে ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি কমিশন গঠনের কথা ছিল না। এরপরও সরকার শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় কমিশন করেছে।
আন্দোলনে সহিংস আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই প্রকৃত পোশাকশ্রমিকদের হতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার অধীনস্থ বাহিনীগুলোর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, এসব ঘটনার পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন রয়েছে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন কোনো কিছু করতে পারবে বলে সরকার বিশ্বাস করে না। তবে দলটির কাছে বিপুল অর্থ রয়েছে, যা দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। এর সঙ্গে ডিসেম্বরের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চিত নন। তবে শেখ হাসিনা যত দিন বেঁচে থাকবেন, তত দিন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে।
শ্রমিক আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের বাইরে অন্যদের অংশগ্রহণ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার আগের মতো বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন দমাতে চায় না। এসব তরুণও রাষ্ট্রের নাগরিক। তাই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি যতটা সম্ভব কম রাখার চেষ্টা করছে সরকার। অল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির অবসান হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উসকানি কঠোর হাতে দমনের হুঁশিয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
পোশাক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করতে রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে পোশাক কারখানার মজুরি নিয়ে শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য কোনো কোনো মহল উসকানি দিচ্ছে, যেন গার্মেন্টসের উৎপাদন ব্যাহত হয়। এটা আমরা কঠোর হাতে দমন করব।”
তিনি আরও বলেন, “কেউ পোশাক কারখানা বন্ধ করার জন্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালালে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাংবাদিকেরা অনেক কারখানা বন্ধ থাকার বিষয়টি জানালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আশা করা যায়, এগুলো খুব শিগগিরই খোলার ব্যবস্থা করা হবে।”
সোমবার প্রায় সব শ্রমিক সংগঠনের নেতা, পোশাক কারখানার মালিক এবং ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়েছিল বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, আলোচনায় সবাই সন্তুষ্ট হয়েছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিছু দুষ্কৃতকারী হামলার চেষ্টা করতে পারে। শ্রমিকদের দাবিদাওয়া পূরণ করা হয়েছে এবং মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখন মজুরি বোর্ডে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ নিয়ে দর-কষাকষি হবে।
তিনি বলেন, এখন অস্থিরতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং রাজনৈতিক হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কোনো মহল অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোর হাতে দমন করা হবে।
নারায়ণগঞ্জে দ্বিতীয় দিনেও সড়ক অবরোধ, যানজট
মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন পোশাকশ্রমিকেরা। সোমবারও একই এলাকায় অবরোধ করেছিলেন তারা।
সকাল ১১টা থেকে শ্রমিকেরা দফায় দফায় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। পরে বেলা তিনটার দিকে আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে সড়কে নামেন এবং অবরোধ সৃষ্টি করেন। এতে সড়কের দুই পাশে বহু যানবাহন আটকে পড়ে।
পুলিশ ১৫ মিনিটের মধ্যে শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। তবে কিছুক্ষণ পর শ্রমিকেরা আবারও অবরোধ করেন।
অবরোধ প্রতিহত করতে পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য।
দুপুরের পর পরিস্থিতি শান্ত, মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক
মিরপুরে সকাল থেকে সংঘর্ষ ও অবরোধ চললেও বেলা পৌনে ১২টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ এলাকায় যানবাহন চলাচল এবং জনজীবন স্বাভাবিক হতে থাকে। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলতে শুরু করে।
সকাল থেকে বন্ধ থাকা মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনও বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খুলে দেওয়া হয়। শুরুতে মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ স্টেশনে ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হলেও দুপুরের পর মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক হয়।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল এবং অন্য স্টেশনগুলোতে যাত্রী ওঠানামা স্বাভাবিক ছিল। ডিএমটিসিএল এ ধরনের ব্যবস্থাকে ‘স্টেশন স্কিপ’ বলে। অর্থাৎ মেট্রোরেল চলাচল করে, কিন্তু নির্দিষ্ট স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ থাকে।
এর আগে গত রবিবার কাজীপাড়া, মিরপুর-১০ ও পল্লবী মেট্রোস্টেশন দুই ঘণ্টার বেশি সময় বন্ধ রাখা হয়েছিল।
বিষয়: