পুলিশের আগেই খুনিরা খুঁজে পেলেন ফাঁসির আসামিকে 

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন জামিন পেয়ে। কিন্তু মুক্তির পর টিকতে পারলেন না ২০ মাসও। পুলিশ খুঁজে পায়নি, কিন্তু খুনিরা ঠিকই খুঁজে নিলো টিটনকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ওত পেতে খাকা খুনিরা খুব কাছ থেকে গুলি করে নিশ্চিত করলো মৃত্যু।

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২২ পিএম

কুড়ি বছর কারাগারে, জীবনাবসান হতে পারতো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে। জামিনে বের হয়ে আসেন চব্বিশের অগাস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর।

কিন্তু মুক্ত পৃথিবীতে থাকতে বাঁচতে পারলেন না খুব বেশিদিন। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত হলেন তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।

জেল থেকে বের হয়ে আসার পর আদালতে হাজিরা না দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন টিটন। তাকে খুঁজছিল পুলিশ, খুঁজে বেড়াচ্ছিল প্রতিপক্ষের ঘাতকরাও।

অবশেষে খুনিদের কাছেই ধরা পড়ে গেলেন, রাস্তায় পড়ে থাকলো গুলিবিদ্ধ টিটনের রক্তাক্ত মরদেহ।

গত ১০ই নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে।

টিটন ও মামুন দুইজনই একসময় ছিলেন একই গ্যাংয়ের সদস্য, আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী।

ইমন ও মামুন দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি।

এই দুই হত্যা মামলায় টিটনের নাম না থাকলেও আরেক হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। জামিন পেয়ে লাপাত্তা হওয়ার পর থেকেই তাকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। জামিন পাওয়া অন্য সন্ত্রাসীদেরও সন্ধান চলছে।

কিন্তু ছয়মাসের ব্যবধানে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, আবার কি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনরা?

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্তঃকোন্দল বেড়ে যাওয়ার কারণেই খুনোখুনি হচ্ছে। তাই পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

“ফাইট বিটউইন ক্রিমিনালস অ্যান্ড পুলিশ একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে এরা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেটা কন্ট্রোল করতে হবে,” আলাপ-কে বলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা।

টিটন-এর গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড ও জামিন

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউ মার্কেট এলাকায় টিটন এবং তার ভাইদের রাজত্ব শুরু হয়।

শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন বিয়ে করেন টিটনের বোন শাহনাজ পারভীন লিনাকে। যার ফলে টিটন, তার ভাই মামুন এবং কিলার রসু মিলে একটি শক্তিশালী পারিবারিক অপরাধী বলয় তৈরি হয়। শুরু হয় তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।

টিটনকে ২০০১ সালের ২৬এ ডিসেম্বর তখনকার সরকার দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করে।

এরপর ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের এ সময় তার কাছ থেকে অবৈধ পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছিল।

জেলে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চাঞ্চল্যকর বাবর এলাহী হত্যা মামলায় টিটনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত।

এরপর থেকে তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে বন্দি ছিলেন।

তবে ২০২৪ সালের অগাস্টে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি মেলে তার। একই সময় কারাগার থেকে মুক্তি পান শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল হাসান ইমনও।

টিটনকে খুঁজে পায়নি পুলিশ

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তত ২৭জন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাদেরই একজন ছিলেন টিটন।

জামিনে থাকা অবস্থায় তাকে খুঁজছিল পুলিশ। 

“সে দীর্ঘদিন জেলে ছিল। ৫ই অগাস্টের পর ১৩ই অগাস্ট সে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর সে পালায় ছিল। আমরা কিন্তু তাকে ট্রেস করার চেষ্টা করেছি, পাই নাই,” আলাপ-কে বলেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস ) এসএন মো. নজরুল ইসলাম।  

পুলিশ টিটনকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে না পেলেও তার শত্রুরা ঠিকই খুঁজে পেয়েছিল।

পুলিশের আগেই খুনিরা খুঁজে পেয়ে ছিল টিটনকে

থ্রিলার অ্যাকশন

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। আলো-আঁধারির মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে হেঁটে নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন টিটন। এই তথ্য আগে থেকেই ছিল তার প্রতিপক্ষের কাছে।

শহীদ শাহনেওয়াজ হলের গেটের কাছে মোটরসাইকেলে অপেক্ষা করছিলেন ক্যাপ ও মাস্ক পরা দুইজন ব্যক্তি।

টিটন রেঞ্জের মধ্যে আসলেও অপেক্ষা করছিলেন তারা। আরও কাছে আসতেই একজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে গুলি ছোড়া শুরু করেন। চারটি শব্দ শোনা যায় এ সময়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গুলিবিদ্ধ টিটন মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারীর চলে যেতে গিয়েও আবার ফিরে এসে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে আরেকটি গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে।

এ সময় আশপাশের লোকজন হামলাকারীদের ধাওয়া দিলে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা।

নিউ মার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোল্লা শাহাদাত বলেন, “খুব কাছ থেকে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ থেকে ছয়টি গুলি করা হয়। এরপর দ্রুততম সময়ে পালিয়ে যায় তারা।”

গুলিবিদ্ধ টিটনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২৭ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলেও জানান তিনি।

তবে এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে বুধবার দুপুরে আলাপ-কে জানিয়েছেন নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আইয়ুব।

বাড়ছে খুনের ঘটনা

কেন এই হত্যা? এই প্রশ্নের উত্তর নেই পুলিশের কাছে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আমরা মনে করছি তাদের লেভেলেই সন্ত্রাসী যারা আন্ডারওয়ার্ল্ড, তাদের লেভেলেই কেউ না কেউ এই ঘটনাটা ঘটাইছে। এখনো ডিটেক্ট করতে পারি নাই।”

নিউ মার্কেট থানার ওসি মো.আইয়ুব আলাপ-কে বলেন, “আমরা সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছি। সেগুলো আমাদের বিভিন্ন টিম বিশ্লেষণ করছে। তবে এখনো হত্যাকারী শনাক্ত করা যায়নি।”

এদিকে এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনেই ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

গত জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই তিন মাসে ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড হয়। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ এবং জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটে ৩৬টি।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৮৫৪টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর ফেরুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে খুন হয় ৩১৭টি।

চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটে। যার সবশেষটি টিটন হত্যা।

তবে এখনো উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু হয়নি বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা। “এই ধরনের হত্যা চলমান প্রক্রিয়া। তাই পুরো বিষয়ের ওপর নজরে রাখতে হবে।”