তৌফিক ইমরোজ খালিদী: বাংলাদেশকে যিনি ইন্টারনেটে খবর পড়ার অভ্যাস গড়ে দিয়েছেন 

ইন্টারনেট তখনও খবরের খোঁজ পাওয়ার ঠিকানা হয়ে ওঠেনি। সেই সময়েই চালু হয়েছিল এমন এক নিউজরুম, যা পরে বাংলাদেশের খবর জানার, পড়ার এবং শোনার অভ্যাসই বদলে দেয়।

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ পিএম

সময়টা ২০০৭ সালের শেষের দিকে অথবা ২০০৮ সালের শুরুর দিকে। রিপোর্টার হিসেবে এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার কাছে গিয়েছি। কিছুতেই বোঝাতে পারছিলাম না বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কী, তাদের খবর কোথায় ছাপা হয় বা দেখা যায়। শেষে তার ডেস্কের পাশে আলাদা একটা টেবিলে রাখা কম্পিউটারটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এটাতে কি ই-মেইল করা যায়? হ্যাঁ, আলাদা টেবিলে আর সেটার জন্য আলাদা একজন অপারেটরও ছিলেন। তিনি বললেন, যায়। আমি অপারেটরকে ডাকতে বললাম। তিনি এলে আমি ব্রাউজার খুলে ওয়েবসাইট দেখালাম। ইন্টারনেটেও খবর পাওয়া যায়, এই ধারণার সাথে বাংলাদেশের মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন যিনি তার নাম তৌফিক ইমরোজ খালিদী।  

২০০৬ সালের আগে বাংলাদেশে খবর মানে ছিল সকালের পত্রিকা আর রাতে টিভি বা রেডিওর নিউজ বুলেটিন। ইন্টারনেটে যে সংবাদ পাওয়া যেতে পারে, তা তখন বেশির ভাগ মানুষের ধারণার বাইরে ছিল।

বার্তা সংস্থা হিসেবে বিডিনিউজ-এর শুরুটা ২০০৫ সালে। অন্যান্য বার্তা সংস্থার খবর গণমাধ্যমে পৌঁছাতো টেলিপ্রিন্টারে, বিডিনিউজেরটা ই-মেইলে।

বিবিসি ছেড়ে এসে তৌফিক ইমরোজ খালিদী ২০০৬ সালে এর দায়িত্ব নিলেন। সে বছরের ২৩এ অক্টোবর তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি 'বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম' নামে নতুন করে যাত্রা শুরু করে। নিজেদের পরিচয় দেয় দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র আর প্রথম ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা বার্তাকক্ষ হিসেবে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর পেছনে তিনটি মাধ্যমের অভিজ্ঞতা ছিলো। ১৯৮৯ সালে সানডে এক্সপ্রেসে শুরু, তারপর ডেইলি স্টারে কূটনৈতিক প্রতিবেদক থেকে যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে অনুসন্ধানী রিপোর্টিং, আর ২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস। ছাপা, সম্প্রচার আর ডিজিটাল, তিনটাই ঠিকঠাক জানতেন। আমার ধারণা, সে কারণেই তিনি অনলাইন বলে কাজে ঢিলেমি মানতেন না।

শুক্রবার (২রা অক্টোবর) লন্ডনে তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল ৫৯। খবরটা প্রথমে শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি। রাষ্ট্রপতি তাকে দেশের অনলাইন ও ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথিকৃৎ বলেছেন, অনলাইন এডিটরস ফোরামও একই কথা বলেছে। কথাগুলো ঠিক। কিন্তু আমার কাছে তিনি তৌফিক ভাই। আমার শিক্ষক। পথপ্রদর্শক। সাংবাদিকতার ব্যাপারে আমার দার্শনিক। প্রায় দুই দশক এই পেশায় থাকার পর আজ মনে হয়, আমাদের নিউজ ইন্ডাস্ট্রিটা যেভাবে বদলেছে, তার অনেকটারই শুরু তার হাতে।

'নিউ মিডিয়া'

২০০৭ সালের একদম শুরুতে আমি ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের অফিসে নিউ মিডিয়া বিভাগে ব্রডকাস্টার হিসেবে ঢুকলাম। কাজ ছিল মোবাইল ফোন নিউজ সার্ভিসের জন্য ইংরেজিতে এসএমএস, আর বাংলা-ইংরেজিতে ভয়েস নিউজের স্ক্রিপ্ট লেখা ও প্রযোজনা। নিউ মিডিয়া শব্দটাই তখন এ দেশে কেউ জানতো না। সারা দুনিয়াতেও হাতে গোনা কয়েকটা গণমাধ্যমে এই নামে একটা বিভাগ ছিলো।

যেই অল্প কয়েকজন বুঝতেন তাদের কাছেও মোবাইল ফোনে খবর বলতে দিনে এক-দুবার আসা সংবাদ-সংক্ষেপ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর অন্যভাবে করলো; নিয়মিত নিউজ এসএমএস, ব্রেকিং নিউজ এসএমএস, ডায়াল করে ভয়েস হেডলাইন, নতুন কোন খবর এলেই সাথে সাথে আপডেইট। মোবাইল ইন্টারনেট তখনো অনেক দূরের ব্যাপার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর এখন একে দেশের প্রথম মোবাইল ব্রেকিং নিউজ সেবা বলে। সেই "প্রথম"-এর একজন আমিও ছিলাম। 

প্রথম দিনেই বিভাগের প্রধান বললেন, "সম্পাদক আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।" মনে মনে ভাবলাম, কিছু একটা ভুল তো হয়েছে, “বিদায় বার্তাকক্ষ!” তৌফিক ভাইয়ের রুমে গেলাম। আমার পড়া স্ক্রিপ্টটা তার হাতে। একটা শব্দ দেখিয়ে সেটা উচ্চারণ করতে বললেন। করলাম। বললেন, "ঠিক আছে।" তারপর আর কিছু কথা-বার্তা বলে কাজ চালিয়ে যেতে বললেন। একজন প্রধান সম্পাদক এক নতুন ব্রডকাস্টারের একটি শব্দের উচ্চারণও নিজে যাচাই করে দেখছেন, এই যত্নটাই ছিলো তার সম্পাদকীয় চরিত্রের পরিচয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে শব্দ, উচ্চারণ, তথ্য, কোনোটাই ছোট ব্যাপার ছিলো না।   

'করো': এক শব্দে সম্পাদকীয় দর্শন

ওয়ান-ইলেভেনের সময়, সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার একটা ঘটনা দিয়ে আমার জীবনের প্রথম রিপোর্টিং হলো। এক-দুদিন পর, কারফিউ চলছে, খবর পেলাম শাহবাগ-আজিজ মার্কেট এলাকার মেসে সেনা সদস্যরা ঢুকে আইডি কার্ড দেখে দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বের করে আনছে। খবরটা দিলো একটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজ করা আমার এক বন্ধু। সে বলল, ঢাকায় আর কেউ করবে কি না সে নিশ্চিত না, আর তাদের নিজেদের অন এয়ার করতে দেরি হবে। "আপনারা এখন চালালে দেশের বাইরেও জানবে।"

তখন একটা ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল লাইভ করার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ, দিনের একটা সময় মোবাইল নেটওয়ার্কও। আর আমার বার্তাকক্ষের অভিজ্ঞতা বড়জোর পাঁচ মাস। 

আমি তৌফিক ভাইকে ফোন করলাম, তিনি ঘটনা শুনলেন, সোর্স কী তা জানলেন। তারপর এক মুহূর্ত না ভেবে বললেন, "করো।"

সেই একটি শব্দে আমি তার সম্পাদকীয় দর্শন বুঝেছিলাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর সেদিন অসাধারণ কিছু করেনি, যা করার কথা, সাংবাদিকতা, তাই করেছে। কিন্তু সেইরকম একটা সময়ে সেই সাধারণ কাজটা যে কতটা অসাধারণ হয়ে ওঠে, তা সেদিন বুঝেছিলাম। 

‘নিউজ অ্যাজ ইট হ্যাপেনস’

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের কথা ছিল "সবার আগে, কিন্তু নির্ভুল"। তখন বাংলাদেশে খবর মানে পরদিনের পত্রিকা বা রাতের সংবাদ। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে জানানোর চল কেবল টিভির নিউজ স্ক্রলে শুরু হচ্ছিল। তৌফিক ভাই আর তার প্রতিষ্ঠান সেটা বদলে দিলো।

কাজ হতো এভাবে: আমরা রিপোর্টাররা স্পট থেকে ফোনে খবরটা আগে জানিয়ে দিতাম। ডেস্ক থেকে সেটা লিখে সাইটে আপলোড করতো। পরে অফিসে এসে বা কোনো সাইবার ক্যাফেতে বসে পুরো স্টোরি লিখতাম। ইন্টারনেট ছিল দামি, বাসায় ছিলো না। ল্যাপটপও তখন দুর্লভ জিনিস।

