আধুনিক ফুটবলের আঁতুড়ঘর ইংল্যান্ড একবারই বিশ্বকাপ জিতেছে- ১৯৬৬ সালে। পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে সেই ফাইনাল ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট- কিন্তু তার দ্বিতীয় গোলটি নিয়ে এখনও চলছে বিতর্ক।
আসলেই কি বলটি গোললাইন অতিক্রম করেছিল? এমন প্রশ্ন এখনও প্রায়ই ভেসে আসে।
মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে থাকা রেফারির দেওয়া সেই গোলের সিদ্ধান্ত সঠিক না ভুল ছিল- তা নির্ধারণের কোনো উপায় তখন অবশ্য ছিল না।
আবার ১৯৮৬-এর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দিয়াগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটি নিয়েও একই কথা বলা হয়। রেফারি বুঝতেই পারেননি ম্যারাডোনার চাতুর্য।
ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও আম্পায়ারের দেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আগে দেখা যেত একইরকম দৃশ্য।
আম্পায়ার স্টিভ বাকনরের দেয়া লেগ বিফোর উইকেটের সিদ্ধান্ত মানতে না পেরে মাথা নাড়াতে নাড়াতে মাঠ ছাড়ছেন শচীন টেন্ডুলকার- এমনটা দেখা যেত হরহামেশাই।
তবে এখন দৃশ্যপট বদলেছে। ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলায় যোগ হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ছোঁয়া। এতে যেমন সহজ ও নির্ভুল হয়েছে রেফারি ও আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত দেওয়া, তেমনি খেলাধুলার জগতে লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া।
জিওফ হার্স্ট-এর গোলটিতে বল আসলেই গোললাইন পার হয়েছিল কিনা বা আম্পায়ার স্টিভ বাকনর আসলেই সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন কি না- এআই প্রযুক্তির কল্যাণে এখন খুব সহজেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
ফুটবলসহ কোথায় কোথায় হচ্ছে এআইয়ের ব্যবহার
প্রাক-মৌসুম বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে ফাইনাল বাঁশি পর্যন্ত- এআই ধীরে ধীরে খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, কোচের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দর্শকরা খেলাটিকে কীভাবে উপভোগ করেন- সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রবেশ করছে।
খেলাধুলার জগতে এখন তাই অনেকটা জুড়ে রয়েছে ডেটা অ্যানালিটিক্স, অ্যালগরিদমের পদচারণা।
হ্যালো ফিউচার, দ্য অরেঞ্জ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন হলো একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যারা ডিজিটাল বিশ্ব, নতুন প্রযুক্তি এবং এআই কীভাবে আরও কার্যকর, সহজলভ্য ও পরিবেশবান্ধব হতে পারে- তা নিয়ে গবেষণা ও উদ্ভাবন তুলে ধরে।
ওয়েবসাইটটিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিপুল পরিমাণ ডেটা আমাদের চেনা পরিচিত ক্রীড়া জগৎকে বদলে দিচ্ছে।
এতে বলা হয়েছে, পেশাদার খেলাধুলায় খেলোয়াড়দের মনোজগত ও মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে এআই বা আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স। সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন এনেছে, তা হলো- আক্ষরিক অর্থে সবকিছুই পরিমাপ করা হচ্ছে।
খেলোয়াড়ের হৃৎপিণ্ডের গতি, ঘুমের ধরণ, পানিশূন্যতা, মেজাজ, মুখের অভিব্যক্তি, অঙ্গবিন্যাস, চোখের নড়াচড়া- দীর্ঘ এই তালিকার আপাত কোনো শেষ নেই।
এআই অ্যালগরিদমগুলো এখন বায়োমেট্রিক ডেটা, ভিডিও ফুটেজ এবং পারফরমেন্সের পরিসংখ্যান ঘেঁটে প্রতিটি ক্রীড়াবিদের প্রশিক্ষণ সূচি তৈরি করছে।
এআই দিয়ে তৈরি করা ক্যালেন্ডার জানিয়ে দিচ্ছে- ভ্রমণের সময়, বিশ্রামের দিন। একজন খেলোয়াড় জানতে পারছেন, ঠিক কোন অনুশীলনটি করলে পরবর্তী ম্যাচে আরও ভালো পারফরম্যান্স করতে পারবেন।
খেলার সময় কৌশলগত পরামর্শ দিতে এবং এমনকি খেলোয়াড়দের ক্লান্তির প্রাথমিক লক্ষণ চিহ্নিত করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে এআই।
নড়াচড়ার ভারসাম্যহীনতা, পেশিতে টান বা হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাগুলো আগেই এআই-এর কল্যাণে জানতে পারছেন খেলোয়াড়রা।
