প্রিয় জোসে ডিনিস অ্যাভেইরো,
তোমার জন্মটাও তো ছিলো গরিব ঘরেই। বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে ঢুকলে। তারপর এক যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে ফিরে এলে নিজ দেশ পর্তুগালে। বেকার জীবনে শেষ পর্যন্ত মদের অভ্যাসটাই মাথা চাড়া দিলো। সাবেক সহকর্মী কিংবা বন্ধুবান্ধব, যখন যাদের থেকেই পেয়েছো, মদটা তুমি খেতেই।
ও হ্যাঁ, তোমরা তো আমাকে পৃথিবীতে আনতেই চাওনি। মনে আছে তোমার? তারপর চিকিৎসক রাজি না হওয়ায় সেটা আর পারলে না। না, আমি দোষ দিচ্ছি না। মাদেইরার ওই ছোট্ট শহরের অভাবের সংসারে তিন সন্তানের পর খাবারের জন্য হা করে থাকা আরেকটা মুখ কে-ই বা চাইতো!
ফুটবলের প্রতি ঝোঁক থেকেই মাত্র আট বছর বয়সে সুযোগ হলো স্থানীয় ক্লাব আন্দোরিনহায়। সেখানে তোমারও সুযোগ হলো। তোমাকে খেলোয়াড়দের কিট পরিষ্কারের কাজ করতে দেখে সতীর্থরা আমায় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো। তবে আমি রাগিনি, বরং নতুন উদ্যম নিয়ে বলটাকে ছুড়ে ফেলতাম জালে।
আর অন্যদিকে রোগ-শোকও পিছু ছাড়ছিলো না। ১৪ বছর বয়সে হার্টের জটিলতা ধরা পড়লো। বলা হলো ফুটবল ছাড়তে। এটা কি সম্ভব, বাবা বলো? ততক্ষণে যে বিশ্বজয়ের স্বপ্নে ডুবে গেছি আমি। সার্জারি হলো ঠিকঠাক, বেঁচে যাই সে যাত্রায়।
কিন্তু তুমি যে বেশি দিন থাকলে না! এতো কিসের তাড়া ছিলো তোমার? আমার সাফল্য দেখে হিংসে হচ্ছিলো বুঝি?
২০০৫ সাল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার কেবল দু’ বছর হয়েছে আমার। ঠিক এমন সময় চলে গেলে তুমি। কারণটা তুমি ভালোই জানো, অতিরিক্ত অ্যালকোহলে লিভারের ক্ষতি। সেদিন পণ করেছিলাম জানো, এখন পর্যন্ত কোনোদিন মদ ছুঁইনি।
এই মদটাই তোমাকে আমার থেকে দূরে রেখেছিলো। আমি তোমার সাথে কখনো ঠিকভাবে কথাও বলতে পারিনি, তোমাকে বুঝতেও পারিনি। ছোটবেলায় একবার আমি বলেছিলাম, ‘আমরা একসময়ে খুব বড়লোক হবো এবং আমাদের বড় একটা বাড়ি থাকবে!’ সেটা শুনে তুমি তো বিশ্বাসই করোনি। বলেছিলে- ‘এটা অসম্ভব, বাবা!’
সেই অসম্ভবকে সম্ভব অনেক আগেই করেছি। কিন্তু তুমি দেখছো তো আমায়? এতসব অর্জনে কতো কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে আমার জানো? অনমনীয় আত্মশক্তি, অক্লান্ত সাধনা আর অবিনাশী মানসিকতা, সব ক’টা পরীক্ষাই দিতে হয়েছে আমার। পরাজয়ের অন্ধকার ভেদ করে উঠে দাঁড়িয়ে লিখেছি এক অনিবার্য মহাকাব্য।
বড় কিছুর শুরুটা ছিলো সেদিনের ফ্রেন্ডলি ম্যাচে। স্পোর্টিং লিসবনের হয়ে যখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বাঘা ডিফেন্ডারদের খাবি খাওয়াচ্ছিলাম, তখনই হয়তো লেখা হয়েছিলো আমার ভাগ্য। ম্যাচ শেষে তো আমাকে দলে নিতে খেলোয়াড়েরা রীতিমতো অনুরোধ করেছিলেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে।
যাইহোক, সেই মাদেইরার ছোট্ট রোগা রোনালদো থেকে আজকের সিআর সেভেন। সাত নাম্বার জার্সিতে আমার দেশটার জন্য কি-না করেছি বলো? তুমিতো দেখেছো, আমার চেষ্টার কোনো কমতি ছিলো না! নিজের হয়ে কথা বলি, তাই সমাজের বাইনোক্যুলারে নাকি আমি অ্যারোগেন্ট! আমার তো আমি ছাড়া কেউ নেই, বলো?
দেশের হয়ে ২৩৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সর্বাধিক গোল। ২০১৬ সালে আমাদের ইউরো জয়, ২০১৯ সালে উয়েফা নেশনস লিগ জয়। অভিষেকের পর থেকে নিজের দেশকে প্রত্যেকটা বিশ্বকাপেই খেলানোর চেষ্টা করেছি। না, নিজের হয়ে বেশি বলছি না। কিন্তু এসবে কি আমার কোনো অবদান নেই? তবুও আমিই নাকি দলের বোঝা। কে জানে, হয়তো তাই!
আচ্ছা তুমি দেখেছিলে ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিরুদ্ধে আমার সেই হ্যাটট্রিক? ৩৩ বছর বয়সে দাঁড়িয়েও আমি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলাম সময়কে। কিন্তু এখন তো বয়সটা আরও বেড়েছে। ৪১ বছরে এসে না, আর পারিনি। বরং স্পেনের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে অশ্রুভেজা চোখে টানেল দিয়ে আমার ড্রেসিংরুমে ফিরে যাওয়ার দৃশ্যটাই যেন ফুটবলের ইতিহাসে একটা গভীর ক্ষত কিংবা আক্ষেপ হয়ে থাকলো।
তবে জানো, ট্র্যাজিক হিরোর তকমা নিয়ে আমি মোটেও অখুশি নই। কারণ আমি জানি, আমার জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষ তার অদৃশ্য পতাকার নিচে একত্রিত হয়েছে। কেউ আমার খেলা অনুকরণ করেছে, কেউ আমার উদযাপন আবার কেউ মন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে আমার জীবনশৃঙ্খল। আজ ‘সিউঊ’ যেন পুরো একটা প্রজন্মের আবেগের প্রতিধ্বনি। যখন এসব কিছুর কথা ভাবি, আমি শান্তিতে নিদ্রা যেতে পারি। তোমারও কি এমন হয়, বাবা?
তবে হ্যাঁ, দিনশেষে অনেক কিংবদন্তির মতোই পারিনি সেই সোনালি স্বপ্নটাকে ছুঁতে। তবুও আমার যাত্রাটাকে কখনো রঙহীন মনে হয়নি জানো! সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আমার এ যাত্রায় তুমি সঙ্গী হতে পারোনি। তবে আমি জানি, আমাকে তুমি সবসময়ই দেখছো।


ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো: মাদেইরা থেকে মহাকালের অনন্ত যাত্রা
