স্টেডিয়ামের আলো গ্যালারির এক কোণে এসে থমকে ছিল। পাশাপাশি বসে ব্রাজিলের পাঁচ পুরোনো ঋতু। রোনালদো, রোনালদিনহো, কাফু, কাকা, রিভালদো।
এতো আলোর নিচে মাঠে নতুন ব্রাজিল। হলুদ জার্সি, নীল শর্টস, পরিচিত পতাকা, চিরচেনা বল।
দশ মিনিট পেরোতে না পেরোতেই রাফিনহা বল জালে পাঠিয়েছিলেন। তারপর সহকারী রেফারির পতাকা উঠল। কয়েক মিনিট পর আবার তাঁর সামনে জায়গা খুলল। গোলের মুখে পৌঁছে বলটি জালের বদলে পাশের বাতাসে মিলিয়ে গেল। পতাকা উঠল আবারও।
ফুটবলে এমন হয়। এক ম্যাচে কত বলই তো ভুল ঠিকানায় যায়। কত গোল জালে গিয়েও স্কোরবোর্ডে ওঠে না। কত সুন্দর আক্রমণ এক টুকরো পতাকার ভাঁজে ভেঙে পড়ে।
তবু সেই মুহূর্তে ক্যামেরা যদি নিচের মাঠ থেকে একটু ওপরে উঠত, দেখা যেত-গ্যালারিতে বসে আছেন এমন কিছু মানুষ, যাঁদের পায়ের কাছে একদিন বল নিজেকে সঁপে দিতো সুন্দরের দায়ে।
একই বল, একই হলুদ জার্সি, একই দেশের পতাকা।
শুধু সময় আলাদা।
রোনালদো নাজারিও বল নিয়ে ছুটলে মনে হতো, পৃথিবী মুহূর্তের জন্য মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম ভুলে গেছে। দু’জন, তিনজন, কখনো চারজন ডিফেন্ডার তাঁর সামনে দাঁড়ালেও তাঁর শরীরের ভেতরে তখন অন্য এক অঙ্ক চলত। কাঁধের সামান্য দোল, পায়ের পাতায় একটুখানি স্পর্শ, তারপর তিনি চলে যেতেন। পেছনে পড়ে থাকত ঘাস, প্রতিপক্ষ আর অপার বিস্ময়!
রোনালদিনহোকে দেখে মনে হতো, ফুটবল তাঁর পেশা নয়। বিকেলের ফুর্তি। তিনি ডিফেন্ডার কাটাতেন এমনভাবে, যেন পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে দুষ্টুমি করছেন। নো-লুক পাস, এলাস্টিকো, অদ্ভুত কোণের ফ্রি-কিক—সবকিছুর মধ্যে এমন এক শিশুসুলভ আনন্দ ছিল যে, তাঁকে দেখে মনে হতো এই ঘাস-মাটির দুনিয়ায় ফুটবল খেলার চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে!
কাফুর ডান প্রান্ত ধরে দৌড়ে ওপরে উঠে যাওয়া ছিলো যেন কোনো পুরোনো নদীর কালান্তরের স্রোত। কাকা যেন সন্ধ্যার আলো ভেজা রাস্তা। রিভালদোর বাঁ পা ছিল নীরব ঘরে রাখা ধারালো অস্ত্র।
তাঁরা কেবল বড় খেলোয়াড় ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন এক জাতির শরীরী উচ্চারণ।
ব্রাজিলের ফুটবলকে সাম্বা বলা হয় কেন—তার উত্তর কোনো একটি স্টেপওভারে নেই। নেই কোনো গোলেও। সাম্বা গোল করার পর হাত নেড়ে নাচার নাম নয়, প্রতিপক্ষকে উপহাস করা ড্রিবলও নয়।
সাম্বা ব্রাজিলের শরীরের স্মৃতি।
তার শুরু মারাকানার আলোয় হয়নি, হয়নি কোনো বিশ্বকাপ ট্রফির পাশে। তার শুরু ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব আটলান্টিক উপকূলে, বাহিয়ায়—সালভাদরের পাশের অল সেন্টস বে ঘিরে থাকা রেকনকাভোর আখখেত, বন্দর আর ঘন কালো ইতিহাসে।
সেখানে একসময় আটলান্টিকের ওপার থেকে শিকল পরিয়ে আনা আফ্রিকান মানুষের শ্রমে গড়ে উঠতো ঔপনিবেশিক শাসকের সম্পদ। নাম, ঘর, মাটি কেড়ে নেওয়া সেই মানুষদের উত্তরসূরিরা হাততালি, ঢোল আর বৃত্ত করে দাঁড়ানো শরীরের ভেতর বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এক ছন্দ।
সেই ছন্দে ছিল দুঃখ, ছিল জেদ, ছিল বেঁচে থাকার অধিকার।
সাম্বা তাই কাঁদার বিপরীত নয়।
সাম্বা কাঁদতে কাঁদতেই নাচা।
রেকনকাভোর সেই সাম্বা দে রোদা পরে বন্দর পেরিয়ে রিওতে গেছে, শহুরে সাম্বার শরীরে নতুন রূপ নিয়েছে। কার্নিভালের আলোয় উঠেছে। শ্রমিকের শরীর, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় আচার আর রাতের উল্লাসে মিশে গিয়ে একদিন তা ব্রাজিলের মুখ হয়ে উঠেছে।
তারপর ফুটবল সেই মুখ চিনেছে।
সাম্বা আর গিঙ্গা এক জিনিস নয়। একই শরীরের দুই স্মৃতি। গিঙ্গা হলো কোমরের দোল, পায়ের প্রতারণা, চোখের ভুল ইশারা—সোজা পথে না হেঁটে প্রতিপক্ষকে ভুল পথে পাঠিয়ে দেওয়ার শিল্প।
ইউরোপ ফুটবলকে রেখা শিখিয়েছে, ব্রাজিল শিখিয়েছে বাঁক।
ইউরোপ ফুটবলকে পরিকল্পনা দিয়েছে, ব্রাজিল শিখিয়েছে, পরিকল্পনার মাঝেও হঠাৎ অবাধ্য হয়ে ওঠা যায়।
বল পায়ে শুধু সামনে এগোনো যায় না, তাকে নাচানোও যায়। প্রতিপক্ষকে শুধু হারানো যায় না, তার শরীরের ওপর তার নিজের বিশ্বাসও এক মুহূর্তের জন্য নষ্ট করে দেওয়া যায়।
এই জন্য ফুটবল ব্রাজিলের কাছে ঋণী।
পেলে ফুটবলকে সূর্যের মতো উজ্জ্বল করেছিলেন। গারিঞ্চা দেখিয়েছিলেন, বেঁকে থাকা পা-ও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পথের জন্ম দিতে পারে। সক্রেটিসের বুদ্ধিদীপ্ত উদাসীনতা, জিকোর শৃঙ্খলার ভেতরকার শিল্প, রোমারিওর চোখে শিকারির ক্ষুধা- এ সব মিলেই তো ব্রাজিল।
তারপর একদিন রোনালদো এলেন ঝড় হয়ে, রোনালদিনহো উৎসব হয়ে। একজনের দৌড়ে মনে হতো, মানবশরীরের সীমা কোথায় শেষ হয় কেউ জানে না। অন্যজনের হাসিতে মনে হতো, ফুটবল এখনও মানুষের সবচেয়ে সুন্দর অবসর।
এই মানুষগুলোই সেদিন গ্যালারিতে বসেছিলেন।
তারা নিশ্চয়ই বর্তমান ব্রাজিলকে নিজেদের নকল হতে দেখতে চান না। ইতিহাসের অবিকল অনুকরণ হলে মাঠ জাদুঘর হয়ে যায়। রাফিনহা রোনালদিনহো হবেন না। ভিনিসিয়ুস রোনালদোর পুনর্জন্ম নন। কুনহার ওপর রোমারিওর ছায়া চাপিয়ে দেওয়াও নিষ্ঠুরতা।
নতুন ব্রাজিলকে নতুনই হতে হবে। কিন্তু নিজের নাম ভুলে নয়।
কার্লো অ্যানচেলত্তি খলনায়ক নন। আধুনিক ফুটবলে কাঠামো লাগে। প্রেসিং লাগে। রক্ষণে ফিরতে হয়। ট্রানজিশন বুঝতে হয়। ইউরোপের সঙ্গে লড়তে হলে ইউরোপের ভাষাও জানতে হয়। ব্রাজিল একজন ইতালীয় কোচের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ তুলে দিয়েছে—এতে লজ্জা নেই।
তবু প্রতীকের ভেতরও তো এক ধরনের হাহাকার থাকে।
একদিন পৃথিবী ব্রাজিলের কাছে জানতে চাইত—ফুটবলকে কীভাবে সুন্দর করা যায়?
আজ ব্রাজিল ইউরোপের সবচেয়ে সফল কোচদের একজনের কাছে জানতে চাইছে—ফুটবলকে কীভাবে নিরাপদ করা যায়?
দুই প্রশ্নের মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটি দূরত্ব আছে। সেই দূরত্বের নাম হয়তো ভয়। হয়তো ব্রাজিল এখন আর পুরোপুরি বিশ্বাস করে না, নিজের শরীরের পুরোনো ছন্দ বিশ্বকাপ জেতানোর জন্য যথেষ্ট।
সাম্বা হারানো মানে ড্রিবল কমে যাওয়া নয়, গোল না পাওয়াও নয়। সাম্বা হারানো মানে হারও নয়। সাম্বা হারানো মানে—বল পেয়ে একজন খেলোয়াড় আর এক মুহূর্তের জন্যও কোচের বোর্ডে আঁকা রেখার বাইরে যেতে না চাওয়া। সাম্বা শৃঙ্খলার বিপরীত নয়। সাম্বা ছিল শৃঙ্খলার ভেতরে স্বাধীনতা।
হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল শেষ পর্যন্ত তিন গোল করেছে। কুনহার দুই গোল, ভিনিসিয়ুসের একটি। স্কোরবোর্ডে স্বস্তি ফিরেছে। সামনে স্কটল্যান্ড। সামনে আরও কঠিন রাত। সামনে বিশ্বকাপের সেই পুরোনো দাবি-জিততে হবে।
জিতুক ব্রাজিল, অবশ্যই জিতুক।
কিন্তু জয়ের পথে কোথাও একজন খেলোয়াড় যেন হঠাৎ বলটিকে একটু বেশি সময় পায়ের কাছে রাখেন। কাউকে কাটিয়ে ওঠেন শুধু জায়গা বানানোর জন্য নয়, বিস্মিত করার জন্য। দৌড়ের মাঝখানে শরীর দোলান, আর স্টেডিয়ামের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরোনো কোনো ঢোল বেজে ওঠে।
কারণ ব্রাজিলের সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক কেবল ট্রফির নয়, ব্রাজিল ফুটবলকে শিখিয়েছিল, খেলা কখনো কখনো মুক্তির শরীরী রূপও হতে পারে।
সেদিন ফিলাডেলফিয়ার স্কোরবোর্ডে ছিল ব্রাজিল ৩-০ হাইতি।
গ্যালারিতে বসে ছিল সাম্বা। মাঠে কি কেউ তাঁর সুর শুনেছিল?