স্পোর্টস টিম ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার বা ‘এসএপি’ এআইনির্ভর কাজ করে। জার্মানির ফুটবল লিগ বুন্দেসলিগা, আমেরিকার ন্যাশনাল হকি লিগ এনএইচএলে ২০১৫ থেকে খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ ও ইনজুরি প্রতিরোধ করাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহৃত হচ্ছে এসএপি।
‘স্পোর্টস কোড’ আরেকটি সফটওয়্যার- যা আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্সির সাহায্যে ভিডিও বিশ্লেষণ করে কোচদের কৌশল ঠিক করতে সাহায্য করে।
ফুটবল খেলায় সবচেয়ে বিতর্ক হয় ‘অফসাইড’ নিয়ে রেফারির সিদ্ধান্ত দেওয়া বা না দেওয়া নিয়ে।
এই বিতর্কের আপাত সমাপ্তি ঘটে- যখন ২০২২ বিশ্বকাপে সেমি-অটোমেটেড অফসাইড টেকনোলজি চালু করে ফিফা।
এর আগে ২০১৮ সাল থেকে ফুটবল মাঠে চালু হয়েছে ‘ভিডিও এসিন্ট্যান্ট রেফারি’ বা ‘ভিআর’ প্রযুক্তি।
অফসাইড শনাক্ত, গোল-লাইন নিশ্চিতকরণ, ফাউল ও পেনাল্টি পর্যালোচনা, রেফারিদের জন্য রিয়েল-টাইম বিশ্লেষণ- এক কথায় এআইয়ের কল্যাণে রেফারিদের ভুল করার সম্ভাবনা এখন অনেকটাই কম।
ক্রিকেটে এআই
ক্রিকেটেও এআইয়ের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। বল ব্যাট ছুঁয়ে উইকেটকিপারের গ্লাভসে জমা হয়েছে কিনা বা লেগ বিফোর উইকেটের আবেদন করা বলটি আসলে স্ট্যাম্পে আঘাত করেছে কি না- জানার জন্য আছে হক-আই প্রযুক্তি।
এক্ষেত্রে অন্তত চারটি উচ্চ ক্ষমতার ক্যামেরা দিয়ে বলের গতিপথ শনাক্ত করা হচ্ছে নিমিষেই।
মার্শাল আর্ট ও বক্সিং
এআই প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে কমব্যাট স্পোর্টস বা মার্শাল আর্টসের মতো খেলাতেও।
জ্যাবের (Jabbr) এমনই এক প্রযুক্তি- যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লড়াই বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিসংখ্যান বের করে, বক্সারদের পারফরম্যান্স আরও ভালোভাবে বুঝতে এবং তাদের লড়াইয়ের কৌশল উন্নত করতে সাহায্য করে।
দর্শক ও ফ্যানদের জন্য এআই
হাই-প্রোফাইল বক্সিং ম্যাচগুলোতে সম্প্রতি বিচারক হিসেবেও কাজ করছে এআই।
স্পোর্টস সংস্থাগুলোও দর্শকদের জন্যও এআই ব্যবহার করে। এর ফলে দর্শকরা খেলার খুঁটিনাটি তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারে, সহজে যোগাযোগ করতে পারে এবং বাড়িতে বা স্টেডিয়ামে বসেও খেলা দেখার দারুণ অভিজ্ঞতা পায়।
ফ্যানদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যও ব্যবহার করা হচ্ছে এআই প্রযুক্তি। এআই ফ্যান এনগেজমেন্টকে দ্রুত, আরও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় রূপ দিয়েছে। মেশিন লার্নিং প্রতিটি ফ্যানের পছন্দের দল বা খেলোয়াড়ের সেরা মুহূর্ত, খেলার তথ্য এবং খবর আলাদা করে সাজিয়ে দিচ্ছে।
ব্যবসা বদলে দিচ্ছে
এআই যেমন খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বাড়াচ্ছে, ঠিক তেমনি খেলাধুলা সম্পর্কিত ব্যবসাকেও পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। অফিসিয়াল কাজ থেকে শুরু করে বাজি ধরার প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত- এআই সবকিছুকে আরও স্মার্ট, দ্রুত এবং লাভজনকভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করছে।
টিকিট বিক্রি, ফ্যানদের ইমেইল পাঠানোর মতো কাজগুলো এআই নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করে দেয়।
ডোপিং, ম্যাচ ফিক্সিং বা অস্বাভাবিক কোনো বাজি শনাক্তের জন্য কাজ করে এআই।
হ্যালো ফিউচার, দ্য অরেঞ্জ রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ওয়েবসাইটে এআইএর প্রভাব ও সম্ভাবনা নিয়ে মতামত দিয়েছেন ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ স্পোর্ট, এক্সপার্টিজ, অ্যান্ড পারফরম্যান্সের স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট এবং ডেটা বিশেষজ্ঞ আদ্রিয়েন সিডো।
প্রযুক্তির এই নতুন গুরুত্ব সম্পর্কে দৃঢ়ভাবে আশাবাদী তিনি। একইসঙ্গে বিশ্বাস করেন যে, এআই প্রযুক্তি এমন ‘অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা’ প্রকাশ করতে পারে, যা প্রথাগত পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রশিক্ষকদের চোখ এড়িয়ে যেতে পারত।
খেলাটি কি এখনও আমাদের?
