এআই নিয়ে ভুল হিসাব: কর্মী ছাঁটাই করেও লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ জাকারবার্গ

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

মেটা এআই প্রযুক্তির ওপর বড় অংকের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছিলো বছরের শুরু থেকেই। এআই নিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের খরচ সামলাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তে যায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ। 

দু’ মাস না যেতেই চলতি সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক ইন্টারনাল টাউন হল মিটিংয়ে জাকারবার্গ জানালেন, এআই অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় খুব একটা এগুতে পারেনি। আর এজন্য তিনি দায়ী করেন মেটার শীর্ষ কর্মকর্তাদের। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাকারবার্গ স্বীকার করেন এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ঠিক করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তারা ‘ভুল হিসাব’ করেছিলেন।

চলতি বছরের শুরুতে পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেটা প্রায় ৮ হাজার কর্মীকে ছাঁটাই করে। যা প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক কর্মীবাহিনীর প্রায় ১০ শতাংশ। একই সঙ্গে ৭ হাজার কর্মীকে এআই-কেন্দ্রিক ইউনিটগুলোতে পুনর্বিন্যাস করা হয়।

এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিলো ২০২৬ সালে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকা মেটার বিশাল এআই অবকাঠামো বিনিয়োগের অর্থায়ন নিশ্চিত করা। পুরো বছরজুড়ে এই সিদ্ধান্ত কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ ও মনোবল নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। 

এআই প্রযুক্তি নিয়ে মেটার হিমশিম

রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মেটা এক ধরনের ‘এআই এজেন্ট’-এর উপর বিনিয়োগ করেছে। যা ব্যবহারকারীদের হয়ে বিভিন্ন কাজ করতে পারবে। 

টাউন হল বৈঠকে মার্ক জাকারবার্গ বলেন, এবছরের শুরুতে মেটার শীর্ষ কর্মকর্তারা অ্যান্থ্রপিকের ক্লড কোড নিয়ে ‘অনেক আশাবাদী’ ছিলেন।

ক্লড কোড মূলত একটি কোডিং এআই। যা শুধু পরামর্শ দেওয়া কিংবা কোডের অংশ লিখে দেওয়ার বাইরেও সরাসরি সফটওয়্যারের ওপর কাজ করতে পারে। 

জাকারবার্গের ভাষ্যে এই প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে মেটার কর্মকর্তারা অনেক আশাবাদী হলেও, এখনও তেমন কোনো সুফল আসেনি। 

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ওয়্যার্ড-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মেটার এআই প্রযুক্তি নিয়ে কার্যক্রমের গতি বাড়াতে একটি টিম গঠন করা হলেও, পুরো প্রক্রিয়াটি ছিলো ‘বিশৃঙ্খল’। 

একই প্রতিবেদনে কয়েকজন কর্মী মেটার এই দলকে কারাগারের সঙ্গেও তুলনা করেন।

মাউস ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ও গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক

কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, এপ্রিলে মেটা তার কর্মীদের কম্পিউটারে একটি মাউস ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ইনস্টল করে। 

এই সফটওয়্যার মূলত একজন ব্যক্তি কম্পিউটারে মাউস কীভাবে নাড়াচ্ছেন, কি-বোর্ডের কোন বাটনগুলো চাপছেন, তা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে পারে। 

মেটার একজন গবেষকের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট করে জানান, এই সফটওয়্যারের উদ্দেশ্য ছিলো কর্মীদের মাউসের নড়াচড়া ও কি-বোর্ডে চাপের ধরন লক্ষ্য করে এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।

এই তথ্য প্রকাশ হওয়ার পরই বিতর্ক তৈরি হয় ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে। 

মেটার কর্মীরা এটিকে দেখেছেন অনলাইন কার্যক্রমের ওপর অবৈধ নজরদারি হিসাবে। একইসঙ্গে তারা অভিযোগ করেন ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এরপর তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদও জানায়। 

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার ২ হাজার কর্মী এই কর্মসূচি বন্ধের দাবিতে একটি পিটিশন স্বাক্ষর করেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, কর্মীদের প্রতিবাদের মুখে মেটা প্রথমে নানারকম ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ করার চেষ্টা করে। 

এক পর্যায়ে কর্মীদের দৈনিক ৩০ মিনিট সময় এই সফটওয়্যারের পর্যবেক্ষণের বাইরে কাটানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু কেউ সেটি মানেননি। শেষ পর্যন্ত সফটওয়্যার কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয় মেটা। 

চলতি সপ্তাহে টাউন হলের বৈঠকে অ্যান্ড্রু বসওয়ার্থ বলেন, “পর্যালোচনার পর সফটওয়্যারের কার্যক্রম আবার চালু হতে পারে। তবে এবার তা ‘ঐচ্ছিক অংশগ্রহণের’ ভিত্তিতে হবে।” 

অর্থাৎ, আগে এই কর্মসূচিতে মেটার কর্মীদের ‘না’ বলার সুযোগ ছিলো না। তবে এবার শুধুমাত্র যারা সম্মতি দিবেন, তাদের কম্পিউটারেই এই সফটওয়্যার ইন্সটল করা হবে।

অন্যদিকে ওয়াইয়ার্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেটার সাম্প্রতিক কার্যক্রমে কর্মীদের বিশ্বাস ভঙ্গ হয়েছে বলে মনে করেন অ্যান্ড্রু বসওয়ার্থ। 

তিনি বলেন, মেটা তার পরিকল্পনা কর্মীদের পরিষ্কারভাবে জানায়নি। একইসঙ্গে খুবই দ্রুত এবং কর্মীদের টিম বদলে অন্য টিমে নেওয়ার কাজটি হয়েছে খুব বিশৃঙ্খলভাবে। এসব পদক্ষেপের কারণে মেটার প্রতি কর্মীদের আস্থাও কমে গেছে।