সংকটের ইরান: কূটনীতি, সামরিক মহড়া ও 'মিডনাইট হ্যামার টু'

ওয়াশিংটনের ১০ দিনের আল্টিমেটাম, পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি, সিরিয়ার মতো মিত্র হারানো, ‘বসন্ত বিপ্লব’ আর ধসে পড়া অর্থনীতিতে কোণঠাসা ইরান কী পারবে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছাতে? নাকি আলোচনার ব্যর্থতা ডেকে আনবে নতুন কোনো যুদ্ধের দামামা?

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আগামী বৃহস্পতিবার এমন এক বৈঠক হতে যাচ্ছে, যার ফলাফলের উপর নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরো পৃথিবীর ভাগ্য।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের মধ্যে এই আলোচনাকে মনে করা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধের আগে শেষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।

ওয়াশিংটনের দেওয়া দশ দিনের আল্টিমেটাম ঘনিয়ে আসছে, একই সাথে পারস্য উপসাগরে জড়ো হচ্ছে মার্কিন নৌবহর।

সিরিয়ার মতো বন্ধু হারিয়ে ইতোমধ্যেই কোণঠাসা ইরান। এ বছরের জানুয়ারিতে হওয়া ‘বসন্ত বিপ্লব’ দেশটিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

অর্থনৈতিকভাবেও পর্যদুস্ত দেশটি, তলানিতে নেমেছে ইরানি রিয়ালের মান। সব মিলিয়ে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইরান এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করছে।

প্রশ্ন উঠছে, ইরান কি পারবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছাতে? নাকি মার্কিন রণতরীগুলোই লিখে দিবে ইরানের ভাগ্যলিপি?

১০ দিনের কাউন্টডাউন

গেল ২০ ফেব্রুয়ারি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ‘১০ থেকে ১৫ দিনের’ আল্টিমেটাম দেয় ইরানকে। এই সময়ের মধ্যে ইরান "অর্থবহ চুক্তিতে" না এলে "দুর্ভাগ্যজনক" পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। মার্চের শুরুতে শেষ হতে যাওয়া এই ডেডলাইনের মূল উদ্দেশ্য ইরানকে তার পারমাণবিক অবকাঠামো নিয়ে নতি স্বীকারে বাধ্য করা।

এর আগে ২০২৫ সালের জুনে 'অপারেশন মিডনাইট হ্যামার' নামে এক সামরিক অভিযানে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র। ওইবার প্রায় ২০ হাজার ‘সেন্ট্রিফিউজ’ ধ্বংস হয়েছিল বলে উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে।

এবার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও ওয়াশিংটন বলছে সময় বেশি নেই ইরানের হাতে। বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, কূটনীতি প্রথম বিকল্প হিসেবে থাকলেও মার্কিন প্রশাসনের ধৈর্য্য “অসীম” নয়।

“ইরানের জন্য একটি চুক্তিতে আসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।” 

'শূন্য' বনাম 'নামমাত্র'

ছাব্বিশে ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া এই আলোচনার মূল এজেন্ডা ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা। যা ওয়াশিংটনের জন্য একটি আপসহীন শর্ত।

শনিবার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেছেন, ইরানকে তাদের সক্ষমতা পুনরায় গড়ে তোলার সুযোগ দিলে "মাত্র এক সপ্তাহের" মধ্যেই দেশটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারবে।

উইটকফ বলেছেন, “কেন ইরান এখনো নতি স্বীকার করেনি এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়নি, সে বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কৌতূহল প্রকাশ করেছেন।” অবশ্য তেহরান বলছে তারা দ্রুত চুক্তিতে আগ্রহী। 

রবিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গণমাধ্যমকে বলেছেন, “একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়ার এখনও ভালো সুযোগ রয়েছে। একটি দ্রুত চুক্তি করার বিষয়ে আলোচনা ও প্রচেষ্টার জন্য মধ্যস্থতাকারীরা বৈঠকে বসবেন।”

একজন ঊর্ধ্বতন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম এক্সিওস জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের এমন একটি প্রস্তাব বিবেচনা করতে রাজি হয়েছে যেখানে ইরানকে 'নামমাত্র' বা 'টোকেন' ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

তবে ফক্স নিউজে ইরানের সাথে যেকোনো ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আগের দাবি ‘জিরো এনরিচমেন্ট’-এর পুনরাবৃত্তি করেন উইটকফ। তিনি বলেন, “কিছু অত্যন্ত কঠোর রেড লাইন নির্ধারণ করা হয়েছে।”

আব্বাস আরাগচি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে জাতীয় ‘মর্যাদা ও গর্বের’ বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইরানি গবেষকদের লক্ষ্যবস্তু করে হত্যাকাণ্ড এবং গত জুনে পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলার ধকল সহ্য করেও দেশটির বিজ্ঞানীরা স্বাধীনভাবে এই প্রযুক্তি গড়ে তুলেছেন।

তিনি বলেন, "আমরা এটি ছেড়ে দেব না। যতক্ষণ সবকিছু শান্তিপূর্ণ এবং সুরক্ষিত আছে, ততক্ষণ এটি ত্যাগ করার কোনো আইনি কারণ নেই।"

'বসন্ত বিপ্লব'

কূটনৈতিক চাপের সাথে যুক্ত হয়েছে ইরানের নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ অশান্তি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে রিয়ালের পতন এবং পদ্ধতিগত দমনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া ‘বসন্ত বিপ্লব’-এর ওপর চালানো হয়েছে ভয়াবহ দমন-পীড়ন।

মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মাত্র এক মাসে নিহতের সংখ্যা ৩২ হাজার ছাড়িয়েছে। আন্দোলন দমন করেই থামেনি খামেনি প্রশাসন। বিচার শুরু করেছে আন্দোলনে অংশগ্রহনকারীদের।

বিচারের নামে ‘গণমৃত্যুদণ্ডের’ আশঙ্কা জানিয়েছে জাতিসংঘ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক হুমকির কারণেই আটশরও বেশি ভিন্নমতাবলম্বীর পরিকল্পিত ফাঁসি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে ইরান।

শনি ও রবিবারও তেহরানের শরীফ ইউনিভার্সিটিসহ ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধী ও সরকারপন্থি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও বিক্ষোভ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বিবিসি। জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহত হাজার হাজার মানুষের স্মরণে এখনো এই সমাবেশগুলো করছে সেদেশের শিক্ষার্থীরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, গত দফার বিক্ষোভে অন্তত ৭ হাজার ১৫ জন নিহত হয়েছেন, যার তদন্ত এখনও চলছে। তবে ইরান সরকার নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১০০ জন দাবি করে জানিয়েছে যে, এর অধিকাংশই নিরাপত্তা কর্মী। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগে থেকেই এই বিক্ষোভকারীদের সহায়তার আশ্বাস দিয়ে আসছিলেন।

সামরিক মহড়া এবং শক্তি প্রদর্শন

একদিকে যখন আলোচনা চলছে অন্যদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতিও এগোচ্ছে সমানতালে। আরব সাগরে অবস্থান নিয়েছে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। তার সাথে যোগ দিতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড। নৌশক্তির সাথে যুক্ত হয়েছে ৫০টিরও বেশি উন্নত যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে আছে সম্প্রতি আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোতে মোতায়েন করা এফ-২২ এবং এফ-৩৫ স্টিলথ বিমানও।

তেহরানও পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ১৯এ ফেব্রুয়ারি ওমান উপসাগরে ইরান ও রাশিয়া যৌথ নৌ মহড়া পরিচালনা করে। সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি সরাসরি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, "যে অস্ত্র একটি যুদ্ধজাহাজকে সমুদ্রের তলদেশে পাঠিয়ে দিতে পারে, সেটি জাহাজের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক।”

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আমেরিকার সাথে পরমাণু আলোচনায় ‘উৎসাহব্যঞ্জক সংকেত’ পাওয়া গেছে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন যে বৃহস্পতিবারের আলোচনার পরও তেহরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

আল্টিমেটাম পরবর্তী সংকট

এই সামরিক তৎপরতা কি কেবল ‘কূটনৈতিক চাপ’ নাকি এটি ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার ২'-এর পূর্বাভাস, তা নিয়ে এখনও দ্বিধাবিভক্ত বিশ্লেষকরা।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন এই বিরোধটি এখনও  ‘উইন উইন গেম’ এর ভিত্তিতে কূটনৈতিকভাবে সমাধান করার সুযোগ আছে।

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিসের বেহনাম বেন তালেবলু বলেন, "সামরিক বিন্যাস ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। এখন প্রশ্ন হলো, এর চূড়ান্ত রাজনৈতিক লক্ষ্য কী? একটি নতুন চুক্তি, নাকি বর্তমান শাসনের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়া?”

হামলার ঘটনা যদি শেষ পর্যন্ত ঘটেই, তবে মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনৈতিকভাবে একটি অনিশ্চিত অবস্থায় চলে যেতে পারে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের হারিয়ে তেহরানের "প্রতিরোধের অক্ষ" এখন সবচেয়ে দুর্বল । দীর্ঘস্থায়ী বিমান হামলা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ঘটাতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে চলা সংঘাতে জর্জরিত এই অঞ্চলে এক বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি করবে।

বৃহস্পতিবার জেনেভার আলোচনার দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব। এর ফলাফল ঠিক করবে ঐতিহাসিক কোন চুক্তি নাকি আল্টিমেটাম শেষে এক নতুন ও অস্থির অধ্যায়ের সূচনা হবে মধ্যপ্রাচ্যে।

বিবিসি, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, ডয়েচে ভেলে, ফক্স নিউজ ও এক্সিওস অবলম্বনে