বিদেশি সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে ‘অপারেশন সার্চলাইট’
ছাদে গিয়ে তিনি দেখতে পান, পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের গলিত মস্তক। হলের কক্ষ ও সিঁড়িতে দেখা যায় রক্তের চিহ্ন। দেয়ালে দেখা যায় গুলির চিহ্ন, একটি দালান থেকে আসতে থাকে লাশের পঁচা গন্ধ। কয়েক ঘণ্টা আগেই নারী ও শিশুদের ২৩টি লাশ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল সেখান থেকে। তারা সবাই ছিলেন স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের সদস্য।
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১১:২৮ এএমআপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
সিডনি শ্যানবার্গ, সাইমন ড্রিং, আর্চার ব্লাড ও অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের মতো অনেকেই সেসময় নিজ দেশের সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি উপেক্ষা করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন - নিজের জীবন, চাকরি ও ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে।
“মিলিটারির নির্মমতার পরিসর বোঝা যাচ্ছিল নিজ বিছানায় মরে পড়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দেখে, বাজারে নিজের দোকানের পেছনে পড়ে থাকা নিহত কসাইদের দেখে, নিজ বাড়িতে জীবিত অবস্থায় পুড়ে ভস্ম হওয়া নারী ও শিশুদের দেখে, নিজ বাড়ি থেকে টেনে বের করে গুলি করা পাকিস্তানি হিন্দুদের দেখে, ভস্ম হওয়া বাজার ও দোকানপাট দেখে, এবং পাকিস্তানের পতাকা দেখে - যা বর্তমানে ঢাকা শহরের প্রায় প্রত্যেকটি দালানেই উড়তে দেখা যাচ্ছে।”
এই বিবরণ যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ছাপা হয়েছিল। লিখেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে লুকিয়ে ছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ছাদে - পরে অপারেশন সার্চলাইটের প্রকৃত নির্মমতার বিবরণ কাগজে টুকে সেই কাগজ মুজোর ভেতর লুকিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন।
ড্রিংয়ের মতো অনেকেই সেসময় নিজ দেশের সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি উপেক্ষা করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন - নিজের জীবন, চাকরি ও ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে। সাইমন ড্রিং, অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস, সিডনি শ্যানবার্গ, আর্চার ব্লাড তাদের মধ্যে কয়েকজন। ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বপ্ন চিরতরে নিঃশেষ করার নীল নকশার নৃশংস বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সেই রাতে এবং তার পরের দিনগুলোতে কী দেখেছিলেন তারা? আসুন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আজ তাদের ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে দেখি ‘অপারেশন সার্চলাইট’-কে।
শহরজুড়ে আগুন, গুলি ও বিস্ফোরণ
২৫এ মার্চ ছিল ঢাকায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বিক্ষোভের ২৩তম দিন। সেদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি - রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘর্ষ ও প্রেসিডেন্টের ঢাকা ত্যাগ দেখে আসন্ন বিপদের অনুমান করে ঢাকায় কর্মরত মার্কিন হাই কাউন্সিলর আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ‘স্টর্ম বিফোর কাম’ শীর্ষক টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সেনাদের সাথে সংঘর্ষের কথা। উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামে অস্ত্র বোঝাই সামরিক জাহাজ খালাস করতে গিয়ে জনতা বাধা দেয়, এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ১৫ জন।
রাতে আর্চারকে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা সামরিক বাহিনীর পথরোধ করতে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করেছে। এক পর্যায়ে নিজ বাসভবনের ছাদে যান আর্চার ও তার স্ত্রী মেগ ব্লাড। সেখান থেকে তারা দেখতে পান, শহরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে আগুন, বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হচ্ছে রাতের আকাশ। একেক জায়গা থেকে শোনা যাচ্ছে মেশিনগানের ধ্বনি, দেখা যাচ্ছে ট্রেসার বুলেটের লাল রেখা।
একই সময়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকা পড়েছিলেন প্রায় দুইশ বিদেশি সাংবাদিক। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাদের সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি জব্দ করে তাদের হোটেল প্রাঙ্গণ ছাড়তে নিষেধ করেছিল। তাদের মধ্যে একদল হোটেলের ছাদে যান, এবং তারাও দেখতে পান শহরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে লক্ষ্য করে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ করতে দেখা যায় সেনাবাহিনীকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাবর্ষণ ও বুদ্ধিজীবী হত্যা
সেই রাতে ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকা সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবার্গ। তিনি হোটেলের ছাদ থেকে দেখতে পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর আগ্রাসন। তার ভাষ্যমতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে আগুন জ্বলতে দেখা যায় হোটেলের ছাদ থেকে।
শ্যানবার্গ ও অন্যান্য সাংবাদিকরা দেখেন, ক্যাম্পাস থেকে দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে সেনাবাহিনীর দিকে এগিয়ে আসছে শিক্ষার্থীদের মিছিল। পাকিস্তানি সেনারা জিপের ওপর লাগানো মেশিনগান দিয়ে তাদের ওপর গুলি করে, সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
সাইমন ড্রিং তার দেখা ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন লেখেন। শিরোনাম - “পাকিস্তানে ট্যাংক দিয়ে বিদ্রোহ দমন। ৭,০০০ নিহত : ঘরবাড়ি ভস্ম”। সেখানে তিনি লেখেন, রাত ১১টার মধ্যেই গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। কিছু মানুষ রাস্তায় উলটানো গাড়ি, গাছের গুঁড়ি, ফার্নিচার, কংক্রিটের পাইপ ও ইট দিয়ে ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা করেছিল - তারাই সহিংসতার প্রথম শিকার হয়।
ড্রিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের আগেই সেনাবাহিনীর আগমন নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, তবুও তারা সরে যায়নি। তাদের মধ্যে কয়েকজন পরে বলে, তারা মনে করেছিল তাদের শুধু গ্রেফতার করা হবে। তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্কিন প্রদত্ত এম-২৪ ট্যাংক নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিল সেনাবাহিনী। ব্রিটিশ কাউন্সিলের গ্রন্থাগারকে ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে ক্যাম্পাসে আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের দিকে নিক্ষেপ করা হয় রকেট। সবচেয়ে বেশি শেলিং করা হয় তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)।
ইকবাল হলে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। পরদিন হল প্রাঙ্গণের দেয়ালে দেয়ালে দেখা যায় শেলিং ও মেশিনগানের গুলির চিহ্ন। মাটিতে, পুকুরের পানিতে দেখা যায় একের পর এক শিক্ষার্থীর লাশ। চারুকলার এক শিক্ষার্থী নিজের ইজেলের ওপর নিথর হয়ে পড়ে ছিল। হলের সাতজন শিক্ষক এবং সেখানে বসবাসকারী ১২ সদস্যের এক পরিবারকে টেনে বের করে গুলি করা হয়।
অপারেশন সার্চলাইটের পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একদল সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তানে “সব পরিস্থিতি স্বাভাবিক” এমনটি প্রচারের উদ্দেশ্যে পাঠায় পাকিস্তানের সরকার। তাদের মধ্যে ছিলেন মর্নিং নিউজের সহকারী সম্পাদক অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস, যিনি বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার পরিসর দেখে সরকারের আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, এবং যুক্তরাজ্যে গিয়ে সান্ডে টাইমস পত্রিকায় তার দেখা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে “জেনোসাইড” শীর্ষক প্রতিবেদন লিখেন।
সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৫ই এপ্রিল ঢাকা সফর করতে গিয়ে মাস্কারেনহাস ইকবাল হলে যান। ছাদে গিয়ে তিনি দেখতে পান, পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের গলিত মস্তক। কেয়ারটেকার জানান, তাদের ২৫এ মার্চ রাতে হত্যা করা হয়েছিল। হলের কক্ষ ও সিঁড়িতে দেখা যায় রক্তের চিহ্ন। দেয়ালে দেখা যায় গুলির চিহ্ন, একটি দালান থেকে আসতে থাকে লাশের পঁচা গন্ধ। আশেপাশের মানুষ জানান, মাস্কারেনহাস আসার কয়েক ঘণ্টা আগেই নারী ও শিশুদের ২৩টি লাশ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল সেখান থেকে। তারা সবাই ছিলেন স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের সদস্য।
এছাড়া ড্রিংয়ের প্রতিবেদনে “আরেকটি হল”-এর বাইরে এলোমেলোভাবে খোঁড়া গণকবরের কথা জানা যায়, যেখানে নিহত শিক্ষার্থীদের মাটিচাপা দেয় পাকিস্তানি সেনারা। এই হলটি জগন্নাথ হল - যেখানে বসবাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চান শিক্ষার্থীরা। বীর প্রতীক শাহজামান মজুমদারের লিখা “গেরিলা : আ পার্সোনাল মেমোর্যান্ডাম অফ ১৯৭১” বইতে এই গণকবরের কথা জানা যায়। তিনি লেখেন, পরদিন সকালে জগন্নাথ হলের বাইরে দেখা যায় এলোমেলোভাবে খোঁড়া গণকবর। কাদামাটি থেকে বেরিয়ে ছিল নিহত শিক্ষার্থীদের হাত-পা, যা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল কাক ও কুকুর। সিডনি শ্যানবার্গ বলেন, “সেই রাতে নিরস্ত্র নাগরিক হত্যার নৃশংসতম ঘটনা ঘটেছিল জগন্নাথ হলে। সেখানে হিন্দু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।”
পাকিস্তানি লেখক ও ইতিহাসবিদ আনাম জাকারিয়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মানুষের দৃষ্টিকোণ তিন দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে লেখেন “১৯৭১- আ পিপলস হিস্টোরি ফ্রম বাংলাদেশ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইন্ডিয়া” নামক বই। সেখানে ২৫এ মার্চে জগন্নাথ হলে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ উঠে আসে জগন্নাথ হলের তৎকালীন প্রভোস্ট ও শহীদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মেয়ে মেঘনা গুহঠাকুরতার সাক্ষাৎকারে।
২৫এ মার্চ রাতে মেঘনার মা হল প্রাঙ্গণের উল্টোদিকে তাদের বাসভবনের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বলেন, “আর্মি এসেছে”। কিছুক্ষণ পরই তাদের দরজায় করাঘাত পড়ে, নিয়ে যাওয়া হয় বাবাকে। তারা ভেবেছিলেন, শুধু গ্রেফতার করা হচ্ছে, উচ্চ পর্যায়ে পরিচিতি আছে এমন বন্ধুদের ফোন করলেই হয়তো ছাড়িয়ে আনা যাবে। তবে হঠাতই বাইরে থেকে শোনা যায় গুলির শব্দ। বাইরে দৌঁড়ে গিয়ে মেঘনা ও তার মা দেখেন, নিজেদের রক্তের মধ্যে পড়ে আছেন একদল শিক্ষক - তাদের মধ্যে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু অধ্যাপক মনিরুজ্জামান।
২৫এ মার্চে বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা জানা যায় অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের প্রতিবেদনেও। তিনি বলেন, ২৫এ মার্চ অভিযান চলাকালীন সেনাবাহিনীর অনেক সদস্যদের কাছে লিখিত তালিকা ছিল - যেখানে লেখা ছিল এমন সব ব্যক্তিদের নাম, যাদের ‘নিষ্ক্রিয়’ করতে হবে। সেই তালিকায় ছিল হিন্দু এবং বড় সংখক মুসলিম শিক্ষার্থী, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, এবং শিক্ষক, অধ্যাপক ও সাংবাদিকদের নাম।
তার লেখা বই “দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ”-এ মাস্কারেনহাস বলেন, সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল পাঁচ ধরনের মানুষ- এক, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সদস্যরা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যরা। দুই, হিন্দু ব্যক্তিরা। তিন, আওয়ামী লীগের সকল স্তরের সদস্যরা। চার, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ও পাঁচ, বাঙালি বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক ও শিক্ষকেরা।
পত্রিকা অফিসে ট্যাংক হামলা, হত্যাযজ্ঞ, আগুন
ঢাকায় রাজনৈতিক সংগ্রাম, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী বয়ান তৈরির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেনাবাহিনীর বিশেষ আক্রোশের পাত্র ছিল। একই কারণে অপারেশন সার্চলাইটের নীল নকশায় স্থান পায় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্র।
ইন্টারকন্টিনেন্টালের ছাদ থেকে সাংবাদিকরা দেখেন, ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য পিপল’-এর কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেনাবাহিনী। কার্যালয়কে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে সেনাবাহিনী। পালানোর চেষ্টা করা কর্মীদের রাস্তার মাঝে গুলি করা হয়। শেষে পত্রিকার কার্যালয় পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতার কথা জানা যায় সিডনি শ্যানবার্গের প্রতিবেদনেও। সেখান থেকে জানা যায়, সেনাবাহিনীর আক্রোশের বিশেষ পাত্র ছিল দ্য পিপল ও দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়। এম-২৪ ট্যাংক দিয়ে সরাসরি কার্যালয়ের ভেতর গোলা নিক্ষেপ করা হয়। দুই দিন পরও সেখানে জ্বলতে দেখা যায় আগুন, ভেতরে পাওয়া যায় পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া সংবাদকর্মীদের লাশ।
রাজারবাগ ও পিলখানায় ঘুমন্ত সৈনিক হত্যা
বাংলাদেশের সামরিক প্রতিরোধের সক্ষমতা ধ্বংস করতে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে, ইপিআর সদর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ২৫এ মার্চ রাতে আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সামরিক বাহিনী অভিযানের শুরুতেই ট্যাংক দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করে। এরপর সৈন্যরা ঢুকে পুলিশের আবাসন কক্ষ পুড়িয়ে দেয়, হত্যা করে ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের। পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন, তবে ড্রিংয়ের তথ্য অনুযায়ী সেখানে উপস্থিত ১,১০০ পুলিশ সদস্যের প্রায় সবাই নিহত হন।
অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের তথ্য অনুযায়ী, পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদরে ট্যাংক, রাইফেল ও অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে হামলা চালায় সেনাবাহিনী। রাজারবাগ পুলিশ লাইনেও একই কায়দায় হামলা চালানো হয়। ইপিআর সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আকস্মিক হামলার মুখে নিহত হন। যদিও মাস্কারেনহাস বলেন, ঢাকা ভ্রমণকালে তার সাথে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এস্কর্ট তার কাছে স্বীকার করে - মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।
হিন্দুদের ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা
অপারেশন সার্চলাইটে হিন্দু বসতবাড়িতে ও আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের ঘরে ঘরে গিয়ে খুঁজে বের করে পাকিস্তানি বাহিনী। “দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ” বইয়ে অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের তথ্য অনুযায়ী, শংকরিপাড়ায় হিন্দু নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হল থেকে শিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে মর্টার শেল নিক্ষেপ করেছে, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে রমনা মন্দিরের আশেপাশের দু’টি হিন্দু কলোনিতে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন হিন্দু পরিবারের সদস্যদের নিজ বাসস্থান থেকে টেনে বের করে দলে দলে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখানে বাঙালি দোসরদের সহায়তায় হত্যাযজ্ঞ চালানোর কথাও জানা যায়। ড্রিং লেখেন, ২৬ তারিখ বেলা ১১টা পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ থামেনি। সেনাবাহিনীর বাঙালি সহযোগীরা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাসা দেখিয়ে দিচ্ছিল, এবং সেই অনুযায়ী সেনাবাহিনী সেখানে ট্যাংক কিংবা রিকয়েললেস রাইফেল দিয়ে সরাসরি আঘাত করছিল, অথবা পেট্রোল দিয়ে বাসা পুড়িয়ে দিচ্ছিল।
নিজ বাড়িতে হত্যা হওয়া মানুষজনের অনেকেই ছিলেন মার্কিন হাই কাউন্সিলর আর্চার ব্লাডের বন্ধু। তার স্ত্রী মেগ ব্লাড এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আর্চার এখানে বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ বাঙালি বন্ধু বানিয়েছিল। তাদের সবাইকে নিজ নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়।”
নিজের দেশবাসীকে হত্যা করেছি, তোমাকে কেন করব না?
আর্চার ব্লাড ২৫এ মার্চে তার ও তার কনস্যুলেটের কর্মীদের প্রত্যক্ষ করা বাস্তবতা জানানোর চেষ্টা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে। তবে কোনো সাড়া আসেনি। সরকারের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ব্লাড। এক পর্যায়ে তিনি “সিলেক্টিভ জেনোসাইড” শীর্ষক এক টেলিগ্রাম প্রেরণ করেন ওয়াশিংটনে, যেখানে আওয়ামী লীগ সদস্য ও হিন্দু ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করার বিবরণী পাওয়া যায়। এই টেলিগ্রামের প্রতিক্রিয়া ও করাচির চাপে আর্চার ব্লাডকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয় সরকার, ফেরত নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রে।
সিডনি শ্যানবার্গের ভাষ্যমতে, ২৫এ মার্চ রাতে ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকা পড়া সাংবাদিকদের পরের দিন করাচিগামী বিমানে তোলে সেনাবাহিনী। তার আগ পর্যন্ত একটাই নির্দেশনা ছিল - “যে হোটেল থেকে বের হবে তাকেই গুলি করা হবে।” তবুও লুকিয়ে বের হতে গিয়ে ধরা খাওয়া এক সাংবাদিককে এক সেনা কর্মকর্তা বলে, “আমি নিজের দেশবাসীকে হত্যা করেছি। তোমাকে কেন হত্যা করব না?” তবুও হোটেলের বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন কিছু সাংবাদিক। তাদের মধ্যে ছিলেন শ্যানবার্গ, সাইমন ড্রিং ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের একজন সাংবাদিক ও একজন ক্যামেরাম্যান।
অন্যদিকে অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসকে পাকিস্তান সরকার পাঠিয়েছিল ফিরে গিয়ে শিখিয়ে দেওয়া বয়ানের পুনরাবৃত্তি করতে। তবে তিনি সেনাবাহিনীর বর্বরতা দেখে এতটাই বিচলিত হন, তিনি তা করতে পারেন না। বাসায় ফিরে তার স্ত্রীকে বলেন, “আমি যা দেখেছি, তা যদি না লিখি, আর কোনোদিন কিছুই লিখতে পারব না।” যুক্তরাজ্যে গিয়ে সোজা ঢোকেন সান্ডে টাইমসের সম্পাদকের অফিসে। সম্পাদক তার লিখা ছাপাতে সম্মত হন, তার পরিবারকে সুরক্ষিতভাবে পাকিস্তান থেকে বের করার পর। আর কখনো নিজ দেশে ফিরে যাননি তিনি।
সাইমন ড্রিং, অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস, আর্চার ব্লাড, সিডনি শ্যানবার্গ ও অন্যান্য অনেকে নিজের দেশের সরকারের নির্দেশ, রাজনৈতিক স্বার্থ ও নিজের জীবনের ভয় ছেড়ে বাংলাদেশের সত্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন বলেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববাসীর সমর্থন পেয়েছিল বাংলাদেশ।
বিদেশি সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে ‘অপারেশন সার্চলাইট’
ছাদে গিয়ে তিনি দেখতে পান, পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের গলিত মস্তক। হলের কক্ষ ও সিঁড়িতে দেখা যায় রক্তের চিহ্ন। দেয়ালে দেখা যায় গুলির চিহ্ন, একটি দালান থেকে আসতে থাকে লাশের পঁচা গন্ধ। কয়েক ঘণ্টা আগেই নারী ও শিশুদের ২৩টি লাশ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল সেখান থেকে। তারা সবাই ছিলেন স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের সদস্য।
“মিলিটারির নির্মমতার পরিসর বোঝা যাচ্ছিল নিজ বিছানায় মরে পড়ে থাকা শিক্ষার্থীদের দেখে, বাজারে নিজের দোকানের পেছনে পড়ে থাকা নিহত কসাইদের দেখে, নিজ বাড়িতে জীবিত অবস্থায় পুড়ে ভস্ম হওয়া নারী ও শিশুদের দেখে, নিজ বাড়ি থেকে টেনে বের করে গুলি করা পাকিস্তানি হিন্দুদের দেখে, ভস্ম হওয়া বাজার ও দোকানপাট দেখে, এবং পাকিস্তানের পতাকা দেখে - যা বর্তমানে ঢাকা শহরের প্রায় প্রত্যেকটি দালানেই উড়তে দেখা যাচ্ছে।”
এই বিবরণ যুক্তরাজ্যের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ছাপা হয়েছিল। লিখেছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে লুকিয়ে ছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ছাদে - পরে অপারেশন সার্চলাইটের প্রকৃত নির্মমতার বিবরণ কাগজে টুকে সেই কাগজ মুজোর ভেতর লুকিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেছিলেন।
ড্রিংয়ের মতো অনেকেই সেসময় নিজ দেশের সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতি উপেক্ষা করে সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন - নিজের জীবন, চাকরি ও ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে। সাইমন ড্রিং, অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস, সিডনি শ্যানবার্গ, আর্চার ব্লাড তাদের মধ্যে কয়েকজন। ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বপ্ন চিরতরে নিঃশেষ করার নীল নকশার নৃশংস বাস্তবায়ন শুরু হওয়া সেই রাতে এবং তার পরের দিনগুলোতে কী দেখেছিলেন তারা? আসুন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আজ তাদের ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শীদের চোখে দেখি ‘অপারেশন সার্চলাইট’-কে।
শহরজুড়ে আগুন, গুলি ও বিস্ফোরণ
২৫এ মার্চ ছিল ঢাকায় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও বিক্ষোভের ২৩তম দিন। সেদিন ঢাকা ও চট্টগ্রামের সার্বিক পরিস্থিতি - রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘর্ষ ও প্রেসিডেন্টের ঢাকা ত্যাগ দেখে আসন্ন বিপদের অনুমান করে ঢাকায় কর্মরত মার্কিন হাই কাউন্সিলর আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে ‘স্টর্ম বিফোর কাম’ শীর্ষক টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সেনাদের সাথে সংঘর্ষের কথা। উল্লেখ করেন, চট্টগ্রামে অস্ত্র বোঝাই সামরিক জাহাজ খালাস করতে গিয়ে জনতা বাধা দেয়, এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ১৫ জন।
রাতে আর্চারকে বলা হয়, শিক্ষার্থীরা সামরিক বাহিনীর পথরোধ করতে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করেছে। এক পর্যায়ে নিজ বাসভবনের ছাদে যান আর্চার ও তার স্ত্রী মেগ ব্লাড। সেখান থেকে তারা দেখতে পান, শহরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে আগুন, বিভিন্ন জায়গায় বিস্ফোরণে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল হচ্ছে রাতের আকাশ। একেক জায়গা থেকে শোনা যাচ্ছে মেশিনগানের ধ্বনি, দেখা যাচ্ছে ট্রেসার বুলেটের লাল রেখা।
একই সময়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকা পড়েছিলেন প্রায় দুইশ বিদেশি সাংবাদিক। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাদের সম্প্রচারের যন্ত্রপাতি জব্দ করে তাদের হোটেল প্রাঙ্গণ ছাড়তে নিষেধ করেছিল। তাদের মধ্যে একদল হোটেলের ছাদে যান, এবং তারাও দেখতে পান শহরের বিভিন্ন জায়গায় আগুন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে লক্ষ্য করে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ করতে দেখা যায় সেনাবাহিনীকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাবর্ষণ ও বুদ্ধিজীবী হত্যা
সেই রাতে ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকা সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবার্গ। তিনি হোটেলের ছাদ থেকে দেখতে পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সেনাবাহিনীর আগ্রাসন। তার ভাষ্যমতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে আগুন জ্বলতে দেখা যায় হোটেলের ছাদ থেকে।
শ্যানবার্গ ও অন্যান্য সাংবাদিকরা দেখেন, ক্যাম্পাস থেকে দেশাত্মবোধক গান গাইতে গাইতে সেনাবাহিনীর দিকে এগিয়ে আসছে শিক্ষার্থীদের মিছিল। পাকিস্তানি সেনারা জিপের ওপর লাগানো মেশিনগান দিয়ে তাদের ওপর গুলি করে, সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
সাইমন ড্রিং তার দেখা ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রতিবেদন লেখেন। শিরোনাম - “পাকিস্তানে ট্যাংক দিয়ে বিদ্রোহ দমন। ৭,০০০ নিহত : ঘরবাড়ি ভস্ম”। সেখানে তিনি লেখেন, রাত ১১টার মধ্যেই গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। কিছু মানুষ রাস্তায় উলটানো গাড়ি, গাছের গুঁড়ি, ফার্নিচার, কংক্রিটের পাইপ ও ইট দিয়ে ব্যারিকেড তৈরির চেষ্টা করেছিল - তারাই সহিংসতার প্রথম শিকার হয়।
ড্রিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের আগেই সেনাবাহিনীর আগমন নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, তবুও তারা সরে যায়নি। তাদের মধ্যে কয়েকজন পরে বলে, তারা মনে করেছিল তাদের শুধু গ্রেফতার করা হবে। তার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্কিন প্রদত্ত এম-২৪ ট্যাংক নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিল সেনাবাহিনী। ব্রিটিশ কাউন্সিলের গ্রন্থাগারকে ঘাঁটি বানিয়ে সেখান থেকে ক্যাম্পাসে আর্টিলারির গোলা নিক্ষেপ করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের দিকে নিক্ষেপ করা হয় রকেট। সবচেয়ে বেশি শেলিং করা হয় তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)।
ইকবাল হলে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। পরদিন হল প্রাঙ্গণের দেয়ালে দেয়ালে দেখা যায় শেলিং ও মেশিনগানের গুলির চিহ্ন। মাটিতে, পুকুরের পানিতে দেখা যায় একের পর এক শিক্ষার্থীর লাশ। চারুকলার এক শিক্ষার্থী নিজের ইজেলের ওপর নিথর হয়ে পড়ে ছিল। হলের সাতজন শিক্ষক এবং সেখানে বসবাসকারী ১২ সদস্যের এক পরিবারকে টেনে বের করে গুলি করা হয়।
অপারেশন সার্চলাইটের পর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একদল সাংবাদিককে পূর্ব পাকিস্তানে “সব পরিস্থিতি স্বাভাবিক” এমনটি প্রচারের উদ্দেশ্যে পাঠায় পাকিস্তানের সরকার। তাদের মধ্যে ছিলেন মর্নিং নিউজের সহকারী সম্পাদক অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস, যিনি বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার পরিসর দেখে সরকারের আদেশের বিরুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, এবং যুক্তরাজ্যে গিয়ে সান্ডে টাইমস পত্রিকায় তার দেখা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে “জেনোসাইড” শীর্ষক প্রতিবেদন লিখেন।
সেই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৫ই এপ্রিল ঢাকা সফর করতে গিয়ে মাস্কারেনহাস ইকবাল হলে যান। ছাদে গিয়ে তিনি দেখতে পান, পড়ে আছে শিক্ষার্থীদের গলিত মস্তক। কেয়ারটেকার জানান, তাদের ২৫এ মার্চ রাতে হত্যা করা হয়েছিল। হলের কক্ষ ও সিঁড়িতে দেখা যায় রক্তের চিহ্ন। দেয়ালে দেখা যায় গুলির চিহ্ন, একটি দালান থেকে আসতে থাকে লাশের পঁচা গন্ধ। আশেপাশের মানুষ জানান, মাস্কারেনহাস আসার কয়েক ঘণ্টা আগেই নারী ও শিশুদের ২৩টি লাশ সরিয়ে নেয়া হয়েছিল সেখান থেকে। তারা সবাই ছিলেন স্থানীয় এক হিন্দু পরিবারের সদস্য।
এছাড়া ড্রিংয়ের প্রতিবেদনে “আরেকটি হল”-এর বাইরে এলোমেলোভাবে খোঁড়া গণকবরের কথা জানা যায়, যেখানে নিহত শিক্ষার্থীদের মাটিচাপা দেয় পাকিস্তানি সেনারা। এই হলটি জগন্নাথ হল - যেখানে বসবাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু-বৌদ্ধ-ক্রিশ্চান শিক্ষার্থীরা। বীর প্রতীক শাহজামান মজুমদারের লিখা “গেরিলা : আ পার্সোনাল মেমোর্যান্ডাম অফ ১৯৭১” বইতে এই গণকবরের কথা জানা যায়। তিনি লেখেন, পরদিন সকালে জগন্নাথ হলের বাইরে দেখা যায় এলোমেলোভাবে খোঁড়া গণকবর। কাদামাটি থেকে বেরিয়ে ছিল নিহত শিক্ষার্থীদের হাত-পা, যা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল কাক ও কুকুর। সিডনি শ্যানবার্গ বলেন, “সেই রাতে নিরস্ত্র নাগরিক হত্যার নৃশংসতম ঘটনা ঘটেছিল জগন্নাথ হলে। সেখানে হিন্দু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।”
পাকিস্তানি লেখক ও ইতিহাসবিদ আনাম জাকারিয়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মানুষের দৃষ্টিকোণ তিন দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে লেখেন “১৯৭১- আ পিপলস হিস্টোরি ফ্রম বাংলাদেশ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইন্ডিয়া” নামক বই। সেখানে ২৫এ মার্চে জগন্নাথ হলে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ উঠে আসে জগন্নাথ হলের তৎকালীন প্রভোস্ট ও শহীদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মেয়ে মেঘনা গুহঠাকুরতার সাক্ষাৎকারে।
২৫এ মার্চ রাতে মেঘনার মা হল প্রাঙ্গণের উল্টোদিকে তাদের বাসভবনের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বলেন, “আর্মি এসেছে”। কিছুক্ষণ পরই তাদের দরজায় করাঘাত পড়ে, নিয়ে যাওয়া হয় বাবাকে। তারা ভেবেছিলেন, শুধু গ্রেফতার করা হচ্ছে, উচ্চ পর্যায়ে পরিচিতি আছে এমন বন্ধুদের ফোন করলেই হয়তো ছাড়িয়ে আনা যাবে। তবে হঠাতই বাইরে থেকে শোনা যায় গুলির শব্দ। বাইরে দৌঁড়ে গিয়ে মেঘনা ও তার মা দেখেন, নিজেদের রক্তের মধ্যে পড়ে আছেন একদল শিক্ষক - তাদের মধ্যে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু অধ্যাপক মনিরুজ্জামান।
২৫এ মার্চে বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা জানা যায় অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের প্রতিবেদনেও। তিনি বলেন, ২৫এ মার্চ অভিযান চলাকালীন সেনাবাহিনীর অনেক সদস্যদের কাছে লিখিত তালিকা ছিল - যেখানে লেখা ছিল এমন সব ব্যক্তিদের নাম, যাদের ‘নিষ্ক্রিয়’ করতে হবে। সেই তালিকায় ছিল হিন্দু এবং বড় সংখক মুসলিম শিক্ষার্থী, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, এবং শিক্ষক, অধ্যাপক ও সাংবাদিকদের নাম।
তার লেখা বই “দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ”-এ মাস্কারেনহাস বলেন, সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল পাঁচ ধরনের মানুষ- এক, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সদস্যরা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যরা। দুই, হিন্দু ব্যক্তিরা। তিন, আওয়ামী লীগের সকল স্তরের সদস্যরা। চার, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ও পাঁচ, বাঙালি বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক ও শিক্ষকেরা।
পত্রিকা অফিসে ট্যাংক হামলা, হত্যাযজ্ঞ, আগুন
ঢাকায় রাজনৈতিক সংগ্রাম, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী বয়ান তৈরির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেনাবাহিনীর বিশেষ আক্রোশের পাত্র ছিল। একই কারণে অপারেশন সার্চলাইটের নীল নকশায় স্থান পায় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্র।
ইন্টারকন্টিনেন্টালের ছাদ থেকে সাংবাদিকরা দেখেন, ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য পিপল’-এর কার্যালয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে সেনাবাহিনী। কার্যালয়কে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে সেনাবাহিনী। পালানোর চেষ্টা করা কর্মীদের রাস্তার মাঝে গুলি করা হয়। শেষে পত্রিকার কার্যালয় পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতার কথা জানা যায় সিডনি শ্যানবার্গের প্রতিবেদনেও। সেখান থেকে জানা যায়, সেনাবাহিনীর আক্রোশের বিশেষ পাত্র ছিল দ্য পিপল ও দৈনিক ইত্তেফাক কার্যালয়। এম-২৪ ট্যাংক দিয়ে সরাসরি কার্যালয়ের ভেতর গোলা নিক্ষেপ করা হয়। দুই দিন পরও সেখানে জ্বলতে দেখা যায় আগুন, ভেতরে পাওয়া যায় পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া সংবাদকর্মীদের লাশ।
রাজারবাগ ও পিলখানায় ঘুমন্ত সৈনিক হত্যা
বাংলাদেশের সামরিক প্রতিরোধের সক্ষমতা ধ্বংস করতে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে, ইপিআর সদর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ২৫এ মার্চ রাতে আক্রমণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে সামরিক বাহিনী অভিযানের শুরুতেই ট্যাংক দিয়ে গোলা নিক্ষেপ করে। এরপর সৈন্যরা ঢুকে পুলিশের আবাসন কক্ষ পুড়িয়ে দেয়, হত্যা করে ঘুমন্ত পুলিশ সদস্যদের। পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন, তবে ড্রিংয়ের তথ্য অনুযায়ী সেখানে উপস্থিত ১,১০০ পুলিশ সদস্যের প্রায় সবাই নিহত হন।
অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের তথ্য অনুযায়ী, পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদরে ট্যাংক, রাইফেল ও অটোমেটিক রাইফেল দিয়ে হামলা চালায় সেনাবাহিনী। রাজারবাগ পুলিশ লাইনেও একই কায়দায় হামলা চালানো হয়। ইপিআর সদস্যরা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আকস্মিক হামলার মুখে নিহত হন। যদিও মাস্কারেনহাস বলেন, ঢাকা ভ্রমণকালে তার সাথে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এস্কর্ট তার কাছে স্বীকার করে - মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ করেছিল ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।
হিন্দুদের ও আওয়ামী লীগ কর্মীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা
অপারেশন সার্চলাইটে হিন্দু বসতবাড়িতে ও আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের ঘরে ঘরে গিয়ে খুঁজে বের করে পাকিস্তানি বাহিনী। “দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ” বইয়ে অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসের তথ্য অনুযায়ী, শংকরিপাড়ায় হিন্দু নারী ও শিশুদের হত্যা করা হয়। জগন্নাথ হল থেকে শিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে মর্টার শেল নিক্ষেপ করেছে, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে রমনা মন্দিরের আশেপাশের দু’টি হিন্দু কলোনিতে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।
সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিভিন্ন হিন্দু পরিবারের সদস্যদের নিজ বাসস্থান থেকে টেনে বের করে দলে দলে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেখানে বাঙালি দোসরদের সহায়তায় হত্যাযজ্ঞ চালানোর কথাও জানা যায়। ড্রিং লেখেন, ২৬ তারিখ বেলা ১১টা পর্যন্ত হত্যাযজ্ঞ থামেনি। সেনাবাহিনীর বাঙালি সহযোগীরা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাসা দেখিয়ে দিচ্ছিল, এবং সেই অনুযায়ী সেনাবাহিনী সেখানে ট্যাংক কিংবা রিকয়েললেস রাইফেল দিয়ে সরাসরি আঘাত করছিল, অথবা পেট্রোল দিয়ে বাসা পুড়িয়ে দিচ্ছিল।
নিজ বাড়িতে হত্যা হওয়া মানুষজনের অনেকেই ছিলেন মার্কিন হাই কাউন্সিলর আর্চার ব্লাডের বন্ধু। তার স্ত্রী মেগ ব্লাড এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আর্চার এখানে বেশ কিছু ঘনিষ্ঠ বাঙালি বন্ধু বানিয়েছিল। তাদের সবাইকে নিজ নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়।”
নিজের দেশবাসীকে হত্যা করেছি, তোমাকে কেন করব না?
আর্চার ব্লাড ২৫এ মার্চে তার ও তার কনস্যুলেটের কর্মীদের প্রত্যক্ষ করা বাস্তবতা জানানোর চেষ্টা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে। তবে কোনো সাড়া আসেনি। সরকারের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ব্লাড। এক পর্যায়ে তিনি “সিলেক্টিভ জেনোসাইড” শীর্ষক এক টেলিগ্রাম প্রেরণ করেন ওয়াশিংটনে, যেখানে আওয়ামী লীগ সদস্য ও হিন্দু ব্যক্তিদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করার বিবরণী পাওয়া যায়। এই টেলিগ্রামের প্রতিক্রিয়া ও করাচির চাপে আর্চার ব্লাডকে তার পদ থেকে অব্যাহতি দেয় সরকার, ফেরত নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রে।
সিডনি শ্যানবার্গের ভাষ্যমতে, ২৫এ মার্চ রাতে ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটকা পড়া সাংবাদিকদের পরের দিন করাচিগামী বিমানে তোলে সেনাবাহিনী। তার আগ পর্যন্ত একটাই নির্দেশনা ছিল - “যে হোটেল থেকে বের হবে তাকেই গুলি করা হবে।” তবুও লুকিয়ে বের হতে গিয়ে ধরা খাওয়া এক সাংবাদিককে এক সেনা কর্মকর্তা বলে, “আমি নিজের দেশবাসীকে হত্যা করেছি। তোমাকে কেন হত্যা করব না?” তবুও হোটেলের বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন কিছু সাংবাদিক। তাদের মধ্যে ছিলেন শ্যানবার্গ, সাইমন ড্রিং ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের একজন সাংবাদিক ও একজন ক্যামেরাম্যান।
অন্যদিকে অ্যান্থনি মাস্কারেনহাসকে পাকিস্তান সরকার পাঠিয়েছিল ফিরে গিয়ে শিখিয়ে দেওয়া বয়ানের পুনরাবৃত্তি করতে। তবে তিনি সেনাবাহিনীর বর্বরতা দেখে এতটাই বিচলিত হন, তিনি তা করতে পারেন না। বাসায় ফিরে তার স্ত্রীকে বলেন, “আমি যা দেখেছি, তা যদি না লিখি, আর কোনোদিন কিছুই লিখতে পারব না।” যুক্তরাজ্যে গিয়ে সোজা ঢোকেন সান্ডে টাইমসের সম্পাদকের অফিসে। সম্পাদক তার লিখা ছাপাতে সম্মত হন, তার পরিবারকে সুরক্ষিতভাবে পাকিস্তান থেকে বের করার পর। আর কখনো নিজ দেশে ফিরে যাননি তিনি।
সাইমন ড্রিং, অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস, আর্চার ব্লাড, সিডনি শ্যানবার্গ ও অন্যান্য অনেকে নিজের দেশের সরকারের নির্দেশ, রাজনৈতিক স্বার্থ ও নিজের জীবনের ভয় ছেড়ে বাংলাদেশের সত্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন বলেই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ববাসীর সমর্থন পেয়েছিল বাংলাদেশ।