‘হুজুগে’ ফিলিং স্টেশনে বেড়েছে ভিড় ও বিক্রি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা আর জ্বালানির সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা ও গুজব- এই তিন কারণে ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে হঠাৎ করে বেড়েছে যানবাহন।

স্বাভাবিকভাবে আগে একবারে যতটা তেল কিনতেন, এখন অনেকেই তারচেয়ে বেশি জ্বালানি কিনছেন। 

এতে হঠাৎ করেই পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ কমে গেছে। অনেক জায়গাতেই দেখা গেছে সংকট। 

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা বিপিসি এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড বা আরপিজিসিএল বলছে এখনই ‘আতঙ্কিত’ হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। 

তবে ‘হুজুগে’ ক্রেতাদের এমন “প্যানিক বাই” আচরণে সংকট বাড়তে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘প্যানিক বাই’ যেভাবে চাপ সৃষ্টি করে

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত সংকট না থাকলেও একসঙ্গে বেশি চাহিদা তৈরি হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক চাপ পড়ে।

এতে বিভিন্ন জায়গায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা আবার অনেকসময় গুজবকেও সত্যি বানিয়ে ফেলে। এটা হয় আতঙ্কে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলে ‘সেল্ফ-ফুলফিলিং প্রফেসি’।

বাংলাদেশে জ্বালানির প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়তে পারে। তবে তা সাধারণত নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়।

তীব্র ভিড় ফিলিং স্টেশনে

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পাম্প ঘুরে ও জ্বালানি বিক্রয়কারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ ক্রেতাই ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে জ্বালানি নিচ্ছেন।

মহাখালীর রাওয়া ক্লাব সংলগ্ন ‘ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ’ পাম্পটিতে গিয়ে জ্বালানি নিতে দেখা গেল অপেক্ষমান যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

এই পাম্পটিতে সিএনজিচালিত গাড়ি ও অটোরিকশাগুলোর জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়। তবে এদিন জ্বালানি তেল বিক্রির অংশেও ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাইকের বাড়তি ভিড় দেখা যায়।

বিক্রয়কর্মীদের একজন বললেন, “সাধারণত এই সময়ে গ্যাসের জন্য গাড়ির চাপ থাকে। কিন্তু কাল রাত থেকে তেলের জন্যও চাপ বেড়েছে।”

সুজা নামের একজন ক্রেতা বলেন, “মিডিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাচ্ছি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দেশে তেলের দাম বাড়তে পারে। তাই ফুয়েল কিছুটা কমলেই ট্যাংক ফুল করে রাখছি।”

গত দুই দিন অফিস থেকে ফেরার পথে এ কাজ করছেন বলে আলাপকে জানান তিনি।

ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে

ঈদ যাত্রার প্রস্তুতি

এদিকে ‘প্যানিক বাই’ এর আরেক কারণ হিসাবে অনেকেই বলছেন আগাম ঈদ যাত্রার প্রস্তুতির কথা।

গেল কয়েক বছর স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিজের গাড়িতে করে ভোলায় ঈদ করতে যান ব্যবসায়ী ইফতেখারুল হক। এবারও সেরকম পরিকল্পনা। তবে এবার জ্বালানির প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন অনেক আগে থেকেই।

“আমি সাধারণত বাড়ি যাওয়ার ঠিক আগেই ট্যাংক ফুল করে ফুয়েল কিনি। কিন্তু এবার আগেই নিয়ে রাখছি। বলতে পারেন আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা,” আলাপকে বলছিলেন তিনি।

বুধবার রাতে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ফুয়েল পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে অনেকটা একই কথা বললেন আরেকজন মটরসাইকেল চালক, “ঈদে বাড়ি যাব, তখন তেল পাই কিনা বা দাম বেড়ে যাবে কি না জানি না, তাই আজই ট্যাংক ফুল করে নিলাম।”

আগামী কয়েকদিন জ্বালানি নষ্ট করতে চাননা বলেও জানালেন তিনি।

রিজার্ভ সংকটে ফিলিং স্টেশন

এদিকে আতঙ্কিত ক্রেতাদের এমন আচরণে চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থা পাম্প গুলোতে।

গত দুই দিনে বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সাউদার্ন ফিলিং স্টেশনের দায়িত্বশীল একজন প্রতিনিধি। ক্রেতাদের ‘হুজুগে’ আচরণে হঠাৎ করেই বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন তিনি। 

“বিক্রি বাড়ায় রিজার্ভ নিয়ে চিন্তায় আছি। আজকে চারটা ট্রাক আসার কথা, কিন্তু এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র একটি,” বৃহস্পতিবার দুপুরে আলাপকে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

আসাদগেটসংলগ্ন তালুকদার ফিলিং স্টেশনে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর তেল না পেয়ে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন অ্যাপে রাইড শেয়ার করা মোটরসাইকেল চালক মো. মাসুম বিল্লাহ।

“সকালে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু পরে সাড়ে ১০টার দিকে বলা হয়েছে তেল নাই। পরে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিয়েছি,” আলাপকে বলেছেন তিনি।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি আমদানির চিত্র

‘প্যানিক’ করার মতো কিছু হয়নি

বিপিসি’র ২রা মার্চ পর্যন্ত দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন ডিপোতে সব মিলিয়ে পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে ৪ লাখ ২০ হাজার ৭৬৫ টন।

এর মধ্যে ডিজেল রয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ১২৭ টন। যা দিয়ে দেশে ১৪ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

তা ছাড়া ৩৪ হাজার ১৩৩ টন অকটেন রয়েছে যা দিয়ে চলবে ৩০ দিন।

অন্যদিকে পেট্রোল রয়েছে ২১ হাজার ৭০৫ টন, যা দেশের ২০ দিনের মজুত।

এছাড়া ১৬ হাজার ৫৪৮ টন কেরোসিন, ৩৮ হাজার ৭৭৭ টন জেট ফুয়েল, ৭৮ হাজার ২৭৮ টন ফার্নেস অয়েল, ৬ হাজার ২৭৫ টন মেরিন ফুয়েল মজুত রয়েছে।

আরপিজিসিএল- এর মহাব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) মো: শফিকুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, দেশে যে পরিমাণ এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) মজুত রয়েছে এবং যে সব জাহাজ পথে রয়েছে তাতে চলতি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনো সমস্যা হবে না।

“আমাদের যে রিজার্ভ আছে তাতে এখনই সংকট হওয়ার কথা না। কিন্তু এভাবে প্যানিক বাই চলতে থাকলে সাপ্লাই চেইনের চাপ সামলানো কঠিন হবে,” আলাপকে বলেন তিনি।

এই মাসে জ্বালানির কোনো সমস্যা হবে না বলে একদিন আগেই জানিয়েছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

তার ভাষায়, “মজুদকৃত জ্বালানি কীভাবে সাশ্রয় করে ব্যবহার করা যায়, এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব জায়গা থেকে জ্বালানি আনারও চেষ্টা চলছে। মজুদকৃত জ্বালানি দিয়ে মার্চ পর্যন্ত চলবে।”

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বৃহস্পতিবার সরকার মন্ত্রী পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করেছে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি।

বৈঠকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে প্রধানমন্ত্রী অনেকগুলো নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ‘প্যানিক বাই’ চলতে থাকলে এবং সরবরাহ ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি (বোরো সেচ) এবং পরিবহন খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।