সরকার ধার করা বাড়িয়েছে, কমেছে বেসরকারি ঋণ - বিনিয়োগ স্থবির

সরকার মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে নতুন করে সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে । আড়াই হাজার কোটি টাকা এসেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকেও - যেটাও মূলত ঋণ। ওদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এত কমেছে যে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে গেছে।

আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩২ পিএম

সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক গঠন প্রক্রিয়া, নির্বাচন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ মেটাতে আবারও দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে সরকার। এই চাপ সামলাতে না পেরে সংশোধিত বাজেটে বাড়ানো হয়েছে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রাও। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বিল, বন্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও দেশের ভেতরের অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনীতিতে। বাড়বে ব্যাংক সুদের হারে। যার প্রভাব পড়বে ব্যবসায়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ মূল্যস্ফীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইতোমধ্যেই ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। অর্থাৎ উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে আগ্রহী হচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। 

এমন অবস্থায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে দেশের ভেতরের উৎস থেকে যে ঋণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল সংশোধিত বাজেটে তার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

বাজেটের আকার ২ হাজার কোটি টাকা কমলেও অন্তবর্তীকালীন সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। যার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকেই।

নভেম্বরের শেষ ও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ - অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ব্যাংক থেকে নতুন করে সাড়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। আড়াই হাজার কোটি টাকা এসেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকেও। 

এছাড়া ট্রেজারি বন্ডের দুটি অতিরিক্ত নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে সরকার তুলেছে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

ঋণ লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি এবং সরকারের হঠাৎ ব্যাংক ঋণ নেওয়া বাড়িয়ে দেওয়া ব্যাবসা ও অর্থনীতিতে সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

আলাপকে বলেন, “সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া এবং ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব না ফেললেও সুদূর প্রসারী প্রভাব ফেলবে। আমরা অতীতেও দেখেছি সরকার যখনই ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়ে দেয় তখন বেড়ে যায় সুদের হার। ব্যাংকে তারল্যের সংকট তৈরি হলে ব্যবসা সংকটে পড়বে।”

ব্যবসায়িক এই নেতা আরও বলেন, “সরকারের ঋণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতি আগামী সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলবে। এর দায় বর্তমান সরকারের। তাদের অনেক পলিসিই ব্যবসা বান্ধব নয়। তারা পলিসি করার আগে আমাদের (ব্যবসায়ী) সঙ্গে পরামর্শ করছেন না। আমরা কিছু বললেও আইএমএম এবং এলডিসি গ্রাজুয়েশনের দোহাই দিচ্ছেন।” 

নতুন করে ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ

আগের লক্ষ্যমাত্রা থেকে সরে এসে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ঘোষিত বাজেটে দেশের ভেতর থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। যার মধ্য থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে এবং বাকি ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাত থেকে নেয়ার লক্ষ্য ছিল। 

ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক খাতের মধ্যে শুধু সঞ্চয়পত্র থেকেই নেয়ার লক্ষ্য ছিল ১২,৫০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারের অন্যান্য উৎস যেমন ট্রেজারি বিল, বন্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড, মিউচুয়াল ফান্ডসহ অন্যান্য উৎস থেকে নেয়ার কথা। 

তবে গত বুধবার সরকার অনুমোদিত সংশোধিত বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের এই লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি করে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। 

অর্থাৎ সংশোধিত বাজেটে সরকার দেশীয় উৎস থেকে আরও ১২,০০০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ঋণ নেয়ার কথা ভাবছে। 

সংশোধিত বাজেটে সরকার দেশীয় উৎস থেকে আরও ১২,০০০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ঋণ নেয়ার কথা ভাবছে

বাড়ছে ব্যাংক ঋণ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ১লা জুলাই থেকে ২৪এ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল মাত্র ৯ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা।

তবে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ শেষে সরকারের ব্যাংক থেকে ধার করেছে ৩৩ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান আলাপকে জানান, ৮ই ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪৫,২৩৯ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, মাত্র সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যেই প্রাথমিক বাজেটে ঠিক করা অভ্যন্তরীণ ঋণ লক্ষ্যমাত্রার ৪৩ শতাংশ নিয়ে ফেলেছে অন্তবর্তীকালীন সরকার।

সংশোধিত বাজেটের হিসাবে সরকারের ব্যাংক ঋণের এই পরিমাণ কত তা জানাতে পারেননি তিনি। তবে নিশ্চিতভাবেই সরকারের ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়বে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে এতে বেসরকারি ঋণগ্রহীতারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে সবার জন্য ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে সতর্ক থাকতে হবে।”

বাড়ছে সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগ 

গত কয়েক মাস ধরে বিল, বন্ডের সুদহার কমতির দিকে। এ কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়ছে। যা সরকারের জন্য এক ধরনের দায়। 

চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সঞ্চয়পত্র থেকে নিট দুই হাজার ৩৬৯ কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে সরকার। 

সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রি থেকে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে এবং মেয়াদের আগে ভাঙানো অংশ বাদ দিয়ে নিট বিক্রির হিসাব করা হয়।

গত অর্থবছর শেষে এই নিট বিক্রি ঋণ ঋণাত্মক ছিল। অর্থাৎ গত তিন অর্থবছর ধরে সঞ্চয়পত্র ভাঙানোর চেয়ে বিক্রি কম ছিল। যে কারণে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। 

সব মিলিয়ে গত অক্টোবরের শেষে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪০ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছর সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ছয় হাজার ৬৩ কোটি টাকা কমে সরকারের ঋণস্থিতি ছিল তিন লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা।

দেশের ভেতরের অন্যান্য উৎস থেকে সরকারের ঋণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলবে দেশের অর্থনীতিতে

অন্যান্য উৎস থেকে ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ ডিসেম্বর নির্ধারিত ক্যালেন্ডারের বাইরে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল নিলামের মাধ্যমে সরকার ৫,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। 

এর আগে, নভেম্বরের শেষ দিকে পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড নিলামের মাধ্যমে আরও ৫,০০০ কোটি টাকা তোলা হয়।

গত জুন শেষে ট্রেজারি বিল বন্ডে ব্যক্তি, করপোরেট বডি, প্রভিডেন্ট, পেনশন ফান্ডের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের জুন শেষে যা ছিল মাত্র ২৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। 

বেসরকারি খাতে প্রভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬ দশমিক ২৩ শতাংশে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ। 

অথচ এই অর্থবছরে সরকারের বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধির টার্গেট ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর মানে স্থবির অবস্থায় রয়েছে দেশের বিনিয়োগ। 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “নতুন বিনিয়োগ না করা হলে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করা কমে যায়। তখন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমে যায়। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে নতুন বিনিয়োগে দুর্বলতা।” 

এ নিয়ে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “আসলে আমরা এখন স্বাভাবিক জীবনে নেই, আইসিইউতে রয়েছি। এ অবস্থায় সরকারের ব্যাংক ঋণ বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারবে না। তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।”

“একদিকে সুদের হার বাড়তি। অন্যদিকে চক্রবৃদ্ধি ভাবে সুদের হারের কারণে নতুন করে কেউ ঋণ নিতে আগ্রহী নয়। অন্যদিকে ব্যাক টু ব্যাক এলসি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে নির্ধারিত সময়ে আমরা পণ্য আমদানি করতে পারছি না।”

মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব

ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, ট্রেজারি বিল থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নেয়ায় সরকারের মোট ঋণ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর এই বিপুল অর্থ প্রভাব ফেলবে বাজারে। 

অর্থনীতির সূত্রে বাজারে তারল্য অর্থাৎ নগদ অর্থ বাড়লে মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব পড়ে। 

তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা। 

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, বাড়তি ঋণ গ্রহণ যেন মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে না তোলে, সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

তিনি জানান, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে ২০ হাজার কোটি টাকার মূলধন সহায়তা দেওয়ার কারণে স্বল্পমেয়াদি তারল্য চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই অর্থ ব্যবস্থাপনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। 

বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ বা ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলে। তবে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে সরাসরি নতুন মুদ্রা তৈরি হয় না, তাই এটি সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়াতে সাহায্য করে না। তবে এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ কমে যায়, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত করে। 

আর উৎপাদন কমে গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ হ্রাস পায়, যা পরোক্ষভাবে দাম বা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।