তারপর (যতদূর মনে পড়ে) ২০০৮-এর কোন এক সময়  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর সব রিপোর্টারকে ল্যাপটপ দিলো। সাদা রঙের ১১ বা ১২ ইঞ্চি স্ক্রিন, একটা বইয়ের চেয়ে একটু বড়, সহজেই বহন করা যায়। আর তার সঙ্গে ইন্টারনেট ডংগল। রিপোর্টাররা এখন স্পট থেকেই খবর লিখে পাঠাবে।

ঢাকার নিউজ ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপারটা নাড়া দিয়েছিল। একটা বাংলাদেশি মিডিয়া তার রিপোর্টারদের ল্যাপটপ দিয়েছে! অ্যাসাইনমেন্টে যেখানেই যেতাম, অন্য হাউজের রিপোর্টাররা তাকিয়ে থাকতো। ব্যাপারটার মধ্যে একটা বনেদী ভাবও ছিলো। সাংবাদিকের বাইরেও যারা নিউজমেকার, তারাও আমাদের অন্য চোখে দেখতে শুরু করলেন।

কোনো এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বলেছিলেন, "আমরা জেগে থাকি প্রায় ২৪ ঘণ্টাই, আমরা কখনো ঘুমাই না।" আমার মনে হয়, কথাটা কেবল গর্বের ছিলো না। ছিলো একটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ঘোষণা।

'আমার রিপোর্টার তো কনফার্ম করে নাই'

২০১০ সালের শেষে তার সিদ্ধান্তেই আমি তার সঙ্গে একটা টেলিভিশনে স্টেশনে কাজ করতে গেলাম। শুরুটা ২০১১ সালের প্রথম মাসে। তিনি তখন একইসঙ্গে ওই চ্যানেলের প্রধান সম্পাদক আর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রধান। আমি বিজনেস করেসপন্ডেন্ট, আর পাশাপাশি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের জন্যও অনানুষ্ঠানিকভাবে কাজ করতাম।

একদিন এক আর্থিক খাতের নীতিনির্ধারণী একটা খবর এলো এমন একজনের কাছ থেকে, যিনি খুব প্রভাবশালী, ক্ষমতার একেবারে কাছাকাছি থাকেন। তৌফিক ভাই আমাকে খোঁজ নিতে বললেন। আমি একাধিক সূত্রে, নিজের নেটওয়ার্কে জিজ্ঞেস করলাম। সবাই জানালো, এমন কিছু ঘটেনি। এসে তাকে বললাম। তিনি বললেন, "না, মনে হয় ঘটেছে।" আমি বললাম, হতেই পারে না। ঘাড়ত্যাড়ার মতো নিজের কথায় অনড় থাকলাম।

কথোপকথনটা চলছিল টেলিভিশন চ্যানেলটির ক্যাম্প অফিসে, আশপাশে আরও অনেক লোকজন। সম্পাদক আর রিপোর্টারের মধ্যে যে ফারাক আছে, সেটা তখন আমার মাথাতেই ছিলো না।

কথার মাঝেই সেই প্রভাবশালী ব্যক্তির ফোন। এ পাশের কথা শুনে বুঝলাম, তিনি জানতে চাইছেন, খবরটা গেলো না কেন। তৌফিক ভাই বারবার একটা কথাই বললেন: "আমার রিপোর্টার তো কনফার্ম করে নাই।"

পরে সেখানে দাঁড়ানো একজন, যিনি পুরো ঘটনাটা জানতেন, আমাকে বললেন, "ভাই, আপনার সাহস আছে। আপনার এডিটরের সামনে এমন বোল্ডলি না বলে গেলেন!" তখন আমার খেয়াল হলো, খবরের সত্যতা নিয়ে এই জেদ আমি কোথা থেকে পেয়েছি। তৌফিক ভাই-ই আমাকে শিখিয়েছেন। আর সেদিন সম্পাদক হয়েও তিনি নিজের ধারণার চেয়ে আমার তথ্যকে বড় করে দেখেছিলেন।

সেই বছরের শেষ দিকে তিনি চ্যানেলটার দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। এক অথবা দুই মাস পর আমিও আরেকটা টিভি স্টেশনে চলে গেলাম।

'কয়টা পয়সার জন্য'

একটা মোবাইল ফোন কোম্পানির বিরুদ্ধে যায়, এমন একটা নিউজ আমি করেছিলাম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের আয়ের সবচেয়ে বড় খাত তখন কোম্পানিটি। ওয়েবসাইটে তখন আর কয়জন বিজ্ঞাপন দিতো! বেতনও অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছিলো। কথা প্রসঙ্গে একদিন আমি বলে ফেললাম, এ ধরনের খবর হয়তো না করলেও হতো। তৌফিক ভাই ধমক দেননি, লম্বা বক্তৃতাও না। শান্ত গলায় বললেন, "অনেক বছর পর, যখন তুমি সিনিয়র হবা আর কোনো জুনিয়র জিজ্ঞেস করবে, কয়টা পয়সার জন্য খবরটা দিলা না, তখন কী উত্তর দিবা?"