বিশ্বের অন্যতম স্পোর্টস মিডিয়া নেটওয়ার্ক হলো সিএলএনএস। এরা আমেরিকার ‘ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন’-এর কভারেজের জন্য সুপরিচিত।
আমেরিকান পেশাদার খেলাধুলার উপর পডকাস্ট এবং ভিডিও শো-এর মাধ্যমে গভীর বিশ্লেষণধর্মী সংবাদের জন্য সংবাদমাধ্যমটি ফ্যানদের মধ্যে জনপ্রিয়।
সিএলএনএসে এক বিশ্লেষণে- ভবিষ্যতে ক্রীড়াজগতে এআই কী প্রভাব রাখবে এবং বর্তমানে কী প্রভাব রাখছে- তা তুলে ধরেছে। এআই প্রযুক্তির ফলে খেলোয়াড় ও দর্শকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোজগতে যে পরিবর্তন এসেছে- বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সে বিষয়ও।
"একবার ভাবুন, ঘুম থেকে উঠেই আপনি দেখলেন ড্যাশবোর্ডে দেখাচ্ছে আপনার শরীর যথেষ্ট বিশ্রাম পায়নি বা 'রিকভারি স্কোর কম'। একই বার্তা পেলেন আপনার কোচও। ফলে শরীর ভালো থাকা সত্ত্বেও আপনি দিন শুরু করছেন একরকম ব্যর্থতার অনুভূতি নিয়ে”- বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে এমনটা।
আর এই ধরনের তথ্য বারবার আসতে থাকলে মানসিক চাপ বাড়ে এবং নিজের শরীর কী বলছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায় বলেও মন্তব্য করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
“এআই প্রযুক্তির এই যুগে খেলোয়াড়রা নিজেদের জিজ্ঞেস করে না 'আমার কেমন লাগছে?' বরং জিজ্ঞেস করে 'ডেটা কী বলছে?”
বিশ্লেষণে আরও লেখা হয়েছে, একজন খেলোয়াড় যখন প্রত্যাশামত পারফর্ম করতে পারে না তখন দ্রুত তার উপর চাপ বাড়ে। সেই মুহূর্তে এআই যখন জানায় 'আপনি খারাপ করছেন'; দলও একই প্রতিক্রিয়া দেখায়।
“এতে খেলোয়াড় নিজেকে সন্দেহ করতে শুরু করেন- আর এভাবেই পারফরম্যান্সের পতন শুরু হয়। বিশেষ করে তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য- আত্মবিশ্বাস ও খেলার ইচ্ছে কমিয়ে দেয় প্রযুক্তির এই চাপ। তাদের কাছে খেলাটি তখন আর খেলা থাকে না, বরং এক ব্যর্থ পরীক্ষায় পরিণত হয়।”
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, এআইএর মতো প্রযুক্তির ব্যবহার করার ফলে একজন ক্রীড়াবিদের শ্রেষ্ঠত্বকে নিছক সংখ্যায় প্রকাশ করা হচ্ছে। খেলার ইতিহাসে যতগুলো স্মরণীয় মুহূর্ত আছে, তার বেশিরভাগই আগে থেকে সাজানো ছিল না, বা কোনো এআই মডেল দিয়ে সেগুলো বিনির্মাণ, পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়।
“সেই মুহূর্তগুলো এসেছিল খেলোয়াড়ের সহজাত বুদ্ধি, সাহস বা এক মুহূর্তের পাগলামি থেকে। দর্শকরা খেলার গল্প, আবেগ ও খেলোয়াড়ের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হন। এআই কিন্তু এই বিষয়গুলো মাপতে পারে না। খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নিয়েও ভাবে না- যে ক্যারিশমাই জার্সি বিক্রি করে এবং স্টেডিয়ামে দর্শক ভর্তি করতে সাহায্য করে।”
খেলাধুলায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। এটি ইতোমধ্যেই পেশাদার খেলাধুলার নিয়মকানুন বদলে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ, ইনজুরি অনুমান, খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন এবং দর্শকদের যুক্ত করার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব রাখবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তবে সব আধুনিক সুবিধার আড়ালে আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটছে। খেলার প্রতি মানুষের যে আবেগ ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক ছিল- তা কমে গিয়ে এখন সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর মডেল ও নিয়ন্ত্রণের দিকে এগোচ্ছে কি না- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অনেকেই।