জেন-জির জন্য কি আরেকটা ‘ফ্রেন্ডস’ সিরিজ বানানো সম্ভব
দুই দশক পরও রস, রেইচেল, জোয়ি, ফিবিরা জনপ্রিয় নতুন প্রজন্মের কাছে। কিন্তু তাদের মতো আরেক দল বন্ধুকে পর্দায় এনে সেই একই ম্যাজিক তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে কেন?
তানজিলা রহমান
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৮ পিএমআপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম
১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু, শেষ হয় ২০০৪ সালে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ দর্শক দেখেছিলেন দশ সিজনের সিরিজটির ফাইনাল এপিসোড।
নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে একটা ছোট্ট কফিশপ, নাম তার সেন্ট্রাল পার্ক। কমলা রঙের সোফায় বসে আছে তিন বন্ধু—মনিকা, ফিবি আর চ্যানলার। পাশের চেয়ারে হাত পা ছড়িয়ে বসে তাদেরই আরেক বন্ধু জোয়ি।
খানিক বাদেই সেখানে উপস্থিত হয় সদ্য ডিভোর্স হওয়া রস। কিন্তু সে আবারও বিয়ে করতে চায়, একা থাকা তার সয় না! রস বল উঠলো “আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি সিঙ্গেল, ওকে?” (আমি সিঙ্গেল থাকতে চাই না)। “আই জাস্ট…আই জাস্ট ওয়ান্ট টু বি ম্যারেইড অ্যাগেইন!” (আমি আবার বিবাহিত হতে চাই)।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটলো ম্যাজিক!
ক্যাফের দরজা খুলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢোকে ধবধবে সাদা বিয়ের গাউন গায়ে এক তরুণী। মাথায় লম্বা ভেইল, হাতে ভেজা ফুলের তোড়া। নাম তার রেইচেল গ্রিন।
বোঝাই যাচ্ছে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসা। পুরো কফিশপ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ। আর তখনই দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে চ্যানলার বলে ওঠে, “অ্যান্ড, আই জাস্ট ওয়ান্ট আ মিলিয়ন ডলারস!” (আর, আমার শুধু চাই এক মিলিয়ন ডলার!)।
‘ফ্রেন্ডস’ টিভি সিরিজের প্রথম এপিসোডের এই দৃশ্য দেখার পর দর্শক আর শুধু দর্শক থাকেনি, হয়ে উঠে ভক্ত। এক পর্ব শেষ হওয়ার পরই আরেক পর্ব, তারপর আরেকটি। এভাবেই এগিয়ে গেছে ছয় বন্ধুর গল্প, যাদের বয়স মেরেকেটে ২৫ বছর।
হাসি, কান্না, প্রেম, বিচ্ছেদ আর তাদের নানারকম পাগলামির সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছেন দর্শকরা। রীতিমতো ডুবে গেছে ‘ফ্রেন্ডস’-এর জগতে।
সেই ১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু। শেষ হয় ২০০৪ সালে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ দর্শক দেখেছিলেন দশ সিজনের সিরিজটির ফাইনাল এপিসোড।
দুই দশক আগে শেষ, তবুও এখনো সমানতালে জনপ্রিয়। এর মাঝে চলে এসেছে নতুন প্রজন্ম। তারাও ‘ফ্রেন্ডস’-এর চরিত্র ও গল্পের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পান।
রেইচেলের হেয়ারস্টাইলের নামই ছিলো ‘দ্য রেইচেল’ আর তার পরনে 'স্লিপ ড্রেস' তখন জনপ্রিয় ট্রেন্ড হয়ে ওঠে। আর জোয়ির ‘হাও ইউ ডু’ইন?’ তো টেলিভিশন সিরিজের অন্যতম জনপ্রিয় সংলাপ!
বাইশ বছর আগে শেষ হয়েছে, তার আগে আরও দশ বছর ধরে চলেছে। কিন্তু এই ২০২৬ সালে এসেও জেন-জির কাছে জনপ্রিয় ‘ফ্রেন্ডস’।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জেন-জির পছন্দের সিনেমা ও টিভি অনুষ্ঠানের তালিকায় ১৬তম অবস্থানে ছিলো সিরিজটি।
কিন্তু জেন-জির জন্য কি এমন আরেকটি ‘ফ্রেন্ডস’ তৈরি করা সম্ভব?
সম্প্রতি জেন-জির যাপিত জীবন আর বন্ধুত্ব নিয়ে ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো বেশ কয়েকটি সিরিজ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
'ফ্রেন্ডস'-এ যেমন হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়েই তুলে আনার হয়েছে চরিত্রগুলোর জীবনের নানা টানাপোড়েন। একইভাবে নতুন সিরিজগুলোতে চেষ্টা করা হয়েছে জেন-জির প্রেম, বন্ধুত্ব, পেশা ও ব্যক্তি জীবনের নানা সংকট তুলে ধরার। কিন্তু এখনও কোনো সিরিজ হালে পানি পায়নি।
বদলে গেছে বিনোদনের মাধ্যম
নব্বইয়ের দশকে মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো টেলিভিশন, রেডিও। ইন্টারনেট তখনও হাতের মুঠোয় আসেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো চিন্তার বাইরে।
টেলিভিশনের সামনে বসে পছন্দের অনুষ্ঠান বা সিনেমা দেখাই ছিলো বিনোদনের অবলম্বন। শুধু একটি কল্পকাহিনী নিয়েই ‘ফ্রেন্ডস’ শুরু হয়নি, বরং সিরিজটির চরিত্রগুলোর মধ্যে দর্শকরা খুঁজে পেয়েছিলেন নিজেকেই।
চাকরির খোঁজে দিশেহারা রেইচেলকে দেখে দর্শক অনুভব করে বেকারত্বের অভিশাপ। রসের একের পর এক বিব্রতকর মুহূর্তে অন্যদের হাসি-ঠাট্টা দেখে নিজেদের অনেক ভুল-ভ্রান্তি আর তেমন বড় হয়ে উঠতো না হয়তো।
ফিবিকে দেখে মানুষ বুঝতে পারে, অন্যরকম হওয়া দোষের কিছু না। আর সবশেষে সিরিজটি মানুষের কাছে যে বার্তা পৌঁছে দেয় তা হলো, জীবনে যত বাধাই আসুক না কেনো, ভালো সঙ্গ থাকলে সবই কাটিয়ে ওঠা যায়।
কিন্তু হাল দুনিয়ার বিনোদনের মাধ্যম এখন আর ৯০ দশকের মতো 'লিনিয়ার' অর্থাৎ একরৈখিক না। আছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যমের মতো নানা বিকল্প। তাই দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন বটে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাক্টিভেট’-এর একটি রিপোর্ট বলছে, ৪৩ শতাংশ জেন-জি ইউটিউব বা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বেশি পছন্দ করেন। পেইড স্ট্রিমিং পছন্দ করেন ৩৭ শতাংশ এবং প্রচলিত টেলিভিশন পছন্দ করেন মাত্র ১২ শতাংশ।
তার মানে হলো কিছু ভালো না লাগলে দর্শকের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার সামনে বিকল্প কনটেন্ট নিয়ে হাজির হবে।
এপিসোডের সংখ্যাও এখানে একটা ব্যাপার। ‘ফ্রেন্ডস’-এর সময় টেলিভিশন সিরিজের একটি সিজনে কমপক্ষে ২০টি এপিসোড থাকতো। তাই দর্শকরা চরিত্রগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ যাত্রার সুযোগ পেতেন। ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠতেন বন্ধুত্ব, প্রেম, ঝগড়া ও ব্যক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে। চরিত্রগুলো হয়ে যেতো চেনা, কার কী পছন্দ-অপছনন্দ, কাকে কী 'ট্রিগার' করতে পারে, সব জানা। অপেক্ষা থাকতো এই এপিসোডে কী হবে।
এখনকার ‘ফ্রেন্ডস’-ধাঁচের সিরিজগুলোর প্রতিটি সিজনে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি পর্ব থাকে। চরিত্রগুলো থেকে যায় পর্দাতেই। মানুষের মনে আর জায়গা হয় না।
গল্প লিখছেন অন্য প্রজন্মের মানুষ
‘ফ্রেন্ডস’ হাস্যরসাত্মক সিরিজ বা সিটকম। বন্ধুদের মধ্যে কথপোকথন ও ঘটনাপ্রবাহ লেখার সময় যারা লেখক ছিলেন তারা তখনকার দর্শকদের প্রত্যাশা আঁচ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু জেন-জিদের নিয়ে তৈরি সিটকমের বড় সমস্যা হলো যারা গল্প লিখছেন, তাদের বেশিরভাগই এই প্রজন্মের না।
বিনোদন সাংবাদিক ম্যাক্স গাওয়ের মতে, জেন-জি প্রজন্মের লেখকরা এখনো নিজেদের গল্প বলার মতো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি।
‘ফ্রেন্ডস’-এর লেখকদের বয়স সিরিজের চরিত্রগুলোর বয়সের থেকে বেশিই ছিলো, কিন্ত তারা ওই সময়ের তরুণদের জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এখনকার সংস্কৃতিও বদলে যাচ্ছে অনেক দ্রুত। সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটের প্রভাব, সম্পর্কের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক নানা পরিবর্তনের কারণে জেন-জির ভাষা, চিন্তাভাবনা ও আচরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে এই প্রজন্মের জীবনকে পর্দায় তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেন-জির মতো কথা বলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে কিছু সিরিজের সংলাপই উল্টো কৃত্রিম মনে হয়েছে।
যেমন, ২০২১ সালের আমেরিকান সিরিজ ‘দ্য সেক্স লাইভস অভ কলেজ গার্লস’। সিরিজটিতে জেন-জিদের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, জেন-জিরা মূলত সে ভাষায় কথা বলে না। এজন্য সংলাপগুলো শুনতে বেশ আরোপিত মনে হয়, যা জেন-জি দর্শকদের নজর কাড়তে পারেনি।
একইভাবে ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’ নামে ২০২৬ সালে মুক্তি পায় আমেরিকান একটি টিভি সিরিজ। এখানেও জেন-জির প্রচলিত কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু শুধু জনপ্রিয় শব্দ দিয়ে একটা জেনারেশনের পুরো চিত্র উঠে আসে না।
সমস্যাটা শুধু শব্দ ব্যবহারে নয়। একটি প্রজন্ম কীভাবে চিন্তা করে, সম্পর্ক তৈরি করে, কাজ খোঁজে কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে এসব বিষয়কে গভীরভাবে বোঝা জরুরি। সেখানে নির্মাতা ও চরিত্রের প্রজন্মগত দূরত্ব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হতাশা হাসির খোরাক হয়ে ওঠেনি
সিটকমের ধারণাই হচ্ছে দর্শককে আনন্দ দেওয়া। হাজারো চাপ-দুশ্চিন্তা ভুলে স্রেফ কিছুক্ষণের হাসি। ‘ফ্রেন্ডস’ সেই কাজটি খুব ভালোভাবেই করতে পেরেছিলো।
কিন্তু এখনকার জেন-জিদের জীবন আগের চেয়ে বহুমাত্রিক, কিছু ক্ষেত্রে অনিশ্চিতও।
ইউসিএলএ’র সেন্টার ফর স্কলার্স অ্যান্ড স্টোরিটেলার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড. ইয়ালদা টি উহলস মনে করেন, এই প্রজন্ম বড় হয়েছে মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক সংঘাত দেখে। তাই ভবিষ্যত ভাবনাও তাদের কাছে ধূসর।
এখনকার চাকরির বাজারও কঠিন। বিশেষ করে তরুণদের ক্যারিয়ার শুরু করতেই বেগ পেতে হয়। তার ওটর এআই কর্মসংস্থানের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
জেন-জির জীবনের এই বাস্তবতা মাথায় রেখে গল্প বললে তা আবার হয়ে উঠতে পারে হতাশাজনক। আবার সমস্যাগুলো বাদ দিলে গল্পটি হবে অবাস্তব ও কৃত্রিম।
‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’-এ এই সংকটের একটি উদাহরণ দেখা যায়। এই সিরিজে কেল নামে এক তরুণ অভিনয়ের জন্য একটি অডিশন দিতে যায়। সে মনে করেছিলো, এটি তার অভিনয় ক্যারিয়ারের জন্য ভালো একটি সুযোগ।
কিন্তু অডিশনে গিয়ে সে জানতে পারে, কাজটি আসলে প্রচলিত অভিনয় নয়। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল চরিত্র তৈরির একটি প্রকল্পে তাকে কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাডাল্টস’ সিরিজে জেন-জি তরুণদের চাকরি না পাওয়ার সমস্যা আরও স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে।
সিরিজের বিলি চরিত্রটি সিজনজুড়ে একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তার সেই চেষ্টা সহজ হয় না।
বাসস্থানের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’ সিরিজের তরুণরা নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের সুন্দর বাসায় থাকে। কিন্তু এখনকার সময়ে এমন বাসায় থাকা অনেক তরুণের জন্য কঠিন।
বাড়তি বাড়িভাড়া, চাকরি পাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে সুন্দর বাসায় থাকা তাই খানিক অবাস্তব হয়ে ওঠে।
‘এডাল্টস’ সিরিজে অবশ্য বাস্তবতাই তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে পাঁচ বন্ধু তিন বেডরুমের একটি বাড়িতে একসঙ্গে থাকে।
জায়গা কম হলেও বাড়িভাড়ার কারণে তাদের সেখানেই মানিয়ে নিতে হয়। যা এখনকার অনেক তরুণের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
বৈচিত্র্য আনাই চ্যালেঞ্জ
জেন-জিকে নিয়ে একটি মাত্র সিটকম তৈরি করে পুরো প্রজন্মের চিত্র তুলে ধরাও কঠিন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জেন-জি প্রজন্মে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সংখ্যা আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় বেশি। তাই এই প্রজন্মের সবার জীবনযাপন বা অভিজ্ঞতা এক রকম নয়।
ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো প্রজন্মকে বোঝানো কঠিন।
‘ফ্রেন্ডস’-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সহজ ছিলো। সিরিজটির ছয়জন প্রধান চরিত্রই শ্বেতাঙ্গ এবং তাদের সম্পর্কের গল্প মূলত নারী-পুরুষের প্রেমকে ঘিরে। নব্বইয়ের দশকে মার্কিন টেলিভিশনে এমন চরিত্র ও জীবনযাপন ছিলো স্বাভাবিক।
এখনকার দর্শকরা টিভি সিরিজে নানা ধরনের মানুষের উপস্থিতি দেখতে চান। তারা চান, সমাজে থাকা বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ গল্পের অংশ হোক।
‘দ্য সেক্স লাইভস অভ কলেজ গার্লস’-এ বিভিন্ন ধরনের মানুষ দেখানো হলেও তাদের গল্প খুব দর্শকমনে দাগ কাটেনি।
‘অ্যাডাল্টস’-এ অবশ্য চরিত্রগুলোকে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে দেখাতে গিয়ে সিরিজটির গল্প হয়ে উঠেছে ছন্নছাড়া।
ইন্টারনেট ছাড়া জেন-জির গল্প অসম্পূর্ণ
ভাবুন তো, ৯০-এর দশকে যদি স্মার্টফোন থাকতো? তাহলে সেন্ট্রাল পার্ক ক্যাফেতে ছয় বন্ধু হয়তো মুখ গুঁজে ফোন স্ক্রল করতো, রস হয়তো ক্যাফে রিংয়ের বেল শুনে না তাকিয়ে নোটিফিকেশন চেক করতো।
জেন-জির জীবনই জড়িয়ে আছে ইন্টারনেটে। কিন্তু পর্দায় ইন্টারনেটের উপস্থিতি দেখানো সহজ নয়।
মোবাইল ফোনের মেসেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের স্ক্রিন দেখাতে গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়। তবে তা যুতসই হয় না।
‘অ্যডাল্টস’ সিরিজের গল্পে তরুণদের জীবনে ফোন ও ইন্টারনেট অস্তিত্ব ছিলো গুরুত্বহীন। আবার ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’-এ প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে অনেক গল্প থাকলেও তরুণদের পরিচিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার খুব বেশি দেখানো হয়নি। ফলে জেন-জির বাস্তব জীবনের সঙ্গে সিরিজগুলোর গল্পের কিছুটা পার্থক্য থেকে গেছে।
এ ক্ষেত্রে ‘আই লাভ এলএ’ কিছুটা ব্যতিক্রম। সিরিজটি ফোনে আসক্ত ইনফ্লুয়েন্সার ও বিনোদন জগতের তরুণদের জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি। সেখানে অনলাইনে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয় তা নিয়েই গল্প এগিয়েছে।
সিরিজের এক ইনফ্লুয়েন্সারের ভাষায়, আপনি যদি এক মুহূর্তের জন্য থেমে যান, তাহলে হারিয়ে যাবেন। তার মতে অনলাইনে সবসময় সক্রিয় থাকতে হয়। কিছু সময়ের জন্য থেমে গেলেই মানুষ তাকে ভুলে যেতে পারে।
নতুন ‘ফ্রেন্ডস’ কি অসম্ভব?
এখন পর্যন্ত জেন-জি নিয়ে তৈরি সিরিজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়েছে ‘অ্যাডাল্টস’। সিরিজটি একদিকে চরিত্রগুলোর বাস্তবতা আছে, আবার গল্পে হাসির খোরাকও আছে।
তবে ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো সাফল্য পাওয়া শুধু ভালো গল্পের ওপর নির্ভর করে না। এজন্য দরকার সঠিক সময়, দর্শকের মনোযোগ আর দীর্ঘ সময় ধরে চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক।
‘ফ্রেন্ডস’ যখন প্রচার হয়, তখন টেলিভিশন ছিলো মানুষের বিনোদনের প্রধানতম মাধ্যম। আজকের জেন-জি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মধ্যে বড় হচ্ছে। তাদের বিনোদন, বন্ধুত্ব ও সামাজিক জীবন অফলাইন ও অনলাইনে চলে সমানতালে।
তাই নতুন ‘ফ্রেন্ডস’ বানাতে হলে শুধু ছয় বন্ধুকে একটি শহরের অ্যাপার্টমেন্টে বসিয়ে গল্প বললে তা ঠিক আজকের দর্শকের মনোপুত হবে না।
চাকরির অনিশ্চয়তা, বাড়িভাড়ার চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সম্পর্কের নতুন ধরন, রাজনৈতিক উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাকেও গল্পের অংশ করতে হবে। এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হয়তো জেন-জির জন্য নতুন ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর সবচেয়ে বড় ভুলটাই হলো ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো আরেকটি ‘ফ্রেন্ডস’ বানাতে চাওয়া।
প্রজন্মান্তরে গল্প বদলে যায়। সময় বদলায়, স্বপ্ন বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, এমনকি এক থাকে না বন্ধুত্বের ধরনও। তাই বদলে যায় গল্প বলা আর শোনার ধরন।
‘ফ্রেন্ডস’ তার সময়ের ছয় তরুণের গল্প বলেছিলো। যারা একসঙ্গে আড্ডা দিতো, প্রেমে পড়তো, ঝগড়া করতো, আবার সব ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়াতো।
হালের জেন-জি’র যাপিত জীবন অফলাইনে যেমন অনেক বেশি এককেন্দ্রিক, আবার অনলাইনে বহুমুখী। তাই বাস্তবতা মাথায় রেখে, ওই গল্প পর্দায় উঠিয়ে আনা বোধহয় খুব একটা সহজ হবে না আজকের নির্মাতাদের জন্য।
জেন-জির জন্য কি আরেকটা ‘ফ্রেন্ডস’ সিরিজ বানানো সম্ভব
দুই দশক পরও রস, রেইচেল, জোয়ি, ফিবিরা জনপ্রিয় নতুন প্রজন্মের কাছে। কিন্তু তাদের মতো আরেক দল বন্ধুকে পর্দায় এনে সেই একই ম্যাজিক তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে কেন?
নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে একটা ছোট্ট কফিশপ, নাম তার সেন্ট্রাল পার্ক। কমলা রঙের সোফায় বসে আছে তিন বন্ধু—মনিকা, ফিবি আর চ্যানলার। পাশের চেয়ারে হাত পা ছড়িয়ে বসে তাদেরই আরেক বন্ধু জোয়ি।
খানিক বাদেই সেখানে উপস্থিত হয় সদ্য ডিভোর্স হওয়া রস। কিন্তু সে আবারও বিয়ে করতে চায়, একা থাকা তার সয় না! রস বল উঠলো “আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি সিঙ্গেল, ওকে?” (আমি সিঙ্গেল থাকতে চাই না)। “আই জাস্ট…আই জাস্ট ওয়ান্ট টু বি ম্যারেইড অ্যাগেইন!” (আমি আবার বিবাহিত হতে চাই)।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটলো ম্যাজিক!
ক্যাফের দরজা খুলে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢোকে ধবধবে সাদা বিয়ের গাউন গায়ে এক তরুণী। মাথায় লম্বা ভেইল, হাতে ভেজা ফুলের তোড়া। নাম তার রেইচেল গ্রিন।
বোঝাই যাচ্ছে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসা। পুরো কফিশপ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ। আর তখনই দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে চ্যানলার বলে ওঠে, “অ্যান্ড, আই জাস্ট ওয়ান্ট আ মিলিয়ন ডলারস!” (আর, আমার শুধু চাই এক মিলিয়ন ডলার!)।
‘ফ্রেন্ডস’ টিভি সিরিজের প্রথম এপিসোডের এই দৃশ্য দেখার পর দর্শক আর শুধু দর্শক থাকেনি, হয়ে উঠে ভক্ত। এক পর্ব শেষ হওয়ার পরই আরেক পর্ব, তারপর আরেকটি। এভাবেই এগিয়ে গেছে ছয় বন্ধুর গল্প, যাদের বয়স মেরেকেটে ২৫ বছর।
হাসি, কান্না, প্রেম, বিচ্ছেদ আর তাদের নানারকম পাগলামির সাথে একাত্ম হয়ে উঠেছেন দর্শকরা। রীতিমতো ডুবে গেছে ‘ফ্রেন্ডস’-এর জগতে।
সেই ১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু। শেষ হয় ২০০৪ সালে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৫ কোটি ২৫ লাখ দর্শক দেখেছিলেন দশ সিজনের সিরিজটির ফাইনাল এপিসোড।
দুই দশক আগে শেষ, তবুও এখনো সমানতালে জনপ্রিয়। এর মাঝে চলে এসেছে নতুন প্রজন্ম। তারাও ‘ফ্রেন্ডস’-এর চরিত্র ও গল্পের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পান।
‘ফ্রেন্ডস’-এর টিভির পর্দা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছিলো ফ্যাশন ট্রেন্ড। জড়িয়ে গিয়েছিলো অনেকের জীবনের পরতে পরতে।
রেইচেলের হেয়ারস্টাইলের নামই ছিলো ‘দ্য রেইচেল’ আর তার পরনে 'স্লিপ ড্রেস' তখন জনপ্রিয় ট্রেন্ড হয়ে ওঠে। আর জোয়ির ‘হাও ইউ ডু’ইন?’ তো টেলিভিশন সিরিজের অন্যতম জনপ্রিয় সংলাপ!
বাইশ বছর আগে শেষ হয়েছে, তার আগে আরও দশ বছর ধরে চলেছে। কিন্তু এই ২০২৬ সালে এসেও জেন-জির কাছে জনপ্রিয় ‘ফ্রেন্ডস’।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে জেন-জির পছন্দের সিনেমা ও টিভি অনুষ্ঠানের তালিকায় ১৬তম অবস্থানে ছিলো সিরিজটি।
কিন্তু জেন-জির জন্য কি এমন আরেকটি ‘ফ্রেন্ডস’ তৈরি করা সম্ভব?
সম্প্রতি জেন-জির যাপিত জীবন আর বন্ধুত্ব নিয়ে ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো বেশ কয়েকটি সিরিজ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
'ফ্রেন্ডস'-এ যেমন হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়েই তুলে আনার হয়েছে চরিত্রগুলোর জীবনের নানা টানাপোড়েন। একইভাবে নতুন সিরিজগুলোতে চেষ্টা করা হয়েছে জেন-জির প্রেম, বন্ধুত্ব, পেশা ও ব্যক্তি জীবনের নানা সংকট তুলে ধরার। কিন্তু এখনও কোনো সিরিজ হালে পানি পায়নি।
বদলে গেছে বিনোদনের মাধ্যম
নব্বইয়ের দশকে মানুষের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো টেলিভিশন, রেডিও। ইন্টারনেট তখনও হাতের মুঠোয় আসেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো চিন্তার বাইরে।
টেলিভিশনের সামনে বসে পছন্দের অনুষ্ঠান বা সিনেমা দেখাই ছিলো বিনোদনের অবলম্বন। শুধু একটি কল্পকাহিনী নিয়েই ‘ফ্রেন্ডস’ শুরু হয়নি, বরং সিরিজটির চরিত্রগুলোর মধ্যে দর্শকরা খুঁজে পেয়েছিলেন নিজেকেই।
চাকরির খোঁজে দিশেহারা রেইচেলকে দেখে দর্শক অনুভব করে বেকারত্বের অভিশাপ। রসের একের পর এক বিব্রতকর মুহূর্তে অন্যদের হাসি-ঠাট্টা দেখে নিজেদের অনেক ভুল-ভ্রান্তি আর তেমন বড় হয়ে উঠতো না হয়তো।
ফিবিকে দেখে মানুষ বুঝতে পারে, অন্যরকম হওয়া দোষের কিছু না। আর সবশেষে সিরিজটি মানুষের কাছে যে বার্তা পৌঁছে দেয় তা হলো, জীবনে যত বাধাই আসুক না কেনো, ভালো সঙ্গ থাকলে সবই কাটিয়ে ওঠা যায়।
কিন্তু হাল দুনিয়ার বিনোদনের মাধ্যম এখন আর ৯০ দশকের মতো 'লিনিয়ার' অর্থাৎ একরৈখিক না। আছে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব, সামাজিক মাধ্যমের মতো নানা বিকল্প। তাই দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন বটে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাক্টিভেট’-এর একটি রিপোর্ট বলছে, ৪৩ শতাংশ জেন-জি ইউটিউব বা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও প্ল্যাটফর্ম বেশি পছন্দ করেন। পেইড স্ট্রিমিং পছন্দ করেন ৩৭ শতাংশ এবং প্রচলিত টেলিভিশন পছন্দ করেন মাত্র ১২ শতাংশ।
তার মানে হলো কিছু ভালো না লাগলে দর্শকের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। অ্যালগরিদম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার সামনে বিকল্প কনটেন্ট নিয়ে হাজির হবে।
এপিসোডের সংখ্যাও এখানে একটা ব্যাপার। ‘ফ্রেন্ডস’-এর সময় টেলিভিশন সিরিজের একটি সিজনে কমপক্ষে ২০টি এপিসোড থাকতো। তাই দর্শকরা চরিত্রগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ যাত্রার সুযোগ পেতেন। ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠতেন বন্ধুত্ব, প্রেম, ঝগড়া ও ব্যক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে। চরিত্রগুলো হয়ে যেতো চেনা, কার কী পছন্দ-অপছনন্দ, কাকে কী 'ট্রিগার' করতে পারে, সব জানা। অপেক্ষা থাকতো এই এপিসোডে কী হবে।
এখনকার ‘ফ্রেন্ডস’-ধাঁচের সিরিজগুলোর প্রতিটি সিজনে সাধারণত ৮ থেকে ১০টি পর্ব থাকে। চরিত্রগুলো থেকে যায় পর্দাতেই। মানুষের মনে আর জায়গা হয় না।
গল্প লিখছেন অন্য প্রজন্মের মানুষ
‘ফ্রেন্ডস’ হাস্যরসাত্মক সিরিজ বা সিটকম। বন্ধুদের মধ্যে কথপোকথন ও ঘটনাপ্রবাহ লেখার সময় যারা লেখক ছিলেন তারা তখনকার দর্শকদের প্রত্যাশা আঁচ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু জেন-জিদের নিয়ে তৈরি সিটকমের বড় সমস্যা হলো যারা গল্প লিখছেন, তাদের বেশিরভাগই এই প্রজন্মের না।
বিনোদন সাংবাদিক ম্যাক্স গাওয়ের মতে, জেন-জি প্রজন্মের লেখকরা এখনো নিজেদের গল্প বলার মতো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি।
‘ফ্রেন্ডস’-এর লেখকদের বয়স সিরিজের চরিত্রগুলোর বয়সের থেকে বেশিই ছিলো, কিন্ত তারা ওই সময়ের তরুণদের জীবন ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এখনকার সংস্কৃতিও বদলে যাচ্ছে অনেক দ্রুত। সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটের প্রভাব, সম্পর্কের পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক নানা পরিবর্তনের কারণে জেন-জির ভাষা, চিন্তাভাবনা ও আচরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে এই প্রজন্মের জীবনকে পর্দায় তুলে ধরা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেন-জির মতো কথা বলানোর চেষ্টা করতে গিয়ে কিছু সিরিজের সংলাপই উল্টো কৃত্রিম মনে হয়েছে।
যেমন, ২০২১ সালের আমেরিকান সিরিজ ‘দ্য সেক্স লাইভস অভ কলেজ গার্লস’। সিরিজটিতে জেন-জিদের যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, জেন-জিরা মূলত সে ভাষায় কথা বলে না। এজন্য সংলাপগুলো শুনতে বেশ আরোপিত মনে হয়, যা জেন-জি দর্শকদের নজর কাড়তে পারেনি।
একইভাবে ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’ নামে ২০২৬ সালে মুক্তি পায় আমেরিকান একটি টিভি সিরিজ। এখানেও জেন-জির প্রচলিত কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু শুধু জনপ্রিয় শব্দ দিয়ে একটা জেনারেশনের পুরো চিত্র উঠে আসে না।
সমস্যাটা শুধু শব্দ ব্যবহারে নয়। একটি প্রজন্ম কীভাবে চিন্তা করে, সম্পর্ক তৈরি করে, কাজ খোঁজে কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে এসব বিষয়কে গভীরভাবে বোঝা জরুরি। সেখানে নির্মাতা ও চরিত্রের প্রজন্মগত দূরত্ব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হতাশা হাসির খোরাক হয়ে ওঠেনি
সিটকমের ধারণাই হচ্ছে দর্শককে আনন্দ দেওয়া। হাজারো চাপ-দুশ্চিন্তা ভুলে স্রেফ কিছুক্ষণের হাসি। ‘ফ্রেন্ডস’ সেই কাজটি খুব ভালোভাবেই করতে পেরেছিলো।
কিন্তু এখনকার জেন-জিদের জীবন আগের চেয়ে বহুমাত্রিক, কিছু ক্ষেত্রে অনিশ্চিতও।
ইউসিএলএ’র সেন্টার ফর স্কলার্স অ্যান্ড স্টোরিটেলার্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ড. ইয়ালদা টি উহলস মনে করেন, এই প্রজন্ম বড় হয়েছে মহামারি, অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক সংঘাত দেখে। তাই ভবিষ্যত ভাবনাও তাদের কাছে ধূসর।
এখনকার চাকরির বাজারও কঠিন। বিশেষ করে তরুণদের ক্যারিয়ার শুরু করতেই বেগ পেতে হয়। তার ওটর এআই কর্মসংস্থানের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
জেন-জির জীবনের এই বাস্তবতা মাথায় রেখে গল্প বললে তা আবার হয়ে উঠতে পারে হতাশাজনক। আবার সমস্যাগুলো বাদ দিলে গল্পটি হবে অবাস্তব ও কৃত্রিম।
‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’-এ এই সংকটের একটি উদাহরণ দেখা যায়। এই সিরিজে কেল নামে এক তরুণ অভিনয়ের জন্য একটি অডিশন দিতে যায়। সে মনে করেছিলো, এটি তার অভিনয় ক্যারিয়ারের জন্য ভালো একটি সুযোগ।
কিন্তু অডিশনে গিয়ে সে জানতে পারে, কাজটি আসলে প্রচলিত অভিনয় নয়। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল চরিত্র তৈরির একটি প্রকল্পে তাকে কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অ্যাডাল্টস’ সিরিজে জেন-জি তরুণদের চাকরি না পাওয়ার সমস্যা আরও স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে।
সিরিজের বিলি চরিত্রটি সিজনজুড়ে একটি স্থায়ী চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তার সেই চেষ্টা সহজ হয় না।
বাসস্থানের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’ সিরিজের তরুণরা নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের সুন্দর বাসায় থাকে। কিন্তু এখনকার সময়ে এমন বাসায় থাকা অনেক তরুণের জন্য কঠিন।
বাড়তি বাড়িভাড়া, চাকরি পাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে সুন্দর বাসায় থাকা তাই খানিক অবাস্তব হয়ে ওঠে।
‘এডাল্টস’ সিরিজে অবশ্য বাস্তবতাই তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে পাঁচ বন্ধু তিন বেডরুমের একটি বাড়িতে একসঙ্গে থাকে।
জায়গা কম হলেও বাড়িভাড়ার কারণে তাদের সেখানেই মানিয়ে নিতে হয়। যা এখনকার অনেক তরুণের জীবনের সঙ্গে মিলে যায়।
বৈচিত্র্য আনাই চ্যালেঞ্জ
জেন-জিকে নিয়ে একটি মাত্র সিটকম তৈরি করে পুরো প্রজন্মের চিত্র তুলে ধরাও কঠিন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের জেন-জি প্রজন্মে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সংখ্যা আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় বেশি। তাই এই প্রজন্মের সবার জীবনযাপন বা অভিজ্ঞতা এক রকম নয়।
ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো প্রজন্মকে বোঝানো কঠিন।
‘ফ্রেন্ডস’-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে সহজ ছিলো। সিরিজটির ছয়জন প্রধান চরিত্রই শ্বেতাঙ্গ এবং তাদের সম্পর্কের গল্প মূলত নারী-পুরুষের প্রেমকে ঘিরে। নব্বইয়ের দশকে মার্কিন টেলিভিশনে এমন চরিত্র ও জীবনযাপন ছিলো স্বাভাবিক।
এখনকার দর্শকরা টিভি সিরিজে নানা ধরনের মানুষের উপস্থিতি দেখতে চান। তারা চান, সমাজে থাকা বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ গল্পের অংশ হোক।
‘দ্য সেক্স লাইভস অভ কলেজ গার্লস’-এ বিভিন্ন ধরনের মানুষ দেখানো হলেও তাদের গল্প খুব দর্শকমনে দাগ কাটেনি।
‘অ্যাডাল্টস’-এ অবশ্য চরিত্রগুলোকে আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু একসঙ্গে দেখাতে গিয়ে সিরিজটির গল্প হয়ে উঠেছে ছন্নছাড়া।
ইন্টারনেট ছাড়া জেন-জির গল্প অসম্পূর্ণ
ভাবুন তো, ৯০-এর দশকে যদি স্মার্টফোন থাকতো? তাহলে সেন্ট্রাল পার্ক ক্যাফেতে ছয় বন্ধু হয়তো মুখ গুঁজে ফোন স্ক্রল করতো, রস হয়তো ক্যাফে রিংয়ের বেল শুনে না তাকিয়ে নোটিফিকেশন চেক করতো।
জেন-জির জীবনই জড়িয়ে আছে ইন্টারনেটে। কিন্তু পর্দায় ইন্টারনেটের উপস্থিতি দেখানো সহজ নয়।
মোবাইল ফোনের মেসেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট কিংবা বিভিন্ন অ্যাপের স্ক্রিন দেখাতে গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়। তবে তা যুতসই হয় না।
‘অ্যডাল্টস’ সিরিজের গল্পে তরুণদের জীবনে ফোন ও ইন্টারনেট অস্তিত্ব ছিলো গুরুত্বহীন। আবার ‘নট সুইটেবল ফর ওয়ার্ক’-এ প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে অনেক গল্প থাকলেও তরুণদের পরিচিত হওয়ার অন্যতম মাধ্যম ডেটিং অ্যাপের ব্যবহার খুব বেশি দেখানো হয়নি। ফলে জেন-জির বাস্তব জীবনের সঙ্গে সিরিজগুলোর গল্পের কিছুটা পার্থক্য থেকে গেছে।
এ ক্ষেত্রে ‘আই লাভ এলএ’ কিছুটা ব্যতিক্রম। সিরিজটি ফোনে আসক্ত ইনফ্লুয়েন্সার ও বিনোদন জগতের তরুণদের জীবনকে কেন্দ্র করে তৈরি। সেখানে অনলাইনে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয় তা নিয়েই গল্প এগিয়েছে।
সিরিজের এক ইনফ্লুয়েন্সারের ভাষায়, আপনি যদি এক মুহূর্তের জন্য থেমে যান, তাহলে হারিয়ে যাবেন। তার মতে অনলাইনে সবসময় সক্রিয় থাকতে হয়। কিছু সময়ের জন্য থেমে গেলেই মানুষ তাকে ভুলে যেতে পারে।
নতুন ‘ফ্রেন্ডস’ কি অসম্ভব?
এখন পর্যন্ত জেন-জি নিয়ে তৈরি সিরিজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়েছে ‘অ্যাডাল্টস’। সিরিজটি একদিকে চরিত্রগুলোর বাস্তবতা আছে, আবার গল্পে হাসির খোরাকও আছে।
তবে ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো সাফল্য পাওয়া শুধু ভালো গল্পের ওপর নির্ভর করে না। এজন্য দরকার সঠিক সময়, দর্শকের মনোযোগ আর দীর্ঘ সময় ধরে চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক।
‘ফ্রেন্ডস’ যখন প্রচার হয়, তখন টেলিভিশন ছিলো মানুষের বিনোদনের প্রধানতম মাধ্যম। আজকের জেন-জি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মধ্যে বড় হচ্ছে। তাদের বিনোদন, বন্ধুত্ব ও সামাজিক জীবন অফলাইন ও অনলাইনে চলে সমানতালে।
তাই নতুন ‘ফ্রেন্ডস’ বানাতে হলে শুধু ছয় বন্ধুকে একটি শহরের অ্যাপার্টমেন্টে বসিয়ে গল্প বললে তা ঠিক আজকের দর্শকের মনোপুত হবে না।
চাকরির অনিশ্চয়তা, বাড়িভাড়ার চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সম্পর্কের নতুন ধরন, রাজনৈতিক উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাকেও গল্পের অংশ করতে হবে। এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
হয়তো জেন-জির জন্য নতুন ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর সবচেয়ে বড় ভুলটাই হলো ‘ফ্রেন্ডস’-এর মতো আরেকটি ‘ফ্রেন্ডস’ বানাতে চাওয়া।
প্রজন্মান্তরে গল্প বদলে যায়। সময় বদলায়, স্বপ্ন বদলায়, সম্পর্ক বদলায়, এমনকি এক থাকে না বন্ধুত্বের ধরনও। তাই বদলে যায় গল্প বলা আর শোনার ধরন।
‘ফ্রেন্ডস’ তার সময়ের ছয় তরুণের গল্প বলেছিলো। যারা একসঙ্গে আড্ডা দিতো, প্রেমে পড়তো, ঝগড়া করতো, আবার সব ভুলে একে অপরের পাশে দাঁড়াতো।
হালের জেন-জি’র যাপিত জীবন অফলাইনে যেমন অনেক বেশি এককেন্দ্রিক, আবার অনলাইনে বহুমুখী। তাই বাস্তবতা মাথায় রেখে, ওই গল্প পর্দায় উঠিয়ে আনা বোধহয় খুব একটা সহজ হবে না আজকের নির্মাতাদের জন্য।