যেভাবে খামেইনির নেতৃত্বে পরাশক্তি হয়ে উঠেছিল ইরান

আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির চার দশকের নেতৃত্বে ইরান যুদ্ধবিধ্বস্ত ও নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত অবস্থা থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়। ইরাক-ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি রাষ্ট্রকে স্থায়ী প্রতিরোধ ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতিতে পরিচালিত করেন। 

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

বিপ্লব ও  ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো একটি দেশ, আর সেই দেশের কেন্দ্রে এক দৃঢ়, বিতর্কিত ও দীর্ঘতম শাসনকালের নেতা। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর আয়াতুল্লাহ আলি খামেেইনি শুধু ইরানের রাজনৈতিক দিকনির্দেশই নির্ধারণ করেননি; তিনি পুনর্গঠন করেছেন রাষ্ট্রের শক্তির কাঠামো, সামরিক কৌশল এবং আঞ্চলিক প্রভাবের মানচিত্র। 

ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া ‘অবরুদ্ধ রাষ্ট্র’ মানসিকতাকে ভিত্তি করে তিনি গড়ে তোলেন শক্তিশালী আইআরজিসি, প্রতিষ্ঠা করেন ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনোমি’ বা প্রতিরোধের অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত করেন ‘প্রতিরোধের অক্ষ’।

সমর্থকদের কাছে এটি ছিল স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল; সমালোচকদের চোখে তা ছিল সংঘাতনির্ভর এক রাষ্ট্রদর্শন। 

কীভাবে খামেইনির নেতৃত্বে ইরান সামরিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠল? 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেইনি।  রবিবার সকালে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।

ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, “ইরানের জনগণকে জানানো হচ্ছে যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনি আমেরিকা ও জায়োনিস্টদের হামলায় শনিবার সকালে শহিদ হয়েছেন।” 

খামেইনির মেয়ে, জামাতা ও নাতিও সেই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানানো হয়।

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প খামেইনিকে হত্যার কথা জানিয়েছিলেন।  

১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন খামেইনি। ইরানে ইসলামি বিপ্লবের কাণ্ডারি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। 

যখন থেকে দৃশ্যপটে খামেইনি

খোমেইনির নেতৃত্বে পাহলাভি শাসনের অবসান ঘটে। তবে তার পেছনে বড় শক্তি ছিলেন খামেইনি। 

তিনিই ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী শক্তিশালী করেছেন। এই বাহিনী ইরানকে শত্রুর আঘাত থেকে সুরক্ষা দিয়েছে এবং এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করেছে। 

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইরানকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খামেইনি। পশ্চিমা দেশগুলো ইরাকি নেতা সাদ্দাম হুসেইনকে সমর্থন দেওয়ায় ইরান অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী সেই সংঘাতে পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র খামেইনির ওপর ক্ষুব্ধ হয়।

ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসর বলেন, “অনেকে ইরানকে একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভাবেন, কারণ খামেইনি পাগড়ি পরেন এবং রাষ্ট্রের ভাষা ধর্মীয় ভাষা। তবে বাস্তবে তিনি ছিলেন একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট। যুদ্ধ শেষে তিনি এই ধারণা পোক্ত করেন যে ইরান ঝুঁকিতে আছে এবং তার নিরাপত্তা প্রয়োজন।”

আহমদ খামেনি (বাম থেকে ), আলি খামেনি, রুহুল্লাহ খোমেনি

‘ইরান’স গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি: অ্যা পলিটিকাল হিস্টোরি’ বইয়ের এই লেখকের মতে বিপ্লব, ইসলামি প্রজাতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ আর ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বৈরিতা আলাদা কিছু নয়, তাই এগুলোকে রক্ষা করা জরুরি।

আর এই আদর্শেই ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তারাই পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারের অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে।  

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ক্রমাগত কঠোর চাপের মুখে খামেইনি তৈরি করেন প্রতিরোধের অর্থনীতি। পশ্চিমাদের সঙ্গে যে কোনো সম্পৃক্ততার ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নেন।

বছরের পর বছর ধরে তার শাসন একাধিকবার বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ২০০৯ সালে বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামা বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়। 

২০২২ সালেও নারীদের অধিকার ইস্যুতে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। মাহসা আমিনি নামে এক তরুণীর পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় ফুঁসে ওঠা সেই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল খামেইনির শাসন।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী অস্থিরতায় রূপ নেয়। বহু বিক্ষোভকারী সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের দাবি জানায়। খামেইনি প্রশাসনও কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে বহু সহিংস সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সংস্কারপন্থী তরুণদের সঙ্গে খামেইনির আদর্শের দূরত্ব ছিল। সবসময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সারাক্ষণ ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধে থাকাটাও অনেকের অসন্তোষের কারণ।

ভ্যালি নাসর বলেন, “জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে এই মাত্রার অনড় অবস্থানের জন্য ইরানিদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। ফলে তিনি ইরানের জনগণের সমর্থন হারিয়েছেন, কারণ তরুণরা আর এই স্বাধীনতার সংজ্ঞায় বিশ্বাস করছিল না।”

বিপ্লবী নেতৃত্ব

১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিয়া নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন খামেইনি। তিনি ছিলেন এক খ্যাতনামা মুসলিম ধর্মীয় নেতার সন্তান; তার পরিবার ছিল পার্শ্ববর্তী ইরাক থেকে আগত আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত।

প্রথমে পরিবারটি ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজে বসবাস শুরু করে, পরে তীর্থযাত্রীদের পছন্দের স্থান মাশহাদে চলে যায়, যেখানে খামেইনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের নেতৃত্ব দেন।

খামেইনি বলতেন, তার মা খাদিজা মিরদামাদি কোরআন ও বই পড়তে ভালোবাসতেন। তিনিই ছেলের মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছিলেন এবং পরবর্তীতে পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার সময় তাকে সমর্থন করেছিলেন।

চার বছর বয়সে পড়াশোনা  শুরু করেন খামেইনি। সেসময়ই কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন। মাশহাদের প্রথম ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন তিনি।

তবে হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ না করে ভর্তি হন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সে সময়ের প্রখ্যাত ইসলামি আলেমদের কাছে পড়াশোনা করেন। তাদের মধ্যে তার বাবা সৈয়দ জাভেদ খামেইনি ও শেখ হাশেম গাজভিনির মতো প্রখ্যাত আলেমরাও ছিল।

পরে নাজাফ ও কোমের মতো বিখ্যাত শিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন খামেইনি।

কোমেতেই তিনি আয়তোল্লাহ খোমেইনির দীক্ষা লাভ করেন। খোমেইনি সে সময় তরুণদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন।

খামেইনি ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) বিষয়ক পাঠদান এবং তাফসির ক্লাস নিতেন। এর মাধ্যমে তিনি মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হন। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কারণ এই তরুণরা রাজতন্ত্র নিয়ে হতাশ ছিল।

১৯৫৩ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনা হয়।

সেই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল সিআইএ এবং এমআই সিক্স। বলা হয়, মোসাদ্দেক ইরানের তেলের খনিগুলো জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সে সময় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন খামেইনি।ইরানের শাহ-এর সিক্রেট পুলিশ সাভাক তাকে গ্রেপ্তার করে এবং প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসনে পাঠায়।

তবে সেখান থেকে ফিরে এসে ১৯৭৮ সালের বিক্ষোভে অংশ নেন খামেইনি, যা শেষ পর্যন্ত পাহলভি শাসনের পতন ঘটায়।

সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পথ

রাজতন্ত্র পতনের পর নতুন ইরান রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন খামেইনি।

১৯৮০ সালে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন।

ভালো বক্তা হওয়ায় তেহরানের জুমার নামাজের খতিবের মতো প্রভাবশালী পদও পান খামেইনি।

১৯৮১ সাল খামেইনির জীবনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে বছরই মুজাহেদিন-ই খালক (এমইকে) নামের একটি বিরোধী গোষ্ঠী তাকে হত্যার চেষ্টা করে। অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও তার ডান হাত একেবারেই অকেজো হয়ে যায়।

খোমেইনির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলামি শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেছিল এমইকে। সেই বছরেই খামেইনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৮৯ সালে খোমেইনির মৃত্যু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত ছিল। মৃত্যুর আগে খোমেইনি তার দীর্ঘদিনের মনোনীত উত্তরসূরি আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলি মনতাজেরিকে সরিয়ে দেন। ১৯৮৮ সালে বন্দিদের গণফাঁসি নিয়ে সমালোচনার কারণে মনতাজেরিকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেইনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে তা করতে গিয়ে পরিষদকে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ার জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত শিথিল করতে হয়। সে সময় খামেইনির ‘হোজাতোলেসলাম’ ছিল না। এটি শিয়াদের শীর্ষ ধর্মীয় উপাধি।

দায়িত্ব নিয়ে খামেইনি বলেছিলেন, “আমি মনে করি না যে আমি এই পদের যোগ্য; হয়তো আপনি এবং আমি দুজনই তা জানি। এটি প্রতীকী নেতৃত্ব হবে, প্রকৃত নেতৃত্ব নয়।”

কিন্তু তা আসলে প্রতীকী ছিল না। 

খামেইনির শুরুর সময়টা কেটেছে ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের চেষ্টায়। ওই সংঘাতে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

প্রেসিডেন্ট থাকাকালেও খামেইনি প্রায়ই যুদ্ধের সম্মুখসারিতে যেতেন। ফলে রেভল্যুশনারি গার্ডদের মধ্যে তার তুমুল সমর্থন ও জনপ্রিয়তা ছিল।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব ও মধ্যপ্রাচ্য অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক নার্গেস বাজোগলি বলেন, “তিনি এমন একজন নেতা, যার রাজনৈতিক মানসগঠন হয়েছে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে। এটি তার অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে।

“সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি অবরোধ পরিস্থিতি ও স্থায়ী প্রতিরোধের প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামো শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেন।”

বিপ্লব দমন

নব্বইয়ের দশকে পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়। দেশে তখন বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল। আর বিপ্লবী উন্মাদনাও কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসছিল। দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তিতে অনেকে ইরানকে আবার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ফিরে যেতে দেখতে চেয়েছিলেন।

সেই মনোভাবের প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৯৭ সালে। সে বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সংস্কারপন্থী মোহাম্মদ খাতামির ব্যাপক জয় পান। তিনি পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী ছিলেন।

তবে খামেইনি পশ্চিমাদের ব্যাপারে সবসময় সতর্ক ছিলেন। সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীর ভেতর থেকেও সংস্কারের পক্ষে যে ভোট পড়েছিল, তা উপলব্ধি করেন তিনি। বিষয়টিকে বিদ্যমান ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেন।

নার্গিস বাজোগলির মতে সংস্কারপন্থীদের মোকাবিলায় তিনি অনুগত সমর্থকদের একটি স্থিতিশীল ভোটব্যাংক গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।

‘ইরান ফ্রেমড’ গ্রন্থের এই লেখক আরও বলেন, “খোমেইনির তুলনায় খামেইনির নিজের তেমন সমর্থকগোষ্ঠী ছিল না। তাই তিনি তরুণ প্রজন্মের সমর্থন নিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যাপক অর্থায়ন করেন, যদিও তা ছিল আধাসামরিক কাঠামোর ভেতরেই।”

এর অর্থ ছিল রেভল্যুশনারি গার্ডকে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রায় অবাধ সুযোগ দেওয়া। এর মাধ্যমে তারা ইরানের অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

তরুণদের, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করা হয়, যার সুফল পায় রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর সদস্যরা।

যদিও এটি ইরানি সমাজের খুব ছোট একটা অংশ ছিল, তারপরও খামেইনির পশ্চিমাবিরোধী অবস্থানের ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই অংশটি ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর এই গ্রুপটি প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিল।

২০০৯ সালে পশ্চিমাবিরোধী কট্টরপন্থী মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত নির্বাচনি জয়ের পর দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দমন করতে এই নতুন আধাসামরিক শক্তিকেই মাঠে নামানো হয়েছিল।

১৯৭৯ সালের পর জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্মের ইরানিরা বিপ্লবে ততটা অনুপ্রাণিত ছিল না। সেই সময় খামেইনির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এটিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।

‘গ্রিন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত আন্দোলনে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে নির্বাচনের ফল চ্যালেঞ্জ করে এবং পরাজিত সংস্কারপন্থী প্রার্থী মির হোসেইন মুসাভির প্রতি সমর্থন জানায়।

বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, আহমাদিনেজাদকে জেতাতে নির্বাচন কারচুপি করা হয়েছে। তবে খামেইনি নির্বাচনের ফল অনুমোদন করেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অনেকে নিহত হন।

তবে ইরান সরকার পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে তারা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের উদ্দেশ্যে অস্থিরতা উসকে দিয়েছে।

‘না শান্তি, না যুদ্ধ’

খামেইনি একই সঙ্গে বাস্তববাদীও ছিলেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি মনে করতেন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই বিভিন্ন কৌশলে করতে হবে। একদিকে প্রতিরোধ, আবার প্রয়োজনে আলোচনা-আলোচনার পথও নিতে হবে।

২০১৫ সালে পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল। খামেইনি উপলব্ধি পারেন, যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ও বিনিয়োগ বাড়াতে এই চাপগুলো কাটাতে হবে।

তাই তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় সবুজ সংকেত দেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পরাশক্তি দেশগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করে ইরান। চুক্তির লক্ষ্য ছিল, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পরিসর সীমিত করা।

ভ্যালি নাসরের মতে সেটা ছিল বাস্তব সিদ্ধান্ত। কারণ কখনও কখনও রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে আপস দরকার হয়।

তিনি আরও বলেন, “খামেইনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘না শান্তি, না যুদ্ধ’ নীতি পছন্দ করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, যুক্তরাষ্ট্র স্বভাবগতভাবেই ইরানের বিরুদ্ধে; তাই ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা বজায় রাখতে হবে।”

এই বিশ্লেষক আরও বলেন, ইরানের পারমাণবিক চুক্তিটি আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেনি। বরং সেটি সোভিয়েতদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি করেছিল, তেমনই।

কিন্তু চুক্তির তিন বছর পরই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে বের করে নেন। আর ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। খামেইনিও আবার আগ্রাসী ভূমিকায় চলে যান।

পরবর্তী বছরগুলোতে ইরান ইউরেনিয়াম মজুদ ৬০ শতাংশ বাড়ায় যার ৯০ শতাংশই ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের জন্য প্রস্তুত।

যদিও ইরান সবসময়ই দাবি করেছে যে তাদের এই পরমাণু গবেষণা একদমই বেসামরিক। ২০০৩ সালে খামেইনি এক ফতোয়া জারি করেন যেখানে বলা হয়, পরমাণু অস্ত্র মজুদ ও ব্যবহার করা যাবে না।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ ও মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকায় ২০১৯ সালে তেলের দাম বাড়ায় ইরান। যার ফলে শুরু হয়ে যায় দেশটি জুড়ে বিক্ষোভ।

নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সহিংস দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

খামেইনি বিক্ষোভকারীদের ‘গুণ্ডা’ বলে আখ্যা দেন এবং অস্থিরতার জন্য পাল্টা-বিপ্লবী ও বিদেশি শত্রুদের দোষারোপ করেন।

দেশের ভেতরে অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিকভাবে বাড়তে থাকা একঘরে অবস্থার মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইব্রাহিম রাইসি বিজয়ী হন। রাইসি আশির দশকের শেষের দিকে গণফাঁসির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সমালোচিত ছিলেন।

ইরানের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতির মধ্যেই তার জয় আসে। কিন্তু তিনি খামেইনির ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

রাইসির মতো ঘনিষ্ঠ মিত্র প্রেসিডেন্ট থাকায় খামেইনির কথিত প্রতিরোধের অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নেন। তবে এই কৌশল থেকে দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি বলে সমালোচনা আছে।

২০২২ সালে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন ভাঙার অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। যা খামেইনির জন্য আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেটিই কঠোরভাবে দমন করে খামেইনি প্রশাসন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে সেসময় ৫০০ জনের বেশি মানুষ মারা যায়। এই ঘটনার জন্যও পশ্চিমাদের দায়ী করেন খামেইনি।

প্রতিরোধের অক্ষ

খামেইনির দৃষ্টিতে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘ক্ষমতা’ শুধু দেশের ভেতরে নয়, দেশের সীমানার বাইরেও দরকার ছিল, যাতে একটি ‘ফরওয়ার্ড ডিফেন্স’ বজায় রেখে সম্ভাব্য আগ্রাসন রুখে দেওয়া যায়।

এর বাস্তব রূপ ছিল মিত্রদের সঙ্গে প্রক্সি সম্পর্কের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা।  যাকে বলা হয় ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ।

এর মূল কারিগর ছিলেন খামেইনির পাঁড় সমর্থক ও ইরানের কুদস বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল কাশেম সোলাইমানি। ২০২০ সালের তাকেও হত্যা করা হয়।

প্রতিরোধের এই অক্ষে ছিল লেবানন-ভিত্তিক হিজবুল্লাহ, সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ, প্যালেস্টাইনের হামাস ও ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতি গোষ্ঠী।

মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে এই গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বজায় রাখতো ইরান। 

তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামাসের হামলার পর চিত্র পালটাতে শুরু করে। ওই হামলার পর অনেকদিন ধরে চলা অভিযান জোরাল করে ইসরায়েল। সত্তর হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছেন সেই অভিযানে। যার মধ্যে হামাসের অনেক শীর্ষ নেতাও ছিলেন।

এই অভিযানের মধ্যেই লেবানেন হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর নেতাদের হত্যা করে ইসরায়েল। এরপর সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উৎখাত করা হয়।

ইরান দুর্বল হওয়ার পর হামলার পরিকল্পনা করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। 

২০২৫ সালের ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীকে হত্যা করে। ইরানও কড়া জবাব দেয়। আঘাত হানে ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে। দুই সপ্তাহ ধরে চলে পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ। 

তখনই খামেইনিকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প চেয়েছিলেন পূর্ণ আত্মসমর্পণ।

খামেইনি জবাবে বলেছিলেন, “যারা ইরান ও এর ইতিহাস জানে তারা কখনোই আত্মসমর্পণ করতে বলবে না, কারণ তারা জানে ইরান হার মানে না।”

সেই যুদ্ধ থামলেও ইরানে অভ্যন্তরীণ সংঘাত থামেনি; বিপ্লবে ফুঁসে ওঠেন জনগণ। কঠোর হাতে সেটাও দমন করে খামেইনি প্রশাসন।  

মানবাধিকার সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, সেই দমন অভিযানে সাত হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। ইরান সরকারের হিসেবে তা তিন হাজার। 

তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হবে, এমন শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। 

অগ্রগতির কথা বলা হলেও, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জেনেভায় একাধিক দফা আলোচনা কোনো বড় সাফল্যে পৌঁছাতে পারেনি। 
যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা চায় ইরান পুরোপুরি পারমাণবিক অবকাঠামো ভেঙে ফেলুক, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সীমিত করুক এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন বন্ধ করুক।

আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।  ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর প্রথমবারের মতো অঞ্চলটিতে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ গড়ে তোলে তারা। শেষ পর্যন্ত অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র, হত্যা করা হয় খামেইনিকে।

(বিবিসি ও আল-জাজিরা অবলম্বনে)