‘এখন আর কেউ পহেলা বৈশাখ খোঁজে না, খোঁজে ১৪ই এপ্রিল কবে’
‘একটা সময় আমাদের এই বাংলা ক্যালেন্ডারকে তথাকথিত পণ্ডিতেরা ১৪ই এপ্রিল, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে ফিক্স করে দিলেন। মানে ওরা ঘুরলে আমরা ঘুরব, ওরা না ঘুরলে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। এই যে একটা ঔপনিবেশিক মানসিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের ক্যালেন্ডারটাকে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে সাপেক্ষ করে দিল, এখানেই আমাদের বাংলা বর্ষের কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেয়া হলো।’
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৪ এএমআপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩১ পিএম
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন তার ‘দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান: রাইটিংস অন ইন্ডিয়ান হিস্টোরি, কালচার অ্যান্ড আইডেন্টিটি’ বইয়ে লিখেছেন, সম্রাট আকবরের পঞ্জিকা ‘তারিখ-ই-ইলাহি’তে ১৫৫৬ সনকে ‘শূন্য সাল’ ধরা হয়েছে এবং এটি ছিল হিন্দু পঞ্জিকা ও ইসলামি পঞ্জিকার মিশ্রণ।
বাংলা নববর্ষের উদ্ভব, উদযাপনের ধরণ ও আনুষ্ঠানিকতার শব্দচয়ন নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই নানা বিতর্কের জন্ম হয়।
শোভাযাত্রা থামাতে ২০২৩ সালেও হাইকোর্টে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ওলামা লীগ নববর্ষ উদযাপনকেই হারাম ঘোষণা করে একটি ফতোয়াহ দেয়।
২০১৭ সালে জামায়াতে ইসলামীর তখনকার নায়েবে আমীর মজিবুর রহমানও একইরকম ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, হিন্দু সংস্কৃতির’ অংশ হওয়ায় এর উদযাপন হারাম এবং এটা তা থামাতে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
রিট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দলের ‘হারাম’ ফতোয়া ও দৈনন্দিন জীবনে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়েই শোভাযাত্রা - তা হোক মঙ্গল, আনন্দ বা বৈশাখী, পান্তা-ইলিশ ও নানা জায়গায় নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় বাংলা বছর বা বঙ্গাব্দের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ।
হালে হয়তো পহেলা বৈশাখ বেশিরভাগ মানুষের কাছে বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম তারিখের চেয়ে এপ্রিলের ১৪ তারিখ হিসেবেই বেশি পরিচিত।
এদিন বাদে অন্য যেকোনো দিনে পত্রিকার ওপরে ইংরেজি তারিখের পাশে লিখা বাংলা তারিখটি না দেখলে হয়তো অনেকে বলতেও পারবেন না যে, আজকে বাংলা পঞ্জিকায় কত তারিখ।
চীন, ইরান ও আরবের অনেক দেশেই নিজেদের পঞ্জিকা অনুযায়ী শুধু নববর্ষ উদযাপনই না, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও যেকোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক পরিসরে নিজেদের পঞ্জিকাই ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু ভাষার জন্য সংগ্রাম করে আন্তর্জাতিক ‘মাতৃভাষা দিবস’-এর স্বীকৃতি পাওয়া বাংলাদেশে কেন বাংলা পঞ্জিকা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাপেক্ষ হয়ে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ ও পহেলা ফাল্গুন উদযাপনের রিমাইন্ডার হয়ে আছে?
বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব নিয়ে বিতর্ক
বিতর্ক রয়েছে বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব নিয়েও। আছে নানা মুনির নানা মত।
সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমর্থিত অভিমত হলো, মোঘল সম্রাট আকবরই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের উদ্ভাবন করেছিলেন।
যদিও অনেকে মনে করেন, সম্রাট আকবরের অনেক আগে বাঙালিদের মধ্যে কৃষির সূত্র ধরে বাংলা সনের উদ্ভব।
তবে তা কবে শুরু হয়েছিল, এ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা কিংবা ঐকমত্য নেই।
এদিকে সম্রাট আকবরের বদলে রাজা শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের উদ্ভাবক বলে দাবি করে আসছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)।
তবে ভারতের ইতিহাসবিদদের বয়ানে, মোঘল সম্রাট আকবরের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়।
১৯৫৪ সালে ভারতীয় পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান ড. মেঘনাদ সাহা ঘোষণা করেন যে, সম্রাট আকবরই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক।
ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সম্রাট আকবরই ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন চালু করেছিলেন।
“হিজরি সনকে সৌর বছরে পরিণত করে বাংলা সন চালু করা হয়েছিল এবং সম্রাট আকবর যা চেয়েছিলেন তা হলো রাজস্ব প্রশাসনের সংকট দূর করা,” বলেন তিনি।
এই অভিমতের সমর্থন পাওয়া যায় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনের ‘দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান: রাইটিংস অন ইন্ডিয়ান হিস্টোরি, কালচার অ্যান্ড আইডেন্টিটি’ বইয়ে।
সেখানে তিনি লিখেছেন, সম্রাট আকবরের পঞ্জিকা ‘তারিখ-ই-ইলাহি’তে ১৫৫৬ সনকে ‘শূন্য সাল’ ধরা হয়েছে এবং এটি ছিল হিন্দু পঞ্জিকা ও ইসলামি পঞ্জিকার মিশ্রণ।
তিনি আরও লিখেছেন, এটি দ্বারা খাজনা আদায়ে সুবিধা হতো, কেননা হিজরি সাল অনুসরণ করলে ফসল তোলার সময়ের সাথে খাজনা আদায়ের সময়ের অমিল হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা হতো।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, হিজরি সাল অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হলে, খাজনা আদায়ের সময় ও ফসল উৎপাদনের সময়ে মিল থাকত না।
খাজনা আদায়ের সময় যখন আসত, খাজনা দেয়ার মতো ফসলই থাকত না। এই সমস্যা সমাধান করতেই সম্রাট আকবর বাংলার ফসল ফলার সময়ের সাথে বছর মেলাতে চন্দ্র বছর থেকে সৌর বছরে নিয়ে বাংলা পঞ্জিকা শুরু করেন।
তবে রাজা শশাঙ্ক, প্রাচীন বাংলার কৃষক কিংবা সম্রাট আকবর, উদ্ভাবক যেই হোক না কেন, বর্তমান বাস্তবতায় পত্রিকার ওপরের অংশ, সংবিধানের প্রস্তাবনার শেষ লাইন এবং নানা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা তারিখের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।
বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর বাংলা বছরের হিসাবে নেওয়া হলেও, সেটিও এখন নেওয়া হয় খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে।
যদিও গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা ফসল উৎপাদন কিংবা ফসল তোলার সময়ের হিসাব রাখতে বাংলা মাসগুলোর হিসাব রাখেন। এর বাইরে দৈনন্দিন জীবনে বাংলা তারিখের তেমন ব্যবহার নেই বললেই চলে।
বাংলা সন-তারিখের চর্চা বাড়ানো যাবে কীভাবে
একাত্তরের বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামের বীজ বপন হয়েছিল বায়ান্নর ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময়।
স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ, চীন ও অন্যান্য সভ্যতার মতো নিজস্ব পঞ্জিকাকে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে আনতে পারছে না কেন এ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর দে বলেন, এর জন্য দায়ী বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে বাংলা পঞ্জিকার প্রয়োগ কিংবা চর্চা না থাকা।
“বাংলা ক্যালেন্ডার না শুধু, বাংলা বছরটা আমরা আমাদের জীবনের সাথে চর্চা করি না বলেই আমরা মেলাতে পারি না। এটি আসলে চর্চার ব্যাপার। যেমন পহেলা বৈশাখেও কিন্তু আমরা একটা অনুষ্ঠানই করি মাত্র,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
এজন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বায়তুল্লাহ কাদেরী।
“আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানে কার্যক্রমের মধ্যে বাংলা ক্যালেন্ডারটি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”
এছাড়া মানুষের “মানসিকতার পরিবর্তন’ প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
“নিজের ভাষা, সংস্কৃতিকে আমার মনে হয় সম্মান ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন,” যোগ করেন কাদেরী।
ড. সৌমিত্র শেখর দে বলেন, যেকোনো জীবন্ত পঞ্জিকাই চলমান থাকে কিংবা পরিবর্তন হয়।
“তবে বাংলা পঞ্জিকাকে ১৪ই এপ্রিল দ্বারা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে জুড়ে দেয়ার কারণেই এর চর্চা মুছে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা জীবন্ত ক্যালেন্ডারই মুভ করে। আপনি দেখবেন যে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডার, যেটা দিয়ে আমরা চলি, সেটাতে লিপ ইয়ার আছে। ফলে ফেব্রুয়ারি সবসময়ই যে আটাশে হবে তা না, বা সবসময় উনত্রিশে হবে তাও না। নওরোজের ক্ষেত্রেও তাই।”
“আমাদের চাঁদ দেখে ঈদ করতে হয় কেন? চাঁদ কখন উঠবে, কখন উঠবে না তার ওপর নির্ভর করে এখানে রমজান হয় বা ঈদ হয়। একই অবস্থায়, বংলা ক্যালেন্ডার, যেটা অ্যালাইভ ক্যালেন্ডার ছিল, সেই ক্যালেন্ডারেও কিন্তু হর্ষবৃদ্ধি ছিল, অর্থাৎ কমবেশ ছিল।”
অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর আরো বলেন, “বাংলা পঞ্জিকাকে ইংরেজি সনের সাথে যুক্ত করাটা একটি ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন। যার কারণে বাংলা বর্ষের ‘কফিনে শেষ পেরেক’ ঠুকে দেয়া হয়।”
“একটা সময় আমাদের এই বাংলা ক্যালেন্ডারকে তথাকথিত পণ্ডিতেরা ১৪ই এপ্রিল, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে ফিক্স করে দিলেন। মানে ওরা ঘুরলে আমরা ঘুরব, ওরা না ঘুরলে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। এই যে একটা ঔপনিবেশিক মানসিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের ক্যালেন্ডারটাকে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে সাপেক্ষ করে দিল, এখানেই হচ্ছে আমাদের বাংলা বর্ষের কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেওয়া হলো। এরপরে আর কেউ পহেলা বৈশাখও খোঁজে না, ওরা খোঁজে ১৪ই এপ্রিল কবে।”
ড. বায়তুল্লাহ কাদেরী মনে করেন, এর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, তেমনি স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে শিক্ষকেরাও অবদান রাখতে পারেন।
নববর্ষ উদযাপন নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই ‘জায়েজ-নাজায়েজ’ বিতর্ক ফিরে আসে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে মিলে যায় আওয়ামী লীগের সমর্থিত ওলামা লীগের সুর, মঙ্গল-আনন্দ-বৈশাখী নিয়ে লেগে যায় শব্দযুদ্ধ।
তবে সব বিতর্কের শেষে ঠিকই বাংলাদেশের বাঙালিরা নববর্ষ উদযাপন করে।
তাহলে সেই বর্ষের প্রথম দিন, সেই পঞ্জিকা নিয়ে জ্ঞান, চর্চা এবং প্রয়োগের অভাবের জন্য আসলে কী দায়ী? ঔপনিবেশিক মানসিকতা, রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার অবহেলা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অনুষ্ঠান ও উদযাপনের বাইরে বাংলা পঞ্জিকার প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেছে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে?
‘এখন আর কেউ পহেলা বৈশাখ খোঁজে না, খোঁজে ১৪ই এপ্রিল কবে’
‘একটা সময় আমাদের এই বাংলা ক্যালেন্ডারকে তথাকথিত পণ্ডিতেরা ১৪ই এপ্রিল, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে ফিক্স করে দিলেন। মানে ওরা ঘুরলে আমরা ঘুরব, ওরা না ঘুরলে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। এই যে একটা ঔপনিবেশিক মানসিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের ক্যালেন্ডারটাকে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে সাপেক্ষ করে দিল, এখানেই আমাদের বাংলা বর্ষের কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেয়া হলো।’
বাংলা নববর্ষের উদ্ভব, উদযাপনের ধরণ ও আনুষ্ঠানিকতার শব্দচয়ন নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই নানা বিতর্কের জন্ম হয়।
শোভাযাত্রা থামাতে ২০২৩ সালেও হাইকোর্টে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ওলামা লীগ নববর্ষ উদযাপনকেই হারাম ঘোষণা করে একটি ফতোয়াহ দেয়।
২০১৭ সালে জামায়াতে ইসলামীর তখনকার নায়েবে আমীর মজিবুর রহমানও একইরকম ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, হিন্দু সংস্কৃতির’ অংশ হওয়ায় এর উদযাপন হারাম এবং এটা তা থামাতে সরকারকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
রিট থেকে শুরু করে বিভিন্ন দলের ‘হারাম’ ফতোয়া ও দৈনন্দিন জীবনে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়েই শোভাযাত্রা - তা হোক মঙ্গল, আনন্দ বা বৈশাখী, পান্তা-ইলিশ ও নানা জায়গায় নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় বাংলা বছর বা বঙ্গাব্দের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ।
হালে হয়তো পহেলা বৈশাখ বেশিরভাগ মানুষের কাছে বাংলা বছরের প্রথম মাসের প্রথম তারিখের চেয়ে এপ্রিলের ১৪ তারিখ হিসেবেই বেশি পরিচিত।
এদিন বাদে অন্য যেকোনো দিনে পত্রিকার ওপরে ইংরেজি তারিখের পাশে লিখা বাংলা তারিখটি না দেখলে হয়তো অনেকে বলতেও পারবেন না যে, আজকে বাংলা পঞ্জিকায় কত তারিখ।
চীন, ইরান ও আরবের অনেক দেশেই নিজেদের পঞ্জিকা অনুযায়ী শুধু নববর্ষ উদযাপনই না, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও যেকোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক পরিসরে নিজেদের পঞ্জিকাই ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু ভাষার জন্য সংগ্রাম করে আন্তর্জাতিক ‘মাতৃভাষা দিবস’-এর স্বীকৃতি পাওয়া বাংলাদেশে কেন বাংলা পঞ্জিকা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাপেক্ষ হয়ে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ ও পহেলা ফাল্গুন উদযাপনের রিমাইন্ডার হয়ে আছে?
বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব নিয়ে বিতর্ক
বিতর্ক রয়েছে বাংলা পঞ্জিকার উদ্ভব নিয়েও। আছে নানা মুনির নানা মত।
সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সমর্থিত অভিমত হলো, মোঘল সম্রাট আকবরই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের উদ্ভাবন করেছিলেন।
যদিও অনেকে মনে করেন, সম্রাট আকবরের অনেক আগে বাঙালিদের মধ্যে কৃষির সূত্র ধরে বাংলা সনের উদ্ভব।
তবে তা কবে শুরু হয়েছিল, এ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা কিংবা ঐকমত্য নেই।
এদিকে সম্রাট আকবরের বদলে রাজা শশাঙ্ককে বঙ্গাব্দের উদ্ভাবক বলে দাবি করে আসছে ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস)।
তবে ভারতের ইতিহাসবিদদের বয়ানে, মোঘল সম্রাট আকবরের পক্ষে সমর্থন পাওয়া যায়।
১৯৫৪ সালে ভারতীয় পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির প্রধান ড. মেঘনাদ সাহা ঘোষণা করেন যে, সম্রাট আকবরই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক।
ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বিবিসি বাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সম্রাট আকবরই ফসলি সন হিসেবে বাংলা সন চালু করেছিলেন।
“হিজরি সনকে সৌর বছরে পরিণত করে বাংলা সন চালু করা হয়েছিল এবং সম্রাট আকবর যা চেয়েছিলেন তা হলো রাজস্ব প্রশাসনের সংকট দূর করা,” বলেন তিনি।
এই অভিমতের সমর্থন পাওয়া যায় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনের ‘দি আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান: রাইটিংস অন ইন্ডিয়ান হিস্টোরি, কালচার অ্যান্ড আইডেন্টিটি’ বইয়ে।
সেখানে তিনি লিখেছেন, সম্রাট আকবরের পঞ্জিকা ‘তারিখ-ই-ইলাহি’তে ১৫৫৬ সনকে ‘শূন্য সাল’ ধরা হয়েছে এবং এটি ছিল হিন্দু পঞ্জিকা ও ইসলামি পঞ্জিকার মিশ্রণ।
তিনি আরও লিখেছেন, এটি দ্বারা খাজনা আদায়ে সুবিধা হতো, কেননা হিজরি সাল অনুসরণ করলে ফসল তোলার সময়ের সাথে খাজনা আদায়ের সময়ের অমিল হওয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা হতো।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, হিজরি সাল অনুযায়ী খাজনা আদায় করা হলে, খাজনা আদায়ের সময় ও ফসল উৎপাদনের সময়ে মিল থাকত না।
খাজনা আদায়ের সময় যখন আসত, খাজনা দেয়ার মতো ফসলই থাকত না। এই সমস্যা সমাধান করতেই সম্রাট আকবর বাংলার ফসল ফলার সময়ের সাথে বছর মেলাতে চন্দ্র বছর থেকে সৌর বছরে নিয়ে বাংলা পঞ্জিকা শুরু করেন।
তবে রাজা শশাঙ্ক, প্রাচীন বাংলার কৃষক কিংবা সম্রাট আকবর, উদ্ভাবক যেই হোক না কেন, বর্তমান বাস্তবতায় পত্রিকার ওপরের অংশ, সংবিধানের প্রস্তাবনার শেষ লাইন এবং নানা আনুষ্ঠানিকতার বাইরে বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা তারিখের অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।
বছর দুয়েক আগে পর্যন্ত জমির খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর বাংলা বছরের হিসাবে নেওয়া হলেও, সেটিও এখন নেওয়া হয় খ্রিষ্টাব্দের হিসাবে।
যদিও গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা ফসল উৎপাদন কিংবা ফসল তোলার সময়ের হিসাব রাখতে বাংলা মাসগুলোর হিসাব রাখেন। এর বাইরে দৈনন্দিন জীবনে বাংলা তারিখের তেমন ব্যবহার নেই বললেই চলে।
বাংলা সন-তারিখের চর্চা বাড়ানো যাবে কীভাবে
একাত্তরের বাংলাদেশের চূড়ান্ত স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামের বীজ বপন হয়েছিল বায়ান্নর ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময়।
স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ, চীন ও অন্যান্য সভ্যতার মতো নিজস্ব পঞ্জিকাকে আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে আনতে পারছে না কেন এ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর দে বলেন, এর জন্য দায়ী বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে বাংলা পঞ্জিকার প্রয়োগ কিংবা চর্চা না থাকা।
“বাংলা ক্যালেন্ডার না শুধু, বাংলা বছরটা আমরা আমাদের জীবনের সাথে চর্চা করি না বলেই আমরা মেলাতে পারি না। এটি আসলে চর্চার ব্যাপার। যেমন পহেলা বৈশাখেও কিন্তু আমরা একটা অনুষ্ঠানই করি মাত্র,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
এজন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে দায়ী করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. বায়তুল্লাহ কাদেরী।
“আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের যে শিক্ষাব্যবস্থা, সেখানে কার্যক্রমের মধ্যে বাংলা ক্যালেন্ডারটি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”
এছাড়া মানুষের “মানসিকতার পরিবর্তন’ প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
“নিজের ভাষা, সংস্কৃতিকে আমার মনে হয় সম্মান ও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন,” যোগ করেন কাদেরী।
ড. সৌমিত্র শেখর দে বলেন, যেকোনো জীবন্ত পঞ্জিকাই চলমান থাকে কিংবা পরিবর্তন হয়।
“তবে বাংলা পঞ্জিকাকে ১৪ই এপ্রিল দ্বারা ইংরেজি ক্যালেন্ডারের সাথে জুড়ে দেয়ার কারণেই এর চর্চা মুছে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “প্রত্যেকটা জীবন্ত ক্যালেন্ডারই মুভ করে। আপনি দেখবেন যে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডার, যেটা দিয়ে আমরা চলি, সেটাতে লিপ ইয়ার আছে। ফলে ফেব্রুয়ারি সবসময়ই যে আটাশে হবে তা না, বা সবসময় উনত্রিশে হবে তাও না। নওরোজের ক্ষেত্রেও তাই।”
“আমাদের চাঁদ দেখে ঈদ করতে হয় কেন? চাঁদ কখন উঠবে, কখন উঠবে না তার ওপর নির্ভর করে এখানে রমজান হয় বা ঈদ হয়। একই অবস্থায়, বংলা ক্যালেন্ডার, যেটা অ্যালাইভ ক্যালেন্ডার ছিল, সেই ক্যালেন্ডারেও কিন্তু হর্ষবৃদ্ধি ছিল, অর্থাৎ কমবেশ ছিল।”
অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর আরো বলেন, “বাংলা পঞ্জিকাকে ইংরেজি সনের সাথে যুক্ত করাটা একটি ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিফলন। যার কারণে বাংলা বর্ষের ‘কফিনে শেষ পেরেক’ ঠুকে দেয়া হয়।”
“একটা সময় আমাদের এই বাংলা ক্যালেন্ডারকে তথাকথিত পণ্ডিতেরা ১৪ই এপ্রিল, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে ফিক্স করে দিলেন। মানে ওরা ঘুরলে আমরা ঘুরব, ওরা না ঘুরলে আমরা দাঁড়িয়ে থাকব। এই যে একটা ঔপনিবেশিক মানসিকতার মধ্য দিয়ে আমাদের ক্যালেন্ডারটাকে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের সাথে সাপেক্ষ করে দিল, এখানেই হচ্ছে আমাদের বাংলা বর্ষের কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেওয়া হলো। এরপরে আর কেউ পহেলা বৈশাখও খোঁজে না, ওরা খোঁজে ১৪ই এপ্রিল কবে।”
ড. বায়তুল্লাহ কাদেরী মনে করেন, এর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, তেমনি স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রে শিক্ষকেরাও অবদান রাখতে পারেন।
নববর্ষ উদযাপন নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই ‘জায়েজ-নাজায়েজ’ বিতর্ক ফিরে আসে। জামায়াতে ইসলামীর সাথে মিলে যায় আওয়ামী লীগের সমর্থিত ওলামা লীগের সুর, মঙ্গল-আনন্দ-বৈশাখী নিয়ে লেগে যায় শব্দযুদ্ধ।
তবে সব বিতর্কের শেষে ঠিকই বাংলাদেশের বাঙালিরা নববর্ষ উদযাপন করে।
তাহলে সেই বর্ষের প্রথম দিন, সেই পঞ্জিকা নিয়ে জ্ঞান, চর্চা এবং প্রয়োগের অভাবের জন্য আসলে কী দায়ী? ঔপনিবেশিক মানসিকতা, রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার অবহেলা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অনুষ্ঠান ও উদযাপনের বাইরে বাংলা পঞ্জিকার প্রয়োজনীয়তা কি ফুরিয়ে গেছে বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে?