‘হাহা রিঅ্যাক্ট’ নিয়ে মারধর, ছেলেকে বাঁচানোয় মাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

কক্সবাজারের উখিয়ায় ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে এক মাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ফেসবুকের হাহা  রিঅ্যাক্ট  ও স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মারধরের ঘটনার সূত্রপাত বলে দাবি নিহতের স্বজনদের।

আপডেট : ১৭ মে ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম

মারধর থেকে ছেলেকে রক্ষা করায় একজন মা-কে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এই ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়ায়।

স্বজনদের অভিযোগ, ছেলেকে মারধরের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়ে ওই নারীর মৃত্যু হয়েছে। 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা ছাত্রদলের একজন নেতা বলেছেন, ঘটনাটি স্থানীয় বিরোধের জের হতে পারে; সংগঠনের কোনো দায়িত্বশীল নেতা এতে জড়িত নন। 

এই ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে একজন কর্মকর্তা। 

শনিবার রাতে উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের টাইপালং এলাকায় ছৈয়দা বেগমকে আঘাত করা হলে  হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন ডাক্তাররা। 

 নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, ফেসবুক পোস্টে হাহা রিঅ্যাক্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছেলেকে মারধরের ঘটনা শুরু হয়। সেই সংঘর্ষে আহত হন ছৈয়দা বেগম। গুরুতর অবস্থায় তাকে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

‘জয় বাংলা’ লেখা ও ফেসবুকে হাহা রিঅ্যাক্ট

স্থানীয় ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সপ্তাহখানেক আগে এলাকায় দেয়ালে ‘জয় বাংলা’ লেখা নিয়ে প্রথম উত্তেজনা তৈরি হয়। 

এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতারা থানায় এজাহার দিলেও মামলা হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে। এরপর থেকেই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো।

নিহতের এক নিকটাত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-কে বলেন, “ওই ঘটনার পর এলাকার কয়েকজন তরুণের নামে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়। সেখানে নিহতের ছেলেকেও আসামি করা হয়। এরপর থেকে তারা বাড়িতে থাকতে পারছিলেন না।”  

 বাইরে বের হলেও পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের নজরদারির মুখে পড়ছিলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এর মধ্যেই স্থানীয় ছাত্রদল নেতা জিসানের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন ইউনুস নামে এক তরুণ। 

অভিযোগ রয়েছে ইউনূস নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা। 

“ফেসবুকের একটি পোস্টে ‘হাহা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে ইউনুসের সঙ্গে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ছেলের বিরোধ তৈরি হয়। পোস্টে ইউনুস একটা হাহা দিছে। এটা নিয়ে সভাপতির ছেলে ইউনুসকে ফোন করে বলছে যে, তুই এটা দিস না। তখন ইউনূস বলে যে যদি ভুল হয়ে থাকে তাইলে সরি ভাই। এটা নিয়ে আর কথা বাড়াইস না,” আলাপ-কে বলেন নিহতের ওই আত্মীয়।

এরপরও তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং স্টেশনে ডাকা হয় বলে দাবি করেন তিনি। আর তখনই পথে ইউনূসকে ধরে মারধর করতে থাকে জিসান ও তার বন্ধুরা।

“ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু”

নিহতের স্বজনদের ভাষ্য, ইউনুসকে মারধরের পর তার বন্ধু ইমরান তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যান। এরপর ইমরানকেও মারধর করা হয়। খবর পেয়ে ইমরানের মা ছৈয়দা বেগম ঘটনাস্থলে যান এবং ছেলেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

নিহতের ওই আত্মীয় বলেন,“তিনি গিয়ে বলেন, আমার ছেলে কোনো দোষ করে নাই। তখন কয়েকজন তাকেও আঘাত করে। মাথা ও ঘাড়ের মাঝামাঝি জায়গায় আঘাত লাগে। এরপর তিনি পড়ে যান।”

ছৈয়দা বেগমকে দ্রুত উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি ও ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীর নেতৃত্বে এ হামলা হয় বলে তার স্বজনের বরাতে জানিয়েছে একাধিক গণমাধ্যম। 

সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার ছাত্রদল নেতার

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফাহিমুর রহমান ফাহিম আলাপ-কে বলেন, “ঘটনাটি নিয়ে তিনিও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে খোঁজ নিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত ছাত্রদলের কোনো দায়িত্বশীল নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য পাননি।” 

“আমাকে অনেক সাংবাদিক ফোন করেছেন। আমি উপজেলাতেও খবর নিয়েছি। আমাদের জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছেন, আমাদের দায়িত্বশীল কারও সঙ্গে এ ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্পৃক্ততা নেই।”

ফাহিমুর রহমানের দাবি, ঘটনা নিয়ে একেকজনের কাছ থেকে একেক ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কেউ বলছেন, ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস বা প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আবার কেউ বলছেন, ওই নারী হৃদরোগে আক্রান্ত  হয়ে মারা যেতে পারেন। 

তাই প্রশাসনের তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিত মন্তব্য করা কঠিন বলে জানান তিনি।

ছাত্রদলের কেউ জড়িত থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না-এমন প্রশ্নে জেলা ছাত্রদল সভাপতি বলেন, “আমাদের দায়িত্বশীল কেউ জড়িত না। তবে ছাত্রদল করে বা কোনো ইউনিট পর্যায়ের কেউ যদি জড়িত থাকে, আমরা কাউকে প্রশ্রয় দেব না।” 

তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কেন্দ্রকে জানিয়ে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে তার দাবি, এলাকাভিত্তিক একটি বিরোধকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।

এ ছাড়া ইউনূস ছাত্রলীগের সদস্য কি না তাও নিশ্চিত করতে পারেননি ফাহিম। তিনি বলেন, “আমরা খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু ছাত্রলীগের কোন পর্যায়ের নেতা সেটাও জানতে পারিনি আমরা।”  

পুলিশ কী বলছে

এ বিষয়ে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, পুলিশ হাসপাতালের মাধ্যমে মৃত্যুর খবর পেয়েছে। ওই নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়েছে বলে তারা জেনেছেন। 

তবে এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।

উখিয়া থানা

আলাপকে তিনি বলেন, “আমরা হাসপাতালের মাধ্যমে শুনেছি। এখনো কেউ অভিযোগ দেয়নি। আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।”

ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু হয়েছে, স্বজনদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য এখনো পুলিশের কাছে নিশ্চিত নয়। 

তার ভাষ্য, “সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে মা মারা গেছেন–এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। কীভাবে মারা গেছেন, তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।” 

এ ছাড়া অভিযুক্ত ইউনূসও ছাত্রলীগের কেউ না বলে দাবি করেন তিনি। 

পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। 

লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, দাফন শেষে তারা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।