স্মৃতিচারণ: ধর্ম যার যার উৎসব সবার এবং একজন ভিন্নধর্মীর ঈদ উদযাপন
আড্ডা আর ইফতারের সমারোহের মাঝে হঠাৎ দেখতাম রোযার মাস শেষ হয়ে আসছে। ঈদের চাঁদ উঠেছে কিনা দেখার জন্য হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম চার কিলোমিটার দূরে মধুমতী নদীর তীরে।
সন্ধি তীর্থ
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএমআপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
এআই জেনারেটেড ছবি
আমার কাছে রোযার ঈদ আর রমযান মাস- অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে। রোযার ঈদ আসছে- এই অনুভূতিটা শুরু হতো রমযান মাস শুরু হওয়ার দিন দুয়েক আগে থেকে। যে বাড়িতে আমার বড় হওয়া সেই বাড়ির সামনেই কলেজ ক্যাম্পাস আর কলেজের মসজিদ। এখনও স্পষ্ট স্মৃতি ভেসে ওঠে ওই মসজিদের পেছনে ইফতারের সময়ে সন্ধ্যার আলো-ছায়াতে লুকিয়ে থাকার কথা। সাথে থাকত আরও দুএকজন আমার মতন সনাতন ধর্মের পাড়াতো খেলার সাথী।
কত বয়স তখন আমার? হয়ত দশ কিংবা বারো। মসজিদের পেছনে লুকিয়ে থাকার কারণ- মুসলিম খেলার সাথীরা তখন মসজিদের সামনের ছোট চত্ত্বরটুকুতে মাদুর বসাতে ব্যস্ত। একটু পরপর সারি সারি ইফতারের প্লেট রাখছে তারা। আমরা সনাতন ধর্মের সাথীরা অপেক্ষায় আছি কখন মুসলিম বন্ধুরা কয়েকটি ইফতারের প্লেট চুপটি করে মসজিদের পেছনে নিয়ে আসবে। তারপর সেই ইফতার নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে আযান দেয়া মাত্র গোগ্রাসে খেয়ে ফেলা।
বলা যায়, সনাতন ধর্মের বন্ধুদের বাদ দিয়ে কিছুতেই আমার রোযা রাখা বন্ধুরা ইফতার করত না- এটাই ছিলো শৈশবের রোযার মাসের প্রথম অনুভূতি। ওই ইফতার খাওয়াটা ছিল সম্প্রীতির এক অদৃশ্য ঐক্যতান- এ অনুভূতি শৈশবে না বুঝলেও পরিণত মন আজ ঠিকই বুঝতে পারে।
আড্ডা আর ইফতারের সমারোহের মাঝে হঠাৎ দেখতাম রোযার মাস শেষ হয়ে আসছে। ঈদের চাঁদ উঠেছে কিনা দেখার জন্য হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম চার কিলোমিটার দূরে মধুমতী নদীর তীরে।
ঈদের দিন সকালেই নামায শেষ করে ফেরার পথে বন্ধুরা ডাক দিয়ে যেত বাসায় তৈরি হয়ে থাকার জন্য। বন্ধুদের সাথে মিল রেখে চেষ্টা থাকত ঈদের দিনটাতে পাঞ্জাবি পরার। এরপর শুরু হতো বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে বের হওয়া। আর - খাওয়া। ঠিক কত বাসায় যেতাম আর সেমাই পোলাও খেতাম- একটা সময় হিসেবটা গুলিয়ে যেত।
রোযার ঈদ আর যে সুযোগ এনে দিত তা হলো এই দিনটাতে স্কুলের মেয়ে সহপাঠিদের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া। এ যেন নিষিদ্ধ অঞ্চলে অবাধে বিচরণের দূর্লভ এক সুযোগ। আমার দায়িত্ব পড়ত ডাক হরকরা হিসেবে। স্কুলের সামনের দোকান থেকে কেনা কোন বন্ধুর ঈদ কার্ডটি তার প্রেয়সী ও বান্ধবীর হাতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব কেন যেন এই আমার উপরেই পড়ত।
