এনসিপির কিছু নেতার পদত্যাগ, নিষ্ক্রিয়তা ও ‘গুপ্ত বিএনপি’ প্রসঙ্গ

এনপিসির আইকনিক চরিত্রদের মধ্যে তাসনিম জারার সরে দাঁড়ানো এবং মাহফুজ আলম, নুসরাত তাবাসসুমদের নিষ্ক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত দলকে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেই মনে করছেন  রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। 

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৬:৩৮ পিএম

চূড়ান্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচনী জোট। এই আলোচিত সমালোচিত সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পদত্যাগ করেছেন দলটির বেশ কিছু পরিচিত মুখ আবার অনেকে জানিয়েছেন নির্বাচনে নিষ্ক্রিয় থাকার বিষয়টি । 

এনসিপির আইকনিক চরিত্রদের মধ্যে তাসনিম জারার সরে দাঁড়ানো এবং মাহফুজ আলম, নুসরাত তাবাসসুমদের নিষ্ক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত দলকে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

আবার তাজনূভা জাবীন, মীর আরশাদুল হকের মতো অনান্য যারা ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন এনসিপির নির্বাচনে তাদের বড় কোন প্রভাব পড়বে কিনা তা সময়ই বলে দেবে বলে মনে করছেন অনেকে।

এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক (গণমাধ্যম) আরিফুর রহমান তুহিন আলাপকে বলেন, “সত্যিকার অর্থে তাসনিম জারা তুমুল জনপ্রিয়। তার সরে দাঁড়ানোতে দল কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গণতান্ত্রিক পন্থায় সহযোদ্ধাদের নেয়া সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিতে পারেননি, যা আমাদের ভারাক্রান্ত করেছে।”

এ সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, “কেউ দলে থাকবে কি না বা নির্বাচন করবে কি না, সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।”

পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “ব্যক্তি তার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটা আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখি। অতীতেও দু-একজন পদত্যাগ করেছিল। তখনও বিভিন্ন আশঙ্কার কথা বলা হয়েছিল। এখনও বলা হচ্ছে। আমরা আশা করি, সঠিক রাজনীতির মাধ্যমে আমরা সামনে এগিয়ে যাবো।’ 

সরে দাঁড়ালেন যারা

জামায়াতের সঙ্গে ‘সম্ভাব্য জোট বিষয়ে নীতিগত আপত্তি’র বিষয় জানিয়ে ২৭ ডিসেম্বরই স্মারকলিপি দিয়ে ছিলেন এনসিপির ৩০ সদস্য। এরপরও রবিবার জামায়েতের সঙ্গে জোটের ঘোষণা দেয় দলটি। যার পর পরই ফেসবুকে একে একে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন দলটির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা। 

এনসিপি থেকে ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব, ডা. তাসনিম জারা; যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাজনুভা জাবীন ও যুগ্ম সদস্য সচিব এবং চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমন্বয়ক মীর আরশাদুল হক পদত্যাগ করেছেন।

এদের মধ্যে ডা. তাসনিম জারার জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। তার দলত্যাগ জুলাই পরবর্তী সময়ে জন্ম নেয়া দলটিকে ভেতরে ও বাইরে থেকে নানা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। 

২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি দলটিতে যোগ দিয়ে ছিলেন। এর আগে কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর জারা যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে 'এভিডেন্স-বেসড হেলথ কেয়ার' বিষয়ে স্নাতকোত্তর (ডিসটিঙ্কশনসহ) ডিগ্রি অর্জন করেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে এনসিপির গঠনে নারী নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের এভাবে সরে যাওয়া নবীন দলটির জন্য বড় ধরনের হোঁচট। আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন এনসিপির জন্য প্রথম নির্বাচন। এই মুহূর্তে দলটির ভেতরের বিভাজন নির্বাচনী রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।”

অন্যদিকে ডা. তাজনুভা জাবীন ও মীর আরশাদুল হকের পদত্যাগ প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করেন আরিফুর রহমান তুহিন।

তিনি বলেন, “তাসনূভার সরে দাঁড়ানো বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। আর মীর তো বিএনপিতে যোগ দেয়ার জন্য সরে দাঁড়ালেন। আমার কাছে তো মনে হয় তিনি আমাদের দলে গুপ্ত বিএনপি হয়েই ছিলেন।”

নিষ্ক্রিয় যারা

এনসিপি যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, তিনি ‘এই এনসিপির’ অংশ হচ্ছেন না।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির জোট বাঁধার ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা পর রোববার রাতে ফেইসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, “বিদ্যমান বাস্তবতায় আমার জুলাই সহযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান, স্নেহ এবং বন্ধুত্ব মুছে যাবে না। কিন্তু, আমি এই এনসিপির অংশ হচ্ছি না।”

নির্বাচনকালে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সব কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয় থাকবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক নুসরাত তাবাসসুমও।

রবিবার তিনি ফেইসবুক পেইজে লেখেন, “আমি নুসরাত তাবাসসুম, (যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি) নিজেকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচনকালীন সময়ে পার্টির সব কার্যক্রম থেকে নিষ্ক্রিয় করছি এবং অবস্থা পুনর্বিবেচনাক্রমে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা করছি।”

তিনি আরও লেখেন, “আজ ২৮ ডিসেম্বর ঠিক ১০ মাস পর জামায়াতে ইসলামীসহ ১০ দলীয় জোটে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, আমি মনে করি এনসিপির সর্বোচ্চ নেতৃবৃন্দ এবং নীতিনির্ধারকেরা নিজেরাই এনসিপির মূল বক্তব্য থেকে চ্যুত হয়েছেন।

আখতার হোসেন বলেন, ‘এনসিপিতে সব মতাদর্শের মানুষের জায়গা আছে।’ 

তবে এদের বোঝানোর চেষ্টা করা হবে বলেও জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম, “যারা বিরোধিতা করছে, তাদের সাথে আমরা কথা বলব। তাদের আরও বোঝানোর চেষ্টা করব। আশা করি, তারা এনসিপির এই সিদ্ধান্তের সাথেই থাকবে।”