সংস্কৃতিতে ‘কম’ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন, বাড়ানোর দাবি কয়েকগুণ
গণগ্রন্থাগারে বই সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে অর্থাভাব–এমন বাস্তবতায় আবারও সামনে এসেছে সংস্কৃতি খাতে সরকারি বিনিয়োগের প্রশ্ন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৮২৬ কোটি টাকা। সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন, সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণের এই খাত কেন এখনো বাজেটের প্রান্তিক অবস্থানে?
রিয়াজুল বাশার
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএমআপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাজেট এখনো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
গণগ্রন্থাগারগুলোতে বই ও সেবার সংকট, বহু লাইব্রেরি ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা, ডিজিটাল সুবিধা ও ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, আর পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ক্ষয়ে যাচ্ছে- বাংলাদেশের এসব বাস্তবতা প্রায়ই উঠে আসে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
এই প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে বারবার।
কিন্তু সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাজেট এখনো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা, যা চলমান অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২ কোটি টাকা বেশি।
তবে সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি ছিলো, এর চেয়ে অনেক বড় বেশি। তাদের ভাষ্য, শুধু সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রাখা নয়, বরং সমাজ গঠনের কার্যকর শক্তি হিসেবে সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
“কয়েকশো কোটি নয়, সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দ দরকার হাজার হাজার কোটি টাকা,” আলাপ-কে বলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ।
সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সামাজিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা ও উগ্রপন্থার বিস্তার ঠেকিয়ে মানবিক ও সহনশীল সমাজ গঠনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা মৌলিক।
আর সেই মৌলিক সক্ষমতা তৈরি করতে এবং সমাজের গভীরে মানে শেকড় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে সরকারি বিনিয়োগকে তারা দেখছেন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট কেন বাড়ানোর দাবি
বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ হলো- দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা, উন্নয়ন এবং প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করা।
মোটা দাগে কাজ হলো- প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষা, চারু ও কারুকলা, ললিত কলা, এবং জাতীয় গ্রন্থাগারের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ করা।
বাংলা ভাষার প্রসার, সাংস্কৃতিক পরিবেশের উৎকর্ষ সাধন এবং সাংস্কৃতিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বও পালন করে এই মন্ত্রণালয়।
এছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও জাতীয় দিবস উদযাপনে সহায়তা দেওয়া, নতুন শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুদান দেওয়া, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম পরিচালনা করে এই মন্ত্রণালয়।
এসবের জন্য দরকার অর্থ। এবার প্রথমবারের মতো বাজেটে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ খাতে বরাদ্দ করেছে সরকার। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংস্কৃতির মতো ‘সৃজনশীল’ খাতে বরাদ্দ না বাড়ানোতে হতাশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে ২১টি দপ্তর ও সংস্থা। এর মধ্যে বাংলাদেশে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে ৭১টি সরকারি গণগ্রন্থাগার রয়েছে।
এই গ্রন্থাগারগুলো ৬৪টি জেলায় জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার হিসেবে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে। মাত্র তিনটি উপজেলায় রয়েছে সরকারি গ্রন্থাগার।
সংস্কৃতিকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি, দেশের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি গণগ্রন্থাগার স্থাপন করতে হবে।
এছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে হবে তৃণমূল পর্যায়েও। আর এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের।
সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংস্কৃতি খাতে বাজেটের কমপক্ষে ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখার দাবি জানায় বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কর্মী সংঘ।
এই দাবি মানলে বরাদ্দ হতো ১৮ হাজার ৭৬০ কোটি টাকার মতো।
কিন্তু ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র দশমিক ০৯ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ছিলো ৮২৪ কোটি টাকা, পরে কমিয়ে করা হয় ৭৫৩ কোটি টাকা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ আলাপ-কে বলেন, “সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় হলো গ্রামের গরীব আত্মীয়ের মতো। এটা অবহেলিত।”
তবে যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সেই ‘বাজেট ব্যবহারই করতে পারে না’ বলে জানান তিনি।
গত ৫ই জুন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কর্মী সংঘ বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি ১৫টি দাবিও তুলে ধরে।
এর মধ্যে রয়েছে সব উপজেলা, জেলায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমির কাজ বিস্তৃত করে সংস্কৃতির মূলধারায় নিয়মিত কাজ পরিচালনা করার ব্যবস্থা করা। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয় এবং চিত্রকলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে বয়সভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা পুনরায় চালু এবং সারা দেশে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল শিল্পীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে বলেও তাদের দাবি।
বাজেট বরাদ্দ নিয়ে সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, “এটা অবশ্যই যথেষ্ট না। সংস্কৃতির জন্য পুরো বাজেটের দুই শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।”
এই খাতে ‘কম’ বরাদ্দ দেওয়াটাকে ‘অদূরদর্শিতা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নাচ, গান, সংস্কৃতি চর্চাকে অনেকেই ভালোভাবে দেখেন না।”
“কিন্তু সংস্কৃতিচর্চা মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা এনে দেয়। মানুষ কীভাবে বাঁচবে, দেশটা কোথায় যাবে- সবকিছুই আসলে ঠিক হয় সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে।”
লেখক ও সাংবাদিক কাজী রওনক হোসেন মনে করেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট “অবশ্যই বাড়ানো উচিত”।
“কারণ, একটা দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি যতো উন্নত, সেই দেশও ততো উন্নত। কাজেই এটা উপক্ষো করলেই অবনতি।”
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, সেখান থেকে বেশিরভাগই খরচ হয়ে যায় পরিচালন ব্যয়ের জন্য, উন্নয়নের জন্য থাকে কম।
প্রস্তাবিত বাজেটের পরিচালন ব্যয় ৪৮৫ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪১ কোটি টাকা। আগের বছরগুলোতেও একই রেওয়াজ দেখা গেছে।
কাজী রওনক হোসেন মনে করেন, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো দরকার।
“কারণ, দুরদুষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।”
সৈয়দ জামিল আহমেদ মনে করেন, সংস্কৃতি চর্চা একেবারে শেকড় পযন্ত নিয়ে যেতে হবে।
“অনেকেই সংস্কৃতির চর্চা করেন কোনো ধরনের টাকাপয়সা ছাড়াই। কিন্তু সমাজ বা যুগের বাস্তবায়ন এটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই তাদেরকে সহায়তার আওতায় আনতে হবে।”
জামিল আহমেদ আরো বলেন, “যতদিন পর্যন্ত পারা যায়, ততদিন পর্যন্ত যথেষ্ট টাকা ঢালতে হবে। তাই এখানে বরাদ্দ শত শত কোটি নয়, হাজার হাজার কোটি করতে হবে।”
তবে শুধু সরকারি সহায়তা দিয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনকে চাঙা করা নিয়ে সন্দিহান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশীদ।
“আপনি যখন সংস্কৃতির কথা বলবেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কথা বলবেন… মাও সে তুং আলাদাভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব করেছিলেন।”
বাংলাদেশেও বছর পরম্পরায় সামাজিক যে ‘অবক্ষয় হয়েছে’ তা থেকে উত্তরণে সামাজিক বিপ্লব না করে শুধু সরকারি বরাদ্দ দিয়ে সংস্কৃতিকে কীভাবে রক্ষা করা যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুন রশীদ।
সংস্কৃতি খাতে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, সংস্কৃতি যে উৎসব বা বিনোদনের পাশাপাশি সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের অন্যতম উপাদান, তা নিয়ে সবাই একমত।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই খাতকে কীভাবে দেখবে রাষ্ট্র? ব্যয় হিসেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে?
অনেকেই বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই সমাধান হবে না। দরকার হলো সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার, তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক অবকাঠামো ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনা।
তবে বই, পাঠাগার, শিল্পচর্চা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সৃজনশীল চর্চাকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হবে, যেমনটি আগেও হয়েছিলো বিভিন্ন সভ্যতায়।
সংস্কৃতিতে ‘কম’ বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন, বাড়ানোর দাবি কয়েকগুণ
গণগ্রন্থাগারে বই সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে অর্থাভাব–এমন বাস্তবতায় আবারও সামনে এসেছে সংস্কৃতি খাতে সরকারি বিনিয়োগের প্রশ্ন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৮২৬ কোটি টাকা। সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন, সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণের এই খাত কেন এখনো বাজেটের প্রান্তিক অবস্থানে?
