সিলিন্ডার গ্যাসের দামে তুঘলকি, ক্রেতারা বাধ‍্য হ‍য়ে কিনছেন ইলেকট্রিক চুলা

তিতাসের সরবরাহকৃত পাইপ লাইনের গ্যাস বাসা বাড়িতে আসুক বা না আসুক গ্রাহককে মাস শেষে গুনতে হচ্ছে ৯৯০ থেকে ১,০৮০ টাকা। তীব্র গ্যাস সংকটে বিকল্প হিসেবে চাহিদা বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসের। কিন্তু এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে গ্রাহক রীতিমত শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীদের তুঘলকি কাণ্ডের। সরকার নির্ধারিত ১,২৫৩ টাকার গ্যাস মিলছে না ২,০০০ টাকায়ও।

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

প্রতি বছরের মতো এবারের শীতেও বাংলাদেশের বাসা-বাড়িতে থাকা পাইপলাইনের গ্যাসে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারের বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে গ্রাহকদের জিম্মি করে ব্যবসায়ীরাও নেমেছেন বাড়তি মুনাফার মিশনে।

প্রতি বছরের এই সময়ে গ্যাসের সংকট এবং এলপিজি ব্যবসায়ীদের তুঘলকি আচরণ নিয়মিত ঘটনা। অথচ এই বছরও সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি আগাম কোনো পদক্ষেপ বা নজরদারি।

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই বাসা-বাড়িতে তীব্র হচ্ছিল গ্যাসের সংকট। আরে এতে বাড়ছিল সিলিন্ডার গ্যাস, ইলেকট্রিক চুলা ও অন্যান্য বিকল্প উপকরণের বিক্রি।

তবে গত এক সপ্তাহে সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর আকার ধারণ করেছে। ফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের দামে।

কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ২৫৩ টাকা দামের চেয়ে হাজার টাকা বেশি দিয়েও মিলছে না গ্যাসের সিলিন্ডার।

গ্রাহক ভোগান্তি

এলপিজি’র দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। বিদ্যুতের জন্য প্রিপেইড মিটার বসানোয় সরকার বরাবরই বেশ উদ্যোগী। কিন্তু তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি বাসা-বাড়িতে গ্যাসের প্রিপেইড মিটার বসানোর ক্ষেত্রে।

তাই তিতাসের সরবরাহকৃত পাইপলাইনের গ্যাস আসুক বা না আসুক আপনাকে মাস শেষে গুনতেই হবে নির্ধারিত টাকা—সিঙ্গেল-বার্নার চুলার জন্য ৯৯০ টাকা এবং ডাবল-বার্নার-এর জন্য ১,০৮০ টাকা।  

এ যেন 'রীতিমতো চাঁদাবাজি' বলছিলেন ধানমন্ডি মধুবাজার এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম (ছদ্ম নাম)।

আলাপ-কে তিনি বলেন, “সকাল ৬টার মধ্যে পাইপের গ্যাস চলে যায়। আসে আবার রাত ৯টা-১০টার পর। তাও চাপ থাকে না। অথচ মাস শেষে ১১০০ টাকার বিল ঠিকই দিতে হচ্ছে। কোনো সার্ভিস দিব না কিন্তু টাকা আমার চাই, এ যেন সরকারি চাঁদাবাজি।”

এলপিজি গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণেও সরকারের ব্যর্থ, তিনি বলেন।

“শুধু শীতের সময়ই নয়, অন্যান্য সময়ও ধানমন্ডি মধুবাজার এলাকায় গ্যাসের চাপ থাকে না। সাধারণত দুপুরের পর বিকেলে গ্যাস আসে। তাই বিকল্প হিসেবে এতদিন সিলিন্ডার ব্যবহার করছিলাম। শুক্রবার বাজারে গিয়ে অনেক দোকান ঘুরে দুই-একটি দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার পেয়েছি। কিন্তু দাম ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাইছে।”

পাইপ লাইনের গ্যাসে সরবরাহ ঘাটতি এবং সিলিন্ডারের দামে তুঘলকি কাণ্ড দেখার পর শেষ পর্যন্ত বৈদ্যুতিক চুলা কিনেই বাসায় ফিরেছেন তিনি।

এলপিজি গ্যাস ব্যবসায়ীদের তুঘলকি বাণিজ্য নিয়ে আরও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আফতাবনগরের বাসিন্দা ফরিদ আহমেদের (ছদ্ম নাম)।

আলাপকে তিনি বলেন, “আমার বাসায় তিতাস গ্যাসের সংযোগ নেই। বরাবরই সিলিন্ডার কিনতে হয়। তাই এজেন্ট ঠিক করা আছে। শনিবার সকালে তাকে ফোন করে নতুন সিলিন্ডার চাইলে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম দুই হাজার টাকা বলে জানিয়েছিলেন। এরপর বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখলাম এলপিজির সিলিন্ডারই নেই! উপায় না দেখে এজেন্টকে ওনার দামেই সিলিন্ডার দিয়ে যেতে বলেছি।”

শীতেই সংকট বাড়ে কেন?

শীতের তীব্র ঠান্ডা আবহাওয়ায় গ্যাসের পাইপলাইনে তেলের মতো ভারী পদার্থ জমে যায়, যা স্বাভাবিক চাপ কমিয়ে দেয় এবং গ্যাসের প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে।

সংকট বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস এর সহকারী ব্যবস্থাপক মো. মনির উদ্দিন গ্যাসের সহজাত ধর্মের বিষয় টেনে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, “শীত এলে গ্যাসের চাপ কমবে। এটাই গ্যাসের সহজাত ধর্ম। ঠান্ডা হলে গ্যাস জমে অনেকটা আইস এর মতো হয়ে যায়। অনেক সময় পাইপও বন্ধ হয়ে যায়। তখন পাইপে গ্যাসের ফ্লো’টা থাকে না।”

প্রতি বছরই শীতে গ্যাস সংকট নিয়ে এমনটাই বলে আসছে তিতাস, তবে এর জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এই সংকট কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সঠিক চাপে গ্যাসের প্রবাহ ধরে রাখতে তাই নিয়মিত পাইপলাইন পরিষ্কারের কাজ করা প্রয়োজন বলেও পরামর্শ দেন তারা।

ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক দোষারোপ

খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী পরিবেশক বা ডিস্ট্রিবিউশন পর্যায় থেকে এলপিজি সিলিন্ডার মিলছে না। তাই পাইকারি থেকে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে তাদের। যার ফলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পরিবেশকদের কাছ থেকে সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এরফলে সরকারি দাম ১,২৫৩ টাকা হলেও পাইকারি পর্যায়ে কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। তাই লোকসান এড়াতে তারাও বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুর্ব রামপুরার একজন সিলিন্ডার ব্যবসায়ী আলাপকে বলেন, “কোম্পানিগুলো গ্যাস সাপ্লাই কমিয়ে দিয়েছে। আবার দামও বেশি রাখছে। তাই ১,৩০০ টাকার গ্যাস ১,৭০০-১,৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।”
এই ব্যবসায়ী আরও বলেন, “এটা একটা সিন্ডিকেট হতে পারে। কোম্পানি থেকে গ্যাস যদি না দেয় এবং বেশি দাম রাখে তাহলে দাম বেশি নেওয়া ছাড়া তো আমাদের কোনো উপায় নেই।”

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ-এর (এলওএবি) সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক এ বিষয়ে সরাসরি সরকারি পদক্ষেপের কথা বলেছেন। 

“আমরা সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে এক টাকাও বেশি নিচ্ছি না। এমনকি কম নিচ্ছি। বাজারে যে অস্থিরতা তার অন্যতম কারন পাইকারি মার্কেট। সরকার এখানে ব্যবস্থা কেন নিচ্ছে না? আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে তদারকি করা প্রয়োজন,” আলাপ-কে বলেন তিনি। 

তবে তিনিও শীতের সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকার বিষয়টি সামনে এনেছেন।