ঈদের সন্ধ্যায় অন্যরকম আনন্দ ছিলো ‘চকলেট বোমা’ নামে বিশেষ এক ধরণের পটকা ফোটানো। কেন এই পটকার নাম চকলেট বোমা তা আমার জানা নেই। আকারের তুলনায় অত্যধিক শব্দ উৎপন্ন করতে পারা ছিলো এই পটকার বৈশিষ্ট্য। তবে মাঝেমধ্যেই বেশ কয়েকটি চকলেট বোমা বেরসিকের মতো শব্দটব্দ না করে ফুস করে জ্বলে নিভে যেত। পয়সা জমিয়ে কেনা চকলেট বোমার এমন নির্দয় নিভৃত আচরণ সেসময় বড্ড কষ্ট দিতো। প্রায়ই এই বোমার সলতেতে আগুন লাগাতে গিয়ে তাড়াহুড়ায় গুবলেট পাকিয়ে যেত। আর নিত্যনুতন কৌশলে চকলেট বোমা ফাটানো ছিলো একটা দক্ষতা প্রদর্শনের বিষয়।
আজ এই লেখার মাধ্যমে একটা দোষ স্বীকার করে নেই আমার পরিচিত সেইসব নারীদের কাছে যাদের বাসায় সন্ধ্যার পরে হঠাৎ বিকট শব্দে চকলেট বোমা ফুটত। একটা আগরবাতি আর চকলেট বোমা সহযোগে তৈরি করা ‘টাইমবোমা’ প্রায়ই উপযুক্ত স্থানে রেখে আসার দায়িত্বটি আমিই পালন করতাম।
ঈদের সন্ধ্যায় আরেক আর্কষণ ছিলো পাড়ার মধ্যে ইমিডিয়েট বড়ভাইদের সাথে লুকোচুরি খেলা। শুরুটা হতো মাঠে গোল হয়ে বসা বড়ভাইদের (যারা হয়ত তখন কলেজের ছাত্র বা পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছেন) আড্ডার মাঝে আমাদের একটি চকলেট বোম নিক্ষেপের মাধ্যমে। তারপর চলত ঘন্টা দুয়েকের লুকোচুরি।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগত ঈদের দিন বৃষ্টি হলে। মনে ভীষণ আফসোস হতো, কেন দুর্গা পূজার মতো ঈদটাও কয়েকটা দিনের জন্য না..
গতকয়েক বছর ধরে ঈদ আর ঈদের আগের দু’একটা দিন মেতে থাকি ‘ব্যাচ ক্রিকেট’ নামে রাতের বেলা হওয়া একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়ে। আমাদের একশ তেইশ বছর পুরোনো স্কুলের মাঠে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মিলে রাতের বেলা আলো জমকালো এক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে মেতে উঠি। এই স্কুলের মাঠেই দেখা হয়ে যায় প্রতিদিন স্কুলে যাদের সাথে সময় কেটেছিল সেই ছোট-বড় সকল চেনা মুখের সাথে।
এখন এই পরিণত বয়সে ঈদের ছুটিতে চেষ্টা থাকে বাড়িতে বন্ধুদের সাথে সময়টা কাটাতে। অনেকদিন পর রোযার ঈদের এই একটুখানি বন্ধুসঙ্গ যেন আমার শহুরে চাকুরে জীবনের সঞ্জীবনী সুধা। চিরচেনা পুরোনো অনেক মুখের সাথে দেখা হয়, এই দেখা হওয়ার সময় মনে মনে জানি সামনের ঈদ আসতে আসতে কিছু মুখের সাথে আর কোনদিনই দেখা হবে না।
শৈশবের ঈদের দিনের তুলনায় বর্তমানের ঈদের দিনটার অনেক পার্থক্য। তবু একটা বিষয় এখনও সেই একইরকম আছে- কীভাবে যেন ঈদের দিনটা বড্ড দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
স্মৃতিচারণ: ধর্ম যার যার উৎসব সবার এবং একজন ভিন্নধর্মীর ঈদ উদযাপন
আড্ডা আর ইফতারের সমারোহের মাঝে হঠাৎ দেখতাম রোযার মাস শেষ হয়ে আসছে। ঈদের চাঁদ উঠেছে কিনা দেখার জন্য হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম চার কিলোমিটার দূরে মধুমতী নদীর তীরে।
আমার কাছে রোযার ঈদ আর রমযান মাস- অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িয়ে আছে। রোযার ঈদ আসছে- এই অনুভূতিটা শুরু হতো রমযান মাস শুরু হওয়ার দিন দুয়েক আগে থেকে। যে বাড়িতে আমার বড় হওয়া সেই বাড়ির সামনেই কলেজ ক্যাম্পাস আর কলেজের মসজিদ। এখনও স্পষ্ট স্মৃতি ভেসে ওঠে ওই মসজিদের পেছনে ইফতারের সময়ে সন্ধ্যার আলো-ছায়াতে লুকিয়ে থাকার কথা। সাথে থাকত আরও দুএকজন আমার মতন সনাতন ধর্মের পাড়াতো খেলার সাথী।
কত বয়স তখন আমার? হয়ত দশ কিংবা বারো। মসজিদের পেছনে লুকিয়ে থাকার কারণ- মুসলিম খেলার সাথীরা তখন মসজিদের সামনের ছোট চত্ত্বরটুকুতে মাদুর বসাতে ব্যস্ত। একটু পরপর সারি সারি ইফতারের প্লেট রাখছে তারা। আমরা সনাতন ধর্মের সাথীরা অপেক্ষায় আছি কখন মুসলিম বন্ধুরা কয়েকটি ইফতারের প্লেট চুপটি করে মসজিদের পেছনে নিয়ে আসবে। তারপর সেই ইফতার নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে আযান দেয়া মাত্র গোগ্রাসে খেয়ে ফেলা।
বলা যায়, সনাতন ধর্মের বন্ধুদের বাদ দিয়ে কিছুতেই আমার রোযা রাখা বন্ধুরা ইফতার করত না- এটাই ছিলো শৈশবের রোযার মাসের প্রথম অনুভূতি। ওই ইফতার খাওয়াটা ছিল সম্প্রীতির এক অদৃশ্য ঐক্যতান- এ অনুভূতি শৈশবে না বুঝলেও পরিণত মন আজ ঠিকই বুঝতে পারে।
আড্ডা আর ইফতারের সমারোহের মাঝে হঠাৎ দেখতাম রোযার মাস শেষ হয়ে আসছে। ঈদের চাঁদ উঠেছে কিনা দেখার জন্য হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম চার কিলোমিটার দূরে মধুমতী নদীর তীরে।
ঈদের দিন সকালেই নামায শেষ করে ফেরার পথে বন্ধুরা ডাক দিয়ে যেত বাসায় তৈরি হয়ে থাকার জন্য। বন্ধুদের সাথে মিল রেখে চেষ্টা থাকত ঈদের দিনটাতে পাঞ্জাবি পরার। এরপর শুরু হতো বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে বের হওয়া। আর - খাওয়া। ঠিক কত বাসায় যেতাম আর সেমাই পোলাও খেতাম- একটা সময় হিসেবটা গুলিয়ে যেত।
রোযার ঈদ আর যে সুযোগ এনে দিত তা হলো এই দিনটাতে স্কুলের মেয়ে সহপাঠিদের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ পাওয়া। এ যেন নিষিদ্ধ অঞ্চলে অবাধে বিচরণের দূর্লভ এক সুযোগ। আমার দায়িত্ব পড়ত ডাক হরকরা হিসেবে। স্কুলের সামনের দোকান থেকে কেনা কোন বন্ধুর ঈদ কার্ডটি তার প্রেয়সী ও বান্ধবীর হাতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব কেন যেন এই আমার উপরেই পড়ত।
ঈদের সন্ধ্যায় অন্যরকম আনন্দ ছিলো ‘চকলেট বোমা’ নামে বিশেষ এক ধরণের পটকা ফোটানো। কেন এই পটকার নাম চকলেট বোমা তা আমার জানা নেই। আকারের তুলনায় অত্যধিক শব্দ উৎপন্ন করতে পারা ছিলো এই পটকার বৈশিষ্ট্য। তবে মাঝেমধ্যেই বেশ কয়েকটি চকলেট বোমা বেরসিকের মতো শব্দটব্দ না করে ফুস করে জ্বলে নিভে যেত। পয়সা জমিয়ে কেনা চকলেট বোমার এমন নির্দয় নিভৃত আচরণ সেসময় বড্ড কষ্ট দিতো। প্রায়ই এই বোমার সলতেতে আগুন লাগাতে গিয়ে তাড়াহুড়ায় গুবলেট পাকিয়ে যেত। আর নিত্যনুতন কৌশলে চকলেট বোমা ফাটানো ছিলো একটা দক্ষতা প্রদর্শনের বিষয়।
আজ এই লেখার মাধ্যমে একটা দোষ স্বীকার করে নেই আমার পরিচিত সেইসব নারীদের কাছে যাদের বাসায় সন্ধ্যার পরে হঠাৎ বিকট শব্দে চকলেট বোমা ফুটত। একটা আগরবাতি আর চকলেট বোমা সহযোগে তৈরি করা ‘টাইমবোমা’ প্রায়ই উপযুক্ত স্থানে রেখে আসার দায়িত্বটি আমিই পালন করতাম।
ঈদের সন্ধ্যায় আরেক আর্কষণ ছিলো পাড়ার মধ্যে ইমিডিয়েট বড়ভাইদের সাথে লুকোচুরি খেলা। শুরুটা হতো মাঠে গোল হয়ে বসা বড়ভাইদের (যারা হয়ত তখন কলেজের ছাত্র বা পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছেন) আড্ডার মাঝে আমাদের একটি চকলেট বোম নিক্ষেপের মাধ্যমে। তারপর চলত ঘন্টা দুয়েকের লুকোচুরি।
সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগত ঈদের দিন বৃষ্টি হলে। মনে ভীষণ আফসোস হতো, কেন দুর্গা পূজার মতো ঈদটাও কয়েকটা দিনের জন্য না..
গতকয়েক বছর ধরে ঈদ আর ঈদের আগের দু’একটা দিন মেতে থাকি ‘ব্যাচ ক্রিকেট’ নামে রাতের বেলা হওয়া একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নিয়ে। আমাদের একশ তেইশ বছর পুরোনো স্কুলের মাঠে বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা মিলে রাতের বেলা আলো জমকালো এক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে মেতে উঠি। এই স্কুলের মাঠেই দেখা হয়ে যায় প্রতিদিন স্কুলে যাদের সাথে সময় কেটেছিল সেই ছোট-বড় সকল চেনা মুখের সাথে।
এখন এই পরিণত বয়সে ঈদের ছুটিতে চেষ্টা থাকে বাড়িতে বন্ধুদের সাথে সময়টা কাটাতে। অনেকদিন পর রোযার ঈদের এই একটুখানি বন্ধুসঙ্গ যেন আমার শহুরে চাকুরে জীবনের সঞ্জীবনী সুধা। চিরচেনা পুরোনো অনেক মুখের সাথে দেখা হয়, এই দেখা হওয়ার সময় মনে মনে জানি সামনের ঈদ আসতে আসতে কিছু মুখের সাথে আর কোনদিনই দেখা হবে না।
শৈশবের ঈদের দিনের তুলনায় বর্তমানের ঈদের দিনটার অনেক পার্থক্য। তবু একটা বিষয় এখনও সেই একইরকম আছে- কীভাবে যেন ঈদের দিনটা বড্ড দ্রুত ফুরিয়ে যায়।