সেই একটি বাক্যে তিনি আমাকে একটি পুরো নৈতিক কাঠামো দিয়ে দিয়েছিলেন। সম্পাদকের কাজ কেবল খবর ছাপা নয়, ভবিষ্যতের সাংবাদিকদের সামনে নিজের জবাবদিহি ঠিক রাখা। 

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পরে মামলা আর ওয়েবসাইট বন্ধের মুখে পড়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলাও হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজের তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো একটা খবর সরাতে রাজি না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা হয়েছিল। ২০১৮ সালে সাইট কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিলো। ২০২৩ সালে ৩৫ দিন ওয়েবসাইট ডাউন ছিল। দুদকের মামলা প্রত্যাহার হয়েছে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে। আমার মনে হয়, সেই দৃঢ়তার শিকড় ছিলো ওই এক প্রশ্নেই। 

২০১৩ সালের শেষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে আরেকবার কাজ করতে গেলাম, কিন্তু ভিন্ন দায়িত্বে। দ্বিতীয় দফায় নিউজ কপির ওয়েব মেকআপ, তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, নিউজ জাজমেন্ট শিখলাম, জানলাম একজন নিউজ ম্যানেজার কীভাবে হতে হয়। এসব শিখেছি তারই নেতৃত্বে, তারই গড়ে দেওয়া নিউজরুমে, তারই নির্ধারিত মানদণ্ডে। সেই মান সবার ওপরে ছিলো, আর সেটা কাউকে মুখে বলে দিতে হতো না। নিউজরুমের বাতাসেই ছিলো।

নাক উঁচু? হ্যাঁ, কিন্তু…

পরিপাটি পোশাক, মেপে বলা কথা, প্রমিত উচ্চারণ, অকারণে একটা শব্দও না। তৌফিক ভাইকে প্রথমবার দেখলে বোঝা যেতো, এই লোক সময় নষ্ট করেন না। সাংবাদিক মহলে তার নামে একটা সমালোচনা ছিল: তিনি নাক উঁচু, কাউকে পাত্তা দেন না।

আমি তার সঙ্গে দুই দফায় কাজ করেছি। সমালোচনাটা পুরোপুরি ভুল না, দূরত্বের একটা দেয়াল তার চারপাশে গড়ে রাখা থাকতো বটে। কিন্তু আমার কাছে সেটা অবহেলা মনে হয়নি। তিনি মেপে কথা বলতেন, যা বিশ্বাস করতেন না তা ভান করে বলতেন না। যে মানুষ আমার একটা শব্দের উচ্চারণ নিজে যাচাই করেন, যিনি অনেক লোকের সামনে এক জুনিয়র রিপোর্টারের ঘাড়ত্যাড়া তর্ক শুনে নিজের মত বদলান, তিনি কাউকে পাত্তা দেন না, এটা মনে হয় বলা যাচ্ছে না। সোশাল মিডিয়াতে তার সহকর্মীরা এখন যে স্মৃতিচারণগুলো করছেন, কর্মীর সিদ্ধান্তের পাশে দাঁড়ানো, কঠিন সভায় "ও থাকবে" বলা ইত্যাদি,সেগুলোও একই কথা বলে।

তার পড়াশোনা আর বিশ্লেষণের ক্ষমতা নিয়ে আমি এক শব্দে বলতে পারি, তুখোড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়া, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রযোজক ও সঞ্চালক, বিশ্বব্যাংকের এক পরিদর্শন প্যানেলের প্রতিবেদনে সহ-লেখক। তৌফিক ভাইয়ের কাছে খবর শুধু একটা ঘটনা ছিলো না, সঙ্গে প্রসঙ্গ আর যাচাইয়ের ব্যাপারও থাকত।

সাংবাদিকতার মূল কথা বস্তুনিষ্ঠতা, সেখানে তিনি ছিলেন আপসহীন। সবার আগে খবর দেওয়ার তাড়া তারও ছিলো, কিন্তু দরকার হলে অন্যের পরে হলেও খবরটা ঠিক হতে হবে, এটাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। তার মানে এই না যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পিছিয়ে থাকতো। তিনি চাইতেন খবর যাচাই হোক, যত বেশি সম্ভব অ্যাঙ্গেল আর বিস্তারিত নিয়ে আসুক। আমার অভিজ্ঞতায়, এ কারণেই বেশির ভাগ বার্তাকক্ষে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সাইট খোলা থাকে। এমন আস্থা এক দিনে হয় না।

তিনি একরোখা ছিলেন, এটাও সত্যি। নিজে যা ঠিক মনে করতেন তাতে অনড় থাকতেন, ফলে বেশির ভাগ সময়ই স্রোতের উল্টো দিকে ছিলেন। কিন্তু যে জেদ তাকে প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে "আমার রিপোর্টার তো কনফার্ম করে নাই" বলিয়েছিল, একরোখা স্বভাবটাও সেখান থেকেই আসতো। দুটোকে আলাদা করা যায় না।

ভেতর থেকে দেখা বদল

প্রায় দুই দশক ধরে সাংবাদিকতায় থাকার কারণে আমার দেখার সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশের মিডিয়া কীভাবে বদলেছে। আমার মনে হয়, এই বদলের একটা বড় অংশের শুরু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর আর তৌফিক ইমরোজ খালিদী থেকে।

"পরদিনের পত্রিকা"র জায়গায় "এখনই"-র সংস্কৃতি এসেছে। ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে জানানো হবে, পাঠকও সেটাই আশা করে-এই অভ্যাস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর গড়েছে। আজ প্রায় প্রতিটা পত্রিকা আর টিভির নিজস্ব অনলাইন ডেস্ক, লাইভ আপডেইট, মোবাইল নিউজ অ্যালার্ট আছে। এর অনেকটাই ওই ধারার ফল।

শুধু দ্রুত নয়, যাচাই করা খবর, এটাই ছিলো নীতি। দেরিতে হলেও ঠিক খবর, যাতে পরে প্রত্যাহার করতে না হয়। সূত্রের নাম উল্লেখ করে খবর লেখার চর্চাও তৌফিক ভাই কঠোরভাবে চালু করেছিলেন। "সূত্র জানিয়েছে" ধরনের অস্পষ্ট লেখার চল এতে ধাক্কা খেয়েছিল।  

ল্যাপটপ দিয়ে রিপোর্টারকে স্পট থেকে লেখার সুযোগ দেওয়া তখনকার ঢাকার সাংবাদিকতায় আলাদা করে চোখে পড়তো, আর এখন তো মোবাইল ফোনেই রিপোর্টিং হয়। ইন্টারনেটে খবর পড়ার অভ্যাসও তিনি গড়ে দিয়েছিলেন। শিশুদের জন্য বাংলা ভাষার প্রথম ওয়েবসাইট 'কিডজ' আর ইউনিসেফের সঙ্গে 'হ্যালো' ছিলো নতুন ক্ষেত্র খোঁজার উদাহরণ।

এর সবটাই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। সব কৃতিত্ব একজন মানুষের না, সময়ও এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু সেই সময়ের জন্য প্রস্তুত একটা প্রতিষ্ঠান আর একজন সম্পাদক ছিলেন বলেই বদলটা সহজ হয়েছিল।

পাঠশালা

আমার কাছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর কখনোই শুধুমাত্র কর্মস্থল না, ছিল একটা স্কুল এবং আনডাউটেডলি, দ্য বেস্ট ওয়ান আই হ্যাভ এভার অ্যাটেন্ডেড । সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

তার কাছ থেকে শিখেছি, খবর কেবল দ্রুত হলে চলে না, নির্ভূল হতে হয়। ভীতিকর সময়ে সাংবাদিকতা মানে নিজের কাজটা ঠিকঠাক করে যাওয়া। বিজ্ঞাপনের টাকা বড় হলেও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তার চেয়ে বড়। আর একজন সম্পাদকের সবচেয়ে বড় কাজ নিজের রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ানো।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের কোনো এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তিনি বলেছিলেন, "আমরা মাথা নত করিনি।" অনেক বছর ধরেই তিনি তরুণদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা বলছিলেন। সেটা দেখে যেতে পারলেন না।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বিশ বছর হতে আর তিন সপ্তাহ বাকি। দুই দশক আগে যেই অক্টোবর মাসে তৌফিক ভাই নিউজরুম চালু করেছিলেন, কোন এক বছরের যেই একই মাসে তিনি বলেছিলেন "আমরা কখনোই ঘুমাই না", সেই মাসেই তিনি চলে গেলেন।

এখনো যখন কোনো জুনিয়র সহকর্মীর নিউজ কপি দেখি, তখন তার সেই প্রশ্নটা মনে পড়ে: "কী উত্তর দিবা?"

উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে যাবো, তৌফিক ভাই।

 

লেখক: ডেপুটি এডিটর, আলাপ