চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন শেষে চীন ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দুই দিনের এই শীর্ষ বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে। ওয়াশিংটনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক ইস্যুতে দুই দেশ একমত হয়েছে। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্রাম্প ও শি “নতুন কিছু সাধারণ বোঝাপড়ায়” পৌঁছেছেন।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ মে ২০২৬, ০১:১২ পিএমআপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০১:১২ পিএম
চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন শেষে শুক্রবার চীন ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
দুই দিনের এই শীর্ষ বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে বাণিজ্য, ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু বিষয়ে ঐক্যমত থাকলেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানে স্পষ্ট মতভেদও দেখা গেছে।
ওয়াশিংটন যেখানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বেইজিং তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সীমা অতিক্রম না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না বলেও মন্তব্য করেছে চীন।
ট্রাম্প ও শি চিনপিংয়ের আলোচনায় কী কী বিষয় উঠে এসেছে, তা নিয়ে উভয় পক্ষই আলাদা বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তবে দুই দেশের বক্তব্যে খুব সীমিত কিছু বিষয়ে মিল রয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে এমন কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর কথা চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে নেই। আবার বেইজিংয়ের বিবৃতিতে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ওয়াশিংটনের বক্তব্যে অনুপস্থিত ছিল।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন বার্তা
বেইজিংয়ে দুই দিনের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একাধিক ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “দুই দেশের জন্যই আমরা দারুণ কিছু বাণিজ্য চুক্তি করেছি।”
শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, চীন মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২০০টি জেট বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। যদিও বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সম্ভাব্য অর্ডারের সংখ্যা ৫০০টির কাছাকাছি হতে পারে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর শুক্রবার বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই হবে চীনের প্রথম মার্কিন জেট বিমান কেনা।
তবে চীন শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে এই চুক্তি বা অন্য কোনো বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেনি। বোয়িংও এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এছাড়া দুই দেশের কেউই নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণাও দেয়নি।
বৃহস্পতিবার শি চিনপিং বলেন, চীন মার্কিন ব্যবসাগুলোর জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করবে। তবে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছে, “চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পারস্পরিক লাভজনক এবং উভয় দেশের জন্যই ইতিবাচক।”
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুই দেশ চীনে মার্কিন ব্যবসার জন্য বাজার আরও খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। পাশাপাশি চীন যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনে, সে বিষয়েও কথা হয়েছে।
তবে চীনের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্য চুক্তির কথা বলা হয়নি।
মাদক পাচার প্রসঙ্গ
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল সংকটের জন্য দায়ী চীন। গত বছর চীনা রপ্তানির ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের পেছনেও তিনি এটিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই সপ্তাহে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলনের পর হোয়াইট হাউস জানায়, দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল তৈরির উপাদান বন্ধে আগের যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে ফেন্টানাইল বা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ নিয়ে কোনো ধরনের উল্লেখ নেই।
ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই জানিয়েছে যে, শীর্ষ সম্মেলনে ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার মূল বক্তব্য নিয়ে দুই দেশের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা দেখা গেছে।
হোয়াইট হাউসের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই দেশ একমত হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারে না।”
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার প্রকাশিত বিবৃতিতে সরাসরি এ ধরনের কোনো কথা উল্লেখ করেনি। বরং সেখানে বলা হয়েছে, “এই সংঘাত, যা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না, এটি অব্যাহত থাকার কোনো কারণ নেই।”
চীন এর আগে ২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করেছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছিল।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই দেশ একমত হয়েছে যে হরমুজ প্রণালি অবশ্যই খোলা রাখতে হবে, যাতে জ্বালানির মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত থাকে।
মার্চের শুরু থেকে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এই সরু জলপথটি উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে এবং যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এখান দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরান কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এর সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা করতে হয়।
যুদ্ধ বন্ধে ইরান আগেও প্রস্তাব দিয়েছে যে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য টোল আদায় করা যেতে পারে। তবে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা প্রস্থানকারী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করা হবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটায়।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং হরমুজ প্রণালির সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন এবং এই পথে জাহাজ চলাচলে টোল নেওয়ারও বিরোধিতা করেছেন।
পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে ওই প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি তেল কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তবে চীনের বিবৃতিতে টোল, সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশি তেল কেনার বিষয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।
চীনের বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছে, এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনের শেষ বৈঠক বেইজিংয়ের ঝংনানহাই কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ট্রাম্প বলেন ইরান ইস্যুতে তিনি ও শি চিনপিং একই অবস্থানে আছেন বলে মনে করেন। তবে শি চিনপিং তা সরাসরি নিশ্চিত করেননি।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন বার্তা
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই প্রেসিডেন্ট এমন একটি নতুন পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন, যার লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই পরিকল্পনা আগামী তিন বছর এবং তার পরের সময়েও দুই দেশের সম্পর্ককে দিকনির্দেশনা দেবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে এই তিন বছরের সময়সীমার কথা বলা হয়নি। সেখানে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে ততটা জোর দেওয়া হয়নি।
তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র–চীনের অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাইওয়ান প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সেখানে আরও বলা হয়, এই বিষয়টি ঠিকভাবে সামলানো হলে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু ভুলভাবে সামলালে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত ও বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, যা পুরো সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে।
তবে হোয়াইট হাউসের পরবর্তী বিবৃতিতে তাইওয়ান ইস্যুর কোনো উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া বেইজিং সফরের সময় সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও “তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট”-এর মাধ্যমে দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছে। এই আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যাকে চীন নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।
এদিকে শুক্রবার তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি তাদের নিরাপত্তার একটি প্রতিশ্রুতি এবং আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় যৌথ প্রতিরোধের অংশ।
কোথায় মিল রয়েছে দুই পক্ষের বক্তব্যে
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই দুই দেশের বিবৃতিতেই বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও শি চিনপিং বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ওয়াশিংটনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক ইস্যুতে দুই দেশ একমত হয়েছে। একইভাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্রাম্প ও শি “নতুন কিছু সাধারণ বোঝাপড়ায়” পৌঁছেছেন।
এ ছাড়া উভয় পক্ষই নিশ্চিত করেছে যে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ট্রাম্প-শি চিনপিং বৈঠক: মিল অমিলে দ্বিমুখী বার্তা
চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন শেষে চীন ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দুই দিনের এই শীর্ষ বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে। ওয়াশিংটনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক ইস্যুতে দুই দেশ একমত হয়েছে। অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্রাম্প ও শি “নতুন কিছু সাধারণ বোঝাপড়ায়” পৌঁছেছেন।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলন শেষে শুক্রবার চীন ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
দুই দিনের এই শীর্ষ বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আলাদা আলাদা বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে বাণিজ্য, ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু বিষয়ে ঐক্যমত থাকলেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানে স্পষ্ট মতভেদও দেখা গেছে।
ওয়াশিংটন যেখানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে, সেখানে বেইজিং তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সীমা অতিক্রম না করার সতর্কবার্তা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না বলেও মন্তব্য করেছে চীন।
ট্রাম্প ও শি চিনপিংয়ের আলোচনায় কী কী বিষয় উঠে এসেছে, তা নিয়ে উভয় পক্ষই আলাদা বিবৃতি প্রকাশ করেছে। তবে দুই দেশের বক্তব্যে খুব সীমিত কিছু বিষয়ে মিল রয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে এমন কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর কথা চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে নেই। আবার বেইজিংয়ের বিবৃতিতে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ওয়াশিংটনের বক্তব্যে অনুপস্থিত ছিল।
বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দুই দেশের ভিন্ন বার্তা
বেইজিংয়ে দুই দিনের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একাধিক ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
শীর্ষ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, “দুই দেশের জন্যই আমরা দারুণ কিছু বাণিজ্য চুক্তি করেছি।”
শুক্রবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, চীন মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২০০টি জেট বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। যদিও বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সম্ভাব্য অর্ডারের সংখ্যা ৫০০টির কাছাকাছি হতে পারে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর শুক্রবার বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই হবে চীনের প্রথম মার্কিন জেট বিমান কেনা।
তবে চীন শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে এই চুক্তি বা অন্য কোনো বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেনি। বোয়িংও এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। এছাড়া দুই দেশের কেউই নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণাও দেয়নি।
বৃহস্পতিবার শি চিনপিং বলেন, চীন মার্কিন ব্যবসাগুলোর জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করবে। তবে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু জানাননি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছে, “চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পারস্পরিক লাভজনক এবং উভয় দেশের জন্যই ইতিবাচক।”
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস তাদের এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুই দেশ চীনে মার্কিন ব্যবসার জন্য বাজার আরও খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে। পাশাপাশি চীন যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য কেনে, সে বিষয়েও কথা হয়েছে।
তবে চীনের বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্য চুক্তির কথা বলা হয়নি।
মাদক পাচার প্রসঙ্গ
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল সংকটের জন্য দায়ী চীন। গত বছর চীনা রপ্তানির ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের পেছনেও তিনি এটিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই সপ্তাহে দুই দিনের শীর্ষ সম্মেলনের পর হোয়াইট হাউস জানায়, দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানাইল তৈরির উপাদান বন্ধে আগের যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে ফেন্টানাইল বা যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ নিয়ে কোনো ধরনের উল্লেখ নেই।
ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে দুই দেশের ভিন্ন অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই জানিয়েছে যে, শীর্ষ সম্মেলনে ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার মূল বক্তব্য নিয়ে দুই দেশের ব্যাখ্যায় ভিন্নতা দেখা গেছে।
হোয়াইট হাউসের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, “দুই দেশ একমত হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে পারে না।”
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার প্রকাশিত বিবৃতিতে সরাসরি এ ধরনের কোনো কথা উল্লেখ করেনি। বরং সেখানে বলা হয়েছে, “এই সংঘাত, যা কখনোই হওয়া উচিত ছিল না, এটি অব্যাহত থাকার কোনো কারণ নেই।”
চীন এর আগে ২০১৫ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশ ও রাশিয়ার সঙ্গে কাজ করেছিল। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছিল।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, দুই দেশ একমত হয়েছে যে হরমুজ প্রণালি অবশ্যই খোলা রাখতে হবে, যাতে জ্বালানির মুক্ত প্রবাহ নিশ্চিত থাকে।
মার্চের শুরু থেকে ইরান এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এই সরু জলপথটি উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে উন্মুক্ত সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত করে এবং যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এখান দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরান কিছু নির্দিষ্ট দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিলেও তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এর সঙ্গে আলাদা করে সমঝোতা করতে হয়।
যুদ্ধ বন্ধে ইরান আগেও প্রস্তাব দিয়েছে যে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য টোল আদায় করা যেতে পারে। তবে ওয়াশিংটন এই প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা প্রস্থানকারী জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করা হবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটায়।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং হরমুজ প্রণালির সামরিক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন এবং এই পথে জাহাজ চলাচলে টোল নেওয়ারও বিরোধিতা করেছেন।
পাশাপাশি তিনি ভবিষ্যতে ওই প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও বেশি তেল কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
তবে চীনের বিবৃতিতে টোল, সামরিক নিয়ন্ত্রণ বা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বেশি তেল কেনার বিষয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ করা হয়নি।
চীনের বিবৃতিতে শুধু বলা হয়েছে, এই সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
শীর্ষ সম্মেলনের শেষ বৈঠক বেইজিংয়ের ঝংনানহাই কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ট্রাম্প বলেন ইরান ইস্যুতে তিনি ও শি চিনপিং একই অবস্থানে আছেন বলে মনে করেন। তবে শি চিনপিং তা সরাসরি নিশ্চিত করেননি।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন বার্তা
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই প্রেসিডেন্ট এমন একটি নতুন পরিকল্পনায় একমত হয়েছেন, যার লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই পরিকল্পনা আগামী তিন বছর এবং তার পরের সময়েও দুই দেশের সম্পর্ককে দিকনির্দেশনা দেবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে এই তিন বছরের সময়সীমার কথা বলা হয়নি। সেখানে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে ততটা জোর দেওয়া হয়নি।
তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র–চীনের অবস্থান
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাইওয়ান প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সেখানে আরও বলা হয়, এই বিষয়টি ঠিকভাবে সামলানো হলে দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু ভুলভাবে সামলালে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত ও বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে, যা পুরো সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে।
তবে হোয়াইট হাউসের পরবর্তী বিবৃতিতে তাইওয়ান ইস্যুর কোনো উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া বেইজিং সফরের সময় সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান।
১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলেও “তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট”-এর মাধ্যমে দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছে। এই আইনের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করে এবং সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছে, যাকে চীন নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে।
এদিকে শুক্রবার তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি তাদের নিরাপত্তার একটি প্রতিশ্রুতি এবং আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলায় যৌথ প্রতিরোধের অংশ।
কোথায় মিল রয়েছে দুই পক্ষের বক্তব্যে
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই দুই দেশের বিবৃতিতেই বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও শি চিনপিং বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ওয়াশিংটনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক ইস্যুতে দুই দেশ একমত হয়েছে। একইভাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্রাম্প ও শি “নতুন কিছু সাধারণ বোঝাপড়ায়” পৌঁছেছেন।
এ ছাড়া উভয় পক্ষই নিশ্চিত করেছে যে ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
(আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে অনুবাদ)
বিষয়: