দুর্গাপূজা হিন্দুদের উৎসব, কিন্তু সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে উঠলো কেবল বাঙালি হিন্দুদের জন্যই, কীভাবে? ভারতের বা বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলে হিন্দুদের বড় ধর্মীয় উৎসব দীপাবলি, হোলি, দশেরা। বাংলায় তাহলে দুর্গাপূজার বিশেষত্বটা কোথায়?
সামি আল মেহেদী
প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪০ পিএমআপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম
দুর্গাপূজা কীভাবে বাঙালি হিন্দুদের জন্যই সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে উঠলো?
সাদা, লালপেড়ে শাড়ি পরা তরুণীটি ধীরেসুস্থে, দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছেন। তার একটু সামনে দেখা যাচ্ছে এক যুবককে, যে ওই তরুণীর পাল্টা আঘাতে এখন হাঁটতেই পারছে না, চুল বাঁধবার কাঁটা দিয়ে আঘাত করেই মোটামুটি তাকে শেষ করে দিয়েছেন ওই তরুণী। এবারে ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে থাকেন। রিভলভারে ম্যাগাজিন লোড করেন। ধুঁকতে থাকা যুবকটি কোনোমতে মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করে, আপনি কে? তরুণী শান্ত কণ্ঠে জবাব দেন, কী আসে যায়? তারপর নিষ্কম্প হাতে একটার পর একটা গুলি। তারপর তরুণী ক্ষিপ্রভাবে মিশে যান ভিড়ের মাঝে, যেখানে হাজারে হাজারে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরা নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করে তিনি সবার সাথে মিলে গেলেন, বিদায়ও নিলেন।
যারা দেখেছেন, তাদের এরই মধ্যে বুঝে ফেলার কথা যে, ২০১২ সালের আলোচিত থ্রিলার সিনেমা কাহানি এর শেষদিকের দৃশ্যর কথা বলছিলাম। সালে সুজয় ঘোষের পরিচালিত এই সিনেমায় মিসেস বিদ্যা বাগচী চরিত্রে বিদ্যা বালান মেটাফরিক্যালি দুর্গাকেও ধারণ করেন। এই দৃশ্যর পটভূমি কিন্তু কলকাতা, সময়টা দুর্গাপূজার। আর এই পুরো সিনেমার ঘটনার সাথেও দুর্গার আগমন আর অশুভ শক্তি, অসুরের বিনাশের একটা সামঞ্জস্যও আছে। আর এই ধাঁচে গল্পটা বলার জন্য কলকাতা বা বাংলায় পুরো গল্পের পটভূমি তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উপায় কিন্তু ছিলো না। কারণ, দেবী দুর্গার এমন আগমন, উদযাপন আর বিদায় তো বাংলা ছাড়া অন্য কোথাও সম্ভব নয়। ধর্মীয় প্রেক্ষিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গা উপাসনার, পূজনীয় দেবী। কিন্তু উৎসবের মাপকাঠিতে দুর্গাপূজার কথা যখনই আসবে, সেটা একচ্ছত্রভাবে বাংলার আওতায়।
ভারতের উত্তরে যদি আপনি যান, সেখানে অন্য দৃশ্য। সেখানে বিশাল রাবণের মূর্তি পুড়ছে, আর মানুষ উল্লাস করছে রামের জয়ে। তার বিবরণও অন্য কোনো সিনেমার সিকোয়েন্স দিয়ে দেওয়া যাবে, ইনফ্যাক্ট বেশিই যাবে। দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে কেন বাংলা বা বঙ্গীয় অঞ্চলেই থেকে গেছে? দশেরা বলেন বা দুর্গা পূজা বলেন, দুটো উৎসবই এক হিসেবে বিজয়ের, দুটোই একই দশমী তিথিতে শেষ হয়। তবু একজায়গায় উৎসবের কেন্দ্রে দেবী দুর্গা, আরেকজায়গায় রাম।
একই উৎসব, তিন রূপ
আগে একটা মজার তথ্য। দুর্গাপূজা আর দশেরা আসলে দুটো আলাদা উৎসব নয়। দুটোই একই নবরাত্রি পর্বের দুটি রূপ। 'নব' মানে নয়, 'রাত্রি' মানে রাত। আশ্বিনের এই নয় রাত আর দশম দিনের বিজয়া, গোটা ভারত জুড়েই পালিত হয়। শুধু উদযাপনের ধরনটা অঞ্চলভেদে আলাদা।
একই ক্যালেন্ডার, একই বিজয়ার বার্তা, কিন্তু তিন জায়গায় তিন রকম গল্প। দক্ষিণেও ছবিটা আলাদা। মহীশূরে দশেরা হয় রাজকীয় আড়ম্বরে, আর নেপালে দশাইন জাতীয় উৎসব।
তাহলে বাংলার বিশেষত্ব কোথায়? বিশেষত্ব হলো স্কেল আর কেন্দ্রীয়তা। বাংলায় দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটা বছরের সামাজিক ক্যালেন্ডারের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন পোশাক, পরিবারের মিলন, শিল্পকলা, অর্থনীতি, গান, সাহিত্য, সবকিছু এর চারপাশে ঘোরে।
ভারতের অন্য অনেক অঞ্চলে হিন্দুদের বড় উৎসব দীপাবলি, হোলি বা দশেরা। সেখানে দুর্গা আছেন, কিন্তু বাংলার মতো কেন্দ্রে নন।
ধর্মীয় প্রেক্ষিত: দুর্গা কে?
দুর্গার সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান পাওয়া যায় দেবীমাহাত্ম্য বা চণ্ডী গ্রন্থে। এটি মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ, আনুমানিক খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে রচিত।
কাহিনির সারকথা এই। মহিষাসুর নামের এক অসুর বর পেয়ে এমন শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে কোনো পুরুষ দেবতা তাকে হারাতে পারেন না। সে দেবতাদের স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেয়। তখন সব দেবতার তেজ একত্র হয়ে জন্ম নেয় এক নারীশক্তি, যাঁর নাম দুর্গা। তিনি দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে সিংহের পিঠে চড়ে মহিষাসুরকে বধ করেন।
লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, এই গল্পে শক্তির উৎস নারী। এই ধারণাকেই বলা হয় শাক্ত দর্শন, যেখানে পরমা শক্তি হলেন দেবী।
এবার আসা যাক দশেরার কথায়। উত্তর ও মধ্য ভারতে দশেরা মানে প্রধানত রামের জয়। রামায়ণ অনুযায়ী এই দিনে রাম রাবণকে বধ করেন। তাই সেখানে রামলীলা হয়, রাবণ-কুম্ভকর্ণ-মেঘনাদের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। এখানে কেন্দ্রে অযোধ্যার রাজা, আদর্শ পুরুষ, ধর্মের বিজয়।
বাংলার দুর্গাপূজার কেন্দ্রে মাতৃশক্তি। ভক্তিতে ভয় আছে, আবার আছে আপন করে নেওয়ার আবেগ।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের আগে রাম দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। এ কারণেই নবরাত্রির পরেই আসে দশেরা। আগে শক্তির আরাধনা, তারপর বিজয়।
লোককথায় আছে, রাম দেবীকে ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু একটি পদ্ম কম পড়ে। তখন তিনি নিজের পদ্মচক্ষু উৎসর্গ করতে উদ্যত হন, আর তখনই দেবী প্রসন্ন হন।
আর কেন বসন্তের বদলে শরতে এই পূজা? এখানেই আছে আরেকটা তথ্য। নবরাত্রি আসলে বছরে দুবার হয়: বসন্তে (চৈত্র নবরাত্রি) আর শরতে। বাংলায় বসন্তের পূজার নাম বাসন্তী পূজা, যদিও তার আয়োজন খুব সীমিত। দেবীপূজার প্রচলিত সময় বসন্ত, তাই রামের শরৎকালের আরাধনাকে বলা হয় অকালবোধন, অর্থাৎ অসময়ে দেবীকে জাগানো। সেই অসময়ের ডাকই বাংলায় সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে উঠল। বাংলার শারদীয় পূজার বিশ্বাসের সঙ্গে এই কাহিনি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
আরেকটি কথা। উত্তর ভারতে দশেরায় যে রাবণকে পোড়ানো হয়, তার দশ মাথাকে অনেকে জ্ঞানের প্রতীক বলেন, আবার অনেকে বলেন দশ রিপু বা দোষের প্রতীক। এভাবে ভাবলে রাবণ দহন শুধু বাইরের শত্রুর পরাজয় নয়, ভেতরের অহংকারের বিরুদ্ধেও একটা স্মারক।
আঞ্চলিক কারণ: কেন বাংলা শক্তির দেশ?
শাক্ত ধারা আর তন্ত্রসাধনার শক্ত ঘাঁটি ছিল পূর্ব ভারত: বাংলা, অসম, ওড়িশা। কামাখ্যা, তারাপীঠ, কালীঘাট, এগুলো সবই এই অঞ্চলের শক্তিপীঠ।
উত্তর ভারতে সেই সময় প্রভাব বাড়ছিল রামভক্তি ও কৃষ্ণভক্তির, বৈষ্ণব ধারার। বাংলাতেও বৈষ্ণব আন্দোলন ছিল, শ্রীচৈতন্যের হাত ধরে। কিন্তু বাংলার ধর্মজীবনে শাক্ত ধারা ছিল গভীর ও জনপ্রিয়।
এর একটা প্রমাণ দীপাবলির দিনেই মেলে। উত্তর ভারতে দীপাবলিতে রামের অযোধ্যায় ফেরা আর লক্ষ্মীপূজা উদযাপিত হয়। বাংলায় সেই রাতেই হয় কালীপূজা। অর্থাৎ বাঙালির আরাধ্য বারবার মাতৃরূপী শক্তি।
দ্বিতীয় কারণ, উমা-মেনকার গল্প। বাংলার ঘরোয়া কল্পনায় দুর্গা কেবল অসুরনাশিনী নন, তিনি ঘরের মেয়ে। বছরে একবার স্বামী শিবের ঘর কৈলাস থেকে, কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে, বাপের বাড়ি আসেন।
এই কল্পনার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ আগমনী-বিজয়ার গান। কন্যার ফেরার অপেক্ষায় মা মেনকা, আর দশমীতে বিদায়ের কান্না। শাস্ত্রের দেবী এখানে হয়ে ওঠেন প্রতিটি বাঙালি পরিবারের মেয়ে। এই আত্মীয়তাবোধই উৎসবকে ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক আবেগে পরিণত করেছে।
নবরাত্রির নয় রাতের একটা সুন্দর বিন্যাসও আছে। অনেক অঞ্চলে প্রথম তিন রাত দুর্গার আরাধনা, মাঝের তিন রাত লক্ষ্মীর, শেষ তিন রাত সরস্বতীর। অর্থাৎ শক্তি থেকে সম্পদ, সম্পদ থেকে জ্ঞান। বাংলার প্রতিমায় এই তিন দেবী এক মণ্ডপেই, দুর্গার দুই পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী, আর সঙ্গে কার্তিক-গণেশ। দেবীর পুরো পরিবারকে একসঙ্গে দেখার এই ধারণা বাংলার পূজার আত্মীয়তাবোধকে আরও গভীর করেছে।
আরেকটা মিল আছে। অনেক জায়গায় অষ্টমী বা নবমীতে কন্যাপূজা হয়, যেখানে ছোট মেয়েদের দেবীর রূপে পূজা করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় কুমারী পূজা। বেলুড় মঠে এটি বিশেষভাবে বিখ্যাত।
তৃতীয় কারণ কৃষিসমাজের ছন্দ। বর্ষা শেষ, মাঠে সবুজ ধান, নদীতে জল, আকাশ ঝকঝকে। আশ্বিন মাস ছিলো অবসর ও আনন্দের সময়। একটা কৃষিনির্ভর সমাজে বড় উৎসবের জন্য এটাই স্বাভাবিক ঋতু।
ইতিহাস: ব্যক্তিগত পূজা থেকে সর্বজনীন উৎসব
বাংলায় দুর্গার উপাসনা অনেক পুরোনো। পাল ও সেন যুগের ভাস্কর্যে দেবীমূর্তি মেলে। ষোড়শ শতকে নবদ্বীপের পণ্ডিত রঘুনন্দন স্মৃতিশাস্ত্রে দুর্গাপূজার বিধি সংকলিত করেন। বাংলার পূজাপদ্ধতির কাঠামো অনেকটাই তাঁর হাত ধরে দাঁড়ায়।
আজকের মতো বড় আয়োজনে পূজার শুরুর দিকের গল্প জড়িয়ে আছে জমিদার ও রাজাদের সঙ্গে। জনশ্রুতি আছে, রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ কিংবা নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদারের মতো ব্যক্তিরা অতি জাঁকজমকে দুর্গাপূজা করেছিলেন। উৎস অনুযায়ী বিবরণ ভিন্ন, তাই ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে একটা বিষয়ে সবাই একমত: মধ্যযুগের শেষ ও আধুনিক যুগের শুরুতে দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা, মর্যাদা আর সম্পদ প্রদর্শনের মঞ্চ।
এরপর আসে ঔপনিবেশিক যুগ। পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতায় নতুন ধনী শ্রেণির উত্থান ঘটে: বেনিয়ান, দেওয়ান, ব্যবসায়ী। জনপ্রিয় কাহিনি অনুযায়ী, শোভাবাজার রাজবাড়ির নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে বিশাল আয়োজনে পূজা করেন, যেখানে অতিথি ছিলেন ইংরেজ কর্মকর্তারাও। এই গল্পেরও কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বাবু-সংস্কৃতির সেই যুগে পূজা মানে বড় বাড়ির উঠোনে নাচ-গান, ভোজ আর অতিথি আপ্যায়ন। উৎসব তখন সামাজিক প্রতিপত্তির মাপকাঠি।
তবে আসল মোড় চলে আসে আঠারো শতকের শেষে। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে পূজা করেন। এর নাম বারোয়ারি পূজা, 'বারো ইয়ার' থেকে। এই ধারণাই বদলে দেয় সবকিছু। এতদিন পূজা ছিলো ধনীর বাড়ির পারিবারিক অনুষ্ঠান। এবার পাড়ার সবাই মিলে এক পূজা। এখান থেকেই বিশ শতকের গোড়ায় এলো সার্বজনীন পূজা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে যে কেউ আসতে পারেন। সার্বজনীন পূজা উৎসবটিকে এভাবেই অভিজাত শ্রেণি আর জমিদারবাড়ির দেয়ালের বাঁধাধরা পরিসর থেকে সব মানুষের জন্য রাস্তায় নিয়ে আসে।
জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়ের রাজনীতি
উনিশ শতকের শেষ থেকে দুর্গা আরেকটা অর্থ পেতে শুরু করলেন। উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভাবুকরা খুঁজছিলেন এমন এক প্রতীক, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ-এ মাতৃভূমিকে দেবীরূপে কল্পনা করা হয়। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও স্বদেশি ধারার সময় 'ভারতমাতা' আর দুর্গার ছবি অনেক সময় মিলেমিশে যায়। পূজামণ্ডপ হয়ে ওঠে জমায়েত ও বার্তা ছড়ানোর জায়গা।
এই পর্বের একটা দিক সতর্কভাবে বোঝা জরুরি। একদিকে দুর্গাপূজা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বাহন হয়েছিল। অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতীকের এই ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও আছে, কারণ এতে হিন্দু প্রতীক হয়ে যায় 'জাতীয়' প্রতীক, আর অন্য ধর্মের মানুষেরা বাদ পড়তে পারেন। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
আরেকটা জিনিস এই সময়ে গড়ে ওঠে, যা বাঙালির উৎসব-মানসকে স্থায়ী রূপ দেয়। ১৯৩১ সালে কলকাতা বেতার থেকে প্রথম প্রচারিত হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়ার চণ্ডীপাঠ। আজও বহু বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোর মানে সেই কণ্ঠস্বর।
দেশভাগের পর: বাংলাদেশ, কলকাতা ও প্রবাস
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বহু হিন্দু পরিবার পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে যান। তাঁদের স্মৃতি, ভিটেমাটি আর ফেলে আসা পূজার গল্প পশ্চিমবঙ্গে নতুন আবেগ জোগায়। শরণার্থী কলোনিগুলোয় গড়ে ওঠে নতুন নতুন বারোয়ারি পূজা। পূজা হয়ে ওঠে হারানো বাংলার সঙ্গে সংযোগের সুতো।
বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যায় সংখ্যালঘু। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৮ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ। তবু দুর্গাপূজা এখানে সবচেয়ে বড় হিন্দু উৎসব। ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে ঢাকার পূজা পুরোনো ঐতিহ্য, আর সারা দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মণ্ডপে পূজা হয়। সরকারি ছুটি, বিজয়ার কোলাকুলি, অনেক এলাকায় অন্য ধর্মের প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণ, এসবই এই উৎসবকে সামাজিক আবহে বুনে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মণ্ডপে হামলা ও নিরাপত্তা-উদ্বেগের ঘটনাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উৎসবের সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব সবার।
আর কলকাতায় দুর্গাপূজা আজ বিশাল শিল্প। পাড়ার ক্লাব, থিমভিত্তিক প্যান্ডেল, মৃৎশিল্পীদের কুমারটুলি, আলোকসজ্জা, প্রতিমা-নির্মাণ, প্রকাশনা, ফ্যাশন। ২০১৩ সালের ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক সমীক্ষায় এর অর্থনৈতিক আকার ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি রুপি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো 'কলকাতার দুর্গাপূজা'কে মানবতার অবস্তুগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
বাঙালি প্রবাসেও এই উৎসবই হয়ে ওঠে পরিচয়ের অবলম্বন। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সিডনি, সবখানেই বাঙালিরা একজায়গায় জড়ো হন পূজার জন্য। কেউ কেউ বলেন, এটা শুধু দেবীর নয়, ভাষা ও সংস্কৃতিরও পূজা।
একটা কথা মনে রাখা দরকার। বাংলার দুর্গাপূজা আর উত্তর ভারতের দশেরা একই নবরাত্রির দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক রূপ। একটি অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প নয়। রাম দেবীর আরাধনা করেই রাবণকে হারিয়েছিলেন, এই বিশ্বাসই দুই উৎসবকে একসুতোয় বাঁধে। হিন্দুধর্ম এত বৈচিত্র্যময় বলেই একই তিথি অঞ্চলভেদে এত ভিন্নভাবে পালিত হয়। দুর্গাপূজা যে এখনো ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ, তার শক্তি ওই আত্মীয়তাবোধেই। দেবী এখানে শুধু পূজ্য নন, তিনি ঘরের মেয়ে। বছরে একবার ফিরে আসেন, আর ফিরে যান। সেই ফেরা আর যাওয়ার মাঝখানেই বাঙালি খুঁজে পায় নিজের উৎসব।
দুর্গাপূজা কেন বাঙালিরই হয়ে উঠলো?
দুর্গাপূজা হিন্দুদের উৎসব, কিন্তু সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে উঠলো কেবল বাঙালি হিন্দুদের জন্যই, কীভাবে? ভারতের বা বিশ্বের অন্য অনেক অঞ্চলে হিন্দুদের বড় ধর্মীয় উৎসব দীপাবলি, হোলি, দশেরা। বাংলায় তাহলে দুর্গাপূজার বিশেষত্বটা কোথায়?
সাদা, লালপেড়ে শাড়ি পরা তরুণীটি ধীরেসুস্থে, দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছেন। তার একটু সামনে দেখা যাচ্ছে এক যুবককে, যে ওই তরুণীর পাল্টা আঘাতে এখন হাঁটতেই পারছে না, চুল বাঁধবার কাঁটা দিয়ে আঘাত করেই মোটামুটি তাকে শেষ করে দিয়েছেন ওই তরুণী। এবারে ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে থাকেন। রিভলভারে ম্যাগাজিন লোড করেন। ধুঁকতে থাকা যুবকটি কোনোমতে মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করে, আপনি কে? তরুণী শান্ত কণ্ঠে জবাব দেন, কী আসে যায়? তারপর নিষ্কম্প হাতে একটার পর একটা গুলি। তারপর তরুণী ক্ষিপ্রভাবে মিশে যান ভিড়ের মাঝে, যেখানে হাজারে হাজারে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরা নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করে তিনি সবার সাথে মিলে গেলেন, বিদায়ও নিলেন।
যারা দেখেছেন, তাদের এরই মধ্যে বুঝে ফেলার কথা যে, ২০১২ সালের আলোচিত থ্রিলার সিনেমা কাহানি এর শেষদিকের দৃশ্যর কথা বলছিলাম। সালে সুজয় ঘোষের পরিচালিত এই সিনেমায় মিসেস বিদ্যা বাগচী চরিত্রে বিদ্যা বালান মেটাফরিক্যালি দুর্গাকেও ধারণ করেন। এই দৃশ্যর পটভূমি কিন্তু কলকাতা, সময়টা দুর্গাপূজার। আর এই পুরো সিনেমার ঘটনার সাথেও দুর্গার আগমন আর অশুভ শক্তি, অসুরের বিনাশের একটা সামঞ্জস্যও আছে। আর এই ধাঁচে গল্পটা বলার জন্য কলকাতা বা বাংলায় পুরো গল্পের পটভূমি তৈরি করা ছাড়া আর কোনো উপায় কিন্তু ছিলো না। কারণ, দেবী দুর্গার এমন আগমন, উদযাপন আর বিদায় তো বাংলা ছাড়া অন্য কোথাও সম্ভব নয়। ধর্মীয় প্রেক্ষিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে দুর্গা উপাসনার, পূজনীয় দেবী। কিন্তু উৎসবের মাপকাঠিতে দুর্গাপূজার কথা যখনই আসবে, সেটা একচ্ছত্রভাবে বাংলার আওতায়।
ভারতের উত্তরে যদি আপনি যান, সেখানে অন্য দৃশ্য। সেখানে বিশাল রাবণের মূর্তি পুড়ছে, আর মানুষ উল্লাস করছে রামের জয়ে। তার বিবরণও অন্য কোনো সিনেমার সিকোয়েন্স দিয়ে দেওয়া যাবে, ইনফ্যাক্ট বেশিই যাবে। দুর্গাপূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব হিসেবে কেন বাংলা বা বঙ্গীয় অঞ্চলেই থেকে গেছে? দশেরা বলেন বা দুর্গা পূজা বলেন, দুটো উৎসবই এক হিসেবে বিজয়ের, দুটোই একই দশমী তিথিতে শেষ হয়। তবু একজায়গায় উৎসবের কেন্দ্রে দেবী দুর্গা, আরেকজায়গায় রাম।
একই উৎসব, তিন রূপ
আগে একটা মজার তথ্য। দুর্গাপূজা আর দশেরা আসলে দুটো আলাদা উৎসব নয়। দুটোই একই নবরাত্রি পর্বের দুটি রূপ। 'নব' মানে নয়, 'রাত্রি' মানে রাত। আশ্বিনের এই নয় রাত আর দশম দিনের বিজয়া, গোটা ভারত জুড়েই পালিত হয়। শুধু উদযাপনের ধরনটা অঞ্চলভেদে আলাদা।
একই ক্যালেন্ডার, একই বিজয়ার বার্তা, কিন্তু তিন জায়গায় তিন রকম গল্প। দক্ষিণেও ছবিটা আলাদা। মহীশূরে দশেরা হয় রাজকীয় আড়ম্বরে, আর নেপালে দশাইন জাতীয় উৎসব।
তাহলে বাংলার বিশেষত্ব কোথায়? বিশেষত্ব হলো স্কেল আর কেন্দ্রীয়তা। বাংলায় দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটা বছরের সামাজিক ক্যালেন্ডারের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন পোশাক, পরিবারের মিলন, শিল্পকলা, অর্থনীতি, গান, সাহিত্য, সবকিছু এর চারপাশে ঘোরে।
ভারতের অন্য অনেক অঞ্চলে হিন্দুদের বড় উৎসব দীপাবলি, হোলি বা দশেরা। সেখানে দুর্গা আছেন, কিন্তু বাংলার মতো কেন্দ্রে নন।
ধর্মীয় প্রেক্ষিত: দুর্গা কে?
দুর্গার সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ আখ্যান পাওয়া যায় দেবীমাহাত্ম্য বা চণ্ডী গ্রন্থে। এটি মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ, আনুমানিক খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে রচিত।
কাহিনির সারকথা এই। মহিষাসুর নামের এক অসুর বর পেয়ে এমন শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে কোনো পুরুষ দেবতা তাকে হারাতে পারেন না। সে দেবতাদের স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেয়। তখন সব দেবতার তেজ একত্র হয়ে জন্ম নেয় এক নারীশক্তি, যাঁর নাম দুর্গা। তিনি দশ হাতে দশ অস্ত্র নিয়ে সিংহের পিঠে চড়ে মহিষাসুরকে বধ করেন।
লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার হলো, এই গল্পে শক্তির উৎস নারী। এই ধারণাকেই বলা হয় শাক্ত দর্শন, যেখানে পরমা শক্তি হলেন দেবী।
এবার আসা যাক দশেরার কথায়। উত্তর ও মধ্য ভারতে দশেরা মানে প্রধানত রামের জয়। রামায়ণ অনুযায়ী এই দিনে রাম রাবণকে বধ করেন। তাই সেখানে রামলীলা হয়, রাবণ-কুম্ভকর্ণ-মেঘনাদের কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। এখানে কেন্দ্রে অযোধ্যার রাজা, আদর্শ পুরুষ, ধর্মের বিজয়।
বাংলার দুর্গাপূজার কেন্দ্রে মাতৃশক্তি। ভক্তিতে ভয় আছে, আবার আছে আপন করে নেওয়ার আবেগ।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাবণের সঙ্গে যুদ্ধের আগে রাম দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। এ কারণেই নবরাত্রির পরেই আসে দশেরা। আগে শক্তির আরাধনা, তারপর বিজয়।
লোককথায় আছে, রাম দেবীকে ১০৮টি নীলপদ্ম নিবেদন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু একটি পদ্ম কম পড়ে। তখন তিনি নিজের পদ্মচক্ষু উৎসর্গ করতে উদ্যত হন, আর তখনই দেবী প্রসন্ন হন।
আর কেন বসন্তের বদলে শরতে এই পূজা? এখানেই আছে আরেকটা তথ্য। নবরাত্রি আসলে বছরে দুবার হয়: বসন্তে (চৈত্র নবরাত্রি) আর শরতে। বাংলায় বসন্তের পূজার নাম বাসন্তী পূজা, যদিও তার আয়োজন খুব সীমিত। দেবীপূজার প্রচলিত সময় বসন্ত, তাই রামের শরৎকালের আরাধনাকে বলা হয় অকালবোধন, অর্থাৎ অসময়ে দেবীকে জাগানো। সেই অসময়ের ডাকই বাংলায় সবচেয়ে বড় উৎসব হয়ে উঠল। বাংলার শারদীয় পূজার বিশ্বাসের সঙ্গে এই কাহিনি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
আরেকটি কথা। উত্তর ভারতে দশেরায় যে রাবণকে পোড়ানো হয়, তার দশ মাথাকে অনেকে জ্ঞানের প্রতীক বলেন, আবার অনেকে বলেন দশ রিপু বা দোষের প্রতীক। এভাবে ভাবলে রাবণ দহন শুধু বাইরের শত্রুর পরাজয় নয়, ভেতরের অহংকারের বিরুদ্ধেও একটা স্মারক।
আঞ্চলিক কারণ: কেন বাংলা শক্তির দেশ?
শাক্ত ধারা আর তন্ত্রসাধনার শক্ত ঘাঁটি ছিল পূর্ব ভারত: বাংলা, অসম, ওড়িশা। কামাখ্যা, তারাপীঠ, কালীঘাট, এগুলো সবই এই অঞ্চলের শক্তিপীঠ।
উত্তর ভারতে সেই সময় প্রভাব বাড়ছিল রামভক্তি ও কৃষ্ণভক্তির, বৈষ্ণব ধারার। বাংলাতেও বৈষ্ণব আন্দোলন ছিল, শ্রীচৈতন্যের হাত ধরে। কিন্তু বাংলার ধর্মজীবনে শাক্ত ধারা ছিল গভীর ও জনপ্রিয়।
এর একটা প্রমাণ দীপাবলির দিনেই মেলে। উত্তর ভারতে দীপাবলিতে রামের অযোধ্যায় ফেরা আর লক্ষ্মীপূজা উদযাপিত হয়। বাংলায় সেই রাতেই হয় কালীপূজা। অর্থাৎ বাঙালির আরাধ্য বারবার মাতৃরূপী শক্তি।
দ্বিতীয় কারণ, উমা-মেনকার গল্প। বাংলার ঘরোয়া কল্পনায় দুর্গা কেবল অসুরনাশিনী নন, তিনি ঘরের মেয়ে। বছরে একবার স্বামী শিবের ঘর কৈলাস থেকে, কার্তিক-গণেশ-লক্ষ্মী-সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে, বাপের বাড়ি আসেন।
এই কল্পনার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ আগমনী-বিজয়ার গান। কন্যার ফেরার অপেক্ষায় মা মেনকা, আর দশমীতে বিদায়ের কান্না। শাস্ত্রের দেবী এখানে হয়ে ওঠেন প্রতিটি বাঙালি পরিবারের মেয়ে। এই আত্মীয়তাবোধই উৎসবকে ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক আবেগে পরিণত করেছে।
নবরাত্রির নয় রাতের একটা সুন্দর বিন্যাসও আছে। অনেক অঞ্চলে প্রথম তিন রাত দুর্গার আরাধনা, মাঝের তিন রাত লক্ষ্মীর, শেষ তিন রাত সরস্বতীর। অর্থাৎ শক্তি থেকে সম্পদ, সম্পদ থেকে জ্ঞান। বাংলার প্রতিমায় এই তিন দেবী এক মণ্ডপেই, দুর্গার দুই পাশে লক্ষ্মী-সরস্বতী, আর সঙ্গে কার্তিক-গণেশ। দেবীর পুরো পরিবারকে একসঙ্গে দেখার এই ধারণা বাংলার পূজার আত্মীয়তাবোধকে আরও গভীর করেছে।
আরেকটা মিল আছে। অনেক জায়গায় অষ্টমী বা নবমীতে কন্যাপূজা হয়, যেখানে ছোট মেয়েদের দেবীর রূপে পূজা করা হয়। বাংলায় একে বলা হয় কুমারী পূজা। বেলুড় মঠে এটি বিশেষভাবে বিখ্যাত।
তৃতীয় কারণ কৃষিসমাজের ছন্দ। বর্ষা শেষ, মাঠে সবুজ ধান, নদীতে জল, আকাশ ঝকঝকে। আশ্বিন মাস ছিলো অবসর ও আনন্দের সময়। একটা কৃষিনির্ভর সমাজে বড় উৎসবের জন্য এটাই স্বাভাবিক ঋতু।
ইতিহাস: ব্যক্তিগত পূজা থেকে সর্বজনীন উৎসব
বাংলায় দুর্গার উপাসনা অনেক পুরোনো। পাল ও সেন যুগের ভাস্কর্যে দেবীমূর্তি মেলে। ষোড়শ শতকে নবদ্বীপের পণ্ডিত রঘুনন্দন স্মৃতিশাস্ত্রে দুর্গাপূজার বিধি সংকলিত করেন। বাংলার পূজাপদ্ধতির কাঠামো অনেকটাই তাঁর হাত ধরে দাঁড়ায়।
আজকের মতো বড় আয়োজনে পূজার শুরুর দিকের গল্প জড়িয়ে আছে জমিদার ও রাজাদের সঙ্গে। জনশ্রুতি আছে, রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ কিংবা নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদারের মতো ব্যক্তিরা অতি জাঁকজমকে দুর্গাপূজা করেছিলেন। উৎস অনুযায়ী বিবরণ ভিন্ন, তাই ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে একটা বিষয়ে সবাই একমত: মধ্যযুগের শেষ ও আধুনিক যুগের শুরুতে দুর্গাপূজা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতা, মর্যাদা আর সম্পদ প্রদর্শনের মঞ্চ।
এরপর আসে ঔপনিবেশিক যুগ। পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতায় নতুন ধনী শ্রেণির উত্থান ঘটে: বেনিয়ান, দেওয়ান, ব্যবসায়ী। জনপ্রিয় কাহিনি অনুযায়ী, শোভাবাজার রাজবাড়ির নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে বিশাল আয়োজনে পূজা করেন, যেখানে অতিথি ছিলেন ইংরেজ কর্মকর্তারাও। এই গল্পেরও কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে বাবু-সংস্কৃতির সেই যুগে পূজা মানে বড় বাড়ির উঠোনে নাচ-গান, ভোজ আর অতিথি আপ্যায়ন। উৎসব তখন সামাজিক প্রতিপত্তির মাপকাঠি।
তবে আসল মোড় চলে আসে আঠারো শতকের শেষে। ১৭৯০ সালে হুগলির গুপ্তিপাড়ায় বারোজন বন্ধু মিলে চাঁদা তুলে পূজা করেন। এর নাম বারোয়ারি পূজা, 'বারো ইয়ার' থেকে। এই ধারণাই বদলে দেয় সবকিছু। এতদিন পূজা ছিলো ধনীর বাড়ির পারিবারিক অনুষ্ঠান। এবার পাড়ার সবাই মিলে এক পূজা। এখান থেকেই বিশ শতকের গোড়ায় এলো সার্বজনীন পূজা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে যে কেউ আসতে পারেন। সার্বজনীন পূজা উৎসবটিকে এভাবেই অভিজাত শ্রেণি আর জমিদারবাড়ির দেয়ালের বাঁধাধরা পরিসর থেকে সব মানুষের জন্য রাস্তায় নিয়ে আসে।
জাতীয়তাবাদ ও পরিচয়ের রাজনীতি
উনিশ শতকের শেষ থেকে দুর্গা আরেকটা অর্থ পেতে শুরু করলেন। উপনিবেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভাবুকরা খুঁজছিলেন এমন এক প্রতীক, যা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ-এ মাতৃভূমিকে দেবীরূপে কল্পনা করা হয়। ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও স্বদেশি ধারার সময় 'ভারতমাতা' আর দুর্গার ছবি অনেক সময় মিলেমিশে যায়। পূজামণ্ডপ হয়ে ওঠে জমায়েত ও বার্তা ছড়ানোর জায়গা।
এই পর্বের একটা দিক সতর্কভাবে বোঝা জরুরি। একদিকে দুর্গাপূজা বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বাহন হয়েছিল। অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতীকের এই ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও আছে, কারণ এতে হিন্দু প্রতীক হয়ে যায় 'জাতীয়' প্রতীক, আর অন্য ধর্মের মানুষেরা বাদ পড়তে পারেন। ইতিহাসবিদদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক আছে।
আরেকটা জিনিস এই সময়ে গড়ে ওঠে, যা বাঙালির উৎসব-মানসকে স্থায়ী রূপ দেয়। ১৯৩১ সালে কলকাতা বেতার থেকে প্রথম প্রচারিত হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়ার চণ্ডীপাঠ। আজও বহু বাঙালির কাছে মহালয়ার ভোর মানে সেই কণ্ঠস্বর।
দেশভাগের পর: বাংলাদেশ, কলকাতা ও প্রবাস
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বহু হিন্দু পরিবার পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে যান। তাঁদের স্মৃতি, ভিটেমাটি আর ফেলে আসা পূজার গল্প পশ্চিমবঙ্গে নতুন আবেগ জোগায়। শরণার্থী কলোনিগুলোয় গড়ে ওঠে নতুন নতুন বারোয়ারি পূজা। পূজা হয়ে ওঠে হারানো বাংলার সঙ্গে সংযোগের সুতো।
বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যায় সংখ্যালঘু। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৮ শতাংশ, অর্থাৎ ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ। তবু দুর্গাপূজা এখানে সবচেয়ে বড় হিন্দু উৎসব। ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে ঘিরে ঢাকার পূজা পুরোনো ঐতিহ্য, আর সারা দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মণ্ডপে পূজা হয়। সরকারি ছুটি, বিজয়ার কোলাকুলি, অনেক এলাকায় অন্য ধর্মের প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণ, এসবই এই উৎসবকে সামাজিক আবহে বুনে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে মণ্ডপে হামলা ও নিরাপত্তা-উদ্বেগের ঘটনাও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে উৎসবের সম্প্রীতি রক্ষার দায়িত্ব সবার।
আর কলকাতায় দুর্গাপূজা আজ বিশাল শিল্প। পাড়ার ক্লাব, থিমভিত্তিক প্যান্ডেল, মৃৎশিল্পীদের কুমারটুলি, আলোকসজ্জা, প্রতিমা-নির্মাণ, প্রকাশনা, ফ্যাশন। ২০১৩ সালের ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক সমীক্ষায় এর অর্থনৈতিক আকার ধরা হয়েছিল প্রায় ২৫ হাজার কোটি রুপি। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো 'কলকাতার দুর্গাপূজা'কে মানবতার অবস্তুগত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
বাঙালি প্রবাসেও এই উৎসবই হয়ে ওঠে পরিচয়ের অবলম্বন। লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, সিডনি, সবখানেই বাঙালিরা একজায়গায় জড়ো হন পূজার জন্য। কেউ কেউ বলেন, এটা শুধু দেবীর নয়, ভাষা ও সংস্কৃতিরও পূজা।
একটা কথা মনে রাখা দরকার। বাংলার দুর্গাপূজা আর উত্তর ভারতের দশেরা একই নবরাত্রির দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক রূপ। একটি অন্যটির প্রতিদ্বন্দ্বী বা বিকল্প নয়। রাম দেবীর আরাধনা করেই রাবণকে হারিয়েছিলেন, এই বিশ্বাসই দুই উৎসবকে একসুতোয় বাঁধে। হিন্দুধর্ম এত বৈচিত্র্যময় বলেই একই তিথি অঞ্চলভেদে এত ভিন্নভাবে পালিত হয়। দুর্গাপূজা যে এখনো ধর্মীয় সীমানা পেরিয়ে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ, তার শক্তি ওই আত্মীয়তাবোধেই। দেবী এখানে শুধু পূজ্য নন, তিনি ঘরের মেয়ে। বছরে একবার ফিরে আসেন, আর ফিরে যান। সেই ফেরা আর যাওয়ার মাঝখানেই বাঙালি খুঁজে পায় নিজের উৎসব।