ফুটবল যেভাবে পৃথিবীজুড়ে উদ্বাস্তুদের গল্প নতুন করে লিখছে

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

বিশ্বকাপের মঞ্চে জার্মানির হয়ে মাঠে নামলেন আন্তোনিও রুডিগার। বদলি হিসেবে নামা এই ডিফেন্ডারের জন্য মুহূর্তটা ছিলো সাধারণ একটি ম্যাচের অংশ, কিন্তু তার জীবনের পেছনের গল্পটি ছিলো অসাধারণ এবং গভীর।

তার পরিবার এসেছে সিয়েরা লিওনের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের বাস্তবতা থেকে। সেই সময় দেশজুড়ে সহিংসতা, মৃত্যু আর অনিশ্চয়তার মধ্যে টিকে থাকা ছিলো কঠিন এক সংগ্রাম। পরিবারকে বাঁচাতে রুডিগারের বাবা-মা ইউরোপে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এটি কোনো সহজ যাত্রা ছিলো না। দীর্ঘ পথ, বিপজ্জনক পরিস্থিতি এবং প্রতিটি মুহূর্তে বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা তাদের সঙ্গী ছিলো।

রুডিগারের পরিবারের এক সদস্য পরে তাকে সেই সময়ের গল্প শোনান। তারা পূর্বাঞ্চলীয় নিজ জেলা থেকে রাজধানীর দিকে দীর্ঘ পথ হেঁটে নিরাপত্তার খোঁজে এগিয়ে যান। পথে নানা বাধা, ভয় আর মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যে তারা টিকে থাকার চেষ্টা করেন।

সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার একটি ছিলো শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিদ্রোহীদের হাত থেকে রক্ষা করতে এক চাচা শিশুদের চালের বস্তার ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন বলে জানা যায়। কখনো কখনো তারা মৃতের মতো পড়ে থেকেছেন, শুধু যাতে গুলির লক্ষ্য না হন বা জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া না হয়।

এই কঠিন পথ পেরিয়ে রুডিগারের পরিবার শেষ পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছাতে সক্ষম হয় এবং পরে তারা জার্মানিতে আশ্রয় পায়। বার্লিনে জন্ম হয় রুডিগারের, যিনি পরবর্তীতে বিশ্বের শীর্ষ ফুটবল লিগে জায়গা করে নেন।

তিনি ছোটবেলায় একটি উদ্বাস্তু কেন্দ্রে বড় হয়েছেন। সেখানে ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে একসঙ্গে বহু পরিবারকে থাকতে হতো। এই অভিজ্ঞতা তার মানসিকতা গড়ে দেয়। তিনি বুঝতে শিখেন, জীবনে কিছুই সহজে আসে না, প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকে পরিশ্রম, ত্যাগ আর ধৈর্য।

আন্তোনিও রুডিগার (ছবি: সংগৃহীত)

আজ তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত নাম হলেও নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি। তার মতে, এই জীবন তাকে দায়িত্ববোধ ও বাস্তবতা শিখিয়েছে।

একই ধরনের গল্প আরও অনেক ফুটবলারের জীবনে দেখা যায়। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন, যাদের শুরু হয়েছিল যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি বা উদ্বাস্তু জীবনের মধ্য দিয়ে।

কানাডার অধিনায়ক আলফন্সো ডেভিসের জীবনও এমনই এক অনুপ্রেরণার গল্প। তার পরিবার লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে ঘানার একটি উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেয়। পরে কানাডা তাদের গ্রহণ করে নতুন জীবন দেয়। ডেভিস স্মরণ করেন, প্রথমবার স্কুলে যাওয়া, বন্ধু তৈরি করা এবং পছন্দের খেলাটি ফুটবল খেলতে পারার সুযোগ পাওয়া ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি। নতুন দেশ তাকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, দিয়েছে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগ।

এমন আরও অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে এসে নতুন দেশে জীবন শুরু করেছেন। কেউ আফ্রিকার শরণার্থী শিবিরে বড় হয়েছেন, কেউ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে ইউরোপে নতুন ভবিষ্যত খুঁজেছেন, আবার কেউ ছোটবেলায় পরিবার হারিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন সমাজে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে তাদের উপস্থিতি তাই শুধু ক্রীড়া দক্ষতার পরিচয় নয়, বরং মানবিক ইতিহাসেরও অংশ।

আলফন্সো ডেভিস (ছবি: সংগৃহীত)

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশু বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছে। তাদের অনেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, সহিংসতার শিকার, মানসিক আঘাত নিয়ে বড় হচ্ছে এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেও ফুটবল তাদের জন্য এক ধরনের আশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এই খেলাই অনেককে নতুন পরিচয় দিয়েছে, নতুন জীবন দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি বিশেষ উদ্যোগও সামনে এসেছে, যেখানে উদ্বাস্তু পটভূমি থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি প্রতীকী দল গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে, সুযোগ পেলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবন থেকেও সফল ভবিষ্যত তৈরি করা সম্ভব।

তবে এই আলোচনার আরেকটি দিকও আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বাস্তু ও অভিবাসীদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বেড়েছে। অনেকের মতে, সহানুভূতির জায়গা কিছুটা সংকুচিত হয়েছে।

রুডিগার নিজেও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তার মতে, কিছু মানুষের নেতিবাচক আচরণের কারণে পুরো একটি জনগোষ্ঠীকে বিচার করা ঠিক নয়। তিনি মনে করেন, অধিকাংশ মানুষই নতুন দেশে গিয়ে শিখতে চায়, কাজ করতে চায় এবং সমাজে অবদান রাখতে চায়।

তার ভাষায়, যদি একজন ব্যক্তি ভুল করে, তার দায় পুরো গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।

অন্যদিকে, কানাডার মতো দেশগুলোতে অভিবাসন এবং শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। কোথাও বাড়ছে, কোথাও আবার কমছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে।

এই বৈশ্বিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ফুটবল একটি ভিন্ন বার্তা দেয়।

যখন রুডিগার, ডেভিস বা তাদের মতো আরও খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপের মাঠে নামেন, তারা শুধু গোল বা জয় নিয়ে খেলেন না। তারা তাদের জীবনের পেছনের বাস্তবতাকেও প্রতিনিধিত্ব করেন।

তারা মনে করিয়ে দেন, সুযোগ পেলে একজন মানুষ নিজের ভাগ্য বদলাতে পারে। আর সেই সুযোগই অনেক সময় পুরো একটি জীবনের গল্পকে নতুন করে লিখে দেয়।