যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ইরানে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক অভিযান বন্ধে প্রস্তাব পাস হয়েছে। কিন্তু তাতে কি ট্রাম্প থামবেন?
কিন্তু এই প্রস্তাব পাস হলেও যুদ্ধ বন্ধে বাধ্যতামূলক কোনো প্রভাব পড়বে না। আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের বরাতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত তিন মাস পেরিয়েছে। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও থেমে থেমে চলেছে সংঘর্ষ। এর মধ্যেই এই সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাব পাস হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট তথা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ, হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে। ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিরাতো বটেই, চারজন রিপাবলিকান সদস্যও যুদ্ধে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে।
বুধবারের এই ভোটাভুটি যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের প্রথম সফল উদ্যোগ। যার মাধ্যমে তারা এমন একটি সংঘাত শেষ করার চেষ্টা করেছে, যা এরই মধ্যে হাজারো বেসামরিক প্রাণহানি ঘটিয়েছে। বড় সংকটে পড়েছে বিশ্ববাণিজ্যে।
ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলে এই সংঘাতের বিরুদ্ধে বিরোধিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ওপর প্রভাব এবং ইরানের সঙ্গে দ্রুত কোনো স্থায়ী চুক্তি করতে না পারা।
তবে পাস হওয়া এই প্রস্তাবের বাস্তব প্রভাব আপাতত সীমিত। কারণ এখানে প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা আছে। উচ্চকক্ষ সিনেটেও আছে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তাই সিদ্ধান্তটি প্রতীকী হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কী ঘটেছিল?
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বে আইনপ্রণেতারা ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ প্রয়োগের পক্ষে ভোট দেন। এই আইন অনুযায়ী, বিদেশে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে যাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন না পেলে আইনপ্রণেতারা সেই সংঘাত বন্ধ করতে বাধ্য করার ক্ষমতা রাখেন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ডেমোক্র্যাটরা বলে আসছেন, যুদ্ধ ঘোষণা বা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নয়, বরং কংগ্রেসের। এই যুক্তিতে তারা বারবার ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন।
তবে, ট্রাম্প প্রশাসন এর পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেছে যে, ইরানে সামরিক অভিযানের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই।
১৯৭৩ সাল থেকে কার্যকর থাকা ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, যেকোনো সশস্ত্র সংঘাতে জড়াতে হলে প্রেসিডেন্টকে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাৎক্ষণিক হামলার পরিস্থিতি থাকলে প্রেসিডেন্ট এককভাবে সেনা মোতায়েন করতে পারেন, তবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে বিষয়টি জানাতে হয়।
এরপর কংগ্রেস যদি যুদ্ধ ঘোষণা না করে তাহলে প্রেসিডেন্টকে ৬০ দিনের মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করতে হয় এটাই আইনটির বিধান।
এই ক্ষেত্রে সমালোচকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র নিজে কোনো তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে ছিলেন না, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলই প্রথম হামলা চালায়।
অভিযোগ আছে, ট্রাম্প ৬০ দিনের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও ইরানে যুদ্ধ পরিচালনায় নিয়োজিত সেনা প্রত্যাহার করেননি।
যুদ্ধ শুরুর পর ২৮এ ফেব্রুয়ারি থেকে ডেমোক্র্যাট রিপ্রেজেন্টেটেটিভরা তিনবার এই আইন প্রয়োগের চেষ্টা করেন। তবে আগের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিলো।
যেভাবে ভোট হলো
বুধবারের ভোটে ২১৫ জন আইনপ্রণেতা ট্রাম্পকে সংযত করার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন এবং ২০৮ জন বিপক্ষে ভোট দেন।
ডেমোক্র্যাটরা এই ভোটে সফল হয়েছে মূলত চারজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে তাদের সমর্থন দেওয়ার কারণে। এটি ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য মতভিন্নতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুরুর দিকে রিপাবলিকানরা যুদ্ধের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিলেও পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। অর্থনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় দলের ভেতরে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে।
দলীয় অবস্থান থেকে সরে আগের ভোটে রিপাবলিকান প্রতিনিধি টম ব্যারেট (মিশিগান), ওয়ারেন ডেভিডসন (ওহাইও) এবং থমাস ম্যাসি (কেন্টাকি) ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন। বুধবার তাদের সঙ্গে যোগ দেন পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক।
এবার কি যুদ্ধ থামবে?
হাউসের এই ভোট সরাসরি ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করে না। আপাতত এই ভোট মূলত প্রতীকী ছিল।
প্রস্তাবটি কার্যকর হতে হলে সিনেটেও পাস করতে হবে। কিন্তু উচ্চকক্ষ সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ বন্ধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বারবার ভোটের চেষ্টা করলেও রিপাবলিকানরা এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাবগুলো পাস হতে দেয়নি।
সবশেষ দুই সপ্তাহ আগে ৫০-৪৭ ব্যবধানে ১০০ সদস্যের সিনেটে ভোট হয় । সেখানে চারজন রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে একমাত্র জন ফেটারম্যান প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন।
যদিও এই ফল রিপাবলিকানদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি করে, তবুও তা প্রস্তাব পাসের জন্য যথেষ্ট ছিলো না।
সিনেটও যদি হাউসের মতো এই প্রস্তাব পাস করে, তবুও ট্রাম্প চাইলে এতে ভেটো দিতে পারবেন।
সে ক্ষেত্রে আইনটি কার্যকর করতে হলে কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ভেটো পার করতে হবে, যার জন্য উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রয়োজন হবে।
এটি অসম্ভব নয়। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তা অর্জন করা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ কিছু রিপাবলিকান সদস্য অসন্তোষ প্রকাশ করলেও অধিকাংশই এখনো প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্র কি আসলেই যুদ্ধ করছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৮ই এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চললেও তাকে ভঙ্গুর বলা হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এই যুদ্ধবিরতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর প্রযুক্তিগতভাবে যুদ্ধাবস্থায় নেই।
পহেলা মে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুদ্ধবিরতির কারণে সামরিক অভিযান ‘শেষ’ হয়েছে। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরের ওপর অবরোধ অব্যাহত রাখে এবং ইরানি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। অন্যদিকে ইরানও হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কংগ্রেসে বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান নিয়ে বিস্তারিত তথ্য আইনপ্রণেতাদের জানানো হবে।
একই সময় তিনি দাবি করেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তবে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই অবস্থানের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, ইরানে হামলা চলার সময়ও কংগ্রেসকে যথাযথভাবে তথ্য দেওয়া হয়নি এবং পরামর্শও নেওয়া হয়নি।
সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটির সদস্য জিন শাহিন বলেন, কংগ্রেসকে যুদ্ধ চলাকালীন যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা ছিল অসম্পূর্ণ এবং দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র তখন সক্রিয় সামরিক অভিযান চালাচ্ছিল, অথচ কংগ্রেসকে বলা হচ্ছিল যে সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতি নেই।
ফের পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ বাধবে কি
যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে কি-না, এই প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা মনে করেন, এটি সম্ভব।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ১২ই মে বলেন, ‘ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে সেনা মোতায়েনের জন্য যে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়, সেটির ভিত্তিতে প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই আবারও ইরানে হামলা শুরু করতে পারে।
সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির শুনানিতে তিনি বলেন, ৮ই এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি মূলত আগের সময়সীমা নতুন করে শুরু করেছে বলে তারা মনে করছেন।
তিনি বলেন, “যদি প্রেসিডেন্ট আবার যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সব ধরনের আইনি ক্ষমতা প্রশাসনের থাকবে।”
রয়টার্স অবলম্বনে



