ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান: বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ও মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে কি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে? নাকি এটি এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের শুরু? দশকের পর দশক ধরে চলা এই 'প্রক্সিওয়্যার' কি এবার চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাচ্ছে?

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের ছায়াযুদ্ধ এবং শেষ কিছু বছরের সরাসরি সংঘাতের পর, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেইনির মৃত্যু এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সম্মিলিত সামরিক অভিযান গোটা বিশ্বের ভূ-রাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে কি এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে? নাকি এটি এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের শুরু? 

প্রক্সিওয়্যার থেকে সরাসরি রণক্ষেত্র

ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যকার উত্তেজনা গত দুই বছরে ধাপে ধাপে বিস্ফোরক রূপ নিয়েছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ দেখা গেল ১লা মার্চ ভোরে। এ দিন তেহরানসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেইনি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

খামেইনির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ইরান এক নজিরবিহীন সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। খামেইনির মৃত্যুর 'চূড়ান্ত প্রতিশোধ' নিতে ‘অপারেশন ট্রুথফুল প্রমিস-৪’ নামক  পালটা আক্রমণ শুরুর ঘোষণা দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি)। এর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতিতে আক্রমণ শুরু করেছে তারা।  

গবেষণা সংস্থা ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস এবং ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ এর মতে, খামেইনির মৃত্যুর পর এই পাল্টা হামলাগুলোর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। 

সেগুলো হলো, খামেইনির মৃত্যুর পর ইরানের সাধারণ মানুষ যাতে রাস্তায় নেমে বিদ্রোহ করতে না পারে, তাই যুদ্ধের আবহ তৈরি করে দেশে 'মার্শাল ল' বা সামরিক আইন জারি রাখা। এবং হিজবুল্লাহ, হুতি এবং হামাসকে এই বার্তা দেওয়া যে, তাদের প্রধান অভিভাবক ইরান দুর্বল হয়ে পড়েনি।

আঞ্চলিক যুদ্ধ 

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত এখন আর কেবল ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। থিংক ট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’-এর মতে, ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ এখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত। খামেইনির মৃত্যুতে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়ায় ইরান চরম প্রতিশোধের পথে হাঁটছে, যা কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকেও যুদ্ধের আওতায় নিয়ে এসেছে।

মিডল ইস্ট রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন প্রজেক্ট-এর বিশ্লেষণ বলছে, এই সংঘাত কেবল সামরিক নয়, বরং এটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই। তারা বলছে, ইরানের আইআরজিসি এখন নিজেকে প্রমাণ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। যতক্ষণ না ইরানে একটি স্থিতিশীল নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। 

পশ্চিমা দেশগুলো যদি সরাসরি শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করে, তবে সংঘাত থামার বদলে আরও ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করে সংস্থাটি।

‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’ এর সিনিয়র ফেলোদের মতে, তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি শেষ পর্যন্ত বিশ্বশক্তিগুলোকে চাপ দিতে বাধ্য করবে যেন তারা যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে।

লন্ডনভিত্তিক থিংকট্যাংক ‘চ্যাটাম হাউস’ মনে করে, খামেনি পরবর্তী যুগে ইরান হয়তো একটি 'মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ' এর দিকে যাবে। তাদের মতে, ইসরায়েল যদি মনে করে খামেনির মৃত্যুতে ইরান দুর্বল হয়ে গেছে, তবে তারা ভুল করবে। বরং সামরিক নেতৃত্ব আরও বেশি উগ্র হতে পারে। সংঘাত থামার একমাত্র পথ হলো 'মিউচুয়াল ডি-এস্কেলেশন' বা উভয় পক্ষের সমানভাবে পিছু হটা।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘তেল-বোমা’

বিশ্ব অর্থনীতির ধমনি হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি। ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ড ইতোমধ্যেই রেডিওবার্তায় জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে দেওয়া হবে না

বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের ২০-৩০ শতাংশ এই রুট দিয়ে পরিবহন করা হয়। তাই এই রুট অবরোধ করা হলে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১২০ থেকে ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

খামেইনি পরবর্তী ইরান  

খামেনির মৃত্যুতে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ডামাডোল শুরু হয়েছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, নতুন নেতা নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচার বিভাগীয় প্রধান মোহসেনি এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। 

খামেইনির সম্ভাব্য উত্তরসূরীর তালিকায় আছে বেশ কিছু নাম। পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে চারটি নাম সবচেয়ে আলোচিত। 

খামেইনির  ছেলে মোজতবা খামেইনি আছেন এই তালিকায়। পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি আলোচনায় থাকলেও, তার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশাসনিক পদ নেই, ধর্মীয় উচ্চপদস্থ উপাধিও নেই তার। এ ছাড়া 'বংশতান্ত্রিক' শাসন ইরানি বিপ্লবের আদর্শবিরোধী হওয়ায় তার পথ বেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান ও অভিজ্ঞ আমলা আলিরেজা আরাফিও আছেন এই তালিকায়। খামেইনির আস্থাভাজন আরাফির প্রশাসনিক দক্ষতা তাকে অনেকটা এগিয়ে রাখছে।

কট্টর রক্ষণশীল ও কড়া পশ্চিম-বিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত মেহদি মিরবাঘেরিও আছেন আলোচনায়। আইআরজিসির কট্টরপন্থী অংশের সমর্থন পেতে পারেন তিনি।

এ ছাড়াও ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি হাসান খোমেনির নামও শোনা যাচ্ছে। তবে জনপ্রিয় হলেও তার রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত এবং সংস্কারপন্থী মনোভাবের কারণে আগে তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছিল।

প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একাধিক দেশে সশস্ত্র সংগ্রাম করছে হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতি। তিনটি গোষ্ঠীকেই সমর্থন করে ইরান। তবে সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বের পরাজয়ে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ইরানের এই সংকটে এই গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তি হারাতে পারে। 

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের বিশ্লেষণে বলছে, যখন কোনো প্রক্সি নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, তখন স্থানীয় কমান্ডগুলো নিজেদের অস্তিত্ব টেকানোর জন্য আরও বেশি অনিয়ন্ত্রিত এবং বেপরোয়া আক্রমণ শুরু করে।

অন্যন্য ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণও বলছে, ‘অভিভাবক’ হারিয়ে হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতির মত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখন আরও বেপরোয়া হয়ে ইসরায়েলের ওপর  আক্রমণ তীব্র করতে পারে।  

চ্যাটাম হাউস এর মতে, হিজবুল্লাহ এখন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব সংকটে। খামেনির অবর্তমানে তারা এখন তেহরানের সরাসরি নির্দেশনার চেয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ ‘চেইন অব কমান্ড’  রক্ষার লড়াইয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠতে পারে ।

পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের শঙ্কা

খামেইনির মৃত্যুতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানের পরমাণু অস্ত্র না বানানোর পেছনে আয়াতোল্লা আলি খামেনির একটি ‘ধর্মীয় ফতোয়া’ বড় ঢাল হিসেবে কাজ করত। সেই ফতোয়ায় খামেইনি ঘোষণা করেছিলেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, মজুত এবং ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ।  ইরান কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু শক্তি ব্যবহার করতে চায়।

খামেইনির মৃত্যুর পর এই ফতোয়া বাতিল বা শিথিল হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলে, খামেইনি পরবর্তী কট্টরপন্থী সামরিক নেতৃত্ব নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্রকে ‘চূড়ান্ত বীমা’ হিসেবে দেখতে পারে।

কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর মতে, যখন কোনো দেশ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হয়, তখন তারা ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ বা পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা অর্জনের জন্য দ্রুত পারমাণবিক পরীক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আইএইএ ইতোমধ্যেই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আইএইএ – এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি একাধিকবার সতর্ক করেছেন যে, সংঘাতের সময় পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা বা নজরদারি বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মস্কোভিত্তিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি মনে করে তাদের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস হতে চলেছে, তবে তারা ‘স্যামসন অপশন’ বা একত্রে ধ্বংস হওয়ার নীতি বেছে নিতে পারে। ওয়াশিংটন এক্সামিনারও তাদের রিপোর্টে ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তেহরান এখন তাদের গোপন ভূগর্ভস্থ ল্যাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৯০ শতাংশে উন্নীত করার চূড়ান্ত নির্দেশ দিতে পারে।

খাঁদের কিনারায় ইরান?

ইরানের সাধারণ মানুষ এখন দ্বিধাবিভক্ত। একদিকে ‘বসন্ত বিপ্লবের’ পর থেকে তরুণ সমাজ এই ব্যবস্থার পতন চায়, অন্যদিকে যুদ্ধের ভয়াবহতা তাদের আতঙ্কিত করছে।

‘ইরান ওয়্যার' এক খবরে বলা হয়, ইরানে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে ৩০০ শতাংশ।

গবেষণা সংস্থা ‘মিডল ইস্ট রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন প্রজেক্ট’ বলছে, তেহরানের বাসিন্দারা এখন ‘রেড জোন’ এ বাস করছেন, যেখানে একদিনের খাবার জোটাতেই নিম্নবিত্তের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সংঘাত কি থামবে?

ইরানের সাথে আমেরিকা-ইসরায়েল এই যৌথ সংঘাত এখন এমন এক বিন্দুতে পৌঁছেছে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ খুব সংকীর্ণ। ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ’ এর মতে, খামেইনির মৃত্যু এবং ইরানের পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি থেকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হতে পারে।

তারা মনে করছে, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার এবং ওমানের ভূমিকা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইরান যদি ইসরায়েলের ভেতরে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটায়, তবে কোনো পক্ষই আর পিছু হটবে না।