নারীর পোষাক কেন তার চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে? রাতে বের হওয়া কী নারীদের জন্য নিষিদ্ধ? মোরাল পুলিশিং এর অধিকার কি আইন কাউকে দেয়?
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৪ পিএমআপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম
‘‘আমাদের ড্রেসে নাকি লেখা আছে আমরা প্রস্টিটিউট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আমরা সেইফ না, আমরা আনসেইফ। ভার্সিটির ছেলেরা আমাদের ধরে মারে’’ –এভাবেই চিৎকার করে অভিযোগ জানাচ্ছিলেন দুই তরুণী।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এক তরুণকে দেখা যায় লাঠি হাতে এক তরুণীকে মারতে উদ্যত অবস্থায়। টিএসসির রাজু ভাস্কর্য সংলগ্ন এলাকায় ঘটে এই ঘটনাটি।
ভিডিওতে ওই তরুণীকে বলতে শোনা যায়, পুরান ঢাকার নাজিরা বাজারে সেহেরি খেয়ে টিএসসির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। তখনই কিছু তরুণ এসে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর শুরু করে। এ সময় সেই তরুণরা তাদের ‘প্রস্টিটিউট ট্যাগ’ দেন বলে জানান হেনস্তার শিকার তরুণীদের একজন।
এ সময় হেনস্তাকারী এক তরুণকে বলতে শোনা যায় – “এদের ডোপ টেস্ট করেন, এটা একটা এইডস এর রোগী”।
নিয়মিত ঘটনা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় ‘বহিরাগত’ ট্যাগ দিয়ে শারীরিক লাঞ্ছনা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির ঘটনা প্রায় নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত ২৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে খেলতে আসায় ২৫ থেকে ৩০ জন শিশু ও কিশোরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কান ধরে ওঠবস করান ডাকসুর সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হলে ডাকসু থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন সর্বমিত্র চাকমা।
এর আগে ২০২৫ এর নভেম্বরে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে শাসাতে দেখা যায় সর্বমিত্রকে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে টিএসসিতে আসা নারীদের ওপর সংঘবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছিলো ২০১৫ সালে। দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে ছিল দীর্ঘ সময়।
এ ছাড়া সৌন্দর্য বর্ধনের নামে বিভিন্ন সময়ে টিএসসির ফুটপাতে থাকা অসহায় মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়।
টিএসসিতে ঘুরতে আসা সাধারণ মানুষদের গতিরোধ করে ‘বহিরাগত’ ট্যাগ দিয়ে তাদের আইডি কার্ড দেখা এবং মোবাইল ফোন চেক করার অসংখ্য অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে।
অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ দর্শনার্থীদের 'সন্দেহভাজন' হিসেবে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটেছে।
সবশেষ ঘটল দুই নারীকে হেনস্থার ঘটনা। তবে নারীদের প্রতি এমন আচরণ প্রথম নয় বলে মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার মিতি সানজানা।
তিনি বলেন, “ঢাকা ইউনিভার্সিটি এরিয়ায় বহুবার বহু নারী নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এমনকি এমন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছিল”
“ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ৯০ এর দশক থেকেই এরকম ঘটনা সবসময়ই ঘটে যাচ্ছে”।
দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েও কেন সেখানকার শিক্ষার্থীরা এ ধরনের নারী নিপীড়ক ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছে না?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘এটা পারিবারিক শিক্ষা। জন্মের পর থেকেই তারা পরিবার থেকেই দেখে আসে মায়ের – বোনের অর্ধেক অধিকার। সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীদের কোন অংশগ্রহণ নেই। তার পরে আসে স্কুল। কিন্তু স্কুলেও তো জেন্ডার বিষয়ক ব্যাপারগুলো যুক্ত করা হয়নি’।
এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা আলাপকে বলেন, বহিরাগতের সংজ্ঞা তার কাছে অন্যরকম। তিনি বলেন, “স্পেশালি যে এনভায়রনমেন্টের সাথে কানেক্টেড হয়ে যায় কিন্তু একাডেমিকভাবে কানেক্টেড না। যদি আমি বলি যে, ভবঘুরে যারা আছে, যারা সেখানে ডিরেক্ট মাদক সেবন করে, মাদক বিক্রি করে,সেটি আমার কাছে বহিরাগত।”
নারী কেন সহজ লক্ষ্য
নারীর পোষাক কেন তার চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? কিংবা ‘রাতে বের হওয়া’ কি নারীদের জন্য নিষিদ্ধ? গায়ে হাত তোলার কি অধিকার কারও আছে?
ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, বাংলাদেশের সমাজ পুরুষশাসিত। এখানে এখনো নারীর সম অধিকার, সমতা নিশ্চিত করা যায়নি।
এর কারণ নিয়ে আলাপকে তিনি বলেন, “এটি পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি। জেন্ডার রোলগুলো সেট করে দেয়া আছে। দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধরেই নেওয়া হয় যে, নারী ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। নারীর যেকোন কিছুই পুরুষ দ্বারা কন্ট্রোলড থাকবে”।
কে কী পরবে, কখন কোথায় থাকবে, এটি কেউ ঠিক করে দিতে পারে কি না – এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট ইশরাত জাহান আলাপকে বলেন, এই ধরনের মোরাল পুলিশিং এর অধিকার সাধারণ মানুষের তো দূরের কথা পুলিশেরও নেই। পুলিশ সন্দেহ করলে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু একজন নারী রাতে কেন বাইরে থাকবে বা কোন পোষাক পড়বে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আইনগত কোন সুযোগ নেই।
“কোন মানুষকেই কেউ হেনস্তা করতে পারে না।”
নারীদের বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর’ জানিয়ে ইশরাত জাহান বলেন, কোনো নারীকে শারীরিক নির্যাতন করা হলে তা নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপরাধ। এবং কথাবার্তার মাধ্যমে অপমান করা হলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ছাড়াও এই ধরনের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে ভিক্টিমের যে মানহানি হয়, এটিও দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা এবং সাইবার এবং ডিজিটাল সুরক্ষার আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও জানান এই আইনজীবী।
এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিক্টিম ব্লেইমিং এর ঘটনা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, “প্রযুক্তির উত্থানের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারচ্ছন্ন ব্যক্তির হাতে টেকনোলজি চলে গেছে, ফলে যার যেখানে ইচ্ছা যেকোন ধরণের মন্তব্য করছে। যেহেতু কমেন্ট করলেও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।”
“নারীর প্রতি বিদ্বেষ অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুফ্যাকচার্ড হয়” মন্তব্য করে মিতি সানজানা বলেন, বিভিন্ন বট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেও নারীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।
প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কিভাবে পরিবর্তন হবে নারীর প্রতি এই বিদ্বেষ ও সহিংস মনোভাবের? একাডেমিক শিক্ষা,মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করেন আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মীরা।
অ্যাডভোকেট ইশরাত জাহান বলেন, ‘আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। এই ধরনের হেনস্তা করে কেউ পার পাচ্ছে না – এই মেসেজটা যখন যাবে তখন অনেক মানুষ এই ধরনের কাজ করতে ভয় পাবে’।
একইসাথে যৌন হয়রানি বিষয়ক আইন ও ইভটিজিং বিষয়ক আইনগুলো স্কুল কলেজে শেখাতে হবে, শিক্ষা কারিকুলামে জেন্ডার ইকুয়ালিটি আনতে হবে বলে মনে করেন মিতি সানজানা। তিনি বলেন, ‘এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা আছে’।
নারী ও শিশু বিষয়ক আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনগুলো শক্ত প্রয়োগ করে গণমাধ্যমে যদি ব্যপক প্রচার চালানো হয়, তাহলে এসব ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন ইশরাত জাহানও।
নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং শিক্ষা কারিকুলামে জেন্ডার সমতার অন্তর্ভুক্তি। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি গণমাধ্যমে এর প্রচার অপরাধীদের মনে ভয়ের বার্তা পৌঁছাবে। সম্মিলিত এই প্রচেষ্টাই পারে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করতে।
ভোরবেলায় টিএসসিতে যাওয়া কি অপরাধ
নারীর পোষাক কেন তার চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে? রাতে বের হওয়া কী নারীদের জন্য নিষিদ্ধ? মোরাল পুলিশিং এর অধিকার কি আইন কাউকে দেয়?
‘‘আমাদের ড্রেসে নাকি লেখা আছে আমরা প্রস্টিটিউট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আমরা সেইফ না, আমরা আনসেইফ। ভার্সিটির ছেলেরা আমাদের ধরে মারে’’ –এভাবেই চিৎকার করে অভিযোগ জানাচ্ছিলেন দুই তরুণী।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে এক তরুণকে দেখা যায় লাঠি হাতে এক তরুণীকে মারতে উদ্যত অবস্থায়। টিএসসির রাজু ভাস্কর্য সংলগ্ন এলাকায় ঘটে এই ঘটনাটি।
ভিডিওতে ওই তরুণীকে বলতে শোনা যায়, পুরান ঢাকার নাজিরা বাজারে সেহেরি খেয়ে টিএসসির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তারা। তখনই কিছু তরুণ এসে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধর শুরু করে। এ সময় সেই তরুণরা তাদের ‘প্রস্টিটিউট ট্যাগ’ দেন বলে জানান হেনস্তার শিকার তরুণীদের একজন।
এ সময় হেনস্তাকারী এক তরুণকে বলতে শোনা যায় – “এদের ডোপ টেস্ট করেন, এটা একটা এইডস এর রোগী”।
নিয়মিত ঘটনা?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় ‘বহিরাগত’ ট্যাগ দিয়ে শারীরিক লাঞ্ছনা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানির ঘটনা প্রায় নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
গত ২৫ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে খেলতে আসায় ২৫ থেকে ৩০ জন শিশু ও কিশোরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কান ধরে ওঠবস করান ডাকসুর সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা শুরু হলে ডাকসু থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন সর্বমিত্র চাকমা।
এর আগে ২০২৫ এর নভেম্বরে একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে লাঠি হাতে শাসাতে দেখা যায় সর্বমিত্রকে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন উপলক্ষে টিএসসিতে আসা নারীদের ওপর সংঘবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া এবং যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছিলো ২০১৫ সালে। দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করা এই ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে ছিল দীর্ঘ সময়।
এ ছাড়া সৌন্দর্য বর্ধনের নামে বিভিন্ন সময়ে টিএসসির ফুটপাতে থাকা অসহায় মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিমের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হয়।
টিএসসিতে ঘুরতে আসা সাধারণ মানুষদের গতিরোধ করে ‘বহিরাগত’ ট্যাগ দিয়ে তাদের আইডি কার্ড দেখা এবং মোবাইল ফোন চেক করার অসংখ্য অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে।
অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ দর্শনার্থীদের 'সন্দেহভাজন' হিসেবে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনাও ঘটেছে।
সবশেষ ঘটল দুই নারীকে হেনস্থার ঘটনা। তবে নারীদের প্রতি এমন আচরণ প্রথম নয় বলে মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার মিতি সানজানা।
তিনি বলেন, “ঢাকা ইউনিভার্সিটি এরিয়ায় বহুবার বহু নারী নিপীড়নের শিকার হয়েছে। এমনকি এমন ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছিল”
“ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ৯০ এর দশক থেকেই এরকম ঘটনা সবসময়ই ঘটে যাচ্ছে”।
দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েও কেন সেখানকার শিক্ষার্থীরা এ ধরনের নারী নিপীড়ক ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারছে না?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘এটা পারিবারিক শিক্ষা। জন্মের পর থেকেই তারা পরিবার থেকেই দেখে আসে মায়ের – বোনের অর্ধেক অধিকার। সিদ্ধান্তগ্রহণে নারীদের কোন অংশগ্রহণ নেই। তার পরে আসে স্কুল। কিন্তু স্কুলেও তো জেন্ডার বিষয়ক ব্যাপারগুলো যুক্ত করা হয়নি’।
এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা আলাপকে বলেন, বহিরাগতের সংজ্ঞা তার কাছে অন্যরকম। তিনি বলেন, “স্পেশালি যে এনভায়রনমেন্টের সাথে কানেক্টেড হয়ে যায় কিন্তু একাডেমিকভাবে কানেক্টেড না। যদি আমি বলি যে, ভবঘুরে যারা আছে, যারা সেখানে ডিরেক্ট মাদক সেবন করে, মাদক বিক্রি করে,সেটি আমার কাছে বহিরাগত।”
নারী কেন সহজ লক্ষ্য
নারীর পোষাক কেন তার চরিত্রের সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? কিংবা ‘রাতে বের হওয়া’ কি নারীদের জন্য নিষিদ্ধ? গায়ে হাত তোলার কি অধিকার কারও আছে?
ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, বাংলাদেশের সমাজ পুরুষশাসিত। এখানে এখনো নারীর সম অধিকার, সমতা নিশ্চিত করা যায়নি।
এর কারণ নিয়ে আলাপকে তিনি বলেন, “এটি পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি। জেন্ডার রোলগুলো সেট করে দেয়া আছে। দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ধরেই নেওয়া হয় যে, নারী ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। নারীর যেকোন কিছুই পুরুষ দ্বারা কন্ট্রোলড থাকবে”।
কে কী পরবে, কখন কোথায় থাকবে, এটি কেউ ঠিক করে দিতে পারে কি না – এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যাডভোকেট ইশরাত জাহান আলাপকে বলেন, এই ধরনের মোরাল পুলিশিং এর অধিকার সাধারণ মানুষের তো দূরের কথা পুলিশেরও নেই। পুলিশ সন্দেহ করলে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। কিন্তু একজন নারী রাতে কেন বাইরে থাকবে বা কোন পোষাক পড়বে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আইনগত কোন সুযোগ নেই।
“কোন মানুষকেই কেউ হেনস্তা করতে পারে না।”
নারীদের বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর’ জানিয়ে ইশরাত জাহান বলেন, কোনো নারীকে শারীরিক নির্যাতন করা হলে তা নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপরাধ। এবং কথাবার্তার মাধ্যমে অপমান করা হলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ ছাড়াও এই ধরনের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে ভিক্টিমের যে মানহানি হয়, এটিও দণ্ডবিধির ৫০০ ধারা এবং সাইবার এবং ডিজিটাল সুরক্ষার আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলেও জানান এই আইনজীবী।
এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিক্টিম ব্লেইমিং এর ঘটনা ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে ব্যারিস্টার মিতি সানজানা বলেন, “প্রযুক্তির উত্থানের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কারচ্ছন্ন ব্যক্তির হাতে টেকনোলজি চলে গেছে, ফলে যার যেখানে ইচ্ছা যেকোন ধরণের মন্তব্য করছে। যেহেতু কমেন্ট করলেও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না।”
“নারীর প্রতি বিদ্বেষ অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুফ্যাকচার্ড হয়” মন্তব্য করে মিতি সানজানা বলেন, বিভিন্ন বট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেও নারীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।
প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
কিভাবে পরিবর্তন হবে নারীর প্রতি এই বিদ্বেষ ও সহিংস মনোভাবের? একাডেমিক শিক্ষা,মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করেন আইনজীবী ও নারী অধিকারকর্মীরা।
অ্যাডভোকেট ইশরাত জাহান বলেন, ‘আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। এই ধরনের হেনস্তা করে কেউ পার পাচ্ছে না – এই মেসেজটা যখন যাবে তখন অনেক মানুষ এই ধরনের কাজ করতে ভয় পাবে’।
একইসাথে যৌন হয়রানি বিষয়ক আইন ও ইভটিজিং বিষয়ক আইনগুলো স্কুল কলেজে শেখাতে হবে, শিক্ষা কারিকুলামে জেন্ডার ইকুয়ালিটি আনতে হবে বলে মনে করেন মিতি সানজানা। তিনি বলেন, ‘এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকা আছে’।
নারী ও শিশু বিষয়ক আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনগুলো শক্ত প্রয়োগ করে গণমাধ্যমে যদি ব্যপক প্রচার চালানো হয়, তাহলে এসব ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন ইশরাত জাহানও।
নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং শিক্ষা কারিকুলামে জেন্ডার সমতার অন্তর্ভুক্তি। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি গণমাধ্যমে এর প্রচার অপরাধীদের মনে ভয়ের বার্তা পৌঁছাবে। সম্মিলিত এই প্রচেষ্টাই পারে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সমাজ নিশ্চিত করতে।