গণগ্রন্থাগারগুলোতে বই ও সেবার সংকট, বহু লাইব্রেরি ভবনের জরাজীর্ণ অবস্থা, ডিজিটাল সুবিধা ও ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা, আর পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ক্ষয়ে যাচ্ছে- বাংলাদেশের এসব বাস্তবতা প্রায়ই উঠে আসে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
এই প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতি খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে বারবার।
কিন্তু সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হওয়া সত্ত্বেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাজেট এখনো অগ্রাধিকার পাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা, যা চলমান অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২ কোটি টাকা বেশি।
তবে সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি ছিলো, এর চেয়ে অনেক বড় বেশি। তাদের ভাষ্য, শুধু সাংস্কৃতিক চর্চাকে টিকিয়ে রাখা নয়, বরং সমাজ গঠনের কার্যকর শক্তি হিসেবে সংস্কৃতিকে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
“কয়েকশো কোটি নয়, সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দ দরকার হাজার হাজার কোটি টাকা,” আলাপ-কে বলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ।
সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সামাজিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা ও উগ্রপন্থার বিস্তার ঠেকিয়ে মানবিক ও সহনশীল সমাজ গঠনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকা মৌলিক।
আর সেই মৌলিক সক্ষমতা তৈরি করতে এবং সমাজের গভীরে মানে শেকড় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে সরকারি বিনিয়োগকে তারা দেখছেন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট কেন বাড়ানোর দাবি
বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ হলো- দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা, উন্নয়ন এবং প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করা।
মোটা দাগে কাজ হলো- প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষা, চারু ও কারুকলা, ললিত কলা, এবং জাতীয় গ্রন্থাগারের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ করা।
বাংলা ভাষার প্রসার, সাংস্কৃতিক পরিবেশের উৎকর্ষ সাধন এবং সাংস্কৃতিক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বও পালন করে এই মন্ত্রণালয়।
এছাড়া সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও জাতীয় দিবস উদযাপনে সহায়তা দেওয়া, নতুন শিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুদান দেওয়া, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম পরিচালনা করে এই মন্ত্রণালয়।
এসবের জন্য দরকার অর্থ। এবার প্রথমবারের মতো বাজেটে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ খাতে বরাদ্দ করেছে সরকার। সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংস্কৃতির মতো ‘সৃজনশীল’ খাতে বরাদ্দ না বাড়ানোতে হতাশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে ২১টি দপ্তর ও সংস্থা। এর মধ্যে বাংলাদেশে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে ৭১টি সরকারি গণগ্রন্থাগার রয়েছে।
এই গ্রন্থাগারগুলো ৬৪টি জেলায় জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার হিসেবে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে পরিচালিত হচ্ছে। মাত্র তিনটি উপজেলায় রয়েছে সরকারি গ্রন্থাগার।
সংস্কৃতিকর্মীদের দীর্ঘদিনের দাবি, দেশের সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি গণগ্রন্থাগার স্থাপন করতে হবে।
এছাড়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে হবে তৃণমূল পর্যায়েও। আর এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দের দাবি সংস্কৃতিকর্মীদের।
সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংস্কৃতি খাতে বাজেটের কমপক্ষে ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখার দাবি জানায় বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কর্মী সংঘ।
এই দাবি মানলে বরাদ্দ হতো ১৮ হাজার ৭৬০ কোটি টাকার মতো।
কিন্তু ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সংস্কৃতির জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৮২৬ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র দশমিক ০৯ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ ছিলো ৮২৪ কোটি টাকা, পরে কমিয়ে করা হয় ৭৫৩ কোটি টাকা।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ আলাপ-কে বলেন, “সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় হলো গ্রামের গরীব আত্মীয়ের মতো। এটা অবহেলিত।”
তবে যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সেই ‘বাজেট ব্যবহারই করতে পারে না’ বলে জানান তিনি।
গত ৫ই জুন বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কর্মী সংঘ বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি ১৫টি দাবিও তুলে ধরে।
এর মধ্যে রয়েছে সব উপজেলা, জেলায় শিল্পকলা অ্যাকাডেমির কাজ বিস্তৃত করে সংস্কৃতির মূলধারায় নিয়মিত কাজ পরিচালনা করার ব্যবস্থা করা। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয় এবং চিত্রকলা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে বয়সভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা পুনরায় চালু এবং সারা দেশে অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল শিল্পীদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে বলেও তাদের দাবি।
বাজেট বরাদ্দ নিয়ে সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, “এটা অবশ্যই যথেষ্ট না। সংস্কৃতির জন্য পুরো বাজেটের দুই শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।”
এই খাতে ‘কম’ বরাদ্দ দেওয়াটাকে ‘অদূরদর্শিতা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “নাচ, গান, সংস্কৃতি চর্চাকে অনেকেই ভালোভাবে দেখেন না।”
“কিন্তু সংস্কৃতিচর্চা মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা এনে দেয়। মানুষ কীভাবে বাঁচবে, দেশটা কোথায় যাবে- সবকিছুই আসলে ঠিক হয় সংস্কৃতিচর্চার মধ্য দিয়ে।”
লেখক ও সাংবাদিক কাজী রওনক হোসেন মনে করেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেট “অবশ্যই বাড়ানো উচিত”।
“কারণ, একটা দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি যতো উন্নত, সেই দেশও ততো উন্নত। কাজেই এটা উপক্ষো করলেই অবনতি।”
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়, সেখান থেকে বেশিরভাগই খরচ হয়ে যায় পরিচালন ব্যয়ের জন্য, উন্নয়নের জন্য থাকে কম।
প্রস্তাবিত বাজেটের পরিচালন ব্যয় ৪৮৫ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪১ কোটি টাকা। আগের বছরগুলোতেও একই রেওয়াজ দেখা গেছে।
কাজী রওনক হোসেন মনে করেন, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো দরকার।
“কারণ, দুরদুষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন নতুন অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।”
সৈয়দ জামিল আহমেদ মনে করেন, সংস্কৃতি চর্চা একেবারে শেকড় পযন্ত নিয়ে যেতে হবে।
“অনেকেই সংস্কৃতির চর্চা করেন কোনো ধরনের টাকাপয়সা ছাড়াই। কিন্তু সমাজ বা যুগের বাস্তবায়ন এটা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। তাই তাদেরকে সহায়তার আওতায় আনতে হবে।”
জামিল আহমেদ আরো বলেন, “যতদিন পর্যন্ত পারা যায়, ততদিন পর্যন্ত যথেষ্ট টাকা ঢালতে হবে। তাই এখানে বরাদ্দ শত শত কোটি নয়, হাজার হাজার কোটি করতে হবে।”
তবে শুধু সরকারি সহায়তা দিয়ে সংস্কৃতি অঙ্গনকে চাঙা করা নিয়ে সন্দিহান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশীদ।
“আপনি যখন সংস্কৃতির কথা বলবেন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কথা বলবেন… মাও সে তুং আলাদাভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব করেছিলেন।”
বাংলাদেশেও বছর পরম্পরায় সামাজিক যে ‘অবক্ষয় হয়েছে’ তা থেকে উত্তরণে সামাজিক বিপ্লব না করে শুধু সরকারি বরাদ্দ দিয়ে সংস্কৃতিকে কীভাবে রক্ষা করা যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুন রশীদ।
সংস্কৃতি খাতে সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, সংস্কৃতি যে উৎসব বা বিনোদনের পাশাপাশি সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের অন্যতম উপাদান, তা নিয়ে সবাই একমত।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই খাতকে কীভাবে দেখবে রাষ্ট্র? ব্যয় হিসেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে?
অনেকেই বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই সমাধান হবে না। দরকার হলো সেই অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার, তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক অবকাঠামো ও কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনা।
তবে বই, পাঠাগার, শিল্পচর্চা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সৃজনশীল চর্চাকে গুরুত্ব না দিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হবে, যেমনটি আগেও হয়েছিলো বিভিন্ন সভ্যতায়।