আজ আন্তর্জাতিক মা দিবস। পৃথিবীর প্রতিটি বিশেষ দিবসের পেছনে থাকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্য বা অনুভূতি। মা দিবসও তেমনই একটি দিন, যেদিন মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। তবে সত্যি বলতে, মা কি শুধু একটি দিনের জন্য? একজন সন্তানের কাছে মা প্রতিদিনের অনুভূতি, প্রতিদিনের প্রয়োজন, প্রতিদিনের আশ্রয়। কাছে থাকুন বা দূরে থাকুন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের উপস্থিতি অনুভূত হয়। তাই মা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি মায়ের প্রতি ভালোবাসা স্মরণ করার একটি উপলক্ষ মাত্র।
বিশ্বজুড়ে বহু বছর ধরেই নানা আকারে মা দিবস পালিত হয়ে আসছে। আজকের আধুনিক মা দিবসের যে পরিচিত রূপ আমরা দেখি, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, সংগ্রাম এবং কিছু মানুষের আন্তরিক উদ্যোগ।
মাতৃ দিবসের শুরুর ইতিহাস মূলত উনিশ শতকের আমেরিকায়। এর অন্যতম পূর্বসূরি ছিলেন দাসপ্রথাবিরোধী ও নারী অধিকারকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হাউ। ১৮৭০ সালে তিনি “মাদার্স ডে প্রোক্লেমেশন” নামে একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা লেখেন। যেখানে তিনি মায়েদের যুদ্ধ ও সহিংসতার বিরুদ্ধে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মায়েরা যদি এক হন, তবে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
এরপর মাতৃ দিবসকে জনপ্রিয় করতে আরও অনেকে কাজ করেন। জুলিয়েট ক্যালহাউন ব্লেকলি, মেরি টোলস স্যাসিন এবং ফ্র্যাঙ্ক হ্যারিং—তাদের অবদানও ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধুনিক মা দিবসের সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে আনা জার্ভিস।
আনা জার্ভিস ছিলেন এক অসাধারণ নারী। তিনি নিজে কখনও বিয়ে করেননি, সন্তানের মা-ও হননি। কিন্তু নিজের মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়। তার মা আনা রিভস জার্ভিস ছিলেন সমাজসেবী। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় তিনি আহত সৈন্যদের সেবা করেছেন এবং নারীদের নিয়ে “ডে ওয়ার্ক ক্লাব” গঠন করেছিলেন। এই ক্লাবের উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং শিশু মৃত্যুহার কমানো।
আনা রিভস জার্ভিস নিজের জীবনে নয়টি সন্তান হারিয়েছিলেন। সেই অসহনীয় বেদনা থেকেই হয়তো তিনি অন্য মায়েদের সন্তানদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। ১৯০৫ সালের ৯ই মে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যু আনা জার্ভিসকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। এরপর ১৯০৭ সালে মায়ের স্মরণে তিনি একটি ছোট্ট স্মরণসভার আয়োজন করেন। আর ১৯০৮ সালের মে মাসে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি মেথডিস্ট গির্জায় যেখানে আনার মায়ের যাতায়াত ছিলো। আনুষ্ঠানিকভাবে সেখানে প্রথম মা দিবস পালিত হয়। দিনটি ছিল মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার।
এরপর আনা জার্ভিস সংবাদপত্র, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং রাজনীতিবিদদের কাছে চিঠি লিখে মায়েদের সম্মানে একটি জাতীয় দিবস চালুর দাবি জানান। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে সরকারি ছুটিসহ “মাদার্স ডে” হিসেবে ঘোষণা করেন। তারপর থেকেই বিশ্বের বহু দেশে এই দিনে মা দিবস পালিত হয়ে আসছে।
তবে শুধু আমেরিকাতেই নয়, মাতৃ দিবসের ইতিহাস ইউরোপেও অনেক পুরোনো। যুক্তরাজ্যে ষোড়শ শতাব্দী থেকেই “মাদারিং সানডে” নামে একটি দিন পালিত হতো। এটি ছিল লেন্টের চতুর্থ রবিবার। সেদিন দূরে থাকা সন্তানরা বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাত। ভৃত্যদেরও ছুটি দেওয়া হতো, যেন তারাও নিজেদের মায়ের কাছে যেতে পারে।
পরিবারগুলো একত্রিত হয়ে মায়েদের সম্মান জানাত। সন্তানরা মায়ের জন্য ছোট উপহার, কেক কিংবা ফুল নিয়ে যেত। বিশেষ করে “সিমনেল কেক” ছিল সেই দিনের ঐতিহ্যবাহী খাবার। গির্জায় যাওয়ার পথে বুনো ফুল সংগ্রহ করে মাকে উপহার দেওয়ার রীতিও ছিল খুব জনপ্রিয়। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজও মা দিবসে ফুলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
বিশেষ করে কার্নেশন ফুল মা দিবসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। গোলাপি বা লাল কার্নেশন জীবিত মায়ের ভালোবাসার প্রতীক, আর সাদা কার্নেশন প্রয়াত মায়ের স্মৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। আজও পৃথিবীর অনেক দেশে মা দিবসে কার্নেশন ফুল উপহার দেওয়ার রীতি প্রচলিত।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন দিনে মা দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টিরও বেশি দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস উদযাপিত হয়। এই দিনে সন্তানেরা মাকে ফুল, উপহার কিংবা শুভেচ্ছা কার্ড দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে।
মেক্সিকোতে প্রতি বছর ১০ই মে মা দিবস পালিত হয়। সেখানে মায়েদের জন্য বিশেষ গান গাওয়া হয়। থাইল্যান্ডে ১২ই আগস্ট, রানির জন্মদিনে মা দিবস পালন করা হয়। জাপানে লাল কার্নেশন ফুল দিয়ে মায়েদের সম্মান জানানো হয়। আরব দেশগুলোতে বসন্তের প্রথম দিন ২১এ মার্চ মা দিবস পালিত হয়। ফ্রান্সে মে মাসের শেষ রবিবার অথবা জুনের প্রথম রবিবার মা দিবস উদযাপন করা হয়। ইরানে হযরত ফাতিমা (রা.)-এর জন্মদিন মা দিবস হিসেবে পালিত হয়। রাশিয়ায় নভেম্বরের শেষ রবিবার এই দিনটি উদযাপিত হয়।
প্রাচীন গ্রিসেও দেবতাদের মা “রিয়া”-র সম্মানে বসন্ত উৎসব পালনের ইতিহাস পাওয়া যায়। অর্থাৎ, মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর ঐতিহ্য মানবসভ্যতার বহু পুরোনো সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ।
আজকের দিনে মা দিবস নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। কেউ মাকে নিয়ে রেস্তোরাঁয় যান, কেউ ফুল বা উপহার দেন, কেউ আবার শুধুই সময় দেন। কারণ অনেক সময় একটি আন্তরিক আলাপ, একটি আলিঙ্গন কিংবা “মা, তোমাকে ভালোবাসি”—এই ছোট্ট কথাটাই সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে ওঠে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মা দিবস অনেকাংশে বাণিজ্যিকও হয়ে উঠেছে। ফুল, কার্ড, উপহার—সবকিছু ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশাল ব্যবসা। আর এই বিষয়টি নিয়েই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন আনা জার্ভিস নিজে। তিনি চেয়েছিলেন, মা দিবস হোক মায়ের প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার দিন। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি ব্যবসায়িক উৎসবে পরিণত হতে থাকে।
১৯২০ সালের দিকে তিনি মানুষকে মা দিবসে অতিরিক্ত ফুল, কার্ড বা মিষ্টি কেনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। এমনকি “মাদার্স ডে” নাম ব্যবহার করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও মামলা করেছিলেন। নিজের ব্যক্তিগত সম্পদের বড় অংশ তিনি এই লড়াইয়ে ব্যয় করেন।
আসলে আনা জার্ভিসের উপলব্ধি ছিল খুব গভীর। তিনি বুঝেছিলেন, মায়ের ভালোবাসার মূল্য কোনো দামি উপহার দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। মায়ের প্রয়োজন সন্তানের আন্তরিকতা, সময়, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
আমরাও হয়তো অনেক সময় ব্যস্ততার ভিড়ে মাকে সময় দিতে ভুলে যাই। অথচ মা সারাজীবন সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন। সন্তানের ছোট্ট একটি ফোনকল, একটি খোঁজ নেওয়া, কিংবা পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করা—এতেই তার পৃথিবী পূর্ণ হয়ে যায়।
মা এমন একজন মানুষ, যিনি নিজের কষ্ট গোপন রেখে সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে চান। নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের স্বপ্ন পূরণ করেন। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সবচেয়ে বড় উদাহরণ যদি কিছু থাকে, তবে তার নাম মা।
তাই মা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যাঁকে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, তাঁকে যেন সবচেয়ে বেশি অবহেলা না করি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনেও প্রকাশ পাক।
কারণ মা শুধু একদিনের কোনো উৎসব নন। মা মানে প্রতিদিনের প্রার্থনা, প্রতিদিনের আশ্রয়, প্রতিদিনের ভালোবাসা। পৃথিবীর সব সম্পর্ক বদলে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা কখনও বদলায় না।
কারণ মা কোনো এক দিনের নয়, মা আজীবনের।



