বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে এক সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘আলোড়ন সৃষ্টি’ করা, পাঠকপ্রিয়তা পাওয়া এবং ‘নতুন কিছু’ উপহার দেওয়া দৈনিক জনকণ্ঠ এখন মৃত্যু পথযাত্রী।
‘নাজুক’ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যখন প্রত্যন্ত অঞ্চলে দৈনিক সংবাদপত্র পৌঁছাতো সন্ধেবেলা কিংবা পরেরদিন, তখন দেশের পাঁচ জায়গা থেকে একযোগে প্রকাশিত হয়ে সকালেই সংবাদপত্র পাঠের ক্ষুধা মিটিয়েছিলো জনকণ্ঠ।
কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের কনটেন্ট চাহিদা বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এক সময় ছিলো একেবারেই উপেক্ষিত।
প্রথমবারের মতো স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের জন্য ‘শিক্ষামূলক’ কনটেন্ট প্রকাশ করে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণেও এগিয়ে এসেছিলো পত্রিকাটি।
জনকণ্ঠের ‘শিক্ষাসাগর’ এতটাই জনপ্রিয় ও পাঠকপ্রিয় হয়েছিলো যে, পরে যেসব সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তারাও ‘শিক্ষামূলক’ কনটেন্ট প্রকাশের ধারা অব্যাহত রাখে।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রভাবশালী বয়ান তৈরি এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সম্পাদকীয় অবস্থান বজায় রাখতে ‘শক্তিশালী’ রাজনৈতিক ভাষ্যকার, লেখক, গবেষক ও ন্যারেটরদের লেখা ছাপা হতো জনকণ্ঠে।
পাশাপাশি, নবীন ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সমন্বয়ে ‘দক্ষ’ সংবাদ বিভাগ তৈরি করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে নিজস্ব ‘প্রভাববলয়’ গড়ে তুলতে সক্ষম হয় পত্রিকাটি।
কিন্তু প্রথম প্রজন্ম যেতে না যেতেই ৩৩ বছরের পথচলায় সেই জনকণ্ঠ এখন অশীতিপর বৃদ্ধ, মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
ইস্কাটনের ‘জনকণ্ঠ ভবন’ এক সময় ছিলো বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ঐশ্বর্যের প্রতীক, ডেইলি স্টারের নিজস্ব ভবন হওয়ার আগ পর্যন্ত আর কোনো পত্রিকার ওইরকম ‘জৌলুসময়’ ভবনই ছিলো না।
জনকণ্ঠ ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই তাকাতেন উঁচু বিল্ডিংয়ের নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর দিকে।
‘দেনার দায়ে’ সেই ভবন এখন নিলামে উঠেছে। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অনেকের স্মৃতি বিজড়িত এবং দেশের সংবাদপত্র ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জনকণ্ঠ ভবনটি।
মার্চ মাসের শেষের দিক থেকে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ, সচল নেই ওয়েবসাইটও।
আবার কবে চালু হবে, সেই অপেক্ষার প্রহর গুনছেন সেখানকার বেতনভাতা বাকি থাকা সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা।
২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘মব সৃষ্টি করে’ জনকণ্ঠ দখলের ‘নজিরবিহীন’ ঘটনা আলোচনায় আসে।
এরপর পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। এখন নিভু নিভু প্রদীপের শেষ আলো জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
“আমরা (জনকণ্ঠ) ঠেকানোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নিচ্ছি,” জনকণ্ঠের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিষয়ে আলাপ-কে একথা বলেন পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক শামীমা এ খান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এক সময়ের ‘প্রভাবশালী’ পত্রিকা জনকণ্ঠের সংকট এতটা ঘনীভূত হয়ে ‘দেউলিয়াত্ব’-এর পর্যায়ে গেলো কীভাবে?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দ্বিতীয় প্রজন্ম এসে গণমাধ্যম শিল্প এগিয়ে নিয়ে গেছেন, এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে নেই।
তাহলে জনকণ্ঠও কি সেই চেনা অন্ধকারেই হারিয়ে যেতে চলেছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, জনকণ্ঠ সংকটের মূলে রয়েছে, প্রযুুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, নেতৃত্বের অভাব এবং উদ্যোক্তাদের উদাসীনতা।
শুরুতে তুমুলভাবে গর্জে ওঠা, অপেক্ষাকৃত ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে পরিচিত পাওয়া এবং পরে ‘বিতর্কিত ও দলীয় আনুগত্যপূর্ণ’ সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ; সব মিলিয়ে জনকণ্ঠের জৌলুস কমতে শুরু করে নতুন শতাব্দী শুরুর সময়েই।
প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদকীয় নেতাদের শূন্যতা, শুরু থেকে জনকণ্ঠে থাকা একঝাঁক ‘দক্ষ’ সাংবাদিকের অন্যত্র চাকরি নেওয়া, সম্পাদক ও প্রকাশের সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক ‘চাপ ও জুলুম’-এর শিকারের সমন্বিত রূপই জনকণ্ঠকে আজকের ‘নাজুক’ অবস্থায় নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আগে থেকেই চলে আসা জনকণ্ঠের নানা সংকট এবং গণমাধ্যমটিকে টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টাকে “আইসিইউ”-তে রেখে বাঁচানোর চেষ্টা বলে মনে করছেন এক সময় পত্রিকাটিতে কাজ করা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল।
‘অত্যন্ত জটিল’ এই পরিস্থিতি কাটিয়ে জনকণ্ঠ আবার পাঠকপ্রিয়তা পাবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
একবার যেহেতু পাঠকপ্রিয়তা হারানোর পর বাংলাদেশে কোনো সংবাদপত্রের আবারও জনপ্রিয় হওয়ার নজির নেই, তাই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে জনকণ্ঠ কি ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বাংলাদেশের ‘প্রথম আধুনিক’ ছাপা পত্রিকার শুরুটা জেনে আসা যাক।
জনকণ্ঠের উত্থান ও আধুনিক সংবাদপত্রের ছোঁয়া
জনকণ্ঠ যখন প্রকাশিত হয়, তখন বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগত ছিলো প্রাণবন্ত, রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত এবং ছাপা পত্রিকার জন্য সময় ছিলো ‘অনুকূল’।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ফিরে আসে সংসদীয় গণতন্ত্র, সামরিক স্বৈরাচারের শাসন থেকে মুক্ত হয়ে বাক স্বাধীনতা এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গন নতুন জোয়ারে প্লাবিত হয়।
বহুদলীয় রাজনীতি, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির প্রভাবে দেশের সংবাদপত্র শিল্প প্রবেশ করে নতুন ধারায়।
তবে দ্রুত সম্প্রসারণশীল এই খাতে রাজনৈতিক মেরূকরণ ছিলো তীব্র এবং নানা রূপান্তরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলছিলো।
১৯৯১ সালে প্রকাশিত হয় দৈনিক আজকের কাগজ এবং এর পরের বছর ১৯৯২ সালে বাজারে আসে দৈনিক ভোরের কাগজ। তখন সাপ্তাহিক পত্রিকার দাপটের মধ্যেও এই দুটি দৈনিক বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতে নতুন ধারা সংযোজন করে।
সেই সময় বিটিভি ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল, বেসরকারি টিভি চ্যানেল ছিলো না। সাধারণ মানুষের কাছে ইন্টারনেট ছিলো অধরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, তখনকার দৈনিক পত্রিকাগুলোর সম্পাদকীয় নীতি ছিলো ‘পক্ষপাতদুষ্ট’; বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলের প্রতি রাজনৈতিক ঝোঁক ছিলো একেবারে পরিষ্কার।
তখনও ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক ছিলো ইত্তেফাক। দৈনিক সংবাদ ছিলো বাম ঘেঁষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার জন্য পরিচিত এবং ইসলামপন্থি পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয় ছিলো ইনকিলাব।
নতুন ধাঁচের চলিত ভাষা ও রিপোর্টিংয়ের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠে আজকের কাগজ এবং ফিচারধর্মী উপস্থাপনার জন্য আলোচিত হয় ভোরের কাগজ।
এই রকম সময় ১৯৯৩ সালের ২১এ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় দৈনিক জনকণ্ঠ। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বাজারে সহজেই জায়গা করে নেয় পত্রিকাটি।
“জনকণ্ঠ যখন শুরু হয়, তখন বাংলাদেশে (দৈনিক) সংবাদপত্রের চাহিদা ছিলো। ইনকিলাবের মতো মৌলবাদী, যাদেরকে অনেকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে জানতো, তাদের বিপরীতে একটা দৈনিক পত্রিকার বাজার ছিলো। সেই বাজারটা ধরবার জন্য জনকণ্ঠের আগমন,” আলাপ-কে বলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক আর রাজী।
জনকণ্ঠ আসার আগেই জাতীয় রাজনীতি, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সাহিত্য ও আন্তর্জাতিক খবরের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছিলো দৈনিক পত্রিকাগুলো। ঢাকার বড় বড় পত্রিকাগুলোর সার্কুলেশন দ্রুত বাড়ছিলো।
সকালে পত্রিকা কেনা হয়ে উঠেছিলো শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের নিয়মিত অংশ। কিন্তু তখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দৈনিক পত্রিকা পৌঁছাতো দেরিতে। কোনো কোনো অঞ্চলে, বিশেষ করে গ্রামে সংবাদপত্র যেতো পরেরদিন।
“জনকণ্ঠ সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে একযোগে পত্রিকা ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়ে। ফলে যে পত্রিকা একসময় বিকেল বা সন্ধ্যায় মফস্বলে পৌঁছাতো, সেটিই সকালবেলায় পাঠকের হাতে পৌঁছানো শুরু করলো। সংবাদপত্র জগতে এটি ছিলো এক বিপ্লব,” আলাপ-কে বলেন জনকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাজেদ রহমান।
যশোরের এই সাংবাদিক জনকণ্ঠের সঙ্গে জড়িত ২৬ বছর ধরে। আগে তার বড় ভাই শামছুর রহমান ছিলেন জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি। সন্ত্রাসীদের নিয়ে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের মাঝপথে ২০০০ সালে যশোরে নিজ অফিসের ভেতরে গুলি করে হত্যা করা হয় শামছুর রহমানকে।
প্রকাশিত হয়ে সকালেই দেশের মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় জনকণ্ঠ। তখন একমাত্র দৈনিক হিসেবে নিজস্ব মাইক্রোওয়েভ সিস্টেম ব্যবহার করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া ও সিলেট থেকে একযোগে পত্রিকা ছাপা করা শুরু করে জনকণ্ঠ।
অফসেট প্রেসে ঝকঝকে চার রঙা পত্রিকাটি নজর কাড়ে সবার।
সাংবাদিকতার শিক্ষক আর রাজী বলেন, “জনকণ্ঠ বাজার ধরবার চেষ্টা করেছিলো। তারা ব্যাপকভাবে মাইক্রোওয়েভ সিস্টেমে ঢাকার বাইরে চারটা জায়গা থেকে বের করে। ওইটা একটা ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলো।”
“বাণিজ্যিক মুভ যেটাকে বলা যায়, বাণিজ্য কীভাবে হবে, সেটা তারা মাথায় রেখেছিলেন। এটা বোঝা যায়, বিভিন্ন জায়গা থেকে বের করবার চেষ্টার মধ্যে।”
আর রাজী আরও বলেন, “এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম ফোর কালার বা চার রঙা পত্রিকা। ছাপা হতো অফসেট প্রেসে। একবারে বেশি পরিমাণে ছাপতে পারতো। দেশের সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিলো। এটা মনে রাখা দরকার যে, সে সময় যমুনা ব্রিজও ছিলো না। যোগাযোগ ব্যবস্থা অতো ভালো ছিলো না।”
জনকণ্ঠের অফসেট প্রিন্টিং ও আধুনিক উপস্থাপনা সহজেই পাঠকদের নজর কাড়ে। পত্রিকার প্রচলিত লেআউট ভেঙে ফেলে আকর্ষণীয় করা হয়। বড় বড় শিরোনাম, রঙিন উপস্থাপনা, আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক রিপোর্টিং এবং অনুসন্ধানী ধারার লেখার মাধ্যমে দ্রুতই আলাদা জায়গা পায়।
অনেকে তখন একে “আক্রমণাত্মক আধুনিক বাংলা দৈনিক” হিসেবেও দেখতেন।
সম্পাদকীয় নীতিতে যুদ্ধাপরাধ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে ‘কড়া অবস্থান’ নেয় পত্রিকাটি। সেই সময় যুদ্ধাপরাধের বিচার জাতীয় রাজনীতিতে বড় ইস্যু না হলেও জনকণ্ঠ এ বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখে যেতে থাকে।
এ কারণে পত্রিকাটি যেমন প্রশংসিত হয়েছিলো, তেমনি তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক আক্রমণের মুখেও পড়েছিলো।
পাশাপাশি সাংবাদিকতার ধরনেও কিছু পরিবর্তন আনে। সে সময় নতুন একটি ধারা তৈরি হচ্ছিলো। গুরুত্ব বাড়ছিলো মানবিক গল্প ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের। এছাড়া রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, ফিচার সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য পাতার গুরুত্বও বাড়ছিলো।
জনকণ্ঠ এই পরিবর্তনের ঢেউয়ের মধ্যে আবির্ভূত হয়ে দ্রুত বড় পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হয়।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল জনকণ্ঠের শুরু থেকেই সেখানকার রিপোর্টিং বিভাগে যুক্ত হন। কাছ থেকে দেখেছিলেন নতুন পত্রিকাটির প্রস্তুতি ও বেড়ে ওঠা।
“জনকণ্ঠের সাফল্যের মূল কারণ হলো- ওই সময়ে একটা শূন্যতা ছিলো সংবাদপত্র জগতে এবং পাঠকদের মধ্যে। একটা অপ্রাপ্তি ছিলো। তখন সবচেয়ে বড় পত্রিকা ছিলো ইত্তেফাক, ইনকিলাব। জনকণ্ঠ যখন ঢুকলো, আমার মনে হয়েছে ইয়াং জেনারেশনের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা তারা করলো,” বলেন তিনি।
“একটা গ্যাপ ছিলো। ইয়াং জেনারেশন কি চায়? নতুনরা কি চায়? ওই দুইটা পত্রিকা টাচ করতো না। যে কারণে জনকণ্ঠ ওই জায়গাটা করে নেয়।”
তোয়াব খান ও কনটেন্ট বৈচিত্র্য
জনকণ্ঠের শুরু থেকে প্রায় তিন দশক পত্রিকাটির প্রাণভোমরা ছিলেন উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান। ১৯৯২ সালে যোগ দিয়ে ২০২১ সালে জনকণ্ঠ ছাড়ার আগে একই পদে ছিলেন তিনি।
যদিও পত্রিকাটির সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও বোরহান আহমেদ। কিন্তু তোয়াব খানই ছিলেন ‘সর্বেসর্বা’।
মাসুদ কামাল বলেন, “তোয়াব খান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু ভার্চুয়ালি আমরা দেখতাম- সম্পাদক, উপদেষ্টা সম্পাদক বা নির্বাহী সম্পাদক- সবকিছুর দায়িত্ব তোয়াব খানই বহন করতেন। এমনকি নিউজ এডিটরের কাজটাও উনিই করতেন। সম্পাদক সাহেব, মালিক যিনি- উনি কোনো নিউজের আগেপিছে ছিলেন না।”
সাংবাদিকতা ও সরকারি চাকরি মিলে বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ছিলো তোয়াব খানের। দৈনিক আজাদ ও মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে সাংবাদিকতার পথিকৃত মোহাম্মদ আকরম খাঁ-র ভাগনে ছিলেন তিনি।
তোয়াব খানের সাংবাদিকতা শুরু পঞ্চাশের দশকে। জনতা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দৈনিক বাংলার সম্পাদক হন তিনি।
দুই বছর ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিব। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদেরও প্রেসসচিব ছিলেন তোয়াব খান।
১৯৮০ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শব্দসৈনিক।
যখন জনকণ্ঠ প্রকাশের প্রস্তুতি প্রায় শেষের দিকে, তখন পত্রিকাটিকে যোগ দেন তোয়াব খান। আর যোগ দিয়েই আমূল পরিবর্তন আনেন তিনি।
মাসুদ কামাল বলেন, “জনকণ্ঠ আমার জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রেখেছে এই কারণে যে, জনকণ্ঠের একেবারে শুরুরও আগে থেকে আমি জনকণ্ঠে জড়িত হয়েছি।”
“এটা প্রকাশিত হলো ১৯৯৩ সালের ২১এ ফেব্রুয়ারি। কথা ছিলো যে, ১৯৯২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রকাশিত হবে। হয়নি তোয়াব খানের কারণে। যখন ১৬ই ডিসেম্বরের পরিকল্পনা হচ্ছিলো, তখন তোয়াব খান এখানে জয়েন করেননি। জয়েন করলেন যতদূর মনে পড়ে, ডিসেম্বরের আট তারিখে ১৯৯২ সালে। আমি জনকণ্ঠে যোগ দেয় ’৯২-এর নভেম্বরের ১৫ তারিখে। তখন এটার মূল লোক ছিলেন বোরহান আহমেদ।”
“তোয়াব খান জয়েন করেই, ডামি দেখে পরেরদিনই বললেন যে, তোমরা যে এটা বের করতেছো, এটা দিয়ে পত্রিকা চালানো যাবে না। তারপরে এটা ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে বের হলো।”
তোয়াব খান দায়িত্ব নিয়েই পরিকল্পনার খোলনলচে একেবারে বদলে ফেললেন। আর এতেই জনকণ্ঠ এগিয়ে যেতে শুরু করলো তরতর করে।
তিনি সিরিয়াস পাঠকদের জন্য কলাম লেখক হিসেবে জড়ো করলেন একদল বুত্তিবৃত্তিক লেখক, গবেষক ও অধ্যাপকদের। জনকণ্ঠে গুরুত্ব পেলো বিশ্লেষণী ও মতামতধর্মী ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন।
‘সাধু সাবধান’ শিরোনামের একটি লেখা দ্রুতই পাঠকের নজর কাড়লো। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মতামতধর্মী প্রতিবেদন লেখা হতো সাধু সাবধান শিরোনামে।
‘আড়ি পেতে শোনা’ নামে একটি বিভাগ খোলা হয়। সরকারের উচ্চপর্যায়, বিরোধী দল বা ক্ষমতার অলিগলিতে কী চলছে, তা গোপন সূত্রের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হতো এই নামে।
অপরাধ প্রতিবেদন বিভাগ ছিলো শক্তিশালী। ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ঘটনার ক্ষেত্রে ফলো-আপ ও তদন্তমূলক প্রতিবেদন থাকতো।
আর ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলোর মতো ‘রগরগে’ বর্ণনা ও খোলামেলা ছবিও প্রকাশিত হতো, যেটা অনেক বাঙালি পাঠকের কাছে সমালোচনা বিষয় হয়ে ওঠে।
জনকণ্ঠের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় আলাপ-কে বলেন, “তোয়াব ভাই একটু সেনসেশনাল নিউজ পছন্দ করতেন। উনার এই একটু ত্রুটি ছিলো সাংবাদিকতায়। যে কারণে কিছু, কিছু জিনিস দিয়ে জনকণ্ঠ হালকা হয়ে যেতো।”
‘সেই রাজাকার’ নামে জনকণ্ঠের একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন সাড়া ফেলে দেয়। বিশেষ অনুসন্ধানী সেই প্রতিবেদনে থাকতো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর তালিকা এবং তাদের অপকর্মের ফিরিস্তি।
এছাড়া খেলাধুলা ও বিনোদনের পর্যাপ্ত কনটেন্ট থাকতো। পাশাপাশি ছাপা হতে থাকে প্রচুর ফিচার।
পেছনের পাতার নির্দিষ্ট জায়গায় প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হওয়া ফিচারে শহরের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও নৈসর্গিকতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হতো।
তবে সবচেয়ে অভিনব বিষয় ছিলো শিক্ষাসাগর। দেশে প্রথমবারের মতো শিক্ষামূলক কনটেন্ট গণমাধ্যমটির সম্প্রসারণ দ্রুত বাড়িয়ে তোলে।
সাংবাদিকতার শিক্ষক আর রাজী বলেন, “ভালো ভালো সাংবাদিকদের জনকণ্ঠ নিয়োগ দিয়েছিলো। মোনাজাতউদ্দিন চারণ সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। শিক্ষাসাগর নামে একটা বিভাগ করেছিলো, যেটার মাধ্যমে শিক্ষার মার্কেট ধরার চেষ্টা করে।”
“এইসব মিলে জনকণ্ঠকে বিশাল কর্মযজ্ঞ বলেই মনে হয়েছিলো। কিন্তু পরে মার্কেট বিস্তৃত হলো। প্রগতিশীল ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সাংবাদিকতাতে আরও অনেকেই অংশ নিলো। দেশের পরিস্থিতিও বদলে যেতে থাকলো।”
জনকণ্ঠে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার এখলাসউদ্দিন আহমদ, যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক পেয়েছিলেন।
ফিচার সম্পাদক হিসেবে তিনি যোগ দেওয়ার পর পত্রিকাটিতে একটা বড় পরিবর্তন এসেছিলো বলে মনে করেন জনকণ্ঠের সাবেক নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “শুরুতেই ইয়াংদের মধ্যে এটা জনপ্রিয় হলো। পত্রিকাটিতে সাহিত্য ও মতামতে পরিবর্তন আনলেন এখলাসউদ্দিন আহমদ যোগ দেওয়ার পরে। একেবারে শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের লেখা সেখানে নিয়মিত ছাপা হতে লাগলো।”
“ওই সময় বাঙালি সমাজে যে বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন, তারা সবাই তখন জনকণ্ঠকেন্দ্রিক হয়ে গেলো। এর আগে আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ ভেতরে মতামত পাতা দিয়েছে। কিন্তু সেখানে ‘যে কেউ’ ওপিনিয়ন লিখতেন। সংবাদ-এর পরে যারা প্রকৃত বুদ্ধিজীবী এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান আছে, ওনারাই কিন্তু জনকণ্ঠে লিখতেন। এইখানে জনকণ্ঠের আলাদা জায়গা হয়ে গেলো।”
জনকণ্ঠ প্রকাশের শুরুর দিকেই তোয়াব খান কীভাবে কনটেন্ট পরিকল্পনা করেছিলেন সেই আভাস পাওয়া যায় সাংবাদিক মাসুদ কামালের বর্ণনায়।
“জনকণ্ঠ নারীদের জন্য কনটেন্ট দিলো। আমার মনে আছে, তোয়াব খান মিটিংয়ে বলতেন, কোন পত্রিকা বাসায় রাখা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেন বাসার গৃহিণীরা। কাজেই নারীদের বিষয়টা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। নারীরা চায় সন্তানের পড়াশোনা ও অন্যান্য।”
তিনি বলেন, “আমার বিবেচনায় জনকণ্ঠ সম্পূর্ণভাবে সাংবাদিকতার রীতিনীতি ভেঙে নতুন জিনিস চালু করলো, যার নাম দিলো শিক্ষাসাগর। শিক্ষাসাগর আসলে কিছুই ছিলো না, এটা ছিলো আসলে নোট বই। খুব ভালো ভালো লোক দিয়ে উনারা নোট লিখে দিতেন এবং শিক্ষাসাগরের নোটগুলি বাজারের প্রচলিত নোটের থেকে অনেক ভালো হতো। যে কারণে গৃহিণীরা তাদের বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য এই নোটগুলো ব্যবহার করতেন।”
শুরুতে ভারসাম্য, পরে ‘বিতর্কিত’ সম্পাদকীয় নীতি
জনকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশের শুরুতে সম্পাদকীয় নীতিমালায় ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ নীতি বজায় থাকলেও পরে তা ‘একপেশে’ হয়ে যায় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পত্রিকাটির সম্পাদক ও প্রকাশক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ছিলেন ব্যবসায়ী, মুক্তিযোদ্ধা এবং গ্লোব-জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।
তার ভাই এম হামিদুল্লাহ খান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এবং পরে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিতে ফিরে যান।
দুই ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয় উল্লেখ করে মাসুদ কামাল বলেন, “যে কারণে উনাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ ছিলো এবং স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে তারা নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।”
শুরুতে জনকণ্ঠ কীভাবে ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ করে চলেছিলো তাও বর্ণনা করেন মাসুদ কামাল।
“আমার স্পষ্ট মনে আছে, শুরুর দিকে জনকণ্ঠ ভবনে ঢুকলেই দুটো ছবি দেখতাম আমি। একটা হলো- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, আরেকটা জিয়াউর রহমানের। পাশাপাশি দুইটা ছবি তারা টাঙিয়ে রাখতো।”
“এর মাধ্যমে তারা একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করলো-বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ-দুইটাই একই রকমভাবে মূল্যায়ন করবো,” যোগ করেন মাসুদ কামাল।
জনকণ্ঠের সম্পাদকীয় নীতির অন্যতম ত্রুটি হিসেবে ‘আওয়ামী লীগ ঘেঁষা’ অবস্থানকে চিহ্নিত করেন সমালোকরা।
তাহলে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় জনকণ্ঠের অবস্থান কেমন ছিলো? জনকণ্ঠ কি তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতো?
মাসুদ কামাল বলেন, “করতো। তোয়াব খান এক সময় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সচিব। যে কারণে বঙ্গবন্ধুর প্রতি উনার একটা প্রীতি বা প্রেম কাজ করবেই। তারপরেও উনি আবার প্রফেশনাল ছিলেন। উনি জিয়াউর রহমান সাহেবের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এরশাদ সাহেবের সময়ও প্রেস সচিব ছিলেন।”
“মানে সব সরকারের সঙ্গেই উনি কাজ করেছেন। অনেকটা প্রফেশনাল ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিবেচনায়, উনি একটু বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক ছিলেন। কিন্তু উনি শেখ হাসিনাকে অতটা পছন্দ করতেন বলে আমার কাছে মনে হয় নাই।”
মাসুদ কামাল বলেন, ১৯৯৬ সালের যে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিলো, সেই সময় ‘রাজনৈতিক’ ভূমিকায় ছিলো না জনকণ্ঠ।
“জনকণ্ঠ তখন নিরপেক্ষভাবেই কাজ করতো। একটা জায়গায় তারা খুব দৃঢ় ছিলো। সেটা হলো- মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে। ওই একটা ব্যাপার ছাড়া সব জায়গায় তারা ঠিক ছিলেন। মানে যা ঘটনা তাই করতেন।”
এরপর ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় সরকারবিরোধী ‘অনেকগুলো’ নিউজ জনকণ্ঠ করেছে বলে জানান মাসুদ কামাল।
“২০০১-এর শুরুর দিকে একটা সিরিজ করেছিলো, যখন আওয়ামী লীগের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিরিজটার নামই ছিলো- ‘শেষ সময়ে যা পাই’। ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে, এই সময়ে যে যতটা লুটপাট করতে পারে। এই জন্য আলাদা একটা সিরিজই করেছিলো।”
মাসুদ কামাল বলেন, “আরেকটা সিরিজ হতো সবসময়। ওইটা খুব জনপ্রিয় ছিলো। সাধু সাবধান। এইটা বেসিক্যালি ছিলো সরকারের সমালোচনামূলক লেখা, সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা।”
“আমার মনে আছে, ওই সময় শেখ হাসিনার সরকারের বিদায়ের আগে, গণভবনটা উনি এবং উনার পরিবারের নামে লিখে নিলেন। এইটা নিয়ে কিন্তু সাধু সাবধানে আমি নিজে লিখেছিলাম। অনেককিছু লিখেছিলাম আমাদের মতো করে। এমনও হয়েছিলো যে, আমাদের ওই লেখাটাকে কোট করে বিএনপি আবার পোস্টারও বানিয়েছিলো।”
“ওই সময় কিন্তু জনকণ্ঠের ভূমিকাটা আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিলো না,” বলেন মাসুদ কামাল।
কিন্তু পরে জনকণ্ঠের সম্পাদকীয় নীতি ‘আওয়ামী লীগ ঘেঁষা হয়ে উঠেছিলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আর রাজী বলেন, “পত্রিকাটাও অনেক বেশি রাজনীতিপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলো। এক সময় মনে হতো, এটা বাংলার বাণীর মতোই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পত্রিকা।”
কিন্তু কেন জনকণ্ঠ আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলো, সেই কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও কখন থেকে পক্ষ নিয়েছিলো সেই বর্ণনা দেন মাসুদ কামাল।
“জনকণ্ঠের ভূমিকা আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে গেলো ২০০১-এ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরে। লতিফুর রহমানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন আসলো, তারপরে দেখলাম জনকণ্ঠের ভূমিকা পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দিকে চলে গেলো।”
মাসুদ কামাল আরো বলেন, “১৯৯৩ থেকে ২০০০ পর্যন্ত-এই সাত বছর জনকণ্ঠ রাজত্ব করেছে। কিন্তু ২০০১-এর নির্বাচন সামনে রেখে জনকণ্ঠ আনঅফিসিয়ালি সিদ্ধান্ত নিলো, তারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে। এবং ২০০১-এর নির্বাচনে সারাদেশে তারা আওয়ামী লীগকে এক ধরনের সাপোর্ট দেওয়ার চেষ্টা করলো। তারা ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করলো যে, এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগই ফিরে আসবে।”
“কিন্তু সেই সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে চিন্তা ছিলো অন্যরকম। সাধারণ মানুষ ছিলো বিএনপির পক্ষে। যে কারণে বিএনপি জিতেছিলো। সাধারণ মানুষের যে সেন্টিমেন্ট, তার বিরুদ্ধে জনকণ্ঠ অবস্থান নিলো। বিএনপি ক্ষমতায় আসায় সাধারণ মানুষের কাছে প্রমাণ হলো যে, জনকণ্ঠের সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো।”
“সেই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও জনকণ্ঠ নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরলো না,” মন্তব্য করেন মাসুদ কামাল।
“পত্রিকাটা আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে গেলো। আওয়ামী লীগকেই তারা প্রমোট করা শুরু করলো,” যোগ করেন তিনি।
২০০১-এর নির্বাচনে পরাজিত হয়ে বিরোধীদল হয় আওয়ামী লীগ। জনকণ্ঠ তখন সরকারবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় পত্রিকার প্রচার সংখ্যা ‘কিছুটা’ হলেও ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়েও তখন অপেক্ষা করছিলো আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
সেই চ্যালেঞ্জ হলো- বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগমন। এক সময় যে পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে জনকণ্ঠ পরিচিতো ছিলো দৃঢ় অবস্থানের জন্য, সেই জায়গা নড়বড়ে হতে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ হওয়ার আগেই।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয় দৈনিক প্রথম আলো। পত্রিকাটির ফিচারসহ অন্যান্য কনটেন্ট এতটাই বৈচিত্র্যময় ছিলো যে, সেই ধাক্কায় বাংলাদেশের সাপ্তাহিক পত্রিকার বাজার প্রায় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত হয় আরেকটি ‘বড়’ পত্রিকা দৈনিক যুগান্তর।
আর এর আগে থেকেই বাজারে আসতে শুরু করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলো। এটিএন বাংলা, চ্যানেল আইয়ের পর, ২০০০ সালে সম্প্রচার শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম টেরিস্ট্রিয়াল টিভি একুশে টেলিভিশন।
নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে পাঠক-দর্শকরাও বিকল্প খুঁজে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জনকণ্ঠ কি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পেরেছিলো?
জনকণ্ঠের তখনকার চ্যালেঞ্জগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষক আর রাজী বলেন, “আরও রঙিন পত্রিকা আসলো। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই দ্রুত বদলে গেলো। পাঁচ জায়গা থেকে পত্রিকা বের করার তেমন অর্থ বা মানে থাকলো না।”
“দেশের রাজনীতি বদলাতে থাকলো। সেই রাজনীতি বদলের সাথে তারা সম্ভবত থাকতে পারে নাই। কারণ, তারা খুবই বেশি আওয়ামীপন্থি রাজনৈতিক পত্রিকা হিসেবে থাকার চেষ্টা করছিলো।”
সম্পাদকীয় নীতি এবং প্রযুক্তির চ্যালেঞ্জের মোকাবিলার সেই সংকট শুরুর পর জনকণ্ঠ “পত্রিকা হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, এমনটা আর কখনো দেখা যায় নাই” বলে মনে করেন আর রাজী।
“বরং বিজনেস অ্যাপারেটাস হিসেবেই থেকে গেছে গ্লোব-জনকণ্ঠ পরিবারের,” যোগ করেন তিনি।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জনকণ্ঠ ‘ধর্মীয় মৌলবাদ’ ও ‘জঙ্গিবাদ’-এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলো। সেই অবস্থান এবং সরকার বিরোধিতার ফলে একটি নির্দিষ্ট পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে কোনোমতে পত্রিকাটি টিকে থাকে।
“তোয়াব ভাইয়ের একটা বিশাল ব্যাপার ছিলো। যখন দেশের গণতন্ত্র, বিশেষ করে মৌলবাদের কোনোকিছু, আর গণতন্ত্রের ওপর আঘাত, তখন কিন্তু তোয়াব ভাই সর্বোচ্চ শক্ত অবস্থায় চলে যেতেন। এবং উনি কিন্তু রিপোর্টারদের দিয়ে সেটা বের করে আনতে পারতেন,” বলেন পত্রিকাটির সাবেক নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়।
“২০০১-এর পরে মাইনোরিটি টর্চার, বাংলা ভাইয়ের উত্থান, ওয়ান ইলেভেন- এই তিন জায়গাতে কিন্তু জনকণ্ঠ স্যারেন্ডার করেনি,” যোগ করেন তিনি।
আর এই কারণেই ওয়ান ইলেভেনের সময় জনকণ্ঠ ‘বেশ বিপদ’-এ পড়েছিলো মনে করেন বিশ্লেষকরা।
জনকণ্ঠের সংকট যেভাবে আরো ঘনীভূত হলো
ওয়ান ইলেভেনের আগেই জনকণ্ঠের সংকট ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করে। সরকারবিরোধী অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক চাপও ছিলো।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যমের আরো বিস্তার ঘটে। নতুন নতুন পত্রিকা ও টেলিভিশন চ্যানেল আসতে শুরু করে।
জনকণ্ঠে কাজ করে যেসব সাংবাদিক ‘দক্ষ’ হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন, তারা বিভিন্ন কারণে অন্যত্র চলে যাওয়া শুরু করেন। কিন্তু সেই জায়গা পূরণ করা হয়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
মাসুদ কামাল বলেন, “অনেক লোক জনকণ্ঠ ছেড়ে চলে গেলেন আস্তে আস্তে। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন। মোস্তফা ফিরোজ, রেজওয়ানুল হক রাজা, ইলিয়াস খান, শাকিল আনোয়ার, আমিও চলে গেলাম। এরপর আস্তে আস্তে কামরুল হাসান, শরিফুজ্জামান পিন্টু চলে গেলো।”
মাসুদ কামাল বলেন, “যারা যারা জনকণ্ঠ ছেড়ে গেলো, তারা সবাই ভালো ভালো জায়গায় গেলো। মোয়াজ্জেম হোসেন চলে গেলো বিবিসিতে। যে লোকগুলো গেলো, এদের জায়গাগুলো কোয়ালিটি লোক দিয়ে পূরণ করা হয় নাই। এই সমস্ত কারণে জনকণ্ঠ ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামা শুরু করলো।”
বিএনপি-জামায়াত জোটের শাসনামলের সময় জনকণ্ঠ যখন নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন আরেকটা ঘটনা ঘটে।
২০০৭ সালের ২২এ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ওই নির্বাচনে জনকণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান। এর ফলে পত্রিকাটির রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি প্রকাশ হয়ে যায়।
মাসুদ কামাল বলেন, “এই যে জনকণ্ঠের পতন শুরু হলো। একটা পত্রিকা যখন নির্দিষ্ট কোনো পার্টির সঙ্গে রিলেটেড হয়ে যায়, তখন যা হবার তাদের তাই হলো।”
কিন্তু ২২এ জানুয়ারির ভোটের ১১ দিন আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিয়ে নেয় এবং দেশে জরুরি জারি ও ভোটের তফসিল বাতিল করে। সেই ঘটনাই ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে পরিচিত।
ওয়ান ইলেভেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিয়েছিলো। সেই প্রভাবে বদলে যায় বহু কিছু।
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে। রাজনৈতিক ‘শুদ্ধি’ অভিযান চালিয়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ মানে শীর্ষ দুই নেত্রীকে রাজনীতির বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করে।
সেই সময় ব্যবসায়ী, আমলাসহ বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে ঢোকানো হয়। সেই অভিযানে ধরা পড়েন জনকণ্ঠের সম্পাদক ও প্রকাশক আতিকউল্লাহ খান। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা হয় এবং সেসব মামলায় ৪৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাকে।
যদিও ২০০৯ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জামিনে মুক্তি এবং মামলাগুলো থেকে অব্যাহতি পান আতিকউল্লাহ খান মাসুদ।
কিন্তু সেই ঘটনা জনকণ্ঠের ওপর ‘মারাত্মক’ প্রভাব সৃষ্টি করে।
সেই সময় পত্রিকাটিতে কাজ করা একজন সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে বলেন, “আগে থেকে ধুঁকে ধুঁকে চলছিলো। ইনক্রিমেন্ট ছিলো না। আর মালিককে গ্রেপ্তারের পর বেতন অনিয়মিত হয়ে পড়লো।”
পরিস্থিতি কতটা ‘মারাত্মক’ হয়েছিলো সেই চিত্র পাওয়া যায় স্বদেশ রায়ের বর্ণনায়।
“ওয়ান ইলেভেনের বিপক্ষে যাওয়ায় মালিক গ্রেপ্তার হলেন। প্রচণ্ড অত্যাচার শুরু হলো, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হলো। এইসব করে দেওয়াতে পত্রিকাটি তখন বাধ্য হলো পৃষ্ঠাসংখ্যা কমিয়ে কোনোরকমে টিকে থাকার জন্য। আর পত্রিকার সার্কুলেশন একবার পড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবে ওঠে না কিন্তু।”
ওইরকম ‘প্রতিকূল’ পরিবেশের জনকণ্ঠ পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যাহত রাখার জন্য ‘আপ্রাণ’ চেষ্টা চালিয়েছিলেন কয়েকজন সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী।
“ওয়ান ইলেভেনর সময় জনকণ্ঠ মালিককে গ্রেপ্তার করা হলো। গ্রেপ্তার করার পর, যারা পত্রিকাটাকে ধরে রেখেছিলো- আশিষুর রহমান শুভ, মীর আহমেদ মীরু, বোরহান আহমেদ- এরা অনেক কষ্ট করে পত্রিকাটাকে ধরে রেখেছিলেন,” বলেন মাসুদ কামাল।
“কিন্তু ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো- জেলখানা থেকে বের হয়ে এসে আতিকউল্লাহ খান মাসুদ, যারা এতদিন পত্রিকাটাকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, তাদের সবাইকে আলটিমেটলি টার্মিনেট করলেন। তারপর জনকণ্ঠ অদ্ভুত একটা জায়গায় পৌঁছে গেলো,” যোগ করেন তিনি।
এরপর আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের সময় জনকণ্ঠ আওয়ামী লীগের পত্রিকা হয়েই টিকে ছিলো বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
“ওয়ান ইলেভেনের সময় কিন্তু তারা বেশ বিপদে পড়েছিলো। বেশকিছু প্রতিষ্ঠান নিলামে উঠেছিলো। কিন্তু পরে এগুলো একভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়,” বলেন আর রাজী।
একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বিশ্বব্যাপী দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকে ইন্টারনেট। অনলাইন সংবাদপত্রের নতুন জোয়ার শুরু হয়।
প্রযুক্তির এই বিপ্লবের ধাক্কায় যারা বদলাতে পারেনি, তাদের অনেকেই হারিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউজউইক ম্যাগাজিন প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়।
আবার অনেকে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রিন্ট মিডিয়ার পুরোনো কৌশল বদলে ফেলে উদ্ভাবনী পথ অবলম্বন করে।
ইন্টারনেটের পাশাপাশি স্মার্ট মোবাইল ফোনের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকায় মুুদ্রিত সংবাদমাধ্যমে আরো পরিবর্তন আসে।
বাংলাদেশেও তখন জনপ্রিয় হতে থাকে ডিজিটাল জার্নালিজম। অনালাইস সংবাদপত্রের জোয়ার সৃষ্টি হয়, পাশাপাশি সংবাদ ও অনুষ্ঠানভিত্তিক কয়েক ডজন টেলিভিশন বাজারে ঢুকে পড়ে।
কিন্তু বৈপ্লবিক এই রূপান্তরের সময় জনকণ্ঠ সেই শুরুর আদলেই বন্দি থেকে যায়। প্রায় একই ধাঁচের কনটেন্ট, একইরকম মেকআপ। এমনকি পত্রিকাটির ওয়েবসাইট চালু হতে লেগে যায় বহু সময়।
গ্লোব- জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের সাবেক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে বলেন, “জনকণ্ঠের ওয়েবসাইট চালু হয় ২০১৩ সালে। আর ভিডিও কনটেন্টসহ ডিজিটাল অপারেশনে আসতে সময় লাগে আরও কয়েকবছর।”
আর রাজী বলেন, “সাংবাদিকতায় প্রথম আলো বা কালের কণ্ঠের মতো পত্রিকার সঙ্গে টিকে থাকার যে ক্ষমতা বা কর্মী বাহিনী, এটা সম্ভবত আর ছিলো না। জনকণ্ঠ দীর্ঘদিন ধরেই একটি ‘প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী’ পত্রিকা হয়েই আছে।”
“আবার আওয়ামী লীগের শাসনামলের সময় তারা মোটামুটি চালিয়ে নিচ্ছিলো। উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু ছিলো না। শিক্ষা পাতা বাংলাদেশের আরও অসংখ্য পত্রিকা করেছে। ওই রকম কালার, সংস্কৃতি, এমনকি ধর্মের পাতা- সবই করেছে,” যোগ করেন তিনি।
তবে জনকণ্ঠের প্রতিপত্তি বা অর্থ সম্পদের অভাব ছিলো না। গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের অধীনে মোট আটটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
গ্লোব মেটাল কমপ্লেক্স, গ্লোব ইনসেক্টিসাইডস, গ্লোব কেবলস, গ্লোব প্রিন্টার্স, জনকণ্ঠ, গ্লোব কনস্ট্রাকশন, গ্লোব খামার প্রকল্প এবং গ্লোব টেকনোলজিস।
ঋণ, অয়িমম ও ব্যবস্থাপনাগত নানা কারণে এসব কোম্পানির বেশিরভাগই এখন রুগ্ন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
“গ্লোব-জনকণ্ঠ পরিবার জনকণ্ঠকে আসলে তাদের শিল্প সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজে ব্যবহার করেছে, এটা বলার সুযোগ আছে নানাভাবে। তাদেরকে অনেক বেশি রাজনীতির অনুগত হয়ে যেতে হয়েছিলো,” বলেন আর রাজী।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, “আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলো। আসার পর তারা প্রচুর লোন নিলো। অনেক লোন হয়ে গেলো জনকণ্ঠের। ধীরে ধীরে এটা একটা শ্বেতহস্তিতে পরিণত হলো।”
“জনকণ্ঠের যে লাভগুলো ছিলো, সেটা মালিক আবার অন্যান্য জায়গায় খাটানো শুরু করলেন। যে কারণে সব মিলিয়েই জনকণ্ঠ একটা শ্বেতহস্তিতে পরিণত হলো।”
তিনি বলেন, “এখানে যেটা হয়েছিলো, প্রচুর খরচ। কিন্তু সেই অনুযায়ী ইনকাম হতো না। যখন ইনকাম হতো, তখন সেটাকে অন্যখাতে নিয়ে ব্যবহার করা হতো। মালিক তার কোনো বিকল্প প্রতিনিধি রেখে যান নাই।”
বর্তমান সংকট কী কাটাতে পারবে জনকণ্ঠ
পুরোপুরি আওয়ামী লীগ ঘেঁষা পত্রিকা হয়ে যাওয়ার পরও ক্ষমতায় থাকার সময় অর্থ সংকট কাটেনি জনকণ্ঠের। সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের অনিয়মিত বেতনভাতা ছিলো আলোচিত ঘটনা।
বেতনভাতার সংকট প্রকট হলে সাবেক ২০২১ সালে জনকণ্ঠকে একটি ঋণ পাইয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সুপারিশে ২৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে গ্লোব জনকণ্ঠের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ২২৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণের অনুমোদন দেয় জনতা ব্যাংকের পর্ষদ।
ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই ২০২১ সালের মার্চে মারা যান গ্লোব-জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের মালিক আতিকউল্লাহ খান মাসুদ। এর কয়েকমাসের মাথায় জনকণ্ঠ ছেড়ে দেন উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান।
এই দুই ঘটনা ধুঁকতে থাকা পত্রিকাটির জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখেন বিশ্লেষকরা।
সম্পাদক-প্রকাশের মৃত্যুর পর ওই দায়িত্বে আসেন তার স্ত্রী শামীমা এ খান। সংবাদমাধ্যম পরিচালনায় অভিজ্ঞতাহীন শামীমা খানের পক্ষে জনকণ্ঠকে আবার টেনে তোলার কাজটা ছিলো ‘একেবারেই অসম্ভব’ এবং বাস্তবে ঘটেছেও তাই।
এর ওপর চব্বিশের রাজনৈতিক পালাবদলের ‘মব সৃষ্টি’ করে জনকণ্ঠ দখল করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
২০২৫ সালের অগাস্টের ও ই ঘটনা নিয়ে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “ঢাকা থেকে প্রকাশিত বাংলা সংবাদপত্র জনকণ্ঠের সম্পাদককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে নিজেরাই একটি সম্পাদকীয় বোর্ড গঠন করেছে পত্রিকাটির একদল কর্মী, যারা গত বছর ৫ই অগাস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন সময়ে পত্রিকাটিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন।”
ওই ঘটনার জন্য সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর আফিজুর রহমান, এনসিপির যুগ্ম আহবায়ক ও পত্রিকাটির প্লানিং এডভাইজর জয়নাল আবেদীন শিশিরসহ বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন শামীমা এ খান।
যদিও আফিজুর রহমান ও জয়নাল আবেদীন শিশির দুজনেই বিবিসি বাংলার কাছে জনকণ্ঠ দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তবে জনকণ্ঠ দখলের ওই ঘটনাটি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলেেই মনে করা হচ্ছে।
সাংবাদিকতা শিক্ষক আর রাজী বলেন, “সাম্প্রতিককালে আমরা দেখছি যে, তাদের অন্তঃকলহ অত্যন্ত প্রবল। বিশেষ করে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরে, অভ্যুত্থানের কিছু মাফিয়া যারা তৈরি হলো, তারা সেই পত্রিকাটা দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করলো।”
এর মধ্যে অনিয়মিত হয়ে পড়লো ঋণ। সেই দেনা এখন মেটাতে নিলামে উঠেছে জনকণ্ঠ ভবন।
শামীমা এ খান বলছেন, তিনি ব্যাংকের দেনা শোধ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার দেওয়া ৮০ কোটি টাকা গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার-এর চিফ বিজনেস অফিসার রাজিয়া রহমান বৃষ্টি ও তার সহযোগীরা গায়েব করে দিয়েছেন।
“ব্ল্যাংক চেকে সাইন নিয়ে গেছে। আমি ব্ল্যাংকভাবেই ওকে বিশ্বাস করি,” আলাপ-কে বলেন শামীমা এ খান।
তার অভিযোগ, জনকণ্ঠের ঋণ শোধ করতে তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার জমি বিক্রি করেন। সেই টাকার ব্যাংকে পরিশোধ করার জন্য বৃষ্টিতে ফাঁকা চেকে সই করে দেন। আর বৃষ্টি টাকা তুলে নিয়ে বিদেশে চলে গেছে।
যদিও অভিযগের বিষয়ে বৃষ্টির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। প্রতারণার অভিযোগে বৃষ্টি ও স্বামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা চলছে বলে আলাপ-কে জানান শামীমা এ খানের আইনজীবী রাজু হওলাদার পলাশ।
এই মামলা কোথায় গড়াবে, কীভাবে অর্থ উদ্ধার হবে তা এখনো নিশ্চিত না।
তবে জনকণ্ঠ আবার ঘুরে দাঁড়াবে এবং কর্মীরা বকেয়া বেতনভাতা পাবেন বলে আশাবাদী সেখানকার সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা।
শিল্প পরিবারের সাবেক ওই বড় কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, জনকণ্ঠে বকেয়া পাওনা রয়েছে ৩০০ থেকে ৩৫০ জনের মতো সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীর।
জনকণ্ঠ আবার প্রকাশ হবে বলে আশাবাদী বর্তমান সম্পাদক ও প্রকাশক শামীমা এ খান।
আলাপ-কে তিনি বলেন, “জনকণ্ঠ এই দেশের মানুষের জন্য। জনকণ্ঠ নিজের লস করে হলেও দেশের জন্য করেছে। মানুষ কিন্তু জনকণ্ঠকে ভোলে নাই।”
কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থাপকদের অধীনে এই কতটা বাস্তব তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আতিকউল্লাহ খান মাসুদের মৃত্যু ও তোয়াব খানের চলে যাওয়ার পর জনকণ্ঠের যে নেতৃত্ব শূন্যতা হয়েছে, তা পূরণ হয়নি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
কামাল বলছেন, “মৃত্যুর পর উনার স্ত্রী দায়িত্ব নিলেন। কিন্তু এই ভদ্রমহিলাকে আমরা যখন চাকরি করতাম, কখনোই কিন্তু দেখি নাই। মানে অফিসেই দেখি নাই।”
“উনি (আতিকউল্লাহ খান মাসুদ) মারা যাওয়ার পর বিকল্প আর কোনো নেতৃত্ব গড়ে উঠলো না। তোয়াব খান সাহেবও চলে গেলেন। উনারও বয়স হয়ে গিয়েছিলো। কে চালাবে? পত্রিকার কোনো সম্পাদকও ছিলো না।”
মাসুদ কামাল বলেন, “একদিকে শ্বেতহস্তী, আরেকদিকে চালকের আসন ছিলো খালি। যে কারণে যা হবার তাই হলো। হয়তো লোন শোধ হয়নি। যে কারণে আজকের এই অবস্থা।”
“এটা আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশের সংবাদপত্রের জন্য একটা দুঃখজনক ঘটনা। আরেক দিকে বিভিন্ন মিডিয়ার জন্য শিক্ষনীয় বিষয়ও আছে।”
স্বদেশ রায় বলেন, “মিডিয়া হলো এডিটোরিয়াল ইনস্টিটিউট। এটা এডিটরের ওপর নির্ভর করে।”
তাহলে জনকণ্ঠের ভবিষ্যৎ কী? এই পত্রিকা কি তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে?
আর রাজী বলেন, “এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, বাংলাদেশের কোনো পত্রিকাই তার প্রতিষ্ঠাতার পরে দ্বিতীয় প্রজন্মে আর ভালো করে নাই। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক যিনি বা প্রতিষ্ঠাতা যেসব লোক, তারা যখন পত্রিকাটা ছেড়ে দিয়েছেন, তারপরে আর ভালো করে নাই।”
ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজারভার, আজকের কাগজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “সুতরাং জনকণ্ঠও ওই অবসানটা দেখলো। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর যে অভিজ্ঞতা, প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে রাখছে, এটা কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতেই নাই।”
মাসুদ কামাল বলেন, “আমি নিজে যেটা ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, একটা রাজনৈতিক দলের প্রতি যদি অনুগত হয়ে যায় কোনো মিডিয়া, তাহলে যেই দিনই আনুগত্য প্রকাশ করবে, সেইদিন থেকেই ওই মিডিয়ার পতন শুরু হবে। তারপর ধীরে ধীরে যে কয়দিন থাকে, এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। জনকণ্ঠ ওইটাই প্রমাণ করেছে।”
এর আগে আওয়ামী লীগের হয়ে বাংলার বাণী, বিএনপির দিনকালের উদাহরণও টানেন তিনি।
মাসুদ কামাল বলেন, “দেখেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। দিনকাল কিন্তু এখনো দাঁড়াতে পারেনি। জামায়াতের পত্রিকা সংগ্রাম। সংগ্রাম কিন্তু দাঁড়াতে পারে নাই। পাঠকপ্রিয়তা পাই নাই।”
“মিডিয়ার গায়ে যখন পলিটিক্যাল পার্টির ট্যাগ লেগে যায়, তখন সাধারণ মানুষ ওটাকে তো গ্রহণ করেই না। ওই পলিটিক্যাল পার্টির লোকও গ্রহণ করে না,” বলেন তিনি।
মাসুদ কামাল আরো বলেন, “বটম লাইন হলো, যখন কোনো মিডিয়া কোনো পলিটিক্যাল পার্টির অনুগত হয়ে যায়, অথবা পাঠক বা দর্শক টের পেয়ে যায় যে, এই পত্রিকাটা, এই মিডিয়া অমুক পার্টির কথা বলে, তখন নিশ্চিত আপনি ধরে নেবেন, ওই মিডিয়ার মৃত্যু শুরু হয়ে গেলো। তারপর যে কয়দিন টিকবে, আইসিইউতে রেখে টেকানোর মতো হবে।”
সব মিলিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠের গল্প শুধু একটি পত্রিকার উত্থান-পতন নয়; বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম শিল্পের রূপান্তর, রাজনৈতিক মেরূকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও একটি প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের মৃত্যুও নতুন নয়, অসংখ্য পাঠকপ্রিয় সংবাদমাধ্যম হারিয়েছে অন্ধকারে।
এক সময় প্রযুক্তি, কনটেন্ট ও উপস্থাপনায় অন্যদের পথ দেখানো জনকণ্ঠও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। রাজনৈতিক আনুগত্য, নেতৃত্বের শূন্যতা, আর্থিক অব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ পত্রিকাটিকে ঠেলে দিয়েছে গভীর সংকটে।
তারপরও জনকণ্ঠের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সংবাদপত্র ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের বয়ান, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, শিক্ষামূলক কনটেন্ট এবং আধুনিক সংবাদপত্রের বিকাশ।
চেষ্টা চলছে গণমাধ্যমটিকে বাঁচিয়ে রাখার। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, জনকণ্ঠ কি আবার নতুনভাবে দাঁড়াতে পারবে, নাকি বাংলাদেশের আরও অনেক ঐতিহাসিক গণমাধ্যমের মতো সেটিও হারিয়ে যাবে চেনা অন্ধকারে?



