দু’জন গিয়েছিলেন রাজাবাড়ী ঘাটে। রাত আড়াইটায় বাড়ি ফিরলেন একজন। পরদিন বিকালে সেখানকার নদীতে পাওয়া গেল অন্যজনের মরদেহ।
বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট তাহসিফ সাউরি কেন গিয়েছিলেন সেখানে? তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ কেনইবা তার সঙ্গী হয়েছিলেন? পুলিশের পোশাক পরা কে বা কারা কেন তাহসিফ ও দীপকে ধাওয়া দিয়েছিল? দীপ কীভাবে পালিয়ে গেলেন আর কেনই বা তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিলেন? পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মনে করছে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের মধ্যেই তাহসিফের মৃত্যুরহস্য লুকিয়ে আছে।
শুক্রবার পিবিআইয়ের ঢাকা মহানগর উত্তরের একটি দল উত্তরা, রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা, টঙ্গীর হোন্ডা রোড এবং হাজী মাজার বস্তি সংলগ্ন ইজতেমার মাঠে যায় তাদের নিজস্ব তদন্তের অংশ হিসাবে। গণমাধ্যমকর্মীদের পিবিআই জানিয়েছে, নৌ পুলিশ এই ঘটনার তদন্ত করছে, তবে ঘটনার গুরুত্বের কারণে তারাও ছায়া তদন্ত চালাচ্ছেন।
প্রশ্ন ১: তাহসিফ কেন রাজাবাড়ী ঘাটে গিয়েছিলেন?

পিবিআই বলছে, মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে তাহসিফ ও দীপ পৃথক মোটরসাইকেলে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। তবে কেন গিয়েছিলেন তা এখনও স্পষ্ট না।
পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, “ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকাটি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত। মাদক কারবারিদের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদে পড়ে ডুবে মারা যেতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
তবে তাহসিফ বা দীপ ওই এলাকায় আগে কখনও গিয়েছিলেন কি-না, তা এখনও জানা যায়নি।
পিবিআইয়ের ঢাকার মহানগর উত্তর বিভাগের ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান আলাপ-কে বলেন, “তাহসিফ মাদকাসক্ত ছিলো কি-না তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে।”
প্রশ্ন ২: দীপের বক্তব্য দুই রকম কেন?
পিবিআই জানিয়েছে, দীপ গাজীপুরের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের একজন সদ্য গ্র্যাজুয়েট। তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয় ছয় বছর ধরে। বয়সে বড় হওয়ায় দীপ তাহসিফকে ‘বড় ভাই’ হিসাবে সম্বোধন করতেন। একসঙ্গে ব্যবসা করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
বৃহস্পতিবার রাতে মোহম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। সেখান থেকে তাকে নেওয়া সংস্থাটির ঢাকা মহানগর উত্তরের কার্যালয়ে। পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তা আলাপকে জানিয়েছেন, দীপকে নিয়ে রাতভর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। শুক্রবারও তদন্তকারীরা দীপকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করেন।

তবে দীপের বক্তব্যে অসঙ্গতি রয়েছে। বৃহস্পতিবার তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ও তাহসিফ উত্তরা থেকে যে যার মতো চলে যান। কিন্তু পিবিআই বলছে, রাত ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে কোন এক সময় তারা দু’জন আলাদা আলাদা মোটরসাইকেলে করে রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় গিয়েছিলেন।
এই অসঙ্গতি নিয়ে জানতে চাইলে, পিবিআইয়ের ঢাকা মহানগর উত্তরের পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান বলেন, “আমরা দীপের মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে দেখেছি। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সঠিক তথ্যই দিয়েছেন। হতে পারে ঘটনার আকস্মিকতায় ভয় পেয়েছিলেন দীপ।”
প্রশ্ন ৩: কারা ধাওয়া দিয়েছিল?
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বলেছেন, “আমরা সেখানে (ঘটনাস্থল) কথা বলছিলাম। এ সময় কিছু লোক ধাওয়া করে। তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেয়। আর আমি পালিয়ে আসি। ধাওয়াকারীরা পুলিশের লোক ছিলেন।”
পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “ওরা যেখানে অবস্থান করছিলেন সেখানে হঠাৎ করে পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া দিলে দীপ তুরাগ তীরের বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পেছনে গিয়ে লুকান। আর তাহসিফ তুরাগ নদে গিয়ে ঝাঁপ দেন। এরপর সুযোগ বুঝে রাত আড়াইটার দিকে নিজের বাড়িতে ফেরেন দীপ।”
ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, “দীপের দেওয়া সব তথ্য যাছাই-বাছাই করা হচ্ছে। দীপ বলেছে তাদের পুলিশের পোশাক পরা কেউ ধাওয়া দিয়েছে, কে ধাওয়া দিলো, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।”
তবে এখন পর্যন্ত কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিশ্চিত করেননি যে পুলিশের কেউ ধাওয়া দিয়েছিল কি-না।
প্রশ্ন ৪: তাহসিফ কেন নদীতে ঝাঁপ দিলেন, কীভাবে তার মৃত্যু হলো?

পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপের দেওয়া ‘ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার’ তথ্য মানতে নারাজ তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম। তার দাবি, মূল ঘটনা ‘ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা’ চলছে।
“কেন তাকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। আমার ছেলে সাঁতার জানত। ও তো পাইলট। সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের,” শুক্রবার গণমাধ্যমকে বলেছেন তিনি।
কোনো ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না জানতে চাইলে, তিনি বলেন, “স্বাভাবিকভাবে তো এটাই মনে হয়। আর ওকে ধাওয়া দেবে কেন লোকজন, কেন তাকে কেউ ধাওয়া দেবে? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমার মনে হচ্ছে।”
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই জানা যাবে ঠিক কেন অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফট্যানেন্ট তাহসিফ মারা গেলেন।
প্রশ্ন ৫: উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল থেকে কী বোঝা যাচ্ছে?

পিবিআই থেকে জানানো হয়েছে, “দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতেই টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে নম্বর প্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে জানিয়েছেন দীপ।”
রাজাবাড়ী ঘাট থেকে টঙ্গী মাজার বস্তির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার।পিবিআই আরও জানিয়েছে, “তাহসিফ বাসা থেকে যে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন, সেটিও নম্বর প্লেটবিহীন বলে সিসিটিভির ভিডিওতে দেখা গেছে।”
দুটি মোটরসাইকেল এক কি-না, তা তদন্তকারীরা আলাদাভাবে নিশ্চিত করেছেন কি-না, তা এখনও জানা যায়নি।
বারবার আলোচনায় তাহসিফ সাউরি
বিমান বাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাহসিফকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। এরপর থেকেই তাকে নিয়ে চলছিল আলোচনা-সমালোচনা।
গত বছরের ৪ঠা অগাস্ট ‘বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরের ‘র’ নেটওয়ার্ক ফাঁস’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক আমার দেশ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনার ভিডিও প্রচারের সাথে জড়িত ছিলেন তাহসিফ সাউরি।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ভিডিওর বিষয়ে বিমান বাহিনী তদন্ত করতে গিয়ে বাহিনীর ভেতরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পায় এবং যারা ‘র’-এর সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তাদের মধ্যে তাহসিফও ছিল।
আমার দেশে সংবাদ প্রকাশের পর গণমাধ্যমে একটি প্রতিবাদ লিপি পাঠিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। ওই প্রতিবাদ লিপিতে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে “বিভ্রান্তিকর” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবাদ লিপিতে আরো বলা হয়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি নামের দুই কর্মকর্তাকে "ভিন্ন প্রেক্ষাপটে" বিমান বাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালার আওতায় যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর প্রদান করা হয়েছে।
এই বছরের ২১এ জুলাই ‘স্পিক উইথ রশীদ’ পডকাস্টে উপস্থিত হয়েছিলেন তাহসিফ। ওই পডকাস্টে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেন তিনি। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ, প্রচার ও দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গও আসে।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওখানে তারা ক্লিয়ারলি লিখেছে ভিডিওটি আমি ছড়িয়েছি। আমি যে শুট করেছি, এটাও তারা বলেনি। বলেছে, রিফাত আশরাফী ভিডিওটা করেছে এবং আমি ভিডিওটা নাকি ছড়িয়ে দিয়েছি। আমি যদি ভিডিওটা করেও থাকি, ছড়িয়েও থাকি, হোয়াট ইজ দ্য প্রুভ দে আর হ্যাভিং। এটাও হতে পারে, এজন্য (এই অভিযোগের জন্য) আমি হয়তো আজকে এয়ারফোর্সে নেই।”
তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম জানান, বিমানবাহিনী থেকে চাকরি চলে যাওয়ার পর তাহসিফ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও সুইডেন-ভিত্তিক অনুসন্ধানী এবং জনস্বার্থবিষয়ক সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজে কাজ করতেন।
পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ বছর বয়সী তাহসিফের জন্ম ১৯৯৮ সালে। ঢাকার উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রজেক্টের (রুয়াপ) ‘করবী’ ভবনের তৃতীয় তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি। তার বাবা এনায়েতুল করিম পদ্মা অয়েল কোম্পানির সাবেক পরিচালক। মা গৃহিনী। তাহসিফের ছোট আরো দুই ভাইবোন আছে।
ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা করা তাহসিফ, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৭৯তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সমমানের জয়েন্ট সার্ভিস কোর্স সম্পন্ন করে বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। সামরিক পাইলট হিসেবে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
তাহসিফের ফেইসবুক অ্যাকাউন্টের বায়োতে লেখা, ‘Veteran Military Pilot | Strategist | Entrepreneur’। মৃত্যুর তিন দিন আগে ভাটারায় এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদন শেয়ার করে তিনি লিখেছিলেন, ‘Lol! Shame on DMP, Government needs to verify this case’। তার ফেইসবুক আইডিতে অনুসারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ হাজার।
যা এখনও অনিশ্চিত: মামলা করবে কে
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবার মামলা করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন বাবা এনায়েতুল করিম। তবে মামলা করা বা না করার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে সরকারকে ছেলের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এনায়েতুল করিম বলেন, “আমরা পারিবারিকভাবে এখনো কোনো ধরনের মামলা করার সিদ্ধান্ত নিইনি। মামলা করব কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ আমাদের নানা ব্যস্ততা আছে। হয়তো আজ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারব না। তবে আমরা চাই, থানায় গিয়ে দুই কলম কী লিখলাম বা না লিখলাম, সেটির ওপর সরকার গুরুত্ব না দিয়ে নিজস্ব আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিক।”
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখনো মামলা করেনি তার পরিবার। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা না হলে পুলিশ নিজেই বাদী হয়ে মামলা করবে বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম।
শুক্রবার বিকেলে আলাপ-কে তিনি বলেন, “তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। পরিবার মামলা না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা হিসেবে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।”


তাহসিফের মৃত্যু: মধ্যরাতের ভয়েস মেসেজ ও অমীমাংসিত দুই ঘণ্টা
