১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে কলম্বিয়াকে অনেকেই সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নদের তালিকায় রেখেছিলেন। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি তখন দুর্দান্ত ছন্দে ছিলো। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তারা শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে ৫-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলো।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপ কলম্বিয়ার জন্য শুধু একটি ক্রীড়া ব্যর্থতার গল্প হয়ে থাকেনি। এটি পরিণত হয়েছিলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ঘটনার সূচনায়।
সেই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার আন্দ্রেস এসকোবার।
এখনো তার নাম উচ্চারিত হলে ফুটবলপ্রেমীদের মনে ভেসে ওঠে প্রতিভাবান এক খেলোয়াড়ের ছবি, যার জীবন থেমে গিয়েছিলো মাত্র ২৭ বছর বয়সে। তার মৃত্যুকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছিলো, তার সবকটির উত্তর এখনো মেলেনি।
স্বপ্ন নিয়ে শুরু, হতাশায় শেষ
১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিলো অনেক। দেশটির ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বাস করতেন, এবার হয়তো বিশ্বমঞ্চে বড় কিছু অর্জন করবে তাদের দল।
কিন্তু বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন।
প্রথম ম্যাচে রোমানিয়ার কাছে ৩-১ গোলে হারের পরই চাপে পড়ে যায় দলটি। এরপর আসে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে জীবন-মরণের ম্যাচ।
২২ জুন, ক্যালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের ৩৫তম মিনিটে ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা পরবর্তীতে ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন আন্দ্রেস এসকোবার। কিন্তু বলটি তার পায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে নিজের জালেই ঢুকে যায়।
ফুটবলে এটিকে বলা হয় আত্মঘাতী গোল।
স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শক বিস্মিত হয়ে যান। কলম্বিয়ার খেলোয়াড়রাও হতবাক হয়ে পড়েন।
শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই পরাজয়ের ফলে কার্যত বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যায় কলম্বিয়া।
যে দলটিকে টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট ধরা হচ্ছিলো, তারা গ্রুপ পর্বের শেষেই বিদায় নেয়।
হুমকি আর চাপের মধ্যে দিনগুলো
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে।
খেলোয়াড়, কোচ এবং দল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, অনেকেই হুমকি এবং ভয়ভীতির মুখেও পড়েছিলেন।
সেই সময়ের কলম্বিয়া ছিলো সহিংসতা, মাদক চক্র এবং অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাবের মধ্যে থাকা একটি দেশ। ফুটবলেও সেই প্রভাব কম ছিলো না।
বিশ্বকাপের ব্যর্থতার পর অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন, অন্তত কিছুদিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যেতে। কিন্তু আন্দ্রেস এসকোবার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।
তার বোন মারিয়া এসথারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসকোবার বলেছিলেন, তিনি দেশে ফিরে মানুষের সামনে দাঁড়াতে চান।
বিশ্বকাপ শেষে কলম্বিয়ার একটি সংবাদপত্রে লেখা এক নিবন্ধে তিনি দলের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেছিলেন। তবে লেখার শেষ অংশে ছিলো আশাবাদের সুর।
তিনি লিখেছিলেন, "শিগগিরই দেখা হবে। কারণ জীবন এখানেই শেষ নয়।"
কেউ তখন ভাবতেও পারেননি, কয়েকদিন পরই এই কথাগুলো তার শেষ জনসম্মুখের বার্তা হয়ে থাকবে।
সেই রাত
১৯৯৪ সালের ২ জুলাই।
বিশ্বকাপ থেকে ফেরার পর প্রথমবারের মতো বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে বের হয়েছিলেন আন্দ্রেস এসকোবার।
কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরের একটি নাইটক্লাবে সময় কাটাচ্ছিলেন তিনি।
সেখানে উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি তাকে নিয়ে কটাক্ষ করতে শুরু করেন বলে পরে জানা যায়।
রাত গভীর হওয়ার পর ক্লাবের পার্কিং এলাকায় আবারও তাদের মুখোমুখি হন এসকোবার।
এরপর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলির শব্দ শোনা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারীরা গুলি করার সময় বারবার "গোল" শব্দটি উচ্চারণ করছিলো।
গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয় এসকোবারকে। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় একজন ফুটবলারের জীবন।
আসল কারণ কি ছিলো?
হত্যাকাণ্ডের পরদিন হাম্বার্তো কাস্ত্রো মুনিওস নামে এক ব্যক্তি হত্যার দায় স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর কখনো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি।
আন্দ্রেস এসকোবার কি সত্যিই সেই আত্মঘাতী গোলের কারণে নিহত হয়েছিলেন?
নাকি এর পেছনে ছিলো আরও জটিল কোনো কারণ?
বহু গবেষক এবং সাংবাদিকের মতে, ঘটনাটি শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলো না। বরং তখনকার কলম্বিয়ার সামাজিক ও অপরাধজগতের বাস্তবতার সঙ্গেও এর যোগ ছিলো।
সে সময় দেশটির ফুটবলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছিলো বিভিন্ন মাদক চক্র। মাঠের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলো অর্থ, প্রভাব এবং অপরাধী স্বার্থ।
ফলে এসকোবারের মৃত্যু অনেকের কাছে একটি আত্মঘাতী গোলের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সেই অস্থির সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
যে গল্প এখনো ভুলতে পারেনি ফুটবল
তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
তবু আন্দ্রেস এসকোবারের নাম আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি।
কারণ তার গল্প শুধু একটি খেলোয়াড়ের মৃত্যুর গল্প নয়।
এটি দেখিয়ে দেয়, কখনো কখনো খেলাধুলার বাইরের বাস্তবতা কতটা নির্মম হতে পারে।
একজন ফুটবলার মাঠে একটি ভুল করেছিলেন। এমন ভুল পৃথিবীর অসংখ্য ফুটবলারই করেন। কিন্তু সেই ভুলের পরিণতি যে এত ভয়াবহ হতে পারে, তা কল্পনাও করা কঠিন।
১৯৯৪ সালের সেই বিশ্বকাপ আজ অনেকের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে। অসংখ্য ম্যাচ, গোল এবং চ্যাম্পিয়নের গল্পও সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে এসেছে।
কিন্তু আন্দ্রেস এসকোবারের গল্প এখনো বেঁচে আছে।
কারণ এটি শুধু ফুটবলের গল্প নয়, এটি এমন এক ট্র্যাজেডির গল্প, যা আজও বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয় যে খেলার ফলাফল কখনোই মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না।



