যেভাবে জঙ্গল সলিমপুর হয়ে উঠেছিলো অপরাধীদের অভয়ারণ্য

দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, দখলবাজি ও অবৈধ অর্থনীতির প্রভাব বিস্তার করেছে। দুর্গম ভূগোল আর দুর্বল নিয়ন্ত্রণে কার্যত অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয় এলাকাটি।

 

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

জঙ্গল সলিমপুরে অনেকদিনের এক ‘অঘোষিত দূর্গ’ ভাঙতে নামতে হয়েছিলো  প্রায় চার হাজার সেনা, র‍্যাব ও পুলিশ। চট্টগ্রামের একেবারে কাছেই, কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রায় আলাদা এক ভূখণ্ডের মতো গড়ে উঠেছিলো এই এলাকা।  পাহাড় কেটে বসতি, খাসজমি দখল, প্লট বেচাকেনা, সশস্ত্র পাহারা আর প্রভাব বিস্তার মিলিয়ে সেখানে তৈরি হয়েছে শক্ত এক অপরাধী কাঠামো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ‘ক্রিমিনাল সেফ হেভেন’ বা অপরাধীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিলো।

সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, সলিমপুর জঙ্গলে কয়েক দশক ধরে প্রায় ৩,১০০ একর সরকারি খাসজমির ওপর গড়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ বসতি। জমি দখল আর প্লট বেচাকেনা এখানে এমন পর্যায়ে গেছে যে, জেলা প্রশাসনের হিসাবে এই জমির বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার সমান। 

এত বড় অর্থনৈতিক স্বার্থকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠী, যারা পাহাড়, বসতি, প্লট আর প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে। জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালানোর উদ্দেশ্য তাই শুধু অপরাধী ধরা নয়। এটি অর্থ, দখল ও প্রভাবের বহুস্তরবিশিষ্ট এক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান।

কেন এই অভিযান 

সোমবার  যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৭টি পাইপগান, এক হাজার ১১৩ রাউন্ড গুলিসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।  সে সময় ২২ জনকে আটক করা হয়।

সীতাকুণ্ড প্রেসক্লাবের সভাপতি সৈয়দ ফোরকান আবু জানান, এই অঞ্চল সবসময়ই দুর্গম। বিভিন্ন সরকারের আমলে সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। 

সেখানে পরিস্থিতি কেন এমন সে বিষয়ে সিনিয়র এই সাংবাদিক বলেন, “সেখানে পাহাড় কেটে বাণিজ্য চলে। যার গ্রুপ বড়, তার জায়গা বেশি, টাকাও বেশি। তারাই মূলত এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।”

এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক সমর্থনও পান বলে মনে করেন সৈয়দ ফোরকান।

এলাকাটি শুধু অপরাধের আশ্রয়স্থল নয়, সাম্প্রতিক সময়ে এটি আবার নতুন করে ক্ষমতার সংঘর্ষের ময়দানও হয়ে উঠেছে। ২০২৪ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা বেড়েছে।

সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাইনুল ইসলাম বলেন, “সরকারি জমি দখল করে বসে ছিলো একটা গোষ্ঠী। সাধারণ মানুষ মুভমেন্ট করতে পারছিলো না। সেজন্যই এই অভিযান।

“ওদের পারমিশন নিতে হবে। কেউ যাবে কেউ যাবে না। এমনটা চলতে দেওয়া যায় না।”

অভিযানের পর সেখানকার পরিস্থিতি নিরাপদ দাবি করে এই পুলিশ কর্মকর্তা আলাপকে বলেন, “এখন পুলিশের ক্যাম্প বসেছে। সাধারণ মানুষ আমাদের সমর্থন করেছে।”

অভিযান কেন কঠিন

এর আগেও সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আসামি ধরতে গিয়ে নিহত হয়েছেন র‌্যাব সদস্য। র‌্যাবের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিলো মাইকে ঘোষণা দিয়ে র‍্যাবকে আক্রমণ করা হয়েছিলো। 

র‍্যাবের দু'টো মাইক্রোবাসকে লাঠিসোঁটা নিয়ে ধাওয়া করছে এবং গাড়ির গ্লাস ভাঙচুর করছে, র‍্যাবকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে গুলি চালাচ্ছে।

হামলাকারীরা এক পর্যায়ে র‍্যাবের কয়েকজন সদস্যকে এবং র‍্যাবের অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়।

র‍্যাবের ওপর হামলার সময় হামলাকারীরা মসজিদের মাইকে গেট বন্ধের ঘোষণা দেয়।

র‍্যাব জানায়, অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ জন মিলে এই হামলা চালিয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুর কোনো সমতল শহুরে মহল্লা নয়। পাহাড়ি, ছড়ানো, আড়াল নেওয়ার উপযোগী, এবং প্রবেশ-প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। একদিকে সীতাকুণ্ড, অন্যদিকে নগরসংলগ্ন এলাকা- এই অবস্থান সলিমপুরকে এক ধরনের নিরাপদ ঘাঁটি বানিয়েছে। 

অপরাধের ভাষায় একে ‘ক্রিমিনাল সেফ হেভেন’ বা অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বলা হয়। তাই বড় অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো শুধু অভিযুক্তদের ধরা নয়, চারদিক ঘিরে ফেলে পালানোর পথ বন্ধ করা এবং প্রতিরোধের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ আলাপকে বলেন, সলিমপুর জঙ্গলটি অনেক আগে থেকেই একটি অপরাধপ্রবণ এলাকা বলে চিহ্নিত ছিলো। এর আগে দেশীয় মদ ও দেশীয় অস্ত্র তৈরীর বেশ কিছু নিয়োগ কারখানা এখানে চিহ্নিত ও ধ্বংস করা হয়। 

“এলাকাটি চট্টগ্রাম শহরের অন্তর্ভুক্ত হলেও মূলত এটি একটি পাহাড়ি এলাকা। দুর্গম এবং যেকোনো রকমের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সেখানে নজরদারি রাখা ও অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম চালানো ভৌগলিক কারণে বেশ কঠিন।”

এলাকাটির এক দিকে বন্দরমুখী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, এক দিকে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকা এবং অন্যদিকে শিল্প অঞ্চল।

জঙ্গল সলিমপুর থেকে চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূল বেশ কাছে হওয়ায় সমুদ্রপথে কোন চোরাচালান হলে তা লুকিয়ে রাখা সহজ বলে মত দেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক। তিনি বলেন, শহর এলাকায় অপরাধ করে এখানে লুকিয়ে থাকাটাও অপরাধীদের জন্য নিরাপদ।

মেজর (অব.) নাসির বলেন, তিন পার্বত্য জেলায় চলাচলকারী যানবাহনগুলো এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে মিয়ানমার থেকে আসা মাদক ও অবৈধ অস্ত্র এখানে সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়। আবার পার্বত্য অঞ্চল থেকে আসা অস্ত্র বা চোরাই কাঠের নিয়ন্ত্রণও এখান থেকে করা সুবিধাজনক। এখান থেকে শিল্পাঞ্চলে চাঁদাবাজিও করা যায়। 

“চারিদিকে অপরাধ করে অপরাধীদের  লুকিয়ে থাকা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দেওয়া সহজ বলেই এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীরা আশ্রয় ও প্রশ্রয় পাচ্ছে।”

অনেক রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের একটা অংশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় বিপথগামী সদস্য এই চক্রের  সঙ্গে যুক্ত  থাকায় অপরাধীদের আশ্রয় এবং ক্রমবিকাশ প্রতিরোধে তাদের অনীহা ছিলো বলে মনে  করেন মেজর নাসির।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন এবং চরাঞ্চলসহ বেশ কিছু উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের অপরাধ সংগঠিত হয়ে থাকে।

মহেশখালী দ্বীপের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “যেখানে কিছুদিন আগেও ছয় জন ছেলেকে হত্যা করে পরিত্যক্ত নৌকায় বরফ দিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছিলো। জলদস্যুতা সেখানকার উপকূলীয় অঞ্চলে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সুন্দরবনেও কিছুদিন আগে পর্যটকদের অপহরণ করা হয়েছিলো।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষত পার্বত্য বান্দরবানে নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত একদল মানুষ ও পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আসা অপরাধীচক্র এই অপরাধ কাঠামো গড়ে তোলে বলে মত দেন মেজর (অব.) নাসির।

দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রশাসন ও সরকারের ইমেজ সংকট দূর করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদ, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে শূন্য সহিষ্ণুতা অবলম্বন করেছে এমন বার্তা দেয়া গেলে এবং তার দৃশ্যমান প্রয়োগ পরিলক্ষিত হলে এসব দুর্গম অঞ্চলে অপরাধ কমে যাবে।