নারীদের সমান সুযোগের ‘অর্থনৈতিক জাদু’ ও বাংলাদেশের বাস্তবতা

‘ওমেনোমিক্স’ নীতির মাধ্যমে নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে জাপান। অথচ বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে নারীদের দৃশ্যমান উপস্থিতি থাকলেও নীতিনির্ধারণ, উদ্যোক্তা হওয়া ও কর্মসংস্থানে পথে রয়েছে বড় বৈষম্য। নিরাপত্তা, ঋণ ও ডেকেয়ারের অভাব কি নারীদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আটকে রাখছে?

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

বৈশ্বিক এমন এক সংকটের মুখে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে, যেখানে একদিকে তৈরি পোশাক খাতে নারীদের রয়েছে দৃশ্যমান অংশগ্রহণ।

এর ঠিক উল্টো পাশে রয়েছে ভিন্ন চিত্র। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি তেমন একটা নেই, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ কম এবং ঘরে ও বাইরে নিরাপত্তার অভাবে নারীরা এখনো রয়েছে পিছিয়ে। 

জাপানে যখন ‘ওমেনোমিক্স’ নামে এক নীতি তৈরি করে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। ঠিক তখনই বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ। 

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি এই ‘অদৃশ্য দেয়াল’গুলো ভেঙে নারীর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পূর্ণ রূপ দিতে? নাকি অর্ধেক জনশক্তিকে পেছনে ফেলে প্রবৃদ্ধির দৌড়ে পিছিয়েই থাকবে?

বিশ্বব্যাংকের নতুন একটি প্রতিবেদন বলা হয়েছে, বিশ্বের ১৯০টি দেশের কোনোটিই নারীদের জন্য পূর্ণ আইনি সমতা নিশ্চিত করতে পারেনি। 

বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও নিরাপত্তা, ঋণের সুযোগ এবং শিশু যত্নের অভাব প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের 'উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল' প্রতিবেদনে এই রূঢ় সত্য তুলে ধরা হয়েছে।

তারা দেখিয়েছে, ২০২৬ সালে এসেও পৃথিবীর কোনো দেশই এখনো নারীদের জন্য পুরুষের সমান আইনি পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। 

বৈশ্বিক সংকটের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। 

একদিকে তৈরি পোশাক খাতের হাত ধরে নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণ, অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে বিশাল ব্যবধান। 

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই সমীকরণ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

জাপানি ‘ওমেনোমিক্স’ বনাম বাংলাদেশের বাস্তবতা

জাপানের তখনকার প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ২০১২ সালে দেশটির স্থবির অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নারীদের ওপর বাজি ধরেছিলেন। 

এটাকেই ‘ওমেনোমিক্স’ বলা হয় বলে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

ওমেনোমিক্সের অংশ হিসেবে শিশুদের জন্য ‘ডে কেয়ার’ সুবিধা ব্যাপক হারে বাড়ানো হয় জাপানে। 

মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি বৃদ্ধি এবং নারীদের পদোন্নতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয় কর সুবিধা। বড় কোম্পানিগুলোর উচ্চপদগুলোর নির্দিষ্ট সংখ্যায় নারী থাকার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। 

জাপান এর সুফলও পায় হাতেনাতে। ২০১৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ২৫ লাখ নারী কাজে যোগ দেন। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার পৌঁছায় রেকর্ড ৬৭ শতাংশে।

’ওমেনোমিক্স’-এর এই সিদ্ধান্ত জাপানের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং গ্র্যাজুয়েট নারীদের কর্মসংস্থান প্রায় সর্বজনীন করে তোলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই রূপান্তর ঘটেছে তৈরি পোশাক খাতের মাধ্যমে। 

সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ নারী কর্মী নিয়োজিত আছেন, যা মোট কর্মীর ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। 

তবে জাপানের মতো এখানে কর সুবিধা বা গড় পদগুলোতে পদোন্নতির হার অনেক কম।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা গত এক দশকে ৮০ শতাংশ থেকে নেমে বর্তমানে প্রায় ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। 

নতুন ‘ওয়ার্কফোর্স’ বনাম কর্মসংস্থান

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস হচ্ছে, আগামী ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে ১২০ কোটি তরুণ, যার অর্ধেকই হবে নারী। 

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, যেসব দেশ পুরুষ ও নারীর কর্মসংস্থানের ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলবে, তাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হবে। 

কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষিত নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশের বেশি। নারীদের মধ্যে এই হার পুরুষদের তুলনায় অঞ্চলভেদে দেড় থেকে দুইগুণ বেশি।

নিরাপত্তার দেয়াল: আইন বনাম প্রয়োগ

নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে অন্যতম বড় অন্তরায় হিসেবে রয়েছে নিরাপত্তা বা সেফটি। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ ২০২৩ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ। 

সেখানে বলা হয়, যাতায়াতের সময় এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব প্রায় ৪০ শতাংশে নারীকে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য করে। 

বিশ্বব্যাংক বলছে, 'কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ' সংক্রান্ত আইনগুলো মাত্র অর্ধেক সময় সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়। 

বাংলাদেশে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছিল। কিন্তু এখনো তা নিয়ে আইন হয়নি।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ৫০৯ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর মত আইনগুলোতে যৌন পীড়নের শাস্তির বিধান আছে।

তবে এই আইনগুলো মূলত ‘অপরাধ ঘটার পর’ শাস্তির কথা বলে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি বা ‘প্রতিরোধ’ করার কোনো কাঠামো এখানে নেই।

উদ্যোক্তা হওয়ার পথে ‘আর্থিক দেয়াল’

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র অর্ধেক দেশ ঋণের ক্ষেত্রে সমান অধিকার স্বীকার করে।

বাংলাদেশেও এই বৈষম্য রয়েছে। 

এসএমই ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের দিতে হবে। তবে বাস্তবে তা মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি হয় না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

বিশ্বব্যাংকের জেন্ডার অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তারা এখনো ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে স্বামী বা পুরুষ অভিভাবকের গ্যারান্টার হওয়ার শর্তের মুখে পড়েন।

সুরিনাম বা ইকুয়েডরের মতো দেশগুলো এই ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করে আইন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে কাগজে-কলমে বাধা না থাকলেও ‘প্রথাগত ব্যাংকিং মানসিকতা’ নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। 

‘ডে কেয়ারের’ অভাব : জিডিপির অদৃশ্য বাধা

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে চাইল্ডকেয়ার বা শিশুর যত্নের অভাবও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ দুর্বল করার অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে 'শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আইন ২০২১' পাস হলেও এর বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর।

সিপিডির এক গবেষণা দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় ৭ গুণ বেশি সময় বিনা বেতনের গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজে ব্যয় করেন। 

পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী শিশু যত্ন কেন্দ্রের অভাবে উচ্চশিক্ষিত নারীদের একটি বড় অংশ ‘ক্যারিয়ার ব্রেক’ নিতে বাধ্য হয়। 

যেখানে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো পরিবারকে কর সুবিধা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে করপোরেট অফিসগুলোতে বাধ্যতামূলক ডে কেয়ার স্থাপনের হার এখনো হাতে গোনা।

আগামীর পথ কী

বিশ্বব্যাংক বলছে, সমাধান কেবল আইন প্রণয়নে নয় বরং প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। 

উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং এবং ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স ট্র্যাকিং প্রয়োজন। 

জামানতবিহীন ঋণের সীমা বাড়ানো এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বাড়াতে হবে। একইসাথে নিশ্চিত করতে হবে নিরাপদ গণপরিবহণ এবং কর্মক্ষেত্রে শিশু যত্ন কেন্দ্র। 

জাপান প্রমাণ করেছে যে, নারীদের ওপর বিনিয়োগ করলে তা কেবল সামাজিক উন্নয়ন নয়, বরং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনে। 

বাংলাদেশকেও ২০২৬ সালের এলডিসি উত্তরণ এবং পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে নারী শ্রমশক্তির বিশাল সম্ভাবনাকে ঘরবন্দি করে রাখার মতো বিলাসিতা দেখানোর সুযোগ নেই।