বিতর্ক ও অবিশ্বাসের মেঘ ঠেলে স্পিকারের আসনে মেজর হাফিজ: এক বর্ণাঢ্য অথচ কণ্টকাকীর্ণ অভিযাত্রা
রণাঙ্গনের বীরত্ব, খেলার মাঠের নেতৃত্ব আর রাজনীতির দীর্ঘ ও নাটকীয় পথ পাড়ি দিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সাত বারের এই সংসদ সদস্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিলো বিতর্ক, অবিশ্বাস এবং দলীয় কোন্দলের গুঞ্জন। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর পদে বসলেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক।
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১০:৩১ পিএমআপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম
ফুটবলার থেকে সেনাসদস্য, পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ হিসেবে মেজর হাফিজের এই যাত্রা যেমন সাফল্যের, তেমনি চরম নাটকীয়তায় ঘেরা।
মেজর হাফিজের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় ১/১১ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়। তখনকার সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভাঙ্গনের গুঞ্জন দেখা দেয় বিএনপিতে। মাইনাস টু ফর্মুলায় দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। সেই সময় দলটির ‘সংস্কারপন্থী’ অংশের নেতাদের মধ্যে প্রথমের দিকে থাকার অভিযোগ ওঠে মেজর হাফিজের বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে দলকে পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টাকে দলের একটি বড় অংশ ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে গণ্য করে। পরবর্তীতে তিনি মূল ধারার বিএনপিতে তাকে নিয়ে এক ধরনের ‘আস্থাহীনতা’ বজায় ছিল।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মেজর হাফিজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে নতুন করে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
নোটিশে তার বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনার অভিযোগ আনা হয়। জবাবে মেজর হাফিজের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক মহলে ‘বিস্ফোরক’ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব নিয়ে খোলামেলা সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা তৎকালীন সময়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
‘কিংস পার্টি’ ও ২০২৪ এর নির্বাচন
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তাকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। গুঞ্জন শোনা যায় মেজর হাফিজ নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন।
ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের সাথে তার বৈঠক এবং তখনকার সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানের সাথে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গুঞ্জন আরও ঘনীভূত হয়। তবে সংবাদ সম্মেলন করে এসব গুঞ্জন অস্বীকার করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অংশ নেননি তিনি।
অ্যাথলেট ও সৈনিক জীবন: রণাঙ্গন থেকে ফুটবল মাঠ
সাত বারের সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সর্বশেষ জাতীয় সংসদের স্পিকার – এসবের বাইরেও হাফিজ উদ্দিন আহমদের আছে আরো অনেক ভিন্ন পরিচয়। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার পূর্ব পাকিস্তানের ‘দ্রুততম মানব’ ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এই রাজনীতিবিদ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কামালপুরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত হন।
নতুন অধ্যায়: অবিশ্বাসের পর আস্থা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একইসাথে সামলেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যের দায়িত্ব। সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার হিসেবে তার ওপরই আস্থা রাখল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।
‘সংস্কারপন্থী’ বা ‘অবিশ্বাসের’ তকমা বয়ে বেড়ানো বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ হলেন সংসদের নতুন অভিভাবক।
বিতর্ক ও অবিশ্বাসের মেঘ ঠেলে স্পিকারের আসনে মেজর হাফিজ: এক বর্ণাঢ্য অথচ কণ্টকাকীর্ণ অভিযাত্রা
রণাঙ্গনের বীরত্ব, খেলার মাঠের নেতৃত্ব আর রাজনীতির দীর্ঘ ও নাটকীয় পথ পাড়ি দিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার হলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সাত বারের এই সংসদ সদস্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছিলো বিতর্ক, অবিশ্বাস এবং দলীয় কোন্দলের গুঞ্জন। তবে সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর পদে বসলেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ক।
ফুটবলার থেকে সেনাসদস্য, পরবর্তীতে রাজনীতিবিদ হিসেবে মেজর হাফিজের এই যাত্রা যেমন সাফল্যের, তেমনি চরম নাটকীয়তায় ঘেরা।
মেজর হাফিজের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় ১/১১ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়। তখনকার সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ভাঙ্গনের গুঞ্জন দেখা দেয় বিএনপিতে। মাইনাস টু ফর্মুলায় দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে। সেই সময় দলটির ‘সংস্কারপন্থী’ অংশের নেতাদের মধ্যে প্রথমের দিকে থাকার অভিযোগ ওঠে মেজর হাফিজের বিরুদ্ধে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে দলকে পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টাকে দলের একটি বড় অংশ ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে গণ্য করে। পরবর্তীতে তিনি মূল ধারার বিএনপিতে তাকে নিয়ে এক ধরনের ‘আস্থাহীনতা’ বজায় ছিল।
দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মেজর হাফিজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে নতুন করে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
নোটিশে তার বিরুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য ও শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনার অভিযোগ আনা হয়। জবাবে মেজর হাফিজের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক মহলে ‘বিস্ফোরক’ হিসেবে বিবেচিত হয়। সেখানে তিনি দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব নিয়ে খোলামেলা সমালোচনা করেন। এই সমালোচনা তৎকালীন সময়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
‘কিংস পার্টি’ ও ২০২৪ এর নির্বাচন
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও তাকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। গুঞ্জন শোনা যায় মেজর হাফিজ নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন।
ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের সাথে তার বৈঠক এবং তখনকার সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানের সাথে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে গুঞ্জন আরও ঘনীভূত হয়। তবে সংবাদ সম্মেলন করে এসব গুঞ্জন অস্বীকার করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অংশ নেননি তিনি।
অ্যাথলেট ও সৈনিক জীবন: রণাঙ্গন থেকে ফুটবল মাঠ
সাত বারের সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সর্বশেষ জাতীয় সংসদের স্পিকার – এসবের বাইরেও হাফিজ উদ্দিন আহমদের আছে আরো অনেক ভিন্ন পরিচয়। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার পূর্ব পাকিস্তানের ‘দ্রুততম মানব’ ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও ফিফার আপিল ও ডিসিপ্লিনারি কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এই রাজনীতিবিদ।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কামালপুরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি ‘বীর বিক্রম’ খেতাবে ভূষিত হন।
নতুন অধ্যায়: অবিশ্বাসের পর আস্থা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান হাফিজ উদ্দিন আহমদ। একইসাথে সামলেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যের দায়িত্ব। সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার হিসেবে তার ওপরই আস্থা রাখল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।
‘সংস্কারপন্থী’ বা ‘অবিশ্বাসের’ তকমা বয়ে বেড়ানো বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ হলেন সংসদের নতুন অভিভাবক।