আইন ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পরও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় কমছে না ধসের ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বসতি ও পাহাড় কাটার প্রবণতা এই সংকট বাড়াচ্ছে।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৭ পিএমআপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৭ পিএম
বছরের পর বছর পাহাড়ধসের ভয়াবহতা, অসংখ্য প্রাণহানি এবং প্রশাসনের ধারাবাহিক সতর্কতার পরও চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে থামছে না মানুষের বসবাস ও পাহাড় কাটার প্রবণতা। ভারী বৃষ্টিতে যখন পাহাড়ধসের আশংকা বাড়ে, তখনই সামনে আসে পুরোনো প্রশ্ন, আইন আছে, অভিযান হয়, সতর্কতাও জারি করা হয়; কিন্তু বাস্তবে কেন রোধ করা যাচ্ছে না এই মৃত্যুঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য না বুঝে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি এবং দুর্বল সমন্বয় এই সংকটকে আরও গভীর করছে। তবে প্রশাসনের দাবি, পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণে নজরদারি, অভিযান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম নিয়মিত চলছে।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, এই শংকার মধ্যেই চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়ে এখনো বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার। অতীতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে বহু মানুষের প্রাণহানি, বারবার উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের নির্দেশ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি, কোনোটিই তাদের পাহাড় থেকে সরাতে পারেনি।
এর মধ্যে চট্টগ্রামে ভারি বৃষ্টিতে বাড়ছে পাহাড়ধসের শংকা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকাল তিনটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে এবং পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, “কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতৃর্ক সরকারী বা আধা-সরকারী বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন ও/বা মোচন করতে পারবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণক্রমে কোন পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে।”
তারপরও পাহাড় কাটা ঠেকানো যায় না। সোমবার কক্সবাজারে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নয়জনের মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে কেন এই অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না।
‘পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য না বোঝাই বিপদের কারণ’
পরিবেশকর্মী ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব আলাপ-কে বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের পাহাড়গুলো দেখতে শক্ত মনে হলেও এগুলো মূলত নরম মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এসব পাহাড়ের মাটির গঠন এমন যে, অতিবৃষ্টি হলে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থিতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটালে তা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, “এই পাহাড়গুলো পাথরের মতো শক্ত নয়। এর জিওটেকনিক্যাল বৈশিষ্ট্য না বুঝে পাহাড় কাটা হলে বৃষ্টির পানিতে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ধসের আশংকা বেড়ে যায়।”
ইকবাল হাবিবের মতে, পাহাড়ে বসতি স্থাপনের ধরন পরিবর্তনের কারণেও ঝুঁকি বেড়েছে। আগে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী পাহাড়ের চূড়া বা টিলার উপরে বসতি স্থাপন করলেও পরবর্তী সময়ে সমতলের মানুষের বসতি স্থাপনের ধরন পাহাড় কাটার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, “পাহাড়িরা সাধারণত পাহাড়কে পাহাড়ের মতো রেখেই বসবাস করে। কিন্তু সমতলের মানুষ পাহাড়কে সমতল করে বসতি তৈরির চেষ্টা করেছে। ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ১৯৮০ সালের পর থেকেই চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সড়ক নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে।
ইকবাল হাবিব বলেন, “উন্নয়ন করতে হলে পাহাড়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বুঝে করতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়কে সমতল ভূমির মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”
তিনি জানান, বড় প্রকল্পগুলোতে প্রকৌশলগত ব্যবস্থা থাকলেও নিম্নআয়ের মানুষ যখন পাহাড় কেটে অস্থায়ী বসতি তৈরি করেন, তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এসব স্থানে পাহাড়ের মাটির স্থিতি বিবেচনা না করেই ঘর নির্মাণ করা হয়।
পাহাড় কাটা বন্ধে আইনের প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আইন প্রয়োগ করবে কে? যখন সরকারি বিভিন্ন সংস্থাই পাহাড় কাটার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও অনেক সময় পাহাড়ের ক্ষতি হয়েছে।
তার ভাষায়, “যারা নিজেরাই পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত, তারা অন্যদের পাহাড় কাটা বন্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। এ কারণে পাহাড় রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”
তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তাসমিয়াহ তাহসীন জানিয়েছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়, যাতে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
তিনি জানান তাদের বিভাগের চলমান প্রকল্পগুলোতে পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার কোনো কার্যক্রম নেই। তবে পাহাড়সংলগ্ন সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের এমন কোনো প্রকল্প নেই যেখানে পাহাড় কেটে উন্নয়ন করা হচ্ছে। পাহাড়ের ভেতরে বা পাহাড় ধ্বংস করে কোনো ধরনের প্রকল্প আমাদের আওতায় নেই।”
পাহাড়সংলগ্ন যেসব সড়ক আগে থেকেই রয়েছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয় বলেও জানান তিনি।
পাহাড়ি এলাকায় উন্নয়নকাজে পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ আইন অনুসরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, “পাহাড় বা পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। পরিবেশগত নিয়ম মেনেই কাজ করতে হয়।”
প্রশাসন কী বলছে
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, তার এলাকায় বর্তমানে পাহাড় কাটার কোনো সুযোগ নেই। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বা মাটি কাটার তথ্য পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, পাহাড় কাটা বা অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় গাড়ি জব্দ, মামলা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানিয়েছেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে অনেক সময় মানুষ নিজের বসতভিটা ছেড়ে যেতে না চাওয়ায় ঝুঁকি কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইউএনও বলেন, “আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি, কিছু পরিবার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পাহাড় কেটে উপরের দিকে যেসব অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোও ঝুঁকির মধ্যে আছে।”
আলাপকে তিনি বলেন, ক্যাম্পে গিয়ে তার মনে হয়েছে এখনো অনেক ঝুঁকিতে আছেন। যারা পাহাড়ের ওপর বসবাস করছেন যেকোনো সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
তিনি বলেন, পাহাড়ধসের আশঙ্কায় কিছু লার্নিং সেন্টারকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং অনেক পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।
পান্না আক্তার বলেন, “অনেক ছোট শিশুসহ পরিবারগুলোও সেখানে উঠেছে। কিন্তু বারবার সচেতন করার পরও অনেকেই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে না থেকে আবার নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।”
তিনি জানান, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় বিপুল জনসংখ্যার কারণে ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়েছে। সরকারি হিসাবে জনসংখ্যার সংখ্যা কম দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে মানুষের চাপ অনেক বেশি।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বলেছেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন নিয়মিত কাজ করছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষদের সরিয়ে নেওয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া বলে জানান তিনি।
পাহাড়ে যারা বসবাস করছেন, তাদের বিষয়টি হঠাৎ করে সমাধান করার মতো নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রশাসন, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়।”
“যেসব পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে, তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার জন্য বর্ষাকালে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে অনেক সময় মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে চান না। কারও গবাদিপশু থাকে, কারও ব্যক্তিগত সম্পদের বিষয় থাকে-এ কারণে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকতে চান।”
তিনি জানান, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার পরই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করছেন এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“মাইকিং করা হচ্ছে, ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মনিটরিং করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
পাহাড় রক্ষায় আইন, বাস্তবে ঝুঁকির বসতি: ধস ঠেকাতে চ্যালেঞ্জ কোথায়
আইন ও প্রশাসনিক উদ্যোগের পরও চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের পাহাড়ি এলাকায় কমছে না ধসের ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বসতি ও পাহাড় কাটার প্রবণতা এই সংকট বাড়াচ্ছে।
বছরের পর বছর পাহাড়ধসের ভয়াবহতা, অসংখ্য প্রাণহানি এবং প্রশাসনের ধারাবাহিক সতর্কতার পরও চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে থামছে না মানুষের বসবাস ও পাহাড় কাটার প্রবণতা। ভারী বৃষ্টিতে যখন পাহাড়ধসের আশংকা বাড়ে, তখনই সামনে আসে পুরোনো প্রশ্ন, আইন আছে, অভিযান হয়, সতর্কতাও জারি করা হয়; কিন্তু বাস্তবে কেন রোধ করা যাচ্ছে না এই মৃত্যুঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য না বুঝে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ বসতি এবং দুর্বল সমন্বয় এই সংকটকে আরও গভীর করছে। তবে প্রশাসনের দাবি, পাহাড় কাটা নিয়ন্ত্রণে নজরদারি, অভিযান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম নিয়মিত চলছে।
গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, এই শংকার মধ্যেই চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়ে এখনো বসবাস করছে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার। অতীতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে বহু মানুষের প্রাণহানি, বারবার উচ্ছেদ অভিযান, আদালতের নির্দেশ ও স্থায়ী পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি, কোনোটিই তাদের পাহাড় থেকে সরাতে পারেনি।
এর মধ্যে চট্টগ্রামে ভারি বৃষ্টিতে বাড়ছে পাহাড়ধসের শংকা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকাল তিনটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করেছে, ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে এবং পাহাড়ি এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, “কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কতৃর্ক সরকারী বা আধা-সরকারী বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন ও/বা মোচন করতে পারবে না।
তবে শর্ত থাকে যে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণক্রমে কোন পাহাড় বা টিলা কাটা যেতে পারে।”
তারপরও পাহাড় কাটা ঠেকানো যায় না। সোমবার কক্সবাজারে পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় নয়জনের মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে কেন এই অপরাধ ঠেকানো যাচ্ছে না।
‘পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য না বোঝাই বিপদের কারণ’
পরিবেশকর্মী ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব আলাপ-কে বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের পাহাড়গুলো দেখতে শক্ত মনে হলেও এগুলো মূলত নরম মাটির স্তর দিয়ে গঠিত। এসব পাহাড়ের মাটির গঠন এমন যে, অতিবৃষ্টি হলে সহজেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থিতিতে কোনো ধরনের পরিবর্তন ঘটালে তা ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি বলেন, “এই পাহাড়গুলো পাথরের মতো শক্ত নয়। এর জিওটেকনিক্যাল বৈশিষ্ট্য না বুঝে পাহাড় কাটা হলে বৃষ্টির পানিতে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ধসের আশংকা বেড়ে যায়।”
ইকবাল হাবিবের মতে, পাহাড়ে বসতি স্থাপনের ধরন পরিবর্তনের কারণেও ঝুঁকি বেড়েছে। আগে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী পাহাড়ের চূড়া বা টিলার উপরে বসতি স্থাপন করলেও পরবর্তী সময়ে সমতলের মানুষের বসতি স্থাপনের ধরন পাহাড় কাটার প্রবণতা বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাবেক এই সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, “পাহাড়িরা সাধারণত পাহাড়কে পাহাড়ের মতো রেখেই বসবাস করে। কিন্তু সমতলের মানুষ পাহাড়কে সমতল করে বসতি তৈরির চেষ্টা করেছে। ফলে পাহাড়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ১৯৮০ সালের পর থেকেই চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সড়ক নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হয়েছে।
ইকবাল হাবিব বলেন, “উন্নয়ন করতে হলে পাহাড়ের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বুঝে করতে হবে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়কে সমতল ভূমির মতো ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”
তিনি জানান, বড় প্রকল্পগুলোতে প্রকৌশলগত ব্যবস্থা থাকলেও নিম্নআয়ের মানুষ যখন পাহাড় কেটে অস্থায়ী বসতি তৈরি করেন, তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কারণ এসব স্থানে পাহাড়ের মাটির স্থিতি বিবেচনা না করেই ঘর নির্মাণ করা হয়।
পাহাড় কাটা বন্ধে আইনের প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “আইন প্রয়োগ করবে কে? যখন সরকারি বিভিন্ন সংস্থাই পাহাড় কাটার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও অনেক সময় পাহাড়ের ক্ষতি হয়েছে।
তার ভাষায়, “যারা নিজেরাই পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত, তারা অন্যদের পাহাড় কাটা বন্ধ করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। এ কারণে পাহাড় রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”
তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তাসমিয়াহ তাহসীন জানিয়েছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়, যাতে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
তিনি জানান তাদের বিভাগের চলমান প্রকল্পগুলোতে পরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার কোনো কার্যক্রম নেই। তবে পাহাড়সংলগ্ন সড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নকাজ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের এমন কোনো প্রকল্প নেই যেখানে পাহাড় কেটে উন্নয়ন করা হচ্ছে। পাহাড়ের ভেতরে বা পাহাড় ধ্বংস করে কোনো ধরনের প্রকল্প আমাদের আওতায় নেই।”
পাহাড়সংলগ্ন যেসব সড়ক আগে থেকেই রয়েছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা হয় বলেও জানান তিনি।
পাহাড়ি এলাকায় উন্নয়নকাজে পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ আইন অনুসরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, “পাহাড় বা পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো কাজ করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। পরিবেশগত নিয়ম মেনেই কাজ করতে হয়।”
প্রশাসন কী বলছে
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, তার এলাকায় বর্তমানে পাহাড় কাটার কোনো সুযোগ নেই। অবৈধভাবে পাহাড় কাটা বা মাটি কাটার তথ্য পেলেই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, পাহাড় কাটা বা অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় গাড়ি জব্দ, মামলা এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানিয়েছেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। তবে অনেক সময় মানুষ নিজের বসতভিটা ছেড়ে যেতে না চাওয়ায় ঝুঁকি কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সম্প্রতি পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইউএনও বলেন, “আমি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি, কিছু পরিবার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পাহাড় কেটে উপরের দিকে যেসব অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোও ঝুঁকির মধ্যে আছে।”
আলাপকে তিনি বলেন, ক্যাম্পে গিয়ে তার মনে হয়েছে এখনো অনেক ঝুঁকিতে আছেন। যারা পাহাড়ের ওপর বসবাস করছেন যেকোনো সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন।
তিনি বলেন, পাহাড়ধসের আশঙ্কায় কিছু লার্নিং সেন্টারকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং অনেক পরিবার সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।
পান্না আক্তার বলেন, “অনেক ছোট শিশুসহ পরিবারগুলোও সেখানে উঠেছে। কিন্তু বারবার সচেতন করার পরও অনেকেই অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে না থেকে আবার নিজেদের ঘরে ফিরে যায়। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যায়।”
তিনি জানান, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় বিপুল জনসংখ্যার কারণে ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়েছে। সরকারি হিসাবে জনসংখ্যার সংখ্যা কম দেখানো হলেও বাস্তবে সেখানে মানুষের চাপ অনেক বেশি।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন বলেছেন, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন নিয়মিত কাজ করছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষদের সরিয়ে নেওয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া বলে জানান তিনি।
পাহাড়ে যারা বসবাস করছেন, তাদের বিষয়টি হঠাৎ করে সমাধান করার মতো নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রশাসন, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়।”
“যেসব পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রয়েছে, তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনার জন্য বর্ষাকালে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে অনেক সময় মানুষ নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে চান না। কারও গবাদিপশু থাকে, কারও ব্যক্তিগত সম্পদের বিষয় থাকে-এ কারণে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত থাকতে চান।”
তিনি জানান, ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার পরই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করছেন এবং উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“মাইকিং করা হচ্ছে, ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত মনিটরিং করছেন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
বিষয়: