সুন্দর নামের পেছনে ছিল কুৎসিত পরিকল্পনা। বিনোদন ও গানের ফাঁকে ফাঁকে শোনা যেত ঘৃণার বার্তা, যা দিনে দিনে আরও সহিংস হতে থাকে। সংবাদ ও বিনোদনের উৎস রেডিও স্টেশনটি পরের বছরই হয়ে উঠেছিল গণহত্যার অস্ত্র। তার সুন্দর নাম আর টেকেনি, মানুষের কাছে এখন তা পরিচিত, 'হেইট রেডিও', 'রেডিও জেনোসাইড' হিসেবে
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১৫ এএমআপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ১১:২৯ এএম
যেভাবে একটি দেশকে রক্তে ভাসিয়েছিল বেতার
রুয়ান্ডার পাহাড়গুলো পরিচিত তাদের নজরকাড়া সৌন্দর্যের জন্য। সারাদেশে ছেয়ে থাকা দীর্ঘ ও ঘন পর্বতশৃঙ্গের কারণে দেশটিকে অনেকেই ডাকে - হাজার পর্বতের দেশ, ফরাসি ভাষায় ‘পেই দে মিল কোলিন।’
এখান থেকেই ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া রুয়ান্ডার নতুন বেতার কেন্দ্রটিও পায় তার নাম ‘রেডিও টেলিভিশন দে লিব্রে মিল কোলিন’ (আরটিএলএম) যার অর্থ হাজার পর্বতের মুক্ত বেতার।
রুয়ান্ডায় তখন টেলিভিশন ছিল হাতে গোনা মানুষের কাছে। তাই সংবাদপত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য সংগ্রহ ও বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল বেতার। দেশটির জাতীয় বেতার ‘রুয়ান্ডা রেডিওর’ গৎবাধা উপস্থাপনা থেকে বের হয়ে এসে তরুণ-যুবাদের পছন্দের গানগুলো বাজানোর কারণে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আরটিএলএম।
তবে তার এই সুন্দর নামের পেছনে ছিল কুৎসিত পরিকল্পনা। বিনোদন ও গানের মাঝখানে মাঝখানে শোনা যেত ঘৃণার বার্তা, যা দিনে দিনে আরও সহিংস হতে থাকে। সংবাদ ও বিনোদনের উৎস বেতার পরের বছরই হয়ে উঠেছিল গণহত্যার অস্ত্র। তার সুন্দর নাম টেকেনি, মানুষের কাছে তা এখন পরিচিত, “হেইট রেডিও”, কিংবা “রেডিও জেনোসাইড” হিসেবে।
ঘৃণার সূত্রপাত
১৯৯৪ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া রুয়ান্ডার গণহত্যায় আরটিএলএম-এর ভূমিকা জানার আগে বুঝতে হবে সেই দেশে তার আগের কয়েক দশক ধরে ফুঁসে ওঠা জাতিগত বিদ্বেষকে। এবং পৃথিবীর প্রায় যেকোনো জাতিগত সংঘাতের মতো এর মূলেও আছে ঔপনিবেশিক শক্তিদের হাত।
রুয়ান্ডায় বাস তিন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের; হুতু, তুৎসি ও তুয়া। হুতু ও তুৎসি এখন আলাদা জাতিসত্ত্বা হিসেবে পরিচিত হলেও, আগে তা ছিল কেবল পেশাগত শ্রেণি পরিচয়। হুতুরা চাষাবাদ করত, তুৎসিরা গবাদি পশু চড়াতো।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে রুয়ান্ডায় রাজত্ব শুরু করে তুৎসি নিগিনিয়া বংশ। রাজার বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতু ও সংখ্যালঘু তুৎসিদের মধ্যে বিভাজন শুরু হয়।
নতুন আইন জারি হয়; তুৎসিদের কাছ থেকে তাদের দখলকৃত জমি ফেরত পেতে হলে জোরপূর্বক শ্রম দিতে হবে হুতুদের, এবং অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত সেবার বিনিময়ে তুৎসিরা হুতুদের গবাদি পশু দেবে।
বুরুন্ডি ও রুয়ান্ডা দখল নিয়ে নেয় জার্মানি ১৮৮৪ সালে। জার্মানরা তুৎসিদের জাতিগতভাবে উচ্চস্তরের মনে করত আর তাই তাদের বেশি সুবিধা দেওয়া হতো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে জার্মানির কাছ থেকে রুয়ান্ডা হাতিয়ে নেয় বেলজিয়াম। বেলজিয়ান প্রশাসন প্রথমবারের মতো হুতু, তুৎসি ও তুয়া জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্যাথলিক চার্চের বদৌলতে গড়ে উঠতে থাকে হুতু সামাজিক আন্দোলন, তৈরি হতে থাকে শিক্ষিত হুতু উচ্চশ্রেণী ও সুশীল সমাজ।
রুয়ান্ডান বিপ্লব শুরু হয় ১৯৫৯ সালে এবং সেই সময় থেকেই তুৎসিদের ওপর আক্রমণ শুরু করে হুতুরা। ১৯৬২ সালের মধ্যে রুয়ান্ডা স্বাধীন হয় এবং ১৯৬৩ সালের মধ্যে তিন লাখ তুৎসি পালিয়ে আশেপাশের দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
সেই সময় থেকে তুৎসিদের ওপর থেকে থেকে আক্রমণ ও হত্যা চলতে থাকে, যা চলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। সেই বছরই চার হাজার সৈন্য নিয়ে উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডায় আক্রমণ চালায় তুৎসি শরণার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা বাহিনী রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ)।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল দখলের পাশাপাশি চালাতে থাকে গেরিলা যুদ্ধ। ১৯৯৩ সালে রুয়ান্ডার হুতু সরকার এবং আরপিএফ-এর মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়, এবং আরপিএফ-এর তুৎসি সদস্যদের সরকারে কিছু পদও দেয়া হয়। এতে নাখোশ হতে থাকে হুতু ডানপন্থীরা। তারা মনে করতে থাকে, সরকার তুৎসিদের ওপর বেশিই সহানুভূতি দেখাচ্ছে।
রুয়ান্ডার পাশের দেশ বুরুন্ডিতে সেখানকার প্রথম হুতু প্রেসিডেন্টকে ১৯৯৩ সালে হত্যা করে তুৎসি সেনা কর্মকর্তারা। এই ঘটনাকে পুঁজি করতে উঠে পড়ে লাগে হুতু ডানপন্থীরা। হামলা আর হত্যার শিকার হতে থাকে তুৎসিরা।
ঠিক সেই সময়ই প্রতিষ্ঠা করা হয় আরটিএলএম, ‘হাজার পর্বতের মুক্ত বেতার’ এবং ছড়ানো শুরু হয় ঘৃণার বার্তা। তুৎসিদের স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতক, এমনকি “তেলাপোকা” বলে অভিহিত করা হতো সেখান থেকে।
১৯৯৪ সালের ৬ই এপ্রিল রাতে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা যেই বিমানে উড়ছিলেন, সেটিকে ভূপাতিত করা হয়, নিহত হন প্রেসিডেন্ট। এই হত্যার দায় এক রাতেই তুৎসিদের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয় আরটিএলএম। পরদিনই শুরু হয় গণহত্যা।
হাজার পর্বতের মুক্ত বেতার
এই গণহত্যা উস্কে দেয়ার প্রধান অস্ত্রগুলোর একটি ছিল কোনো বন্দুক বা ধারালো অস্ত্র নয়, আরটিএলএম বেতার কেন্দ্র। সাতই এপ্রিল ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে সেখান থেকে তুৎসিদের বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়েছে ঘৃণার বার্তা, নাম ধরে ধরে মানুষের তালিকা দেয়া হয়েছে, বলে দেয়া হয়েছে তাদের লুকানোর স্থান।
প্রতিবেশীদের একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছিল আরটিএলএম। সরকার, ডানপন্থী দল ও যুব মিলিশিয়ার বাইরে সাধারণ জনগণও ঘরে থাকা চাপাতি আর রামদা-এর মতো অস্ত্র হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল গণহত্যায় অংশ নিতে।
সে সময়ে রুয়ান্ডায় টেলিভিশন ছিল হাতেগোনা কয়েকটি ঘরে। সাক্ষরতার হার কম হওয়ায় সংবাদপত্রও যেত না সব জায়গায়। তবে বেতার বার্তা পৌঁছাতো সবার কাছে। আর এইটাই কাজে লাগিয়েছিল আরটিএলএম।
১৯৯৩ সালের জুনে প্রতিষ্ঠার পরপর ঘৃণার বার্তাগুলো ছিল সূক্ষ্ম। উপস্থাপকরা কথা বলতেন জাতিগত পরিচয় নিয়ে, বিতর্ক করতেন; কে রুয়ান্ডার মানুষ আর কে নয় তা নিয়ে। আস্তে আস্তে সেখানে তুৎসিদের, এবং তুৎসিদের ওপর সহানূভুতিশীল হুতুদের উপস্থাপন করা শুরু হয় বিপজ্জনক, বহিরাগত ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে।
তুৎসিদের সমালোচনা আস্তে আস্তে রূপ নেয় বিদ্বেষে। এমন কী তাদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করা হচ্ছিল না । “ইনিয়েঞ্জি” শব্দটি শোনা যেত বারবার; তেলাপোকা। তুৎসিরা এবং তাদের ওপর সহানুভূতিশীল সকল হুতুকে বলা হতো তেলাপোকা, যাদেরকে নিঃশেষ করে জীবাণুমুক্ত করতে হবে ঘর।
আরটিএলএম একটি বয়ান তৈরি করছিল যেখানে হুতুরা নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে পারবে এবং মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেবে জাতিগত সহিংসতাকে।
প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানার বিমান ভূপাতিত হবার পরপরই এর দায় রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট ও তুৎসি সাধারণ মানুষের ওপর চাপাতে থাকতে আরটিএলএম। এর পরের ১০০ দিন চলে গণহত্যা।
তুৎসি ও মুক্তমনা হুতু মিলিয়ে আট লাখের বেশি মানুষ হত্যা করা হয় এই সময়ে। এবং এই নৃশংসতার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে কাজ করছিল বেতার।
গণহত্যা চলার সময় বেতার উপস্থাপকেরা নির্দ্বিধায় সরাসরি সহিংসতার ডাক দিতে থাকে। তুৎসিদের নিধন করার ডাক আসতে থাকে সেখান থেকে। আর মাঝখানে মাঝখানে বাজতে থাকে গান।
গান ও কৌতুকের মাঝখানে মাঝখানে তুৎসি নিধনের ডাক হয়তো মানুষকে এই গণহত্যার বিষয়টা স্বাভাবিক মনে করতে সাহায্য করেছিল।
গবেষকদের মতে আরটিএলএম তার বয়ান তিন ধাপে ছড়িয়েছিল। প্রথমটি ছিল ভয়। শুরুর দিকে এমন বার্তা ছড়ানো হতো যে তুৎসিরা দেশের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে, যাতে হঠাৎ করেই তারা আক্রমণ করে সবার ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম করতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ ছিল অমানবিকীকরণ; তুৎসিদের দেখানো হতো পোকামাকড়, কীট কিংবা তেলাপোকা হিসেবে, যাদের অনতিবিলম্বে দেশ থেকে উচ্ছেদ করাতেই মঙ্গল।
এরপরের ধাপে আসে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয়া। হুতুদের মুক্তির পথ হিসেবী সহিংসতাকে দেখিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এটিকে ন্যায্যতা দিতে সহিংসতাকে আখ্যায়িত করা হতো হুতুদের দায়িত্ব এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে।
আর শেষে, গণহত্যা শুরু হয়ে যাওয়ার পর আসতে থাকে দিকনির্দেশনা, কে কোথায় লুকিয়ে আছে, কারা কোন স্কুলে, কোন হোটেলে, কোন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে, সেই তথ্য হত্যাকারীদের কাছে সম্প্রচার হতে থাকে।
রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট গণহত্যার জবাবে আবার আক্রমণ করে রুয়ান্ডায়। ১৯৯৪ সালের ৪ জুলাই তারা দেশটির রাজধানী কিগালি দখল করে হুতু সরকারকে উৎখাতের পরই গণহত্যা থামে। হুতু গণহত্যাকারীদের অনেকেই তখন পালিয়ে বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক রিপাব্লিক অফ কংগোতে চলে যায়। আরটিএলএম-এর পরিচালকরাও সম্প্রচার যন্ত্রপাতি নিয়ে পালিয়ে যায়। সম্প্রচার চালু থাকে ১৯৯৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত।
বর্তমান
রুয়ান্ডায় গণহত্যার বিচারের জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তৈরির পাশাপাশি গঠিত হয়েছে গাকাকা কোর্ট, যার মাধ্যমে খোলা জায়গায় বসে স্থানীয়ভাবেই গণহত্যায় অংশগ্রহণকারীদের বিচার করা হয়।
আইসিটি ও গাকাকা কোর্ট মিলে আরটিএলএম-এর সাথে সম্পৃক্ত শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যক্তিকেই বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। তবে প্রশ্ন জাগে, এখনো কি গণমাধ্যম দিয়ে এই ধরনের সহিংসতা ছড়ানো অসম্ভব?
এখন আর বেতারের নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ। যেখানে যে কেউ যেকোনো কিছুই বলতে পারেন অবাধভাবে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেই ২০২৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর রাতে গণমাধ্যমের কার্যালয়ে আগুন জ্বলতে দেখা যায়, যার জন্যে অনেকেই প্রাথমিকভাবে দায় দেন সামাজিক মাধ্যমের দু’জন ভ্লগার ও তাদের উস্কানিমূলক বার্তাকে।
সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির কথা শুনে একটি বয়ানে ঢুকে যাওয়ার আগে কী আজকের মানুষ ৩২ বছর আগের রুয়ান্ডার দিকে তাকিয়ে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারবে?
যেভাবে একটি দেশকে রক্তে ভাসিয়েছিল বেতার
সুন্দর নামের পেছনে ছিল কুৎসিত পরিকল্পনা। বিনোদন ও গানের ফাঁকে ফাঁকে শোনা যেত ঘৃণার বার্তা, যা দিনে দিনে আরও সহিংস হতে থাকে। সংবাদ ও বিনোদনের উৎস রেডিও স্টেশনটি পরের বছরই হয়ে উঠেছিল গণহত্যার অস্ত্র। তার সুন্দর নাম আর টেকেনি, মানুষের কাছে এখন তা পরিচিত, 'হেইট রেডিও', 'রেডিও জেনোসাইড' হিসেবে
রুয়ান্ডার পাহাড়গুলো পরিচিত তাদের নজরকাড়া সৌন্দর্যের জন্য। সারাদেশে ছেয়ে থাকা দীর্ঘ ও ঘন পর্বতশৃঙ্গের কারণে দেশটিকে অনেকেই ডাকে - হাজার পর্বতের দেশ, ফরাসি ভাষায় ‘পেই দে মিল কোলিন।’
এখান থেকেই ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়া রুয়ান্ডার নতুন বেতার কেন্দ্রটিও পায় তার নাম ‘রেডিও টেলিভিশন দে লিব্রে মিল কোলিন’ (আরটিএলএম) যার অর্থ হাজার পর্বতের মুক্ত বেতার।
রুয়ান্ডায় তখন টেলিভিশন ছিল হাতে গোনা মানুষের কাছে। তাই সংবাদপত্রের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে তথ্য সংগ্রহ ও বিনোদনের প্রধান উৎস ছিল বেতার। দেশটির জাতীয় বেতার ‘রুয়ান্ডা রেডিওর’ গৎবাধা উপস্থাপনা থেকে বের হয়ে এসে তরুণ-যুবাদের পছন্দের গানগুলো বাজানোর কারণে দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে আরটিএলএম।
তবে তার এই সুন্দর নামের পেছনে ছিল কুৎসিত পরিকল্পনা। বিনোদন ও গানের মাঝখানে মাঝখানে শোনা যেত ঘৃণার বার্তা, যা দিনে দিনে আরও সহিংস হতে থাকে। সংবাদ ও বিনোদনের উৎস বেতার পরের বছরই হয়ে উঠেছিল গণহত্যার অস্ত্র। তার সুন্দর নাম টেকেনি, মানুষের কাছে তা এখন পরিচিত, “হেইট রেডিও”, কিংবা “রেডিও জেনোসাইড” হিসেবে।
ঘৃণার সূত্রপাত
১৯৯৪ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া রুয়ান্ডার গণহত্যায় আরটিএলএম-এর ভূমিকা জানার আগে বুঝতে হবে সেই দেশে তার আগের কয়েক দশক ধরে ফুঁসে ওঠা জাতিগত বিদ্বেষকে। এবং পৃথিবীর প্রায় যেকোনো জাতিগত সংঘাতের মতো এর মূলেও আছে ঔপনিবেশিক শক্তিদের হাত।
রুয়ান্ডায় বাস তিন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের; হুতু, তুৎসি ও তুয়া। হুতু ও তুৎসি এখন আলাদা জাতিসত্ত্বা হিসেবে পরিচিত হলেও, আগে তা ছিল কেবল পেশাগত শ্রেণি পরিচয়। হুতুরা চাষাবাদ করত, তুৎসিরা গবাদি পশু চড়াতো।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে রুয়ান্ডায় রাজত্ব শুরু করে তুৎসি নিগিনিয়া বংশ। রাজার বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতু ও সংখ্যালঘু তুৎসিদের মধ্যে বিভাজন শুরু হয়।
নতুন আইন জারি হয়; তুৎসিদের কাছ থেকে তাদের দখলকৃত জমি ফেরত পেতে হলে জোরপূর্বক শ্রম দিতে হবে হুতুদের, এবং অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত সেবার বিনিময়ে তুৎসিরা হুতুদের গবাদি পশু দেবে।
বুরুন্ডি ও রুয়ান্ডা দখল নিয়ে নেয় জার্মানি ১৮৮৪ সালে। জার্মানরা তুৎসিদের জাতিগতভাবে উচ্চস্তরের মনে করত আর তাই তাদের বেশি সুবিধা দেওয়া হতো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে জার্মানির কাছ থেকে রুয়ান্ডা হাতিয়ে নেয় বেলজিয়াম। বেলজিয়ান প্রশাসন প্রথমবারের মতো হুতু, তুৎসি ও তুয়া জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্যাথলিক চার্চের বদৌলতে গড়ে উঠতে থাকে হুতু সামাজিক আন্দোলন, তৈরি হতে থাকে শিক্ষিত হুতু উচ্চশ্রেণী ও সুশীল সমাজ।
রুয়ান্ডান বিপ্লব শুরু হয় ১৯৫৯ সালে এবং সেই সময় থেকেই তুৎসিদের ওপর আক্রমণ শুরু করে হুতুরা। ১৯৬২ সালের মধ্যে রুয়ান্ডা স্বাধীন হয় এবং ১৯৬৩ সালের মধ্যে তিন লাখ তুৎসি পালিয়ে আশেপাশের দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
সেই সময় থেকে তুৎসিদের ওপর থেকে থেকে আক্রমণ ও হত্যা চলতে থাকে, যা চলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। সেই বছরই চার হাজার সৈন্য নিয়ে উগান্ডা থেকে রুয়ান্ডায় আক্রমণ চালায় তুৎসি শরণার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা বাহিনী রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ)।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল দখলের পাশাপাশি চালাতে থাকে গেরিলা যুদ্ধ। ১৯৯৩ সালে রুয়ান্ডার হুতু সরকার এবং আরপিএফ-এর মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়, এবং আরপিএফ-এর তুৎসি সদস্যদের সরকারে কিছু পদও দেয়া হয়। এতে নাখোশ হতে থাকে হুতু ডানপন্থীরা। তারা মনে করতে থাকে, সরকার তুৎসিদের ওপর বেশিই সহানুভূতি দেখাচ্ছে।
রুয়ান্ডার পাশের দেশ বুরুন্ডিতে সেখানকার প্রথম হুতু প্রেসিডেন্টকে ১৯৯৩ সালে হত্যা করে তুৎসি সেনা কর্মকর্তারা। এই ঘটনাকে পুঁজি করতে উঠে পড়ে লাগে হুতু ডানপন্থীরা। হামলা আর হত্যার শিকার হতে থাকে তুৎসিরা।
ঠিক সেই সময়ই প্রতিষ্ঠা করা হয় আরটিএলএম, ‘হাজার পর্বতের মুক্ত বেতার’ এবং ছড়ানো শুরু হয় ঘৃণার বার্তা। তুৎসিদের স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতক, এমনকি “তেলাপোকা” বলে অভিহিত করা হতো সেখান থেকে।
১৯৯৪ সালের ৬ই এপ্রিল রাতে রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানা যেই বিমানে উড়ছিলেন, সেটিকে ভূপাতিত করা হয়, নিহত হন প্রেসিডেন্ট। এই হত্যার দায় এক রাতেই তুৎসিদের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয় আরটিএলএম। পরদিনই শুরু হয় গণহত্যা।
হাজার পর্বতের মুক্ত বেতার
এই গণহত্যা উস্কে দেয়ার প্রধান অস্ত্রগুলোর একটি ছিল কোনো বন্দুক বা ধারালো অস্ত্র নয়, আরটিএলএম বেতার কেন্দ্র। সাতই এপ্রিল ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে সেখান থেকে তুৎসিদের বিরুদ্ধে ছড়ানো হয়েছে ঘৃণার বার্তা, নাম ধরে ধরে মানুষের তালিকা দেয়া হয়েছে, বলে দেয়া হয়েছে তাদের লুকানোর স্থান।
প্রতিবেশীদের একজনকে আরেকজনের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছিল আরটিএলএম। সরকার, ডানপন্থী দল ও যুব মিলিশিয়ার বাইরে সাধারণ জনগণও ঘরে থাকা চাপাতি আর রামদা-এর মতো অস্ত্র হাতে নিয়ে ছুটে যাচ্ছিল গণহত্যায় অংশ নিতে।
সে সময়ে রুয়ান্ডায় টেলিভিশন ছিল হাতেগোনা কয়েকটি ঘরে। সাক্ষরতার হার কম হওয়ায় সংবাদপত্রও যেত না সব জায়গায়। তবে বেতার বার্তা পৌঁছাতো সবার কাছে। আর এইটাই কাজে লাগিয়েছিল আরটিএলএম।
১৯৯৩ সালের জুনে প্রতিষ্ঠার পরপর ঘৃণার বার্তাগুলো ছিল সূক্ষ্ম। উপস্থাপকরা কথা বলতেন জাতিগত পরিচয় নিয়ে, বিতর্ক করতেন; কে রুয়ান্ডার মানুষ আর কে নয় তা নিয়ে। আস্তে আস্তে সেখানে তুৎসিদের, এবং তুৎসিদের ওপর সহানূভুতিশীল হুতুদের উপস্থাপন করা শুরু হয় বিপজ্জনক, বহিরাগত ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে।
তুৎসিদের সমালোচনা আস্তে আস্তে রূপ নেয় বিদ্বেষে। এমন কী তাদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করা হচ্ছিল না । “ইনিয়েঞ্জি” শব্দটি শোনা যেত বারবার; তেলাপোকা। তুৎসিরা এবং তাদের ওপর সহানুভূতিশীল সকল হুতুকে বলা হতো তেলাপোকা, যাদেরকে নিঃশেষ করে জীবাণুমুক্ত করতে হবে ঘর।
আরটিএলএম একটি বয়ান তৈরি করছিল যেখানে হুতুরা নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে দেখতে পারবে এবং মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেবে জাতিগত সহিংসতাকে।
প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানার বিমান ভূপাতিত হবার পরপরই এর দায় রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট ও তুৎসি সাধারণ মানুষের ওপর চাপাতে থাকতে আরটিএলএম। এর পরের ১০০ দিন চলে গণহত্যা।
তুৎসি ও মুক্তমনা হুতু মিলিয়ে আট লাখের বেশি মানুষ হত্যা করা হয় এই সময়ে। এবং এই নৃশংসতার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে কাজ করছিল বেতার।
গণহত্যা চলার সময় বেতার উপস্থাপকেরা নির্দ্বিধায় সরাসরি সহিংসতার ডাক দিতে থাকে। তুৎসিদের নিধন করার ডাক আসতে থাকে সেখান থেকে। আর মাঝখানে মাঝখানে বাজতে থাকে গান।
গান ও কৌতুকের মাঝখানে মাঝখানে তুৎসি নিধনের ডাক হয়তো মানুষকে এই গণহত্যার বিষয়টা স্বাভাবিক মনে করতে সাহায্য করেছিল।
গবেষকদের মতে আরটিএলএম তার বয়ান তিন ধাপে ছড়িয়েছিল। প্রথমটি ছিল ভয়। শুরুর দিকে এমন বার্তা ছড়ানো হতো যে তুৎসিরা দেশের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে, যাতে হঠাৎ করেই তারা আক্রমণ করে সবার ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম করতে পারে।
দ্বিতীয় ধাপ ছিল অমানবিকীকরণ; তুৎসিদের দেখানো হতো পোকামাকড়, কীট কিংবা তেলাপোকা হিসেবে, যাদের অনতিবিলম্বে দেশ থেকে উচ্ছেদ করাতেই মঙ্গল।
এরপরের ধাপে আসে সহিংসতাকে ন্যায্যতা দেয়া। হুতুদের মুক্তির পথ হিসেবী সহিংসতাকে দেখিয়ে দেয়ার পাশাপাশি এটিকে ন্যায্যতা দিতে সহিংসতাকে আখ্যায়িত করা হতো হুতুদের দায়িত্ব এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হিসেবে।
আর শেষে, গণহত্যা শুরু হয়ে যাওয়ার পর আসতে থাকে দিকনির্দেশনা, কে কোথায় লুকিয়ে আছে, কারা কোন স্কুলে, কোন হোটেলে, কোন জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে, সেই তথ্য হত্যাকারীদের কাছে সম্প্রচার হতে থাকে।
রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট গণহত্যার জবাবে আবার আক্রমণ করে রুয়ান্ডায়। ১৯৯৪ সালের ৪ জুলাই তারা দেশটির রাজধানী কিগালি দখল করে হুতু সরকারকে উৎখাতের পরই গণহত্যা থামে। হুতু গণহত্যাকারীদের অনেকেই তখন পালিয়ে বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক রিপাব্লিক অফ কংগোতে চলে যায়। আরটিএলএম-এর পরিচালকরাও সম্প্রচার যন্ত্রপাতি নিয়ে পালিয়ে যায়। সম্প্রচার চালু থাকে ১৯৯৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত।
বর্তমান
রুয়ান্ডায় গণহত্যার বিচারের জন্য জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তৈরির পাশাপাশি গঠিত হয়েছে গাকাকা কোর্ট, যার মাধ্যমে খোলা জায়গায় বসে স্থানীয়ভাবেই গণহত্যায় অংশগ্রহণকারীদের বিচার করা হয়।
আইসিটি ও গাকাকা কোর্ট মিলে আরটিএলএম-এর সাথে সম্পৃক্ত শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যক্তিকেই বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। তবে প্রশ্ন জাগে, এখনো কি গণমাধ্যম দিয়ে এই ধরনের সহিংসতা ছড়ানো অসম্ভব?
এখন আর বেতারের নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগ। যেখানে যে কেউ যেকোনো কিছুই বলতে পারেন অবাধভাবে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেই ২০২৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর রাতে গণমাধ্যমের কার্যালয়ে আগুন জ্বলতে দেখা যায়, যার জন্যে অনেকেই প্রাথমিকভাবে দায় দেন সামাজিক মাধ্যমের দু’জন ভ্লগার ও তাদের উস্কানিমূলক বার্তাকে।
সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির কথা শুনে একটি বয়ানে ঢুকে যাওয়ার আগে কী আজকের মানুষ ৩২ বছর আগের রুয়ান্ডার দিকে তাকিয়ে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারবে?