একাত্তরের ২৬ মার্চ যে আলোচনা হয়েছিল ওয়াশিংটন বৈঠকে

“দুপুরের আগে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংক্ষেপে কথা হয়েছে। তার অবস্থান সবার মতোই। তিনি কিছু করতে চান না। পাকিস্তান ভাঙনে উৎসাহ দিয়েছেন, এমন অভিযোগের মুখে পড়তে চান না।”

আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ১১:৩৭ এএম

২৬ মার্চ ১৯৭১। ওয়াশিংটন। দুপুর ৩টা ৩ মিনিট। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বে জরুরি বৈঠকে বসেছে 'স্পেশাল অ্যাকশনস গ্রুপ'।

ঢাকায় তখন ২৬ মার্চ, দিবাগত রাত। ঘটে গেছে নারকীয় এক হত্যাকাণ্ড। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদারদের নিধনযজ্ঞ।

বেতার বার্তায় ২৫ মার্চ কালরাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর খবর পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণেই স্পেশাল অ্যাকশনস গ্রুপের বৈঠক।

ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী (মিটিং মিনিটস) পাওয়া যায় স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান’-এর নথিতে। ওয়াশিংটন সময় ২৬ মার্চ বেলা ৩টা ৩ মিনিট থেকে ৩টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত চলে বৈঠক।

এতে পররাষ্ট্র দপ্তর, প্রতিরক্ষা, সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি), শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে সবাই একমত হয় যে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের বিরোধে যুক্তরাষ্ট্র সম্পৃক্ত না হওয়ার নীতিই বজায় রাখা উচিত। বিশেষ করে এমন কোনো অবস্থান নেওয়া উচিত নয়, যেখানে পাকিস্তান ভাঙনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে উৎসাহদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা যেতে পারে।

স্পেশাল অ্যাকশনস গ্রুপ আরও একমত হয় যে, স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বীকৃতি বিষয়ক কোনো অনুরোধ এলে তা নিয়ে যেকোনো পদক্ষেপ বিলম্ব করা উচিৎ।

আরও সিদ্ধান্ত হয়, পাকিস্তানের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট অর্থাৎ পররাষ্ট্র দপ্তর এবং হোয়াইট হাউসকে অবহিত করবে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও হবে তাদের দায়িত্ব।

বৈঠকের সভাপতি হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন। পরে তিনি সেক্রেটারি অব স্টেট হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে হাজির ছিলেন রাজনৈতিক বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালেক্সিস জনসন এবং ডেপুটি অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি ক্রিস্টোফার ভ্যান হোলেন।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সিআইএ'র পরিচালক রিচার্ড হেলমস, জয়েন্ট চিফস অব স্টাফস কার্যালয়ের লেফটেন্যান্ট জেনারেল মেলভিন জাইস ও কর্নেল ফ্র্যাংক রিয়া।

এ ছাড়া ছিলেন প্রতিরক্ষা বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি ডেভিড প্যাকার্ড এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কর্মকর্তা হ্যারল্ড এইচ সন্ডার্স।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় হেনরি এ. কিসিঞ্জার যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরে তিনি সেক্রেটারি অব স্টেট হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রকাশ করা নথি অনুযায়ী, চলুন দেখে নেওয়া যাক সেই বৈঠকে আসলে কী কথা হয়েছিল

হেলমস: [এক লাইন গোপন রাখা হয়েছে] (ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের) কনস্যুলেট জেনারেলের এলাকার পরিস্থিতি খুবই শান্ত, তবে শহরের পুরোনো অংশে কয়েক ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলছে। (কনস্যুলেট জেনারেলের এলাকায়) খুব কম গুলির শব্দ বা বিস্ফোরণ শোনা গেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কনস্যুলেটের মাত্র দুইজন কর্মী ভবনে পৌঁছাতে পেরেছেন।

[এক লাইন গোপন রাখা হয়েছে] মুজিবুর রহমানকে দুপুর একটায় সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। গ্রেপ্তারের সময় তার দুইজন সমর্থক নিহত হয়। [দুই লাইন গোপন রাখা হয়েছে]

[দেড় লাইন গোপন রাখায় হয়েছে] তারা বলছে, শুক্রবার (২৬ মার্চ) রাতে ইয়াহিয়ার ভাষণে মুজিবুর রহমান সম্পর্কে বর্ণনার সময় যে তিনি বিষিয়ে ছিলেন তা বোঝা যায়। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। ইসলামাবাদ নিশ্চিত করেছে যে মুজিবুর রহমানকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার কারণ স্পষ্ট নয়।

কিসিঞ্জার: গতকাল মনে হচ্ছিল একটি সমঝোতা হতে পারে।

হেলমস: হ্যাঁ, ২৪ মার্চ একটি সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত ছিল। সামরিক আইন প্রত্যাহার করে নিতে মুজিবুর রহমানের জোর দাবি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে।

একটি গোপন রেডিও সম্প্রচারে মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করতে শোনা গেছে। পূর্ব পাকিস্তানে ২০ হাজার অনুগত পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা রয়েছে। এ ছাড়া পাঁচ হাজার পূর্ব পাকিস্তানি নিয়মিত সৈন্য এবং ১৩ হাজার প্যারামিলিটারি সদস্য আছে। তবে (পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি) তাদের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা জাহাজে করে নিয়ে আসা হয়েছে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এমন খবর আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি। করাচি থেকে ঢাকা পর্যন্ত সৈন্য বহনকারী ছয়টি সি–১৩০ বিমান আজ রওনা হওয়ার কথা। তবে সেগুলোকে সিলন (শ্রীলঙ্কা) হয়ে যেতে হওয়ায়, সময় লাগবে।

ঢাকায় সম্ভাব্য ৭০০ জন মার্কিন নাগরিক এবং চট্টগ্রামে ৬০ অথবা ৭০ জন আছে। এখনও তাদের সরিয়ে নেওয়ার কোনো অনুরোধ আসেনি।

[দেড় লাইন গোপন রাখা হয়েছে]

কিসিঞ্জার: আলোচনা ভেঙে পড়ার কারণ সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আমিও অন্যদের মতো বিস্মিত।

ভ্যান হোলেন: একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ইয়াহিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে সমঝোতাটি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেননি। আরেকটি কারণ হলো ২০ জন নিহত হওয়া এবং তাতে উত্তেজনা তৈরি হওয়া।

কিসিঞ্জার: যদি (ইয়াহিয়া ও মুজিবুর রহমানের মধ্যে আলোচনাধীন) সমঝোতাটি বাস্তবায়িত হতো, তবে স্বাধীনতার দিকে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠেকানো যেত না। সে ক্ষেত্রে মুজিবুর রহমান কেন তা গ্রহণ করলেন না, তা বুঝতে পারছি না।

[কিছু লাইন গোপন রাখা হয়েছে] পশ্চিমে কি ভুট্টো প্রভাবশালী চরিত্র হয়ে উঠবেন?

ভ্যান হোলেন: সম্ভবত ভুট্টোর বিরুদ্ধে পশ্চিমে প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে, কারণ তিনিই ইয়াহিয়াকে গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করতে বাধ্য করেছিলেন।

কিসিঞ্জার: আপনার কী মনে হয়, কী ঘটতে যাচ্ছে?

ভ্যান হোলেন: আলাদা হয়ে যাওয়া ঠেকানোর চেষ্টা হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পূর্ব পাকিস্তানে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর সক্ষমতা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। তারা ঢাকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তবে আওয়ামী (লীগের) নেতৃত্ব (ঢাকার) বাইরে সরে যাবে।

ক্রিস্টোফার ভ্যান হোলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিয়ার ইস্ট অ্যান্ড সাউথ এশিয়া ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি। বলা হয় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মনিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে প্রকাশ্যেই দ্বিমত করেন। পরে তিনি শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন।

কিসিঞ্জার: আপনি কি মনে করেন আওয়ামী (লীগ) প্রতিরোধ গড়ে তুলবে?

ভ্যান হোলেন: তারা এইটার জন্য গত মাস থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

কিসিঞ্জার: নেতারা গ্রেপ্তার হলেও কি তারা চালিয়ে যেতে পারবে?

ভ্যান হোলেন: হ্যাঁ, কারণ তাদের ব্যাপক জনসমর্থন আছে। নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টির মধ্যে ১৬০টি আসনই তারা জিতেছে।

কিসিঞ্জার: তাহলে সম্ভাবনা হচ্ছে গৃহযুদ্ধ। যা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতায় রূপ নিতে পারে অথবা খুব দ্রুত স্বাধীনতা।

ভ্যান হোলেন: ঠিক তাই।

কিসিঞ্জার: এখন ইয়াহিয়া (পাকিস্তান) আলাদা হওয়ার বিরোধিতায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কিন্তু যুদ্ধ ছাড়া তিনি কীভাবে পিছিয়ে আসবেন?

ভ্যান হোলেন: খুবই কঠিন হবে। ৬ মার্চ থেকেই তিনি আলাদা হওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন।

জনসন: প্রশ্ন হলো, তিনি কতদিন এই অবস্থান বজায় রাখতে পারবেন।

কিসিঞ্জার: পূর্ব পাকিস্তানে কতদিন তিনি ফোর্স সরবরাহ করতে পারবেন?

ভ্যান হোলেন: এটা করা খুবই কঠিন হবে।

কিসিঞ্জার: সেখানে তাদের বাহিনীর কাছে কি মজুদ আছে?

হেলমস: না।

ভ্যান হোলেন: সেখানে একটি দুর্বল ডিভিশন আছে। তারা কেবল ঢাকার একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তাদের চারপাশে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি, যারা সহজেই উত্তেজিত হতে পারে, বিশেষত মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে।

কিসিঞ্জার: আগামী কয়েক দিনের সম্ভাবনা কী?

জনসন: আমাদের সময় অনুযায়ী সন্ধ্যা সাতটা বা আটটায় ঢাকায় ভোর হয়। আরেক দিন গেলে আমরা বুঝতে পারব কতটা রক্তপাত হতে পারে।

কিসিঞ্জার: আমরা কি সবাই একমত যে প্রয়োজন হলে (যুক্তরাষ্ট্রের) নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই?

জনসন: এই মুহূর্তে ঠিক তাই।

হেলমস: হ্যাঁ।

প্যাকার্ড: হ্যাঁ।

অ্যালেক্সিস জনসন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পলিটিকাল অ্যাফেয়ার্স ব্যুরোর আন্ডার সেক্রেটারি। তিনি জাপান, থাইল্যান্ড, চেকোস্লভিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভ্যান হোলেন: ব্রিটিশরাও তেমন কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। আমাদের আগের যোগাযোগের পর হিথ (তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ) ইয়াহিয়াকে একটি নিরপেক্ষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। সম্ভবত আবারও সেরকমই কিছু হবে।

জনসন: ঢাকায় তাদের (ব্রিটিশদের) লোকদের কাছ থেকে রিপোর্ট পাওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমরা দপ্তরে (স্টেট ডিপার্টমেন্টে) ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালাচ্ছি (এই ব্যাপারে)।

কিসিঞ্জার: দুপুরের আগে প্রেসিডেন্টের (রিচার্ড নিক্সনের) সাথে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। তার অবস্থান সবার মতোই। তিনি কিছু করতে চান না। পাকিস্তান ভাঙনে উৎসাহ দিয়েছেন, এমন অভিযোগের মুখে পড়তে চান না। তিনি খুব সক্রিয় নীতির পক্ষে নন। এর মানে, আমরা সম্ভবত ইয়াহিয়াকে গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে সতর্ক করব না।

জনসন: আমি একমত। তা করলে তিনি দেশের ভাঙনের জন্য আমাদের দায়ী করতে পারেন।

কিসিঞ্জার: স্বীকৃতির বিষয়টি কী?

জনসন: এই ব্যাপারে আমরা আরও দেরি করতে পারি।

ভ্যান হোলেন: সিদ্ধান্ত না দিয়ে চুপচাপ থাকা যেতে পারে। প্রকাশ্য অনুরোধ এলে পরিস্থিতি কঠিন হবে। আমাদের অবশ্যই প্রথম স্বীকৃতিদাতা (দেশ) হওয়া উচিত নয়।

জনসন: আমাদের প্রধান উদ্বেগ সেখানে থাকা মার্কিন নাগরিকরা। এখন পর্যন্ত কোনো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব দেখা যায়নি। তাদের আপাতত বাড়িতে থাকা উচিত। আমাদের ওয়ার্ডেন ব্যবস্থা ও রেডিও যোগাযোগ আছে। সরিয়ে নেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্যান আমেরিকান ও টিডব্লিউএ’র (এয়ারলাইন্সের) সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে, প্রয়োজনে বিমান পাওয়ার জন্য। পেন্টাগন, জেসিএস ও প্যাসিফিক ফ্লিটের সঙ্গেও সামরিক বিমান ব্যবহারের বিষয়ে যোগাযোগ হয়েছে। বিমানবন্দর চালু থাকলে আমরা লোকজন সরিয়ে নিতে পারব। মার্কিনিদের সরিয়ে নিতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা সহায়তার সম্ভাবনা সম্পর্কে আজ বিকালে ইসলামাবাদের কাছে জানতে চাওয়া হবে।

কিসিঞ্জার: যে ত্রাণ সামগ্রী পশ্চিম পাকিস্তানে ডাইভার্ট হয়েছিল সেগুলোর কী হলো? এখনও কি পথে আছে?

ভ্যান হোলেন: সেগুলো নিশ্চয়ই করাচিতে পৌঁছেছে।

 কিসিঞ্জার: সমস্যা হলো এখন এসব চালানের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের কাছে দায়বদ্ধ। বিষয়টি পরে মীমাংসা করতে হবে।

ভ্যান হোলেন: পরে আমাদের পুষিয়ে দিতে হবে।

কিসিঞ্জার: আপনি নিশ্চিত আমরা কোনো অভ্যন্তরীণভাবে ঝামেলা জড়াবো না?

ভ্যান হোলেন: না, আমরা ব্যবস্থা করেছি (পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ক্ষতিপূরণ)।

 কিসিঞ্জার: ইয়াহিয়াকে বিচ্ছিন্নতা দমনে পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ জনমতের জন্য কাজে লাগবে। তবে যাই হোক, অভ্যন্তরীণ জনমতের জন্য এমন পদক্ষেপ জরুরি নয় এবং আন্তর্জাতিক মত কী তা আমরা নিশ্চিত নই।

ভ্যান হোলেন: এখনকার পরিস্থিতিতে তা খুব বেশি কাজে আসবে বলে মনে হয় না। স্বীকৃতির প্রকাশ্য দাবি এলে সমস্যা হবে।

কিসিঞ্জার: তখন কী করা উচিত?

ভ্যান হোলেন: আমাদের ধীরে সুস্থে চলতে হবে। কারণ এতে ইয়াহিয়ার সঙ্গে সম্পর্কেও সমস্যা হবে।

রিচার্ড হেলমস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সিআইএ’র পরিচালক। পরে তিনি ইরানের রাষ্ট্রদূত পদেও দায়িত্ব পালন করেন।

কিসিঞ্জার: সেদিন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছেন, ভারত চায় পাকিস্তান এক থাকুক কারণ স্বাধীন বাংলা হলে একধরণের চাপ তৈরি হবে। 

ভ্যান হোলেন: আমার মনে হয় প্রধান সব দেশই (সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) অখণ্ড পাকিস্তানকে নিজেদের স্বার্থ মনে করে।

কিসিঞ্জার: চীনের অবস্থান আলাদা হওয়ার কথা।

ভ্যান হোলেন: না, তাও নয়। ভারতে বাঙালি আবেগ একটা সমস্যা দেশটির জন্য।

কিসিঞ্জার: (পাকিস্তান) আলাদা হওয়া সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদ উসকে দিতে পারে।

ভ্যান হোলেন: হ্যাঁ।

কিসিঞ্জার: পূর্ব পাকিস্তানে আমরা ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতাতে নেই। তারা এগিয়ে গেলে সমস্যা নেই।

ভ্যান হোলেন: না, সমস্যা নেই।

কিসিঞ্জার: এটি মনে হচ্ছে স্পষ্টই পরিচালনাগত জটিলতা। আমরা অ্যালেক্সকে (বৈঠকে উপস্থিত স্টেট ডিপার্টমেন্টের দুই প্রতিনিধির একজন) এটি সামলাতে দিতে পারি। বড় কোনো আন্তঃদপ্তর মতপার্থক্য নেই। জনসন, আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখব।

ভ্যান হোলেন: পশ্চিম পাকিস্তানে আমাদের অবস্থা পূর্ব পাকিস্তানের চেয়েও খারাপ হতে পারে, কারণ সেখানে অনেকে সন্দেহ করে যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতার পেছনে আছে।

জনসন: ভুট্টো অবশ্যই সেই ধারণা নিরুৎসাহিত করবেন না।

কিসিঞ্জার: ইয়াহিয়া তা বিশ্বাস করেন না।

ভ্যান হোলেন: আমরা তাকে বারবার বলেছি যে আমরা বিচ্ছিন্নতাকে সমর্থন করছি না।

কিসিঞ্জার: ব্রিটিশদের তুলনায় আমাদের প্রতি সন্দেহ কি বেশি?

ভ্যান হোলেন: অনেক বেশি।

কিসিঞ্জার: পাকিস্তান ভেঙে গেলে আমাদের কী লাভ?

ভ্যান হোলেন: পাকিস্তানিদের দৃষ্টিতে আমরা কোনোভাবে পাকিস্তানকে দুর্বল করতে চাই।

সন্ডার্স: এটি ব্যক্তিস্বার্থে অপপ্রচারমূলক রাজনীতির উদাহরণ।

কিসিঞ্জার: এ বিষয়ে কি ইয়াহিয়াকে বার্তা পাঠানো উচিত?

ভ্যান হোলেন: আমরা তাকে বারবার এই কথা বলেছি।

জনসন: এখন এটি ঠিক হবে না। ইয়াহিয়া ভাবতে পারেন আমরা বিচ্ছিন্নতাকে উৎসাহ দিচ্ছি।

লে. জে. জাইস: পূর্ব পাকিস্তানিরা কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তাদের লোক সরিয়ে নিয়েছে। সে ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিমান ব্যবহার সম্ভব না হলে সামরিক বিমান ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছি।

 কিসিঞ্জার: তাহলে বাণিজ্যিক বিমানে (যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের) সরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।

লে. জে. জাইস: অবশ্যই সমস্যা হবে।

ড. কিসিঞ্জার: এখন কি কেউ ল্যান্ড করতে পারছে?

লে. জে. জাইস: ল্যান্ড করা সম্ভব। পশ্চিম প্যাসিফিক অঞ্চলে আমাদের চারটি সি–১৪১ বিমান প্রস্তুত আছে। সেগুলো উত্তাপাও থেকে উড়তে পারে। সেখান থেকে ঢাকায় পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা লাগে। প্রথম বিমানে নিয়ন্ত্রণকারী থাকবে। তারা পৌঁছালে দ্রুত লোকজন সরিয়ে আনা যাবে। দুই দফায় সবাইকে সরানো সম্ভব।

কিসিঞ্জার: তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় যে সামরিক বিমানেই (যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের) সরিয়ে নিতে হবে?

জনসন: এই পরিস্থিতিতে কোনো বাণিজ্যিক বিমান যাবে না।

কিসিঞ্জার: আমাদের পরিকল্পনা সে অনুযায়ী করতে হবে [অর্থাৎ, সামরিক বিমান ব্যবহার করে]।

লে. জে. জাইস: বিমানবন্দর পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণে আছে।

জনসন: তাদের বিমানবাহিনীর সঙ্গে কি আমাদের যোগাযোগ হয়েছে?

কর্নেল রিয়া: শেষ যোগাযোগ হয়েছিল তিন বা চার দিন আগে।

জনসন: ব্যাংককের টাওয়ার থেকে কি জানা সম্ভব যে ঢাকায় কেউ আছে কিনা?

কর্নেল রিয়া: পাকিস্তান বিমানবাহিনীর লোকজন টাওয়ার পরিচালনা করছে। তারা বলেছে দিনে ছয়টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে।

জনসন: সব কিছু মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, তাদের যোগাযোগ সহায়তা পেলে বাণিজ্যিক বিমান ব্যবহার সম্ভব হতে পারে।

প্যাকার্ড: সেটি আমার কাছে গ্রহণযোগ্য।

 

তথ্যসূত্র: ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান’