‘ইউরোপের এই প্রচেষ্টায় চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন এলেও, বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি দেখা দিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পারমাণবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে।’
ফাতিন নূর অবনি
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ১০:৪৯ এএমআপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ১২:১২ পিএম
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট নেটো এখন সংকটে।
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য করে পুরোনো আলোচনা আবার সামনে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
“আমি বলব এক্ষেত্রে (নেটোতে থাকার ব্যাপারে) পুনর্বিবেচনার কিছু নেই... আমি কখনোই নেটো দ্বারা প্রভাবিত হইনি। আমি সবসময় জানতাম এটা কাগুজে বাঘ এবং পুতিনও তা জানেন।”
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। তা হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট নেটো কি এবার ভেঙে যাচ্ছে?
গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকা ও ইসরায়েল। যুদ্ধের দুই মাস গড়িয়ে গেছে।
এই যুদ্ধে ইরানকে মোকাবিলার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের বারবার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু সাড়া দেয়নি কেউই।
এরপরই বেশ কয়েকবার নেটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
কিন্তু কিছুদিন আগে পরিস্থিতি এমন ছিলো না। আফগানিস্তান থেকে সিরিয়া, ডাক দেওয়া মাত্রই একযোগে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নেটোর সদস্যরা।
কিন্তু ইরান ইস্যুতে হঠাৎ করেই যেন তারা শামুকের মতো মুখ বন্ধ করে ফেলেছেন।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর ইউরোপের দেশগুলোকেও ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমেরিকার ডাকে সাড়া দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি নেটোর সদস্যরা।
এমনকি যুদ্ধের মধ্যে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ইরানের সাথে বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। এটাও ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমেরিকার জন্য।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নিরাপত্তা জোট নেটোর বয়স ৭৭ বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরাপত্তা জোট ‘ওয়ারসো প্যাক্ট’ টিকতে না পারলেও দোর্দণ্ড প্রতাপে টিকে আছে নেটো।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নানা সংকটে এতদিন ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা ছিলো না নেটোর। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।
ইরান, গ্রিনল্যান্ড ও ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নাখোশ ইউরোপীয় নেতারা। এখান থেকেই নেটোর অজানা গন্তব্যের ভবিষ্যত নিয়ে শুরু হয়েছে সমীকরণ।
নতুন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির চেষ্টায় রয়েছেন ইউরোপের নেতারা। চীনকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইউরোপ কি রাশিয়াকে মোকাবিলা করতে পারবে? আর সত্যিই যদি নেটো ভেঙে যায়, তাহলে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ কেমন হবে?
যেখানে নেটোর সিংহভাগ খরচই বহন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে ইউরোপ কীভাবে সামলাবে এই প্রতিরক্ষা জোট?
আরও প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের হুমকি যদি বাস্তবতায় রূপ নেয়, তাহলে তা কি এই প্রতিরক্ষা জোটের ইতি টানবে? নাকি নেটোর ইউরোপীয় কোনো রূপ সামনে আসবে? আর শেষমেষ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বেই যদি নেটো টিকে থাকে, তাহলে কি জোটটির ভেতরে ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে?
নেটোর শুরু
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামতে না থামতেই ইউরোপে নতুন এক সংঘাত দেখা দেয়। সেই সংঘাতের একদিকে ছিলো যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, অন্যদিকে তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য কমিউনিস্ট দেশগুলো।
দুই পক্ষই নিজেদের শক্তি দেখানোর জন্য আলাদা আলাদা নিরাপত্তা চুক্তি গড়ে তোলে। উত্তর আটলান্টিকের দেশগুলো নিয়ে গড়ে ওঠে নেটো। আর কমিউনিস্ট দেশগুলো গড়ে তোলে ‘ওয়ারসো প্যাক্ট’ নামে জোট।
যুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেসব দেশে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। ১৯৪৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পশ্চিম বার্লিনের সঙ্গে সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়। এতে ঘাবড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিম ইউরোপীয় মিত্ররা।
১৯৪৯ সালের এপ্রিলে পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ওয়াশিংটন ডিসিতে মিলিত হন এবং উত্তর আটলান্টিক চুক্তিতে সই করেন। এর মাধ্যমেই ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা নেটো গঠিত হয়।
ইম্পেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম-এর ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিলো তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও বিস্তার রোধ করা এবং ইউরোপে পুনরায় কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ঠেকানো।
নেটোর প্রথমদিকের সদস্যদেশগুলো ছিলো- বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫২ সালে গ্রিস ও তুরস্ক এবং ১৯৫৫ সালে পশ্চিম জার্মানি এই জোটে যোগ দেয়।
বর্তমানে নেটোর সদস্য দেশের সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে ৩০টি ইউরোপীয় ও ২টি উত্তর আমেরিকার দেশ রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এই নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হয়েছে সুইডেন। এছাড়াও নেটোর সদস্য নয়, এমন বেশ কিছু দেশের সাথেও নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে।
সোভিয়েতের সঙ্গে নেটোর বিরোধ শুরু হয় পশ্চিম জার্মানিকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন করে পশ্চিম জার্মানি সামরিক জোটে যোগ দেবে, এটা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনোভাবেই মানতে পারেনি।
তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলো যে, পশ্চিম জার্মানি যদি সেনাবাহিনী গঠন করে নেটোতে যোগ দেয়, তাহলে তারাও আলাদা একটি জোট গঠন করবে। ১৯৫৫ সালে পশ্চিম জার্মানি নেটোতে যোগ দিলে সে বছরই পূর্ব ইউরোপীয় কমিউনিস্ট মিত্রদের নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি চুক্তি করে। এই চুক্তিই ‘ওয়ারসো প্যাক্ট’ নামে পরিচিত, যা সামরিক জোটে রূপ নেয়।
নেটোর মতোই ওয়ারসো প্যাক্টের সদস্য দেশগুলো একে অন্যের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এই জোটের একটি কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ছিলো, যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। মিত্র দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এই জোটকে ব্যবহার করতো সোভিয়েত ইউনিয়ন। হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া এবং পোল্যান্ডের গণঅভ্যুত্থানগুলো দমন করেছিলো সোভিয়েতরা।
স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলো নেটো ও ওয়ারসো প্যাক্টের সদস্যরা। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে ওয়ারসো প্যাক্টের বিলুপ্তি ঘটে।
কিন্তু টিকে থাকে নেটো, বিশ্বের একমাত্র শক্তিশালী সামরিক জোট হিসেবে। সেই জোট এখন সংকটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ এই জোটের ভবিষ্যতকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোট ভেঙে গেলে একুশ শতকের ভূরাজনীতিতে আসবে বিশাল পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আর্টিকেল ৫ ও বর্তমান বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বজুড়ে নেটোর প্রভাব বিস্তারের পেছনে রয়েছে সংস্থাটির গঠনতন্ত্রের একটি অনুচ্ছেদ, যেটি আর্টিকেল ৫ নামে পরিচিত।
নেটো চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর যদি অন্য কোনো দেশ, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, তাহলে তা পুরো জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখা হবে। অর্থাৎ একজনের উপর হামলা মানে সবার উপর হামলা।
নেটোর আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, আর্টিকেল ৫ মাত্র একবারই কার্যকর করা হয়েছিলো, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার পর, যেটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত নাইন ইলেভেন নামে।
নেটোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যেহেতু দুটি বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে, তাই জোটের ভেতরে নিজেদের মধ্যে সংঘাত কমিয়ে আনাই ছিলো নেটোর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বরাবরই ব্যবহার করা হয়েছে রাশিয়াকে।
নেটোর প্রথম মহাসচিব লর্ড লিওনেল হেস্টিংস ইজমে জোটটির লক্ষ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “রাশিয়াকে বাইরে রাখা, আমেরিকানদের ভেতরে রাখা এবং জার্মানদের নিচে রাখা।”
নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রতিরক্ষা জোটটির রাশিয়াবিরোধী লক্ষ্য অনেকটাই ফিকে হয়ে পড়ে। তখন নেটোর উদ্দেশ্য ইউরোপীয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার দিকে মোড় নেয়।
ওই সময়ে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত নেটো বলকান অঞ্চলের সংঘাতগুলোতে অংশ নেয় এবং সেখানে এখনও তাদের শান্তিবাহিনী অবস্থান করছে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আর্টিকেল ৫ কার্যকর করলে নেটো ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে পাকিস্তান, আফ্রিকা উপকূল, লিবিয়া এবং ইরাকের মতো অঞ্চলগুলোতে সামরিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নাইন ইলেভেনের পর আল-কায়েদা এবং তাদের আশ্রয়দাতা তালিবানদের দমনে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। নেটোর প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্র এই যুদ্ধে সরাসরি সৈন্য বা লজিস্টিক সহায়তা দেয়।
'ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফোর্স' গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘ ২০ বছর আফগানিস্তানে অবস্থান করে নেটো।
এমনকি ইরাকের মতো বিতর্কিত যুদ্ধেও মিত্র দেশগুলোর সহায়তা পেতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। সাদ্দাম হোসেন গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে, এমন অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল। এর আগে ১৯৯১ সালে নেটোভুক্ত দেশ এবং আরব ও এশিয়ার মিত্রদের থেকে সৈন্য, লজিস্টিকস ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে কুয়েতে ইরাকের বিরুদ্ধে বহুজাতিক বাহিনী পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় অনেক আন্তর্জাতিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা সঙ্গ দিয়েছিলো। তবে যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিলেও ফ্রান্স ও জার্মানি এই অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করে।
আরেক সদস্য তুরস্ক যুদ্ধের শুরুতে তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। শেষ পর্যন্ত ইরাকে প্রথম অভিযানে চারটি দেশের বাহিনী অংশগ্রহণ করে এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চারটি দেশ সৈন্য পাঠায়।
এর আগে বিভিন্ন যুদ্ধে মিত্রদের সহায়তা পেলেও এবারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ট্রাম্প ও ইউরোপীয় মিত্রদের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ লিখেছেন বিবিসির সাংবাদিক অ্যালান লিট্যল।
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব বেন ওয়ালেস তাকে বলেছেন, “আমি মনে করি আর্টিকেল ৫ এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে।”
“এখন রাশিয়া হামলা করলে, আর্টিকেল ৫ কার্যকর করা সম্ভব হবে কি না, তার উপর আমি নিজের বাড়িও বাজি ধরতে রাজি না। আর যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধার করতে ছুটে আসবে, তা তো আমি কখনই ভাববো না,” যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিবকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন বিবিসির সাংবাদিক।
“যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ যদি এখনই সক্রিয় না হয়, প্রতিরক্ষা খাতে প্রচুর বিনিয়োগ না করে এবং সর্বোপরি গুরুত্ব সহকারে না নেয়, তবে সম্ভবত আমাদের চেনা নেটো এবং আর্টিকেল ৫-এর সমাপ্তি হতে চলেছে,” বেন ওয়ালেসের এই সতর্কবার্তা উঠে আসে বিবিসির সাংবাদিকের লেখায়।
নেটোর বকেয়া মেটাচ্ছে না ইউরোপীয় মিত্ররা
শুরু থেকেই নেটোর অর্থায়নের সিংহভাগ বহন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালে এক নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্প একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন, একটি বড় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা অর্থ পরিশোধ না করলে এবং রাশিয়া হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, তিনি তাদের রক্ষা করবেন না, বরং তিনি রাশিয়াকে উৎসাহিত করবেন তাদের সাথে যা খুশি তাই করার জন্য। কারণ, তাদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে, বকেয়া মেটাতে হবে।
ট্রাম্প আরও আগে থেকেই এই ইস্যু নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে আসছেন। প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি তিনটি মার্কিন সংবাদপত্রে পূর্ণ-পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সুরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
১৯৮৭ সালে তিনি লিখেছিলেন, “কয়েক দশক ধরে জাপান এবং অন্যান্য দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ নিয়ে আসছে। এই দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় আমরা যে শত শত প্রাণ এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারিয়েছি, তার বিনিময়ে কেনো তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ পরিশোধ করছে না?”
“যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের দেখে হাসছে বিশ্ব। কারণ, আমরা অন্যদের জাহাজ রক্ষা করছি, অন্যদের তেল বহন করছি, যা আমাদের প্রয়োজন নেই এবং সেগুলো পৌঁছে দিচ্ছি এমন সব মিত্রদের কাছে, যারা আমাদের সাহায্য করবে না,” লিখেছিলেন তিনি।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেও সেই একই কথা বারবার বলে আসছেন ট্রাম্প। ইউরোপের মার্কিন নির্ভরশীলতাকে তার প্রশাসনের কেউ কেউ যে ক্ষোভের সাথে দেখেন, তা ষ্পষ্ট হয়ে যায় গত বছরে ইয়েমেনে হুথিদের ওপর বিমান হামলা নিয়ে ফাঁস হওয়া কিছু বার্তায়।
ওই ঘটনা নিয়ে ২০২৫ সালে বিবিসির এক প্রতিবেদনে লেখা হয়, ফাঁস হওয়া বার্তাগুলোতে জেডি ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্টের নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লিখেছেন যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এই হামলা থেকে উপকৃত হতে পারে।
“ইউরোপকে বারবার বিপদ থেকে উদ্ধার করাটা আমি ঘৃণা করি,” সেখানে লেখেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
বিশাল দুই মহাসাগরের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুক্ত বিশ্বের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বজুড়ে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি, যুদ্ধ-পরবর্তী দশকগুলোতে বিশ্বের একটি বড় অংশকে নিজের আদলে গড়ে তুলেছিলো যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডনাল্ড ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি বহু দশক ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। একইসাথে সবচেয়ে প্রভাবশালী নিরাপত্তা জোটের ভবিষ্যতকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
তবে ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রেসিডেন্টরাও এই নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের বিশাল খরচের একটা বড় অংশ আমেরিকার একা বয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ১৯৬০ ও ‘৭০-এর দশকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তখন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা নেটো সদস্যদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০১৬ সালে বারাক ওবামা নেটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, “ইউরোপ মাঝে মাঝে নিজের প্রতিরক্ষার বিষয়ে অনেক বেশি আত্মতুষ্ট থেকেছে।”
তবে বোঝা হিসেবে দেখলেও নেটো’র এই মিত্র নেটওয়ার্কই বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক অ্যাকশনে যাওয়া সম্ভব করেছে।
ইরান যুদ্ধ ও নেটোর ভবিষ্যৎ
২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্র যখন গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে আমেরিকা, তখন নেটোর ভেতরে প্রথম বড় ফাটলটি দেখা দেয়।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান, যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পার হয়। প্রণালি বন্ধ হওয়ার তীব্র প্রভাব পড়ে বিশ্ব বাজারে। বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম, সংকট সৃষ্টি হয় বিশ্বজুড়ে।
ইরানে হামলার পর এই অভিযানে সাহায্যের জন্য নেটো মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকলেও, তারা ট্রাম্পের ডাকে সাড়া দেয়নি।
ইউরোপীয় নেতাদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের আহ্বানের প্রতিক্রিয়া ছিলো মিশ্র। যুক্তরাজ্য সীমিত বা শর্তসাপেক্ষ সমর্থনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু স্পেন, ইতালি ও জার্মানির মতো দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের সহায়তা দিতে সরাসরি অস্বীকার করে বসে।
অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। কোনো ধরনের আক্রমণে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দেয় ক্যানাডা।
পরে পুরো জোট সম্মিলিতভাবে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে সংঘাতের সাথে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সদস্য দেশগুলোর বিরোধিতা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখার বিষয়ে একমত হলেও, তারা সামরিক হামলার চেয়ে কূটনৈতিক পথকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে অথবা এই সংঘাতের অবসান ঘটলেই কেবল তারা হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে সাহায্য করতে আগ্রহী।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই বিষয়ে একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা টেনে দেন।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম আইটিভি নিউজের এক পডকাস্টে তিনি বলেন, “পুতিন বা ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের দেশের সাধারণ পরিবারগুলোর জীবনযাপন ও ব্যবসায় জ্বালানি খরচ ওঠানামা করছে। আমি এ নিয়ে খুবই বিরক্ত।”
যুক্তরাজ্যের লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র ক্যালাম মিলার বলেন, “এটি স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আমরা আর ভরসা করতে পারছি না।”
একই বক্তব্য যুক্তরাজ্যের গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলেন্সকিরও। তিনি বলছেন, যুক্তরাজ্যের এখন ইউরোপীয় নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহযোগিতা হারানোটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বিশাল এক কূটনৈতিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি নিজেও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ইউরোপীয় দেশগুলো ব্যক্তিগতভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরোধিতা করলেও, যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে সাহসী নয়। ইরান-সংকটই মূলত প্রমাণ করেছে যে, ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলসের কৌশলগত লক্ষ্য এখন আর এক নয়।
আর এসব ঘটনার মধ্যে ষ্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, যেসব মিত্ররা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের পাশে যেকোনো সংঘাতে যোগ দিতো, তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নিরাপত্তার ঝুঁকি বইতে অনিচ্ছুক।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করার এই অনীহা হয়তো ইউরোপীয় মিত্রদের বোঝা হিসেবে দেখার কারণেই গড়ে উঠেছে। একইসাথে ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা যে এতদিন ইউরোপীয় মিত্রদের তাচ্ছিল্য করে এসেছে এবং নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেই ঘটনাকেও এই অনীহার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে এই দ্বিমত নতুন নয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকট ও ইরাক যুদ্ধের সময়ও নেটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। তখন তা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন ও সাহায্য দেয় বেশিরভাগ দেশ।
“তবে এবারের ব্যাপারটি শুধু মিত্রদের দ্বিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও গভীর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে,” লেখা হয়েছে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষণে।
ভূরাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করা ডিজিটাল মিডিয়া দ্য কনভার্সেশনের একটি বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, নেটোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই দূরত্বের একটি বড় কারণ হলো- আমেরিকার আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে দেখার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
“আগের প্রেসিডেন্টরা নেটোকে দেখতেন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এই জোটটি অনেক বেশি লেনদেনভিত্তিক। আর ইউরোপীয় মিত্ররা সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানালে ট্রাম্প প্রশাসন একে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জোটের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।”
কনভার্সেশনে লেখা হয়েছে, “সম্প্রতি বেশ কিছু নেটো সদস্য দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকার করার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।”
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু
তবে শুধু ইরান যুদ্ধকেই নেটোর ভঙ্গুর ভবিষ্যতের কারণ হিসেবে দেখতে নারাজ অনেকেই। ইরানে হামলার বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করার অস্বীকৃতি জানানোর আগেই নেটোর ভেতরে ভাগযোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
এ বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে শুরু হয় নতুন এক কূটনৈতিক সংঘাত। জাতীয় নিরাপত্তার তকমা দিয়ে অঞ্চলটির দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তিনি দাবি করেন, রাশিয়া ও চীন যাতে গ্রিনল্যান্ডের দখল নিতে না পারে, সেজন্যই ডেনমার্কের অধীনে স্বশাসিত এই অঞ্চলটির 'মালিকানা' যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন।
“গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজ কিংবা কঠিন, যেকোনো উপায়ে, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের দখল নেবে।”
গ্রিনল্যান্ড প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় ডেনমার্কসহ আটটি ইউরোপীয় দেশের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর সমাধান না হলে জুন থেকে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
তখন ডেনমার্ক সতর্ক করেছিলো যে, গ্রিনল্যান্ড দখল করতে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে সমাপ্তি ঘটবে নেটোর।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটিই বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ।
নেটো ছাড়ার হুমকি নিয়ে তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, সবকিছুর শুরু হয়েছিল গ্রিনল্যান্ড দিয়ে। আমরা গ্রিনল্যান্ড চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা তা দিতে রাজি হলো না। তখন আমি বললাম, ঠিক আছে, বিদায়।”
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের একটি ভিডিও পোল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন, “নোটেড”।
নেটো সদস্যদের নিস্ক্রিয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
ইরান যুদ্ধে সহযোগিতা না করায় বেশ কয়েকবারই নেটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে সহযোগিতা না পেয়ে কিছু মিত্র দেশকে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই শাস্তির অংশ হিসেবে স্পেনকে নেটো থেকে বাদ এবং ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে ব্রিটেনের পক্ষ নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। পেন্টাগনের একটি গোপন ইমেইল এবং মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ ইরান যুদ্ধে সহযোগিতা করছে না, তাদেরকে নেটোর বড় বড় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে ওই ইমেইলে।
পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলি উইলসন বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশের জন্য অনেক কিছুই করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের কথা অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় সেই প্রতিদান পাওয়া যায়নি।”
“আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো যাতে কেবল নামেই বন্ধু না হয়ে কাজেও নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, আমরা সেই ব্যবস্থা করছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমরা বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছি, তবে সেগুলো নিয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়,” বলেন উইলসন।
ওই ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে, স্পেনকে নেটো থেকে বহিষ্কার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে বড় কোনো ক্ষতি হবে না। তবে মিত্রদের কাছে কঠোর বার্তা দেওয়ার জন্য এটা প্রতীকী হুঁশিয়ারি হিসেবে কাজ করবে।
নেটো জোট থেকে কোনো মিত্র রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নও উঠছে। জোটের একজন কর্মকর্তা জানান, “নেটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তি অনুযায়ী সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই।”
পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া ইমেইল নিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেছেন, বেনামি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো বার্তাকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
মিত্র নিয়ে ইউরোপের বিকল্প ভাবনা
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ইউরোপ এখন একটি বিকল্প পরিকল্পনা করছে। অনেক বিশেষজ্ঞই এই উদ্যোগকে ডাকছে ‘ইউরোপীয় নেটো’। সামরিক জোটের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ইউরোপীয়রা অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে সম্প্রতি বলেছেন, এই জোট এখন থেকে আরও বেশি “ইউরোপ-চালিত” হবে। সব মিলিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সামরিক ব্যয় বাড়াতে শুরু করেছে। এমনকি আগামী বছরগুলোতে এই ব্যয় আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে পরিকল্পনার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এটি বর্তমান নেটো জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে না। বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং পারমাণবিক নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। ট্রাম্পের হুমকির ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয় বা যুদ্ধে সাহায্য করতে অস্বীকার করে, তাহলে ইউরোপ যেন বিপর্যয়ে না পড়ে।
এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত অন্যতম নেতা ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউরোপের দিকে দায়িত্ব হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি চলমান এবং এটি অব্যাহত থাকবে।”
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে জার্মানির পক্ষ থেকে। কয়েক দশক ধরে জার্মানি নিজস্ব ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব তৈরির ফরাসি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছিলো এবং নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপরই নির্ভরশীল ছিলো।
“তবে বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ-এর অধীনে সেই অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্পের শাসনামলে এবং তার পরবর্তী সময়েও মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণেই জার্মানি এখন এই নতুন পথে হাঁটছে।”
নেটোতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয়কেই দরকার বলে মনে করেন জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস।
তিনি বলেছেন, “তবে এটিও স্পষ্ট যে, আমাদের ইউরোপীয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে এবং আমরা সেটিই করছি। নেটোকে ট্রান্স-আটলান্টিক বা দুই মহাদেশের ঐক্যবদ্ধ জোট হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে এটিকে আরও বেশি ইউরোপীয়-প্রধান হয়ে উঠতে হবে।”
জার্মানির এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, নর্ডিক দেশগুলো এবং কানাডার মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তারা এখন নেটোর ভেতরেই একটি “স্বেচ্ছাসেবী জোট” হিসেবে এই বিকল্প পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
নেটোতে কর্মরত সাবেক মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস ফোগো বলেন, “নেটোর এই ইউরোপীয়করণ আরও আগেই হওয়া উচিত ছিলো।”
দ্য কনভার্সেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জার্মানি আগামী ১০ বছরে তাদের সামরিক জনবল ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য হাতে নিয়েছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম লিথুয়ানিয়াতে স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েন করেছে। একইভাবে ফ্রান্সও তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যাতে পুরো ইউরোপকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
“এই বাড়তি সামরিক ব্যয় ট্রাম্প প্রশাসন ও নেটো সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয়দের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিত এবং বিনিময়ে দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখত, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘নিরাপত্তা-স্বায়ত্তশাসন বিনিময়’ বলে থাকেন।”
এখন মার্কিন কর্মকর্তারা যদি সরে দাঁড়ান, তাহলে নেটোর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করবে কে? পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোতে সেনা পাঠানোর করিডোর, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং বড় ধরনের আঞ্চলিক সামরিক মহড়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে কারা?
“কর্মকর্তাদের মতে, এগুলোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,” লেখা হয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে।
ইউরোপীয় নেটো নিয়ে ওই বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, “ইউরোপের এই প্রচেষ্টায় চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন এলেও, বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি দেখা দিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পারমাণবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে।”
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, শুধু মাত্র সৈন্য রদবদল করে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী স্যাটেলাইট, নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। এর ফলে পারমাণবিক সুরক্ষা এবং কৌশলগত গোয়েন্দা তৎপরতার পরিধি বিস্তারের ক্ষেত্রে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়ছে। নেতৃত্ব এবং পারমাণবিক সুরক্ষার অভাব ইউরোপকে রাশিয়ার সামনে দুর্বল করে তুলতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
বিবিসির অ্যালান লিট্যলের প্রতিবেদনে দেখোনো হয়েছে, ফরাসি সংস্থা 'ইনস্টিটিউট এলাবে'-এর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ফরাসি নাগরিক মনে করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ফ্রান্সের মিত্র নয়। ঐতিহাসিকভাবে প্রো-আমেরিকান বা আমেরিকাপন্থি দেশ হিসেবে পরিচিত ব্রিটেন এবং ডেনমার্কের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেও এখন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং রক্ষণশীল ধারাভাষ্যকার রবার্ট কাগান দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের সমালোচনা করে আসছেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প নেটোর যে ক্ষতি করেছেন তা সম্ভবত অপূরণীয়।”
“এই জোটটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা এখন আর নির্ভরযোগ্য নয়, এটি বলাই বাহুল্য,” বলেছেন তিনি।
নেটো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে পুরোনো বন্ধুত্ব আর কাজ করছে না। ইরান যুদ্ধ এবং গ্রিনল্যান্ড সংকটের মতো ইস্যুগুলো প্রমাণ করেছে যে, জাতীয় স্বার্থ এখন যৌথ নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পলিটিকো-এর মতে, ট্রাম্প হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে নেটো ত্যাগ করবেন না। কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখবেন যে, জোটটি কেবল নামমাত্র টিকে থাকবে।
দ্য কনভার্সেশন বলছে, ট্রাম্প হয়তো স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় নেটো মিত্রদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ইউরোপ মানে হলো সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়া, বেড়ে যাওয়া নয়।
নেটোয় ভাঙনের সুর, নতুন জোটের সন্ধানে ইউরোপীয়রা
‘ইউরোপের এই প্রচেষ্টায় চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন এলেও, বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি দেখা দিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পারমাণবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে।’
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য করে পুরোনো আলোচনা আবার সামনে এনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
“আমি বলব এক্ষেত্রে (নেটোতে থাকার ব্যাপারে) পুনর্বিবেচনার কিছু নেই... আমি কখনোই নেটো দ্বারা প্রভাবিত হইনি। আমি সবসময় জানতাম এটা কাগুজে বাঘ এবং পুতিনও তা জানেন।”
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের মধ্যে ট্রাম্পের এই মন্তব্য নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। তা হলো, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক জোট নেটো কি এবার ভেঙে যাচ্ছে?
গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র আমেরিকা ও ইসরায়েল। যুদ্ধের দুই মাস গড়িয়ে গেছে।
এই যুদ্ধে ইরানকে মোকাবিলার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের বারবার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। কিন্তু সাড়া দেয়নি কেউই।
এরপরই বেশ কয়েকবার নেটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
কিন্তু কিছুদিন আগে পরিস্থিতি এমন ছিলো না। আফগানিস্তান থেকে সিরিয়া, ডাক দেওয়া মাত্রই একযোগে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নেটোর সদস্যরা।
কিন্তু ইরান ইস্যুতে হঠাৎ করেই যেন তারা শামুকের মতো মুখ বন্ধ করে ফেলেছেন।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর ইউরোপের দেশগুলোকেও ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমেরিকার ডাকে সাড়া দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি নেটোর সদস্যরা।
এমনকি যুদ্ধের মধ্যে ইউরোপের বেশ কিছু দেশ ইরানের সাথে বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। এটাও ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমেরিকার জন্য।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নিরাপত্তা জোট নেটোর বয়স ৭৭ বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরাপত্তা জোট ‘ওয়ারসো প্যাক্ট’ টিকতে না পারলেও দোর্দণ্ড প্রতাপে টিকে আছে নেটো।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নানা সংকটে এতদিন ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা ছিলো না নেটোর। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন।
ইরান, গ্রিনল্যান্ড ও ল্যাটিন আমেরিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নাখোশ ইউরোপীয় নেতারা। এখান থেকেই নেটোর অজানা গন্তব্যের ভবিষ্যত নিয়ে শুরু হয়েছে সমীকরণ।
নতুন পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির চেষ্টায় রয়েছেন ইউরোপের নেতারা। চীনকেই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ছাড়া ইউরোপ কি রাশিয়াকে মোকাবিলা করতে পারবে? আর সত্যিই যদি নেটো ভেঙে যায়, তাহলে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ কেমন হবে?
যেখানে নেটোর সিংহভাগ খরচই বহন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র, সেখানে ইউরোপ কীভাবে সামলাবে এই প্রতিরক্ষা জোট?
আরও প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের হুমকি যদি বাস্তবতায় রূপ নেয়, তাহলে তা কি এই প্রতিরক্ষা জোটের ইতি টানবে? নাকি নেটোর ইউরোপীয় কোনো রূপ সামনে আসবে? আর শেষমেষ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বেই যদি নেটো টিকে থাকে, তাহলে কি জোটটির ভেতরে ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে?
নেটোর শুরু
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামতে না থামতেই ইউরোপে নতুন এক সংঘাত দেখা দেয়। সেই সংঘাতের একদিকে ছিলো যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, অন্যদিকে তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য কমিউনিস্ট দেশগুলো।
দুই পক্ষই নিজেদের শক্তি দেখানোর জন্য আলাদা আলাদা নিরাপত্তা চুক্তি গড়ে তোলে। উত্তর আটলান্টিকের দেশগুলো নিয়ে গড়ে ওঠে নেটো। আর কমিউনিস্ট দেশগুলো গড়ে তোলে ‘ওয়ারসো প্যাক্ট’ নামে জোট।
যুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেসব দেশে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। ১৯৪৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়ার গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পশ্চিম বার্লিনের সঙ্গে সরবরাহ পথ বন্ধ করে দেয়। এতে ঘাবড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র এবং তার পশ্চিম ইউরোপীয় মিত্ররা।
১৯৪৯ সালের এপ্রিলে পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ওয়াশিংটন ডিসিতে মিলিত হন এবং উত্তর আটলান্টিক চুক্তিতে সই করেন। এর মাধ্যমেই ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা নেটো গঠিত হয়।
ইম্পেরিয়াল ওয়ার মিউজিয়াম-এর ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিলো তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও বিস্তার রোধ করা এবং ইউরোপে পুনরায় কোনো উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান ঠেকানো।
নেটোর প্রথমদিকের সদস্যদেশগুলো ছিলো- বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, ইতালি, লাক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫২ সালে গ্রিস ও তুরস্ক এবং ১৯৫৫ সালে পশ্চিম জার্মানি এই জোটে যোগ দেয়।
বর্তমানে নেটোর সদস্য দেশের সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে ৩০টি ইউরোপীয় ও ২টি উত্তর আমেরিকার দেশ রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে এই নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হয়েছে সুইডেন। এছাড়াও নেটোর সদস্য নয়, এমন বেশ কিছু দেশের সাথেও নিরাপত্তা চুক্তি রয়েছে।
সোভিয়েতের সঙ্গে নেটোর বিরোধ শুরু হয় পশ্চিম জার্মানিকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন করে পশ্চিম জার্মানি সামরিক জোটে যোগ দেবে, এটা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনোভাবেই মানতে পারেনি।
তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলো যে, পশ্চিম জার্মানি যদি সেনাবাহিনী গঠন করে নেটোতে যোগ দেয়, তাহলে তারাও আলাদা একটি জোট গঠন করবে। ১৯৫৫ সালে পশ্চিম জার্মানি নেটোতে যোগ দিলে সে বছরই পূর্ব ইউরোপীয় কমিউনিস্ট মিত্রদের নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি চুক্তি করে। এই চুক্তিই ‘ওয়ারসো প্যাক্ট’ নামে পরিচিত, যা সামরিক জোটে রূপ নেয়।
নেটোর মতোই ওয়ারসো প্যাক্টের সদস্য দেশগুলো একে অন্যের সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। এই জোটের একটি কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড ছিলো, যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। মিত্র দেশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেও এই জোটকে ব্যবহার করতো সোভিয়েত ইউনিয়ন। হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া এবং পোল্যান্ডের গণঅভ্যুত্থানগুলো দমন করেছিলো সোভিয়েতরা।
স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ ছিলো নেটো ও ওয়ারসো প্যাক্টের সদস্যরা। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে ওয়ারসো প্যাক্টের বিলুপ্তি ঘটে।
কিন্তু টিকে থাকে নেটো, বিশ্বের একমাত্র শক্তিশালী সামরিক জোট হিসেবে। সেই জোট এখন সংকটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ এই জোটের ভবিষ্যতকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জোট ভেঙে গেলে একুশ শতকের ভূরাজনীতিতে আসবে বিশাল পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আর্টিকেল ৫ ও বর্তমান বাস্তবতা
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিশ্বজুড়ে নেটোর প্রভাব বিস্তারের পেছনে রয়েছে সংস্থাটির গঠনতন্ত্রের একটি অনুচ্ছেদ, যেটি আর্টিকেল ৫ নামে পরিচিত।
নেটো চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সদস্য দেশের ওপর যদি অন্য কোনো দেশ, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, তাহলে তা পুরো জোটের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখা হবে। অর্থাৎ একজনের উপর হামলা মানে সবার উপর হামলা।
নেটোর আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, আর্টিকেল ৫ মাত্র একবারই কার্যকর করা হয়েছিলো, ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসী হামলার পর, যেটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত নাইন ইলেভেন নামে।
নেটোর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানো। বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যেহেতু দুটি বিশ্বযুদ্ধের সূচনা ঘটে, তাই জোটের ভেতরে নিজেদের মধ্যে সংঘাত কমিয়ে আনাই ছিলো নেটোর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বরাবরই ব্যবহার করা হয়েছে রাশিয়াকে।
নেটোর প্রথম মহাসচিব লর্ড লিওনেল হেস্টিংস ইজমে জোটটির লক্ষ্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “রাশিয়াকে বাইরে রাখা, আমেরিকানদের ভেতরে রাখা এবং জার্মানদের নিচে রাখা।”
নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর প্রতিরক্ষা জোটটির রাশিয়াবিরোধী লক্ষ্য অনেকটাই ফিকে হয়ে পড়ে। তখন নেটোর উদ্দেশ্য ইউরোপীয় আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার দিকে মোড় নেয়।
ওই সময়ে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত নেটো বলকান অঞ্চলের সংঘাতগুলোতে অংশ নেয় এবং সেখানে এখনও তাদের শান্তিবাহিনী অবস্থান করছে।
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র আর্টিকেল ৫ কার্যকর করলে নেটো ইউরোপের সীমানা ছাড়িয়ে পাকিস্তান, আফ্রিকা উপকূল, লিবিয়া এবং ইরাকের মতো অঞ্চলগুলোতে সামরিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নাইন ইলেভেনের পর আল-কায়েদা এবং তাদের আশ্রয়দাতা তালিবানদের দমনে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। নেটোর প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্র এই যুদ্ধে সরাসরি সৈন্য বা লজিস্টিক সহায়তা দেয়।
'ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাসিস্ট্যান্স ফোর্স' গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘ ২০ বছর আফগানিস্তানে অবস্থান করে নেটো।
এমনকি ইরাকের মতো বিতর্কিত যুদ্ধেও মিত্র দেশগুলোর সহায়তা পেতে সক্ষম হয় যুক্তরাষ্ট্র। সাদ্দাম হোসেন গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে, এমন অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করেছিল। এর আগে ১৯৯১ সালে নেটোভুক্ত দেশ এবং আরব ও এশিয়ার মিত্রদের থেকে সৈন্য, লজিস্টিকস ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে কুয়েতে ইরাকের বিরুদ্ধে বহুজাতিক বাহিনী পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।
২০০৩ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় অনেক আন্তর্জাতিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা সঙ্গ দিয়েছিলো। তবে যুক্তরাজ্য ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিলেও ফ্রান্স ও জার্মানি এই অভিযানের তীব্র বিরোধিতা করে।
আরেক সদস্য তুরস্ক যুদ্ধের শুরুতে তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে সরাসরি অস্বীকার করে। শেষ পর্যন্ত ইরাকে প্রথম অভিযানে চারটি দেশের বাহিনী অংশগ্রহণ করে এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চারটি দেশ সৈন্য পাঠায়।
এর আগে বিভিন্ন যুদ্ধে মিত্রদের সহায়তা পেলেও এবারের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ট্রাম্প ও ইউরোপীয় মিত্রদের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ লিখেছেন বিবিসির সাংবাদিক অ্যালান লিট্যল।
যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব বেন ওয়ালেস তাকে বলেছেন, “আমি মনে করি আর্টিকেল ৫ এখন লাইফ সাপোর্টে রয়েছে।”
“এখন রাশিয়া হামলা করলে, আর্টিকেল ৫ কার্যকর করা সম্ভব হবে কি না, তার উপর আমি নিজের বাড়িও বাজি ধরতে রাজি না। আর যুক্তরাষ্ট্র উদ্ধার করতে ছুটে আসবে, তা তো আমি কখনই ভাববো না,” যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিবকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন বিবিসির সাংবাদিক।
“যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপ যদি এখনই সক্রিয় না হয়, প্রতিরক্ষা খাতে প্রচুর বিনিয়োগ না করে এবং সর্বোপরি গুরুত্ব সহকারে না নেয়, তবে সম্ভবত আমাদের চেনা নেটো এবং আর্টিকেল ৫-এর সমাপ্তি হতে চলেছে,” বেন ওয়ালেসের এই সতর্কবার্তা উঠে আসে বিবিসির সাংবাদিকের লেখায়।
নেটোর বকেয়া মেটাচ্ছে না ইউরোপীয় মিত্ররা
শুরু থেকেই নেটোর অর্থায়নের সিংহভাগ বহন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালে এক নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্প একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন, একটি বড় দেশের রাষ্ট্রপ্রধান তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তারা অর্থ পরিশোধ না করলে এবং রাশিয়া হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে কি না। জবাবে তিনি বলেছিলেন, তিনি তাদের রক্ষা করবেন না, বরং তিনি রাশিয়াকে উৎসাহিত করবেন তাদের সাথে যা খুশি তাই করার জন্য। কারণ, তাদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে, বকেয়া মেটাতে হবে।
ট্রাম্প আরও আগে থেকেই এই ইস্যু নিয়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করে আসছেন। প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি তিনটি মার্কিন সংবাদপত্রে পূর্ণ-পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সুরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
১৯৮৭ সালে তিনি লিখেছিলেন, “কয়েক দশক ধরে জাপান এবং অন্যান্য দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ নিয়ে আসছে। এই দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় আমরা যে শত শত প্রাণ এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারিয়েছি, তার বিনিময়ে কেনো তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থ পরিশোধ করছে না?”
“যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিদদের দেখে হাসছে বিশ্ব। কারণ, আমরা অন্যদের জাহাজ রক্ষা করছি, অন্যদের তেল বহন করছি, যা আমাদের প্রয়োজন নেই এবং সেগুলো পৌঁছে দিচ্ছি এমন সব মিত্রদের কাছে, যারা আমাদের সাহায্য করবে না,” লিখেছিলেন তিনি।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসেও সেই একই কথা বারবার বলে আসছেন ট্রাম্প। ইউরোপের মার্কিন নির্ভরশীলতাকে তার প্রশাসনের কেউ কেউ যে ক্ষোভের সাথে দেখেন, তা ষ্পষ্ট হয়ে যায় গত বছরে ইয়েমেনে হুথিদের ওপর বিমান হামলা নিয়ে ফাঁস হওয়া কিছু বার্তায়।
ওই ঘটনা নিয়ে ২০২৫ সালে বিবিসির এক প্রতিবেদনে লেখা হয়, ফাঁস হওয়া বার্তাগুলোতে জেডি ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্টের নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লিখেছেন যে, ইউরোপীয় দেশগুলো এই হামলা থেকে উপকৃত হতে পারে।
“ইউরোপকে বারবার বিপদ থেকে উদ্ধার করাটা আমি ঘৃণা করি,” সেখানে লেখেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।
বিশাল দুই মহাসাগরের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুক্ত বিশ্বের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বজুড়ে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি, যুদ্ধ-পরবর্তী দশকগুলোতে বিশ্বের একটি বড় অংশকে নিজের আদলে গড়ে তুলেছিলো যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ডনাল্ড ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি বহু দশক ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। একইসাথে সবচেয়ে প্রভাবশালী নিরাপত্তা জোটের ভবিষ্যতকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
তবে ট্রাম্পের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রেসিডেন্টরাও এই নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের বিশাল খরচের একটা বড় অংশ আমেরিকার একা বয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ১৯৬০ ও ‘৭০-এর দশকে যখন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তখন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা নেটো সদস্যদের নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ ব্যয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০১৬ সালে বারাক ওবামা নেটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, “ইউরোপ মাঝে মাঝে নিজের প্রতিরক্ষার বিষয়ে অনেক বেশি আত্মতুষ্ট থেকেছে।”
তবে বোঝা হিসেবে দেখলেও নেটো’র এই মিত্র নেটওয়ার্কই বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সামরিক অ্যাকশনে যাওয়া সম্ভব করেছে।
ইরান যুদ্ধ ও নেটোর ভবিষ্যৎ
২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর যুক্তরাষ্ট্র যখন গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি যখন ইরানে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে আমেরিকা, তখন নেটোর ভেতরে প্রথম বড় ফাটলটি দেখা দেয়।
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান, যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি পার হয়। প্রণালি বন্ধ হওয়ার তীব্র প্রভাব পড়ে বিশ্ব বাজারে। বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম, সংকট সৃষ্টি হয় বিশ্বজুড়ে।
ইরানে হামলার পর এই অভিযানে সাহায্যের জন্য নেটো মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানান ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকলেও, তারা ট্রাম্পের ডাকে সাড়া দেয়নি।
ইউরোপীয় নেতাদের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের আহ্বানের প্রতিক্রিয়া ছিলো মিশ্র। যুক্তরাজ্য সীমিত বা শর্তসাপেক্ষ সমর্থনের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু স্পেন, ইতালি ও জার্মানির মতো দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো ধরনের সহায়তা দিতে সরাসরি অস্বীকার করে বসে।
অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। কোনো ধরনের আক্রমণে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দেয় ক্যানাডা।
পরে পুরো জোট সম্মিলিতভাবে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে সংঘাতের সাথে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে সদস্য দেশগুলোর বিরোধিতা আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
ইউরোপীয় দেশগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত রাখার বিষয়ে একমত হলেও, তারা সামরিক হামলার চেয়ে কূটনৈতিক পথকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে অথবা এই সংঘাতের অবসান ঘটলেই কেবল তারা হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে সাহায্য করতে আগ্রহী।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই বিষয়ে একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা টেনে দেন।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম আইটিভি নিউজের এক পডকাস্টে তিনি বলেন, “পুতিন বা ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের কারণে আমাদের দেশের সাধারণ পরিবারগুলোর জীবনযাপন ও ব্যবসায় জ্বালানি খরচ ওঠানামা করছে। আমি এ নিয়ে খুবই বিরক্ত।”
যুক্তরাজ্যের লিবারেল ডেমোক্র্যাট দলের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র ক্যালাম মিলার বলেন, “এটি স্পষ্ট যে, ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আমরা আর ভরসা করতে পারছি না।”
একই বক্তব্য যুক্তরাজ্যের গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলেন্সকিরও। তিনি বলছেন, যুক্তরাজ্যের এখন ইউরোপীয় নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের ও ইউরোপীয় মিত্রদের সহযোগিতা হারানোটা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য বিশাল এক কূটনৈতিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি নিজেও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ইউরোপীয় দেশগুলো ব্যক্তিগতভাবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরোধিতা করলেও, যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে সাহসী নয়। ইরান-সংকটই মূলত প্রমাণ করেছে যে, ওয়াশিংটন এবং ব্রাসেলসের কৌশলগত লক্ষ্য এখন আর এক নয়।
আর এসব ঘটনার মধ্যে ষ্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, যেসব মিত্ররা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের পাশে যেকোনো সংঘাতে যোগ দিতো, তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নিরাপত্তার ঝুঁকি বইতে অনিচ্ছুক।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করার এই অনীহা হয়তো ইউরোপীয় মিত্রদের বোঝা হিসেবে দেখার কারণেই গড়ে উঠেছে। একইসাথে ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা যে এতদিন ইউরোপীয় মিত্রদের তাচ্ছিল্য করে এসেছে এবং নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, সেই ঘটনাকেও এই অনীহার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে এই দ্বিমত নতুন নয়। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকট ও ইরাক যুদ্ধের সময়ও নেটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। তখন তা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন ও সাহায্য দেয় বেশিরভাগ দেশ।
“তবে এবারের ব্যাপারটি শুধু মিত্রদের দ্বিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আরও গভীর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে,” লেখা হয়েছে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষণে।
ভূরাজনীতি, অর্থনীতি নিয়ে প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করা ডিজিটাল মিডিয়া দ্য কনভার্সেশনের একটি বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, নেটোর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই দূরত্বের একটি বড় কারণ হলো- আমেরিকার আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোকে দেখার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
“আগের প্রেসিডেন্টরা নেটোকে দেখতেন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এই জোটটি অনেক বেশি লেনদেনভিত্তিক। আর ইউরোপীয় মিত্ররা সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানালে ট্রাম্প প্রশাসন একে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জোটের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে।”
কনভার্সেশনে লেখা হয়েছে, “সম্প্রতি বেশ কিছু নেটো সদস্য দেশ ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকার করার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।”
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু
তবে শুধু ইরান যুদ্ধকেই নেটোর ভঙ্গুর ভবিষ্যতের কারণ হিসেবে দেখতে নারাজ অনেকেই। ইরানে হামলার বিষয়ে ইউরোপীয় মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করার অস্বীকৃতি জানানোর আগেই নেটোর ভেতরে ভাগযোগের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।
এ বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে শুরু হয় নতুন এক কূটনৈতিক সংঘাত। জাতীয় নিরাপত্তার তকমা দিয়ে অঞ্চলটির দখল নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তিনি দাবি করেন, রাশিয়া ও চীন যাতে গ্রিনল্যান্ডের দখল নিতে না পারে, সেজন্যই ডেনমার্কের অধীনে স্বশাসিত এই অঞ্চলটির 'মালিকানা' যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন।
“গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সহজ কিংবা কঠিন, যেকোনো উপায়ে, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলের দখল নেবে।”
গ্রিনল্যান্ড প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় ডেনমার্কসহ আটটি ইউরোপীয় দেশের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুর সমাধান না হলে জুন থেকে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
তখন ডেনমার্ক সতর্ক করেছিলো যে, গ্রিনল্যান্ড দখল করতে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে সমাপ্তি ঘটবে নেটোর।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটিই বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ।
নেটো ছাড়ার হুমকি নিয়ে তিনি বলেন, “সত্যি বলতে, সবকিছুর শুরু হয়েছিল গ্রিনল্যান্ড দিয়ে। আমরা গ্রিনল্যান্ড চেয়েছিলাম, কিন্তু তারা তা দিতে রাজি হলো না। তখন আমি বললাম, ঠিক আছে, বিদায়।”
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের একটি ভিডিও পোল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী রাডোস্লাভ সিকোরস্কি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে ক্যাপশনে লিখেছিলেন, “নোটেড”।
নেটো সদস্যদের নিস্ক্রিয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
ইরান যুদ্ধে সহযোগিতা না করায় বেশ কয়েকবারই নেটো থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে সহযোগিতা না পেয়ে কিছু মিত্র দেশকে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই শাস্তির অংশ হিসেবে স্পেনকে নেটো থেকে বাদ এবং ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে ব্রিটেনের পক্ষ নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে। পেন্টাগনের একটি গোপন ইমেইল এবং মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই তথ্য প্রকাশ করেছে রয়টার্স।
মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশ ইরান যুদ্ধে সহযোগিতা করছে না, তাদেরকে নেটোর বড় বড় পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে ওই ইমেইলে।
পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলি উইলসন বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশের জন্য অনেক কিছুই করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের কথা অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় সেই প্রতিদান পাওয়া যায়নি।”
“আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো যাতে কেবল নামেই বন্ধু না হয়ে কাজেও নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, আমরা সেই ব্যবস্থা করছি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমরা বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপের কথা জানিয়েছি, তবে সেগুলো নিয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়,” বলেন উইলসন।
ওই ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে, স্পেনকে নেটো থেকে বহিষ্কার করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে বড় কোনো ক্ষতি হবে না। তবে মিত্রদের কাছে কঠোর বার্তা দেওয়ার জন্য এটা প্রতীকী হুঁশিয়ারি হিসেবে কাজ করবে।
নেটো জোট থেকে কোনো মিত্র রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা সম্ভব কি না এমন প্রশ্নও উঠছে। জোটের একজন কর্মকর্তা জানান, “নেটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তি অনুযায়ী সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই।”
পেন্টাগনের ফাঁস হওয়া ইমেইল নিয়ে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেছেন, বেনামি বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো বার্তাকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
মিত্র নিয়ে ইউরোপের বিকল্প ভাবনা
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, ইউরোপ এখন একটি বিকল্প পরিকল্পনা করছে। অনেক বিশেষজ্ঞই এই উদ্যোগকে ডাকছে ‘ইউরোপীয় নেটো’। সামরিক জোটের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ইউরোপীয়রা অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে সম্প্রতি বলেছেন, এই জোট এখন থেকে আরও বেশি “ইউরোপ-চালিত” হবে। সব মিলিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের সামরিক ব্যয় বাড়াতে শুরু করেছে। এমনকি আগামী বছরগুলোতে এই ব্যয় আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে পরিকল্পনার সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এটি বর্তমান নেটো জোটের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে না। বরং রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং পারমাণবিক নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। ট্রাম্পের হুমকির ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপ থেকে সৈন্য সরিয়ে নেয় বা যুদ্ধে সাহায্য করতে অস্বীকার করে, তাহলে ইউরোপ যেন বিপর্যয়ে না পড়ে।
এই পরিকল্পনার সাথে যুক্ত অন্যতম নেতা ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউরোপের দিকে দায়িত্ব হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়াটি চলমান এবং এটি অব্যাহত থাকবে।”
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে জার্মানির পক্ষ থেকে। কয়েক দশক ধরে জার্মানি নিজস্ব ইউরোপীয় সার্বভৌমত্ব তৈরির ফরাসি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে আসছিলো এবং নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপরই নির্ভরশীল ছিলো।
“তবে বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ-এর অধীনে সেই অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্পের শাসনামলে এবং তার পরবর্তী সময়েও মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণেই জার্মানি এখন এই নতুন পথে হাঁটছে।”
নেটোতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয়কেই দরকার বলে মনে করেন জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস।
তিনি বলেছেন, “তবে এটিও স্পষ্ট যে, আমাদের ইউরোপীয়দের নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে এবং আমরা সেটিই করছি। নেটোকে ট্রান্স-আটলান্টিক বা দুই মহাদেশের ঐক্যবদ্ধ জোট হিসেবে টিকিয়ে রাখতে হলে এটিকে আরও বেশি ইউরোপীয়-প্রধান হয়ে উঠতে হবে।”
জার্মানির এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, নর্ডিক দেশগুলো এবং কানাডার মধ্যে একটি বৃহত্তর ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, তারা এখন নেটোর ভেতরেই একটি “স্বেচ্ছাসেবী জোট” হিসেবে এই বিকল্প পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
নেটোতে কর্মরত সাবেক মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস ফোগো বলেন, “নেটোর এই ইউরোপীয়করণ আরও আগেই হওয়া উচিত ছিলো।”
দ্য কনভার্সেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জার্মানি আগামী ১০ বছরে তাদের সামরিক জনবল ৫০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য হাতে নিয়েছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম লিথুয়ানিয়াতে স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েন করেছে। একইভাবে ফ্রান্সও তাদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যাতে পুরো ইউরোপকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
“এই বাড়তি সামরিক ব্যয় ট্রাম্প প্রশাসন ও নেটো সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ এতদিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয়দের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিত এবং বিনিময়ে দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতির ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখত, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘নিরাপত্তা-স্বায়ত্তশাসন বিনিময়’ বলে থাকেন।”
এখন মার্কিন কর্মকর্তারা যদি সরে দাঁড়ান, তাহলে নেটোর আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করবে কে? পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোতে সেনা পাঠানোর করিডোর, লজিস্টিক নেটওয়ার্ক এবং বড় ধরনের আঞ্চলিক সামরিক মহড়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে কারা?
“কর্মকর্তাদের মতে, এগুলোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,” লেখা হয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে।
ইউরোপীয় নেটো নিয়ে ওই বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, “ইউরোপের এই প্রচেষ্টায় চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তন এলেও, বাস্তবে এই লক্ষ্য পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি দেখা দিয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পারমাণবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে।”
ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মতে, শুধু মাত্র সৈন্য রদবদল করে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী স্যাটেলাইট, নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়। এর ফলে পারমাণবিক সুরক্ষা এবং কৌশলগত গোয়েন্দা তৎপরতার পরিধি বিস্তারের ক্ষেত্রে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের ওপর চাপ বাড়ছে। নেতৃত্ব এবং পারমাণবিক সুরক্ষার অভাব ইউরোপকে রাশিয়ার সামনে দুর্বল করে তুলতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
বিবিসির অ্যালান লিট্যলের প্রতিবেদনে দেখোনো হয়েছে, ফরাসি সংস্থা 'ইনস্টিটিউট এলাবে'-এর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ফরাসি নাগরিক মনে করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ফ্রান্সের মিত্র নয়। ঐতিহাসিকভাবে প্রো-আমেরিকান বা আমেরিকাপন্থি দেশ হিসেবে পরিচিত ব্রিটেন এবং ডেনমার্কের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেও এখন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসির ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো এবং রক্ষণশীল ধারাভাষ্যকার রবার্ট কাগান দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্পের সমালোচনা করে আসছেন। তিনি বলেন, “ট্রাম্প নেটোর যে ক্ষতি করেছেন তা সম্ভবত অপূরণীয়।”
“এই জোটটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা এখন আর নির্ভরযোগ্য নয়, এটি বলাই বাহুল্য,” বলেছেন তিনি।
নেটো এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে পুরোনো বন্ধুত্ব আর কাজ করছে না। ইরান যুদ্ধ এবং গ্রিনল্যান্ড সংকটের মতো ইস্যুগুলো প্রমাণ করেছে যে, জাতীয় স্বার্থ এখন যৌথ নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পলিটিকো-এর মতে, ট্রাম্প হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে নেটো ত্যাগ করবেন না। কিন্তু তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এমনভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখবেন যে, জোটটি কেবল নামমাত্র টিকে থাকবে।
দ্য কনভার্সেশন বলছে, ট্রাম্প হয়তো স্বল্পমেয়াদি লাভের আশায় নেটো মিত্রদের সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী ইউরোপ মানে হলো সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়া, বেড়ে যাওয়া নয়।
বিষয়: