বিলেত ফেরত এক তরুণ দেশে ফিরে পুরোদমে জড়ালেন রাজনীতিতে। কিংবদন্তি পিতার উত্তরসূরি কেবল নয়, কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় হয়ে এলেন আলোচনায়। তারপর মেয়র হওয়ার লড়াই, সংসদ নির্বাচনে জয়, অতঃপর মন্ত্রিত্ব। তারপর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বারবার বিতর্কিত হওয়া। সবশেষে প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিদায়। ইশরাক হোসেনের রাজনীতির ক্যারিয়ার এরপর কোনদিকে যেতে চলেছে?
সামি আল মেহেদী
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৩ পিএমআপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম
পদত্যাগ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
একজন তরুণ যুবক। গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে পিস্তল। গাড়ি থেকে নেমেই চিৎকার করে ছুটছেন কয়েকজনের দিকে। পেছনে দৌড়াচ্ছে দেহরক্ষীরা। সেখানকার অপরাধী, মাদক কারবারিরা ভয়ে ছোটাছুটি করছে। মোটামুটি একটা অ্যাকশন সিনেমার দৃশ্য বলতে পারেন।শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়ায় ধারণ করা এই ভিডিও প্রকাশিত হয়েছিল একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজেরই ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে। সেই ঘটনার পর দুই দিনও পেরোয়নি। তার পর, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, আর তার ফলশ্রুতিতে মন্ত্রিত্ব থেকে সরে আসা।
তার নাম ইশরাক হোসেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য। তার পিতার লিগ্যাসি আর পরিচয় অত্যন্ত সম্মানের, আর মর্যাদার। সেই পরিচয়ের সুবাদে আর নিজের রাজনৈতিক কাজের জোরে তিনি নিজেও মূলধারার রাজনীতিতে নিজের মতো করে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সাদেক হোসেন খোকার ছেলে তিনি, যাকে পক্ষ-বিপক্ষ সবাই আজীবন সম্মান-সমীহ করে চলেছেন। ঢাকা শহরে বলতে গেলে মেয়রের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠা বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্র্যাক প্ল্যাটুনের মেম্বার সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের রাজনীতিতে আসার ব্যাপারটা অনুমিতই ছিলো। বাবার মতো ইশরাকও ঢাকার মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে ছিলেন, পাঁচ বছর আইনি লড়াই করে আদালতের রায়ে মেয়র ঘোষিত হয়েছিলেন, তবে মেয়র হিসেবে শপথ নিতে পারেননি।
তবে কেউ যদি ভাবেন যে মেয়র হওয়ার জন্য মামলা করে, বা কিংবদন্তী পিতার নামের ঐতিহ্য পেয়েই ইশরাক লাইমলাইটে চলে এসেছেন, তাহলে ভুল করবেন। ইশরাক হোসেন যখন বিদেশে পড়ালেখা করে দেশে ফেরেন, আজকের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তখন একেবারেই কোনঠাসা এক বিরোধী দল। নেতাকর্মীরা জেলে বা ধরপাকড়ের ওপর আছেন। রাস্তায় নামতে না নামতেই আইনশৃংখলা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের লোকজন চড়াও হয়ে যান। সেই সময়েই, বিদেশ ফেরত তরুণ ইশরাক রাজপথে নেতাকর্মীদের নিয়ে নেমেছেন। সামনে থেকেছেন। নেতাকর্মীদের সাথে নিজেও মার খেয়েছেন, ধরপাকড়ের মুখোমুখি হয়েছেন। মার খেতে থাকা কর্মীকে আগলে নিয়ে অন্য সবার কাছ থেকে ছুটিয়ে নিয়ে এসেছেন। ওই সময়ে পুলিশ বা ক্ষমতাসীন দলের মারমুখী অবস্থানের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে জমায়েত বা মিছিল করা খুবই কঠিন কাজ ছিলো তা যে কেউই বলবেন। ঠিক যে সময় বলতে গেলে কেউ রাস্তাতেই নামে না, সেই সময়ে তরুণ একজন নেতা, যার বাবা আবার সাদেক হোসেন খোকা, তার খুব কম সময়েই লাইমলাইটে সামনের দিকে চলে আসতে সময় লাগেনি।
ইশরাক হোসেনের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল, ঢাকায়। স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ও-লেভেল ও এ-লেভেল শেষ করে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। রাজনীতিতে তার পরিচিতির বড় অংশ জুড়ে আছেন তার বাবা, সাদেক হোসেন খোকা। তিনি অবশ্য নিজেও যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসেন, তখন থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং পুরান ঢাকার আসনের সংসদ সদস্য। তার ছেলে ইশরাক যুক্তরাজ্যে ছাত্রদলের শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, আর ২০১৫ সালের কাছাকাছি সময়ে দেশে ফেরেন। বিএনপির তখন কঠিন সময়। আর তখন থেকেই ইশরাক প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিজের সাহসী অবস্থানের জন্য দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠতে থাকেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বাবার আসন ঢাকা-৬-এ বিএনপির মনোনয়ন পান তিনি। সেই নির্বাচনে জয় আসেনি। কিন্তু তার নাম রাজনীতির মঞ্চে প্রত্যাশিতভাবেই চলে আসে।
২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিএনপি মেয়র প্রার্থী করে তরুণ ইশরাক হোসেনকে। তবে কেবলমাত্র পিতার নাম দিয়ে নয়, ইশরাক হোসেনের আলোচনায় আর সামনের দিকে আসার পেছনে বিএনপির কঠিন সময়ে রাজপথে তুমুল সক্রিয় হয়ে ওঠাও বড় কারণ ছিলো। সিটি কর্পোরেশনের সেই নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস জয়ী হন, ঘনমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় পৌনে দুই লাখ ভোটের ব্যবধানে। বিএনপি সেই ফল প্রত্যাখ্যান করে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলে। ইশরাক রাজপথে নয়, যান আদালতে। ২০২০ সালের ৩ মার্চ তিনি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
এর মধ্যেই আরেকটি মামলা তার নাম জড়ায়। ২০২০ সালের নভেম্বরে মতিঝিলে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ৪২ জনের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা হয়, যাতে ইশরাকও আসামি। ২০২২ সালের এপ্রিলে তিনি গ্রেপ্তার হন, পরে আদালত তাঁকে জামিন দেন। মূল মামলাটি ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। সেই সাথে বদলায় ইশরাকের মামলার গতিও। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করেন এবং বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করেন। আদালতে ইশরাক নিজে উপস্থিত ছিলেন, রায়ের পর হয় বিজয় মিছিল।
রায়ের এক মাসের মাথায়, ২৭ এপ্রিল, নির্বাচন কমিশন তাঁকে মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ আর হয় না। সেই শপথ না হওয়ার গল্পটাও দীর্ঘ। পাঁচ বছর আইনি লড়াইয়ের পর পাওয়া রায়, গেজেট আর সমর্থকদের আন্দোলন, কোনোটিই তাঁকে মেয়রের চেয়ারে বসাতে পারেনি। এই লড়াই তাঁকে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে পরিচিত মুখে পরিণত করে। মেয়রের চেয়ার না মিললেও তার রাজনীতির পথ থেমে থাকেনি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ইশরাক আবার প্রার্থী হন বাবার সেই আসন ঢাকা-৬-এ, ধানের শীষ প্রতীকে। এবার তিনি জেতেন, প্রায় ৭৯ হাজার ভোট পান। দ্বিতীয় হন জামায়াতের আব্দুল মান্নান, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রায় ৫৪ হাজার ভোট নিয়ে। এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার ২৪ প্রতিমন্ত্রীর একজন হিসেবে শপথ নেন ইশরাক। দায়িত্ব পান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
তবে সংসদ আর মন্ত্রীসভার মন্ত্রী ইশরাকের ভাবমূর্তি বিভিন্ন সময়েই সোশ্যাল মিডিয়া বা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। দুর্দিনে রাজপথের তুমুল সাহসী ইশরাক ছিলেন প্রশংসিত, তবে নির্বাচনের পরের ইশরাক আলোচনার খোরাক জুগিয়েছেন কখনো স্যালুট দিয়ে, কখনো মেয়র হিসেবে নিজের নাম ব্যানারে রেখে, কিংবা তার অনুসারীদের নগর ভবন ঘেরাও দিয়ে কার্যক্রম আটকে রাখা, বা আরও অনেক কিছু নিয়ে। তিনি তার রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচি বন্ধ রাখেননি, আবার এই ঘটনাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে চর্চিতও করে তুলেছে। বলতেই হয়, বিরোধী দলের সাহসী নেতা ইশরাক হোসেনের যে ভাবমূর্তি অজস্র মানুষের কাছে ছিলো, নির্বাচনে জেতা বা মন্ত্রী হওয়া বা মেয়রের পদের জন্য দাবীদাওয়া করে যেতে থাকা ইশরাক হোসেন সেই ভাবমূর্ত থেকে একটু ভিন্ন দিকে চলে গিয়েছিলেন।
১৭ অক্টোবর, শনিবার। রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুণ্টিঘর রেলগেট এলাকা। বিকেলে এখানে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। অভিযানের ভিডিও তার নিজের পেইজ থেকেই প্রকাশ হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই তিনি পিস্তল উঁচিয়ে চিৎকার করছেন। পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, গুলি করে দেওয়ার কথা। সেই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে ছোটেন। একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি দেন। এক যুবক বলছেন, তিনি গরিব মানুষ, কিছু করেননি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ দেওয়া দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং একজন সরকারি দেহরক্ষী। তাদের কাছেও অস্ত্র ছিলো। ভিডিওর কিছু অংশে পিস্তল ঝাপসা করা হলেও অন্য অংশে সেটি স্পষ্ট। পরে দেখা যায়, আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ওই একই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শনে ছিলেন। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা। তবে সব ছাপিয়ে সারা দেশে মূল আলোচনায় চলে আসে ইশরাক হোসেনের পিস্তল নিয়ে অভিযান।
ভিডিও ছড়িয়ে যেতে একেবারেই সময় লাগেনি। আর এর পর বিভিন্ন মতামত আসতে থাকে। মাদকের বিরুদ্ধে একজন জনপ্রতিনিধি মাঠে নেমেছেন, এটাকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেন। আবার একে ‘ত্রাসের রাজত্বের ইঙ্গিত’, ‘শপথ ভঙ্গ করার মতো কাজ’, ‘দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড’ বা আরও অনেক ধরনের সমালোচনাও করা হলো।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যায় না। ডিএমপি জানিয়েছে, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশরাক এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, তিনি পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে নেওয়া মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। ৩০–৩৫ জন মারমুখী ভঙ্গিতে গাড়িবহরের দিকে এগিয়ে এলে আত্মরক্ষায় অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। অস্ত্র বৈধ, লাইসেন্সপ্রাপ্ত। চার-পাঁচটি অস্থায়ী আস্তানা উচ্ছেদ হয়েছে, ছয়জন আটক হয়েছে।
রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ হওয়ার পর প্রথম আলোসহ একাধিক গণমাধ্যম সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে জানায়, বৈঠকের পর ইশরাককে ডেকে নিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিও খবরটি প্রচার করে। সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইশরাকের ভেরিফায়েড পেজ থেকে বলা হলো, খবরটি সঠিক নয়, পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না, একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গুজব ছড়াচ্ছে। তিনি নিজেও গণমাধ্যমকে বললেন, গুজবে কান না দিতে। তবে মধ্যরাতে, রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুর বদলাল। নতুন পোস্টে লেখা হলো, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়, তাই তৃতীয় বা চতুর্থ কারও মাধ্যমে যাচাই করার দরকার নেই। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হবে। পরদিন দুপুরে মন্ত্রিসভা থেকে "স্বেচ্ছায় অব্যাহতি" নেওয়ার ঘোষণা দেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আরেকটি নাম আসে। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ২৫এ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম আসে। দলীয় নির্দেশনার পর ১লা অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্য পদ ছাড়েন। তার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইশরাকের ঘটনা। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করা আচরণের পর পদত্যাগের নির্দেশ। বিশ্লেষকদের একটি অংশ এটিকে জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখছেন।
ইশরাক হোসেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হতে চেয়েছিলেন, আদালতের রায় পেয়েছিলেন, শপথ নিতে পারেননি। প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন, আট মাসের মাথায় সেটিও অতীত। ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পরবর্তীতে আসলে কোনদিকে, কীভাবে গড়াবে?
ইশরাক এরই মধ্যে জানিয়েছেন, তিনি মেয়র নির্বাচন করবেন এবং মাদকের বিরুদ্ধে তার অভিযান অব্যাহত থাকবে। পদত্যাগ করার ঘোষণার সময় তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি, তার কাজের জন্যও ভুল স্বীকার করেছেন। জনপ্রতিনিধির আচরণ কেমন হওয়া উচিত, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ কতটুকু যথাযথ হলো, তা নিয়েও বিভিন্ন মতামত সোশ্যাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন অনেকেই। পরবর্তীতে ইশরাক হোসেনেও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গতি কোনদিকে যাবে, সেটি এখন সময়ের অপেক্ষা।
উত্থানে-পতনে ইশরাক হোসেন
বিলেত ফেরত এক তরুণ দেশে ফিরে পুরোদমে জড়ালেন রাজনীতিতে। কিংবদন্তি পিতার উত্তরসূরি কেবল নয়, কঠিন সময়ে রাজপথে সক্রিয় হয়ে এলেন আলোচনায়। তারপর মেয়র হওয়ার লড়াই, সংসদ নির্বাচনে জয়, অতঃপর মন্ত্রিত্ব। তারপর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বারবার বিতর্কিত হওয়া। সবশেষে প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিদায়। ইশরাক হোসেনের রাজনীতির ক্যারিয়ার এরপর কোনদিকে যেতে চলেছে?
একজন তরুণ যুবক। গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে পিস্তল। গাড়ি থেকে নেমেই চিৎকার করে ছুটছেন কয়েকজনের দিকে। পেছনে দৌড়াচ্ছে দেহরক্ষীরা। সেখানকার অপরাধী, মাদক কারবারিরা ভয়ে ছোটাছুটি করছে। মোটামুটি একটা অ্যাকশন সিনেমার দৃশ্য বলতে পারেন।শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়ায় ধারণ করা এই ভিডিও প্রকাশিত হয়েছিল একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজেরই ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে। সেই ঘটনার পর দুই দিনও পেরোয়নি। তার পর, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, আর তার ফলশ্রুতিতে মন্ত্রিত্ব থেকে সরে আসা।
তার নাম ইশরাক হোসেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য। তার পিতার লিগ্যাসি আর পরিচয় অত্যন্ত সম্মানের, আর মর্যাদার। সেই পরিচয়ের সুবাদে আর নিজের রাজনৈতিক কাজের জোরে তিনি নিজেও মূলধারার রাজনীতিতে নিজের মতো করে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সাদেক হোসেন খোকার ছেলে তিনি, যাকে পক্ষ-বিপক্ষ সবাই আজীবন সম্মান-সমীহ করে চলেছেন। ঢাকা শহরে বলতে গেলে মেয়রের প্রতিশব্দ হয়ে ওঠা বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্র্যাক প্ল্যাটুনের মেম্বার সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেনের রাজনীতিতে আসার ব্যাপারটা অনুমিতই ছিলো। বাবার মতো ইশরাকও ঢাকার মেয়র হওয়ার লড়াইয়ে ছিলেন, পাঁচ বছর আইনি লড়াই করে আদালতের রায়ে মেয়র ঘোষিত হয়েছিলেন, তবে মেয়র হিসেবে শপথ নিতে পারেননি।
তবে কেউ যদি ভাবেন যে মেয়র হওয়ার জন্য মামলা করে, বা কিংবদন্তী পিতার নামের ঐতিহ্য পেয়েই ইশরাক লাইমলাইটে চলে এসেছেন, তাহলে ভুল করবেন। ইশরাক হোসেন যখন বিদেশে পড়ালেখা করে দেশে ফেরেন, আজকের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তখন একেবারেই কোনঠাসা এক বিরোধী দল। নেতাকর্মীরা জেলে বা ধরপাকড়ের ওপর আছেন। রাস্তায় নামতে না নামতেই আইনশৃংখলা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের লোকজন চড়াও হয়ে যান। সেই সময়েই, বিদেশ ফেরত তরুণ ইশরাক রাজপথে নেতাকর্মীদের নিয়ে নেমেছেন। সামনে থেকেছেন। নেতাকর্মীদের সাথে নিজেও মার খেয়েছেন, ধরপাকড়ের মুখোমুখি হয়েছেন। মার খেতে থাকা কর্মীকে আগলে নিয়ে অন্য সবার কাছ থেকে ছুটিয়ে নিয়ে এসেছেন। ওই সময়ে পুলিশ বা ক্ষমতাসীন দলের মারমুখী অবস্থানের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে জমায়েত বা মিছিল করা খুবই কঠিন কাজ ছিলো তা যে কেউই বলবেন। ঠিক যে সময় বলতে গেলে কেউ রাস্তাতেই নামে না, সেই সময়ে তরুণ একজন নেতা, যার বাবা আবার সাদেক হোসেন খোকা, তার খুব কম সময়েই লাইমলাইটে সামনের দিকে চলে আসতে সময় লাগেনি।
ইশরাক হোসেনের জন্ম ১৯৮৭ সালের ৫ এপ্রিল, ঢাকায়। স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ও-লেভেল ও এ-লেভেল শেষ করে তিনি যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন। রাজনীতিতে তার পরিচিতির বড় অংশ জুড়ে আছেন তার বাবা, সাদেক হোসেন খোকা। তিনি অবশ্য নিজেও যখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসেন, তখন থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এবং পুরান ঢাকার আসনের সংসদ সদস্য। তার ছেলে ইশরাক যুক্তরাজ্যে ছাত্রদলের শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, আর ২০১৫ সালের কাছাকাছি সময়ে দেশে ফেরেন। বিএনপির তখন কঠিন সময়। আর তখন থেকেই ইশরাক প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিজের সাহসী অবস্থানের জন্য দ্রুত পরিচিত হয়ে উঠতে থাকেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে বাবার আসন ঢাকা-৬-এ বিএনপির মনোনয়ন পান তিনি। সেই নির্বাচনে জয় আসেনি। কিন্তু তার নাম রাজনীতির মঞ্চে প্রত্যাশিতভাবেই চলে আসে।
২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। বিএনপি মেয়র প্রার্থী করে তরুণ ইশরাক হোসেনকে। তবে কেবলমাত্র পিতার নাম দিয়ে নয়, ইশরাক হোসেনের আলোচনায় আর সামনের দিকে আসার পেছনে বিএনপির কঠিন সময়ে রাজপথে তুমুল সক্রিয় হয়ে ওঠাও বড় কারণ ছিলো। সিটি কর্পোরেশনের সেই নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস জয়ী হন, ঘনমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় পৌনে দুই লাখ ভোটের ব্যবধানে। বিএনপি সেই ফল প্রত্যাখ্যান করে ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলে। ইশরাক রাজপথে নয়, যান আদালতে। ২০২০ সালের ৩ মার্চ তিনি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন।
এর মধ্যেই আরেকটি মামলা তার নাম জড়ায়। ২০২০ সালের নভেম্বরে মতিঝিলে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ৪২ জনের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা হয়, যাতে ইশরাকও আসামি। ২০২২ সালের এপ্রিলে তিনি গ্রেপ্তার হন, পরে আদালত তাঁকে জামিন দেন। মূল মামলাটি ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যায়। সেই সাথে বদলায় ইশরাকের মামলার গতিও। ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম ২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করেন এবং বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করেন। আদালতে ইশরাক নিজে উপস্থিত ছিলেন, রায়ের পর হয় বিজয় মিছিল।
রায়ের এক মাসের মাথায়, ২৭ এপ্রিল, নির্বাচন কমিশন তাঁকে মেয়র ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু শপথ আর হয় না। সেই শপথ না হওয়ার গল্পটাও দীর্ঘ। পাঁচ বছর আইনি লড়াইয়ের পর পাওয়া রায়, গেজেট আর সমর্থকদের আন্দোলন, কোনোটিই তাঁকে মেয়রের চেয়ারে বসাতে পারেনি। এই লড়াই তাঁকে বিএনপির ভেতরে ও বাইরে পরিচিত মুখে পরিণত করে। মেয়রের চেয়ার না মিললেও তার রাজনীতির পথ থেমে থাকেনি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ইশরাক আবার প্রার্থী হন বাবার সেই আসন ঢাকা-৬-এ, ধানের শীষ প্রতীকে। এবার তিনি জেতেন, প্রায় ৭৯ হাজার ভোট পান। দ্বিতীয় হন জামায়াতের আব্দুল মান্নান, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রায় ৫৪ হাজার ভোট নিয়ে। এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার ২৪ প্রতিমন্ত্রীর একজন হিসেবে শপথ নেন ইশরাক। দায়িত্ব পান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
তবে সংসদ আর মন্ত্রীসভার মন্ত্রী ইশরাকের ভাবমূর্তি বিভিন্ন সময়েই সোশ্যাল মিডিয়া বা গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। দুর্দিনে রাজপথের তুমুল সাহসী ইশরাক ছিলেন প্রশংসিত, তবে নির্বাচনের পরের ইশরাক আলোচনার খোরাক জুগিয়েছেন কখনো স্যালুট দিয়ে, কখনো মেয়র হিসেবে নিজের নাম ব্যানারে রেখে, কিংবা তার অনুসারীদের নগর ভবন ঘেরাও দিয়ে কার্যক্রম আটকে রাখা, বা আরও অনেক কিছু নিয়ে। তিনি তার রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচি বন্ধ রাখেননি, আবার এই ঘটনাগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে চর্চিতও করে তুলেছে। বলতেই হয়, বিরোধী দলের সাহসী নেতা ইশরাক হোসেনের যে ভাবমূর্তি অজস্র মানুষের কাছে ছিলো, নির্বাচনে জেতা বা মন্ত্রী হওয়া বা মেয়রের পদের জন্য দাবীদাওয়া করে যেতে থাকা ইশরাক হোসেন সেই ভাবমূর্ত থেকে একটু ভিন্ন দিকে চলে গিয়েছিলেন।
১৭ অক্টোবর, শনিবার। রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশন-সংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুণ্টিঘর রেলগেট এলাকা। বিকেলে এখানে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। অভিযানের ভিডিও তার নিজের পেইজ থেকেই প্রকাশ হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই তিনি পিস্তল উঁচিয়ে চিৎকার করছেন। পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, গুলি করে দেওয়ার কথা। সেই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে ছোটেন। একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি দেন। এক যুবক বলছেন, তিনি গরিব মানুষ, কিছু করেননি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ দেওয়া দুই ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং একজন সরকারি দেহরক্ষী। তাদের কাছেও অস্ত্র ছিলো। ভিডিওর কিছু অংশে পিস্তল ঝাপসা করা হলেও অন্য অংশে সেটি স্পষ্ট। পরে দেখা যায়, আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। ওই একই দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ১৩টি স্থানে আকস্মিক পরিদর্শনে ছিলেন। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি আবাসিক এলাকা। তবে সব ছাপিয়ে সারা দেশে মূল আলোচনায় চলে আসে ইশরাক হোসেনের পিস্তল নিয়ে অভিযান।
ভিডিও ছড়িয়ে যেতে একেবারেই সময় লাগেনি। আর এর পর বিভিন্ন মতামত আসতে থাকে। মাদকের বিরুদ্ধে একজন জনপ্রতিনিধি মাঠে নেমেছেন, এটাকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেন। আবার একে ‘ত্রাসের রাজত্বের ইঙ্গিত’, ‘শপথ ভঙ্গ করার মতো কাজ’, ‘দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ড’ বা আরও অনেক ধরনের সমালোচনাও করা হলো।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সধারী অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা যায়। কিন্তু অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যায় না। ডিএমপি জানিয়েছে, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইশরাক এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, তিনি পুলিশ ও স্থানীয় নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে নেওয়া মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন। ৩০–৩৫ জন মারমুখী ভঙ্গিতে গাড়িবহরের দিকে এগিয়ে এলে আত্মরক্ষায় অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। অস্ত্র বৈধ, লাইসেন্সপ্রাপ্ত। চার-পাঁচটি অস্থায়ী আস্তানা উচ্ছেদ হয়েছে, ছয়জন আটক হয়েছে।
রবিবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষ হওয়ার পর প্রথম আলোসহ একাধিক গণমাধ্যম সরকারসংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের সূত্রের বরাতে জানায়, বৈঠকের পর ইশরাককে ডেকে নিয়ে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিও খবরটি প্রচার করে। সরকারের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেননি।
রাত সাড়ে ১০টার দিকে ইশরাকের ভেরিফায়েড পেজ থেকে বলা হলো, খবরটি সঠিক নয়, পদত্যাগের প্রশ্নই ওঠে না, একটি মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গুজব ছড়াচ্ছে। তিনি নিজেও গণমাধ্যমকে বললেন, গুজবে কান না দিতে। তবে মধ্যরাতে, রাত সাড়ে ১২টার দিকে সুর বদলাল। নতুন পোস্টে লেখা হলো, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়, তাই তৃতীয় বা চতুর্থ কারও মাধ্যমে যাচাই করার দরকার নেই। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হবে। পরদিন দুপুরে মন্ত্রিসভা থেকে "স্বেচ্ছায় অব্যাহতি" নেওয়ার ঘোষণা দেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আরেকটি নাম আসে। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ২৫এ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় তার ঘনিষ্ঠ স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম আসে। দলীয় নির্দেশনার পর ১লা অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্য পদ ছাড়েন। তার তিন সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ইশরাকের ঘটনা। দুটি ঘটনাতেই দল ও সরকারকে বিব্রত করা আচরণের পর পদত্যাগের নির্দেশ। বিশ্লেষকদের একটি অংশ এটিকে জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখছেন।
ইশরাক হোসেন ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হতে চেয়েছিলেন, আদালতের রায় পেয়েছিলেন, শপথ নিতে পারেননি। প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন, আট মাসের মাথায় সেটিও অতীত। ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার পরবর্তীতে আসলে কোনদিকে, কীভাবে গড়াবে?
ইশরাক এরই মধ্যে জানিয়েছেন, তিনি মেয়র নির্বাচন করবেন এবং মাদকের বিরুদ্ধে তার অভিযান অব্যাহত থাকবে। পদত্যাগ করার ঘোষণার সময় তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের পাশাপাশি, তার কাজের জন্যও ভুল স্বীকার করেছেন। জনপ্রতিনিধির আচরণ কেমন হওয়া উচিত, ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ কতটুকু যথাযথ হলো, তা নিয়েও বিভিন্ন মতামত সোশ্যাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন অনেকেই। পরবর্তীতে ইশরাক হোসেনেও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গতি কোনদিকে যাবে, সেটি এখন সময়ের অপেক্ষা।