নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম কতটা প্রভাব রাখতে পারবে

নির্বাচনি হিসাবের কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানের পর যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি সামনে এসেছে, সেটিকেই কাঠামোবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা বলছেন উদ্যোক্তরা।

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর একাধিক নতুন প্ল্যাটফর্ম আর দলের আবির্ভাব হয়েছে রাজনীতির ময়দানে। ষোলই জানুয়ারি আসছে আরও একটি প্ল্যাটফর্ম।

শুক্রবার বিকালে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর ঘোষণা আসতে পারে। এই উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে বের হয়ে আসা তরুণরা যেমন আছেন, একইসাথে আছেন বাম ঘরানার ব্যক্তিও।

এমন এক সময় এই প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা এলো যখন স্পষ্টতই তাদের নির্বাচনি সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নেই। তবে কেন এই প্ল্যাটফর্ম?

উদ্যোক্তারা বলছেন, এটি তাৎক্ষণিক নির্বাচনি হিসাবের কোনো প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি সামনে এসেছে, সেটিকেই কাঠামোবদ্ধভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

ভোটের মাঠে না নেমে ‘আন্দোলনভিত্তিক’ এই রাজনৈতিক যাত্রা কতটা জনসমর্থন আদায় করতে পারবে, এবং এটি রাজনীতির কোন দিক নির্দেশ করবে তা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মঙ্গলবার প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়,  জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বাম ও মধ্যপন্থি ভাবাদর্শের অনেকে নতুন এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। গত সেপ্টেম্বরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে পদত্যাগ করা অনিক রায়, মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) এবং অলিক মৃ আছে এই প্ল্যাটফর্মে।

আরও আছেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, লেখক ও গবেষক মীর হুযাইফা আল-মামদূহ, লেখক ফেরদৌস আরা রুমী, ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক নাজিফা জান্নাত, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু, সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদসহ আরও অনেকে।

প্ল্যাটফর্ম থেকেই আসবে রাজনৈতিক দল

গণমাধ্যমের বিভিন্ন খবরে এই প্ল্যাটফর্মের নাম ‘জনযাত্রা’ বলা হয়েছে। তবে এর অন্তত দুইজন সংগঠক আলাপ-কে নিশ্চিত করেছেন যে এই নামে প্ল্যাটফর্মটি হচ্ছে না। তবে চূড়ান্ত হওয়া নামও বলেননি তারা।

প্ল্যাটফর্মটির অন্যতম সংগঠক অনিক রায়ের মতে, শুধু দল ঘোষণা করলেই রাজনীতি টেকসই হয় না, তার আগে প্রয়োজন সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দলিল।

“একটা দল টিকিয়ে রাখতে হলে তার নিজের কিছু অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট থাকতে হয়। এই বেইসিক না থাকলে দল সাসটেইন করা কঠিন,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।

এই বিবেচনায় প্রথমে প্ল্যাটফর্ম, পরে বিস্তর আলোচনার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক দলিল তৈরির কথা ভাবছেন তারা, বলে জানান অনিক।

এতে বিভিন্ন শিক্ষাগত ও সামাজিক পটভূমির মানুষ যুক্ত হচ্ছেন, তবে সবাইকে একত্র করছে গণতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক গণতন্ত্রের ধারণা, বলেন ছাত্র ইউনিয়নের এই সাবেক কর্মী।

অনিক রায় বলেন, “এটা একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। (জানুয়ারির) ১৬ তারিখের ঘোষণার পর আমরা সদস্য সংগ্রহে নামবো।”

নির্বাচনের এই সময়ে কেন?

নির্বাচনের মনোনয়ন ও জোট গঠনের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এই উদ্যোগ কেন? এই প্রশ্নের জবাবে উদ্যোক্তারা বলছেন, এটিই তাদের অবস্থানকে পরিষ্কার করে দিয়েছে।

অনিক রায় মনে করেন, আরও আগে এ ধরনের উদ্যোগ নিলে সেটিকে নির্বাচনি সমঝোতা বা প্রার্থিতা ঘিরে সন্দেহ করা হতো।

“এই সময়ে আসাটাই ভালো হয়েছে। নাহলে সবাই মনে করতো নির্বাচনের কারও সঙ্গে কোনো হিসাব-নিকাশ, জোট, কোনো ক্যান্ডিডেট বের করে আনা হচ্ছে।

“এখন কেউ বলতে পারবে না যে আমরা নির্বাচনের জন্য এসেছি”, তিনি বলেন।

একই কথা বললেন আরেক সংগঠক গবেষক মীর হুযাইফা আল-মামদূহ।

তার মতে জাতীয় নির্বাচনের সময় প্ল্যাটফর্ম গড়ার সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই, কারণ তারা নির্বাচন করছেন না। বরং নির্বাচনের বাইরের পরিসরে থেকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চিন্তা ও সংগঠনের কাজটাই তাদের লক্ষ্য।

কারা থাকছেন প্ল্যাটফর্মে

সংগঠকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা মানুষরা।

অনিক রায় জানান, এই প্ল্যাটফর্মে মাদ্রাসা, ইংলিশ মিডিয়াম, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আসা ব্যক্তিরা রয়েছেন।

পাশাপাশি বাম রাজনীতি, মধ্যপন্থি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারীরাও এতে যুক্ত হচ্ছেন।

মীর হুযাইফা আল-মামদূহ বলছেন, এই বৈচিত্র্যই প্ল্যাটফর্মটির মূল শক্তি। আদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রশ্নে মানুষরা একত্র হচ্ছেন।

“আমরা মধ্যপন্থি একটা রাজনৈতিক দলের দিকে যাবো। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড কওমী মাদ্রাসা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেকেই আছেন বাম রাজনীতি করে আসছেন। এমন অনেকে আছেন মধ্যপন্থি রাজনীতি করে আসছেন”, আলাপ-কে বলেন তিনি।

লক্ষ্য কী

এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে আসছে অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন। উদ্যোক্তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক আলোচনায় পরিবর্তন এলেও অর্থনৈতিক কাঠামোয় তেমন কোনো সংস্কার হয়নি।

‘পুঁজিবাদী শোষণমূলক মডেল বা পুরোপুরি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি’-এর বদলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক গণতান্ত্রিক মডেলের কথা বলছেন অনিক রায়।

তাদের লক্ষ্য এমন একটি  অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে ব্যবসা থাকবে, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণও থাকবে, আবার নাগরিকের মৌলিক চাহিদা ও শোষণমুক্ত জীবনের নিশ্চয়তা থাকবে। 

“আমাদের বেসিক আইডিয়া হলো বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক অর্থনীতি,” যোগ করেন তিনি।

আর হুযাইফা আল মামদূহ লক্ষ্য নিয়ে বলছেন, “মধ্যপন্থি একটা রাজনৈতিক দল যা প্রাণ ও প্রকৃতির বিকাশ নিয়ে কথা বলবে।”

কেন আলাদা

সংগঠকদের দাবি, তাদের এই প্ল্যাটফর্মটি আলাদা কারণ এটি দলকেন্দ্রিক নয়, বরং চিন্তা ও নীতিনির্ভর রাজনৈতিক কাঠামো।

তাদের মতে, প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে ক্ষমতা ও নির্বাচনি সমীকরণকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে এই প্ল্যাটফর্ম অর্থনৈতিক সংস্কারকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে চায়।

“বাংলাদেশে একটা বড় অর্থনৈতিক সংস্কারে যেতে চাই আমরা। জুলাই আন্দোলনের পর অর্থনৈতিক কোনো সংস্কার হয়নি,” বলেন অনিক রায়।

রাজনৈতিকভাবে একটা 'সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক মডেল' তৈরি করতে চান উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে ব্যবসা হবে, রাষ্ট্রেরও নিয়ন্ত্রণ থাকবে। যেন নাগরিকরা শোষণের মধ্যে না পড়ে। সেই বন্দোবস্তের মধ্যে নতুন বাংলাদেশ তৈরি হবে।

“এই জিনিসটার মডেল কী হবে, রাষ্ট্রকে কী করতে হবে, সেই থিসিস নাই। এই আইডিয়াতে যারা একমত, তারা একসাথে হব। বাংলাদেশের সব প্রান্তে যাব। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলব।”

সব রাজনৈতিক দলেরই নিজস্ব মত আছে উল্লেখ করে মামদূহ বলেন, “আমরা মনে করছি মানুষের অর্থনৈতিক স্ট্রাগলের ব্যাপারটি মুখ্য। আমরা মনে করছি এই জায়গা থেকেই আমরা আলাদা।”

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

সংগঠকদের দেওয়া ব্যাখ্যা, লক্ষ্য ও ঘোষণার বাইরেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে এই  প্ল্যাটফর্ম রাজনীতিতে বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফাহাম আব্দুস সালাম আলাপ-কে বলেছেন, “তাদের জন্য শুভকামনা। বাংলাদেশে সেন্টার-লেফট একটা পলিটিকাল পার্টির দরকার আছে।”

আলতাফ পারভেজ

এই প্ল্যাটফর্মকে সাধুবাদ জানিয়েছেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজও। তিনি বলেন, তরুণদের রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়াই উচিত। একাধিকবার নিয়েছে এবং আরও হবে।

চব্বিশের গণঅভুত্থানের আকাঙ্খা পূরণ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সরকার কিছু করতে পারে নাই। বড় রাজনৈতিক দলগুলো অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে বেশ সরে যাচ্ছে। ফলে অভ্যুত্থানে শুধু তরুণরা এখন রাজনৈতিক উদ্যোগ নিবে এটা স্বাভাবিক এবং এটাই প্রত্যাশিত। এটা ইতিবাচকভাবে দেখি।”

আলতাফ পারভেজ বলেন, “বলাটা যত সহজ, কাজ আরও অনেক বেশি কঠিন। আমাদের অপেক্ষা করতে যে তারা ভবিষ্যতে কী করবে।”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে দলকেন্দ্রিক বা ভোটের রাজনীতি মূল শক্তি, সেখানে এই মঞ্চভিত্তিক রাজনীতি কতটা প্রভাব রাখতে পারবে এমন প্রশ্নের জবাবে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আগে দলের ঘোষণাপত্র, সাংগঠনিক লক্ষ্য, রাজনৈতিক লক্ষ্য জানতে হবে। সব বোঝা যাবে তারা কাজে নামলে।”