পোশাক খাতে শ্রমিক বিক্ষোভের ৪৩ বছরের ইতিহাস

পৃথিবীর কোনো শহরে, কোনো বিপণিবিতানে জামা কিনতে গিয়ে হঠাৎ কলারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ শব্দ তিনটি লেখা দেখলে গর্বে কার না বুক ফুলে ওঠে! একটি ছোট্ট ট্যাগ যেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতীক। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে এই গর্বের পাশাপাশি অস্বস্তিকর একটি প্রশ্নও সামনে আসে।

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম

ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের অ্যারিস্টোক্র্যাট গার্মেন্টস লিমিটেডের শ্রমিকদের সেদিন মাসিক বেতন পাওয়ার কথা। ৭ই জুন ১৯৮৩। বেতন নিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধের একপর্যায়ে ঘটে অনাকাঙ্খিত এক ঘটনা। 

অভিযোগ ওঠে, বহিরাগত একদল লোক কারখানার ফ্লোরে ঢুকে নারী শ্রমিকদের বেধড়ক মারধর করে। তাদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস ছোঁড়ার অভিযোগও ওঠে। সেদিন অন্তত ২৫ জন নারীশ্রমিক আহত হন। কেউ কেউ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

ওইদিনের ঘটনাপ্রবাহের এখানেই শেষ নয়। আটজন শ্রমিককে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগও ওঠে সেদিন। 

কারখানাটির প্রায় ৪০০ শ্রমিকের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ১১টি জাতীয় শ্রমিক সংগঠনের নেতা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা।

পরদিন, ৮ই জুন, দৈনিক বাংলার বাণী-তে ঘটনাটির সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে হাসপাতালে আহত পোশাকশ্রমিকদের ছবিও ছিল।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের গোড়ার দিকের এই ঘটনাটি আজকের বেশিরভাগ মানুষেরই স্মরণে থাকবার কথা না।

সেদিনের সেই শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদটি সংরক্ষিত রয়েছে জাতীয় আর্কাইভে। 

এই ঘটনার চার দশকেরও বেশি সময় পর ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে সেই সংবাদটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হাসান আশরাফ এবং জার্মান নৃবিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রুম্পেল তাদের একটি গবেষণায় ১৯৮৩ সালের ‘বাংলার বাণী’র সেই প্রতিবেদনটির অংশবিশেষ তুলে ধরেছেন। 

লাতিন আমেরিকার গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা ক্লাকসো’র প্রকাশিত ‘লাস পেরিফেরিয়াস ডেল ট্রাবাহো’ নামের বইতে অন্তর্ভুক্ত গবেষণাটির ২৮২–২৮৩ পৃষ্ঠায় ঘটনার বিবরণ এবং সংবাদপত্রের ছবি রয়েছে।

গবেষকেরা একই সঙ্গে ২৮এ জুন ১৯৮৩ সালের দৈনিক সংবাদ থেকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের আরেকটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। দুটি ঘটনা আলাদা, কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার নারীশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যটি ঢাকার স্থানীয় দর্জিশ্রমিকদের সংগঠিত আন্দোলন।

প্রথম ঘটনাটির দিকে ফিরে তাকানো যাক।

বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প তখনও শৈশবে। দেশ থেকে বিদেশে পোশাক রপ্তানির নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছেন। হাজার হাজার শ্রমিক, যাদের বড় একটি অংশ নারী, নতুন এই শিল্পে কাজ করতে আসছেন।

কিন্তু শিল্পের সেই শুরুর দিনেই মজুরি নিয়ে বিরোধের জেরে নারীশ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ উঠেছিল।

আরও বিস্ময়কর হলো, যে কারখানাকে ঘিরে এই অভিযোগ, সেই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা ছিলেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর প্রথম সভাপতি এএম সুবিদ আলী।

বিজিএমইএ-এর আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে এএম সুবিদ আলীর নাম রয়েছে সংগঠনের প্রথম সভাপতি হিসেবে। তিনি দায়িত্ব পালন করেন জুলাই ১৯৭৮ থেকে নভেম্বর ১৯৮৫ পর্যন্ত। এর অর্থ, ৭ই জুন ১৯৮৩ সালের শ্রমিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার সময় সুবিদ আলী কেবল ওই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাই ছিলেন না, তিনি তখন দেশের পোশাক কারখানার মালিকদের শীর্ষ সংগঠনের সভাপতিও।

ঐতিহাসিকভাবে এই যোগসূত্রের গুরুত্ব অনেক।

 একটি সংবাদ দিয়ে রাখি, পোশাকশিল্পে সুবিদ আলীর ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে ৩রা এপ্রিল ২০২৪ সালে উত্তরার বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে ‘সুবিদ আলী ডিজিটাল প্লিনারি’ উদ্বোধন হয়। তৎকালীন সভাপতি ফারুক হাসান এটি উদ্বোধন করেন। 

সংগঠনটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশে সুবিদ আলীর অগ্রণী অবদানের স্বীকৃতির কথা উল্লেখ করা হয়। একই বছরের ১৭ই জুলাই, মোহাম্মদ সালাউদ্দীন নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন রিয়াজ গার্মেন্টসের পরিচালক হিসেবে, লিংকডইনে একটি নিবন্ধে লেখেন, প্রথম বিজিএমইএ সভাপতি সুবিদ আলী তখন পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছিলেন। লেখক তার সুস্বাস্থ্যও কামনা করেন। এই ব্যক্তিগত বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, তবে পোশাকশিল্পের প্রাথমিক উদ্যোক্তাদের স্মৃতিচারণের সূত্র হিসেবে এটি প্রাসঙ্গিক।

বলতে চাচ্ছি, একেবারে শুরুর যে গার্মেন্টস কর্মীদের নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হিসেবে পাওয়া গেল সেটি ছিল খোদ বিজিএমই-এর তৎকালীন সভাপতির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।

কারখানায় অনেক নারী শ্রমিক হিসেবে প্রবেশ করলেও ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানের অনেক পদে পুরুষদের প্রাধান্য বজায় থাকে।

একটি ট্যাগলাইন, একটি দেশের গর্ব

পৃথিবীর কোনো শহরে, কোনো বিপণিবিতানে জামা কিনতে গিয়ে হঠাৎ কলারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখলে কার না বুক ফুলে উঠে গর্বে!

বিদেশের মাটিতে এই তিনটি শব্দ একজন বাংলাদেশির মনে অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। গর্ব হয়। মনে হয়, আমাদের দেশের মানুষ পৃথিবীর জন্য কিছু তৈরি করছে। যে দেশে একসময় দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য আর বিদেশি সাহায্যের সংবাদই ছিল প্রধান পরিচয়, সেই দেশ এখন বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ডের পোশাক সরবরাহ করছে।

একটি ছোট্ট ট্যাগ যেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতীক।

এ গর্বের যথেষ্ট কারণও রয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প কয়েক দশকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের নারীদের জন্য শিল্পকারখানায় কাজের সুযোগ তৈরি করেছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। তৈরি করেছে উদ্যোক্তা, পরিবহনব্যবস্থা, ব্যাংকিং কার্যক্রম, বন্দরসেবা এবং অসংখ্য সহযোগী ব্যবসার বিস্তৃত অর্থনৈতিক জগৎ।

কিন্তু একটু গভীরে তাকালে এই গর্বের পাশাপাশি অস্বস্তিকর একটি প্রশ্নও সামনে আসে।

বাংলাদেশ এত বড় পোশাক রপ্তানিকারক হলো কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আগ্রহ, উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ, আমদানি-রপ্তানির নীতিসুবিধা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কোটা ব্যবস্থা এবং উৎপাদনক্ষমতার দক্ষতার কথা আসে। তবে সবার আগে যেটা আসে তা হলো, সস্তা শ্রম।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এই সস্তা শ্রমের কথা বলা হয়েছে। মালিকপক্ষ বলছে, সরকার বলছে, বিদেশি দাতা সংস্থা বলছে। অর্থাৎ সস্তা শ্রম যে এখানে একটি ব্যাপার তা সর্বজনবিদিত। কথাটি অর্থনীতির পরিভাষায় যতটা নিরীহ, মানুষের জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে ততটা নয়।

শ্রম সস্তা হওয়ার অর্থ, একজন মানুষ তার শ্রমের বিনিময়ে তুলনামূলকভাবে কম মজুরি পাচ্ছেন। তার কাজের সময়, দক্ষতা ও শ্রমশক্তির মূল্য অন্য অনেক দেশের তুলনায় কম।

যে বিষয়টি শ্রমিকের জীবনে সীমাবদ্ধতা, সেটিই আবার আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্পের সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থাৎ আমরা পৃথিবীকে বলছি, আমাদের দেশে উৎপাদন খরচ কম। আর এই খরচ কম থাকার একটি কারণ আমাদের শ্রমিকদের মজুরি কম।

যারা পোশাক তৈরি করছেন, তাদের কম পারিশ্রমিক দেওয়ার সক্ষমতাই যদি আমাদের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরিচয় হয়, তাহলে সেই পরিচয় নিয়ে গর্বের সঙ্গেই একটি নৈতিক প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে।

তবে এখানে একটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্যের একমাত্র কারণ কম মজুরি নয়। শিল্পের বিকাশে দক্ষতা, আন্তর্জাতিক কোটা সুবিধা, উদ্যোক্তাদের ঝুঁকি গ্রহণ, সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারি নীতিসহায়তারও ভূমিকা রয়েছে।

কিন্তু সস্তা শ্রম যে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ব্যবসায়িক মডেলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এবং এখনও রয়েছে, তা অস্বীকার করা কঠিন।

এই শিল্পের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালেই বোঝা যায়, মজুরি ও শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বিরোধ কোনো সাম্প্রতিক সমস্যা নয়। প্রায় শুরু থেকেই এটি শিল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

১৯৮৩ সালের অ্যারিস্টোক্র্যাটের ঘটনা সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

দর্জির দোকান থেকে কারখানার মেশিনে

বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকের ইতিহাস বুঝতে হলে কেবল রপ্তানিমুখী কারখানার ইতিহাস পড়লে চলবে না। তার আগে দেখতে হবে দর্জির দোকান, সেলাইয়ের কারিগর এবং তাদের কাজের ধরন।

একসময় ঢাকার নিউমার্কেট, অভিজাত বিপণিবিতান কিংবা পাড়া-মহল্লার দর্জির দোকানে পোশাক তৈরি হতো মূলত নির্দিষ্ট ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী। ক্রেতা কাপড় নিয়ে যেতেন। দর্জি মাপ নিতেন। তারপর সেই মাপ অনুযায়ী জামা, প্যান্ট কিংবা অন্য পোশাক তৈরি হতো।

দর্জির কাজ তখন একটি বিশেষ দক্ষতা হিসেবে বিবেচিত হতো।

কাপড়ের কাটিং, সেলাই, মাপ, ফিটিং এবং পোশাকের নকশা বোঝার জন্য অভিজ্ঞতা প্রয়োজন ছিল। একজন শিক্ষানবিশকে কাজ শিখতে হতো দীর্ঘ সময় ধরে। দক্ষতার সঙ্গে আয়ও বাড়ত।

কিন্তু এই দক্ষতার পেছনে ছিল অনিশ্চিত কর্মজীবন।

অনেক দর্জিশ্রমিক মাসিক বেতনে কাজ করতেন না। তাদের পারিশ্রমিক নির্ভর করতো কতটি পোশাক তৈরি করছেন তার ওপর। কাজ বেশি থাকলে আয় বাড়তো, কাজ কম থাকলে আয় কমে যেতো।

রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার উত্থান এই কর্মজীবনে বড় পরিবর্তন আনে।

হাসান আশরাফ ও ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রুম্পেল তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, পোশাক উৎপাদন যখন ব্যক্তিগত দর্জির দোকান থেকে কারখানায় স্থানান্তরিত হতে থাকে, তখন শুধু উৎপাদনের পদ্ধতিই বদলায়নি। বদলেছে শ্রমিকের পরিচয়, দক্ষতার মূল্য, কাজের নিয়ন্ত্রণ এবং নারী-পুরুষের শ্রমবিভাজন।

কারখানায় একটি পোশাক তৈরির কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করা সম্ভব। একজন শ্রমিক পুরো পোশাক তৈরি না করে শুধু একটি নির্দিষ্ট অংশ সেলাই করতে পারেন। অন্যজন কলার, আরেকজন হাতা, কেউ বোতাম, কেউবা শেষ পর্যায়ের কাজ করেন।

এর ফলে উৎপাদন দ্রুত হয়। প্রতিটি শ্রমিককে পুরো পোশাক তৈরির দক্ষতা অর্জন করতে হয় না। ব্যবস্থাপক ও তত্ত্বাবধায়কেরা উৎপাদনের গতি এবং কাজের মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

শিল্পায়নের ভাষায় এটি উৎপাদনক্ষমতার উন্নতি। কিন্তু শ্রমিকের দৃষ্টিকোণ থেকে এর আরেকটি অর্থ আছে।

একজন দক্ষ দর্জি আগে নিজের কাজের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। কারখানায় এসে তিনি বড় একটি উৎপাদনব্যবস্থার অংশ হয়ে যান। সেখানে কাজের গতি, বিরতি, সময় এবং পারিশ্রমিক নির্ধারণের ক্ষমতা প্রধানত কর্তৃপক্ষের হাতে।

গবেষণাপত্রটিতে ১৯৮৩ সালে কারখানার কাজে যোগ দেওয়া শঙ্কর নামের এক শ্রমিকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি এর আগে দুই বছর একটি অভিজাত বাজারের দর্জির দোকানে কাজ করেছিলেন। 

তার বর্ণনা অনুযায়ী, কারখানায় যোগ দেওয়ার পর মাসিক বেতন পান ৪৫০ টাকা। দর্জির দোকানের আয় থেকে তা বেশি ছিল না। তবে নিয়মিত মাসিক বেতন ও নির্দিষ্ট কর্মসময়ের আকর্ষণ ছিল।

এই ছোট্ট অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ।

রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে শ্রমিকেরা কেবল অধিক আয়ের আশায় আসেননি। অনেকে এসেছিলেন নিয়মিত কাজ এবং নিশ্চিত মজুরির প্রত্যাশায়। 

কিন্তু সেই প্রত্যাশা আজ অব্দি পূরণ হয়নি। আর তাই ঈদে-চাঁদে আমরা গার্মেন্টস শ্রমিকদের রাস্তায় দেখি।

গবেষকেরা ২৮এ জুন ১৯৮৩ সালের দৈনিক সংবাদ থেকে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের আরেকটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। দুটি ঘটনা আলাদা, কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার নারীশ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যটি ঢাকার স্থানীয় দর্জিশ্রমিকদের সংগঠিত আন্দোলন।

আট ঘণ্টা কাজের দাবি

অ্যারিস্টোক্র্যাটের ঘটনার মাত্র তিন সপ্তাহ পর, ২৮এ জুন ১৯৮৩ সালে, দৈনিক সংবাদ প্রকাশ করে ঢাকার দর্জিশ্রমিকদের আন্দোলনের খবর। তাদের দাবি ছিল তিনটি: শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দিতে হবে, দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মদিবস নির্ধারণ করতে হবে, মাসিক বেতন ও অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদটির বিবরণ অনুযায়ী, দর্জিশ্রমিকেরা দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেন। একই ধরনের পোশাক তৈরির পারিশ্রমিকও দোকানভেদে আলাদা ছিল।

ঢাকা মহানগর দর্জি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কাজী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে আন্দোলন চলছিল। নিউমার্কেট এলাকার ১০ জন দর্জিশ্রমিককে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সংগঠনটি সভা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ এবং ১৪টি ছাত্রসংগঠনের নেতারাও শ্রমিকদের দাবির প্রতি সংহতি জানান।

হাসান আশরাফ ও ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রুম্পেলের গবেষণায় এই আন্দোলনের সাংগঠনিক প্রস্তুতিরও বিবরণ রয়েছে।

১৯৮২ সালের শেষ দিকে ঢাকা মহানগর দর্জি শ্রমিক ইউনিয়নে প্রায় ৬০০ সদস্য নিবন্ধিত হয়েছিলেন। 

তারা শুধু নিউমার্কেটের শ্রমিক ছিলেন না। অন্য কয়েকটি বাজারের দর্জি ও কারিগরেরাও সংগঠিত হয়েছিলেন।

গবেষকদের বিবরণে নিউমার্কেটের পরিচিত দর্জির দোকান ব্রাইট স্টারে কর্মরত কাজী আলীর কথাও এসেছে। শ্রমিকদের অসন্তোষ সংগঠিত আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮৩ সালের দর্জিশ্রমিকদের আন্দোলন এবং অ্যারিস্টোক্র্যাটের ঘটনার মধ্যেএকটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে। নতুন শিল্পে প্রবেশের আগেই শ্রমজীবী মানুষের বড় একটি অংশ মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিলেন।

অর্থাৎ শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্নটি বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশের পরে সৃষ্টি হয়নি।

এটি শিল্পটির জন্মপর্ব থেকেই উপস্থিত ছিল। আর দুঃখজনক হলেও সত্যি আমরা যদি দর্জিদের সেই আন্দোলনের চার দশকেরও বেশি সময় পরে এসে পোশাক খাতের আন্দোলন দেখি, তাহলে দেখবো অবস্থাটি পাল্টেছে খুব কমই।  

নারীর ক্ষমতায়নের সরল কিন্তু জটিল গল্প

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উত্থান নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় বারবার গুরুত্ব পায়। সেটি হলো নারীর কর্মসংস্থান।

এতে সন্দেহ নেই যে এই শিল্প গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারের বহু নারীর জীবনে পরিবর্তন এনেছে। অনেক নারী প্রথমবারের মতো পরিবারের বাইরে নিয়মিত বেতনের কাজ পেয়েছেন। নিজেদের উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা বেড়েছে।

কিন্তু এই পরিবর্তনের আরেকটি দিকও রয়েছে। নারীরা কেন এত দ্রুত পোশাকশিল্পের প্রধান শ্রমশক্তিতে পরিণত হলেন?

এ প্রশ্নের উত্তর কেবল নারীর ক্ষমতায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

হাসান আশরাফ ও ক্রিশ্চিয়ান স্ট্রুম্পেল তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে নারীশ্রমিকদের ব্যাপক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে শ্রমের মূল্য কমিয়ে রাখা এবং কারখানায় শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পোশাকশিল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে দক্ষ পুরুষ দর্জি ও কারিগরদের একটি অংশ কারখানায় যোগ দিলেও উৎপাদনব্যবস্থা দ্রুত বদলে যায়। পোশাক তৈরির কাজকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর ফলে অভিজ্ঞ দর্জির পুরো পোশাক তৈরির দক্ষতার ওপর নির্ভরতা কমতে থাকে।

অন্যদিকে গ্রামের নারীরা ক্রমশ বড় শ্রমশক্তি হিসেবে যুক্ত হতে থাকেন।

এই পরিবর্তনকে শুধু নারীশ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা হিসেবে দেখেননি গবেষকেরা। তারা একে শ্রমের দক্ষতা, শ্রেণি এবং লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার সম্পর্কের পরিবর্তন হিসেবেও বিশ্লেষণ করেছেন।

কারখানায় অনেক নারী শ্রমিক হিসেবে প্রবেশ করলেও ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানের অনেক পদে পুরুষদের প্রাধান্য বজায় থাকে।

অর্থাৎ একই প্রতিষ্ঠানে নারী উৎপাদনের প্রধান শ্রমশক্তি হয়ে উঠলেন, অথচ কাজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের হাতে রয়ে গেল।

এই বিশ্লেষণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প সম্পর্কে প্রচলিত একটি সরল গল্পকে জটিল করে তোলে।

প্রচলিত গল্পটি হলো, পোশাকশিল্প নারীদের কাজ দিয়েছে, তাই এটি নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম বড় উদাহরণ। কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ সত্যও নয়। কারণ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সেই কর্মসংস্থানে ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা নিশ্চিত করা দুটি ভিন্ন বিষয়।

একজন নারী নিজের উপার্জন করতে পারছেন, এটি তার জীবনের অগ্রগতি। কিন্তু সেই নারী যদি দীর্ঘ সময় কাজ করেও পরিবারের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে না পারেন, তাহলে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কতটা কার্যকর হলো, সেই প্রশ্নও করতে হবে।

আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অভিযোগও পুরনো

১৯৮৩ সালের শ্রমিক আন্দোলনের পরের বছর, ২৩এ নভেম্বর ১৯৮৪। সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ সাংবাদিক সৈয়দ শফিক আহমেদের একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শিরোনাম, ‘বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার।’ প্রতিবেদনটির ভাষা ও বিষয়বস্তু লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প তখন আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নেওয়ার সংগ্রামে ব্যস্ত।

বিদেশি ক্রেতা, আমদানি-রপ্তানির বিধিনিষেধ, পোশাক উৎপাদনের ব্যয়, কারখানার যন্ত্রপাতি, কোটা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে সেখানে।

প্রতিবেদনের সঙ্গে ছাপা হয়েছে কারখানায় কাজ করা নারীশ্রমিকদের ছবি। আছে সেলাইযন্ত্র, উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ এবং কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা শ্রমিকদের দৃশ্য।

১৯৮৩ সালের ‘বাংলার বাণী’-এর  শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং ১৯৮৪ সালে ‘বিচিত্রা’-এর নতুন শিল্পের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সংকট, এই দুটি প্রতিবেদন পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের দুটি আলাদা বাস্তবতা সামনে আসে।

‘বিচিত্রা’-এর প্রতিবেদনে উৎপাদনব্যয়ের বিভিন্ন উপাদান তুলে ধরা হয়েছিল। পোশাক তৈরির জন্য কত ধরনের যন্ত্র প্রয়োজন, কীভাবে কাজ ভাগ করা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও তৈরি পোশাকের দাম কীভাবে প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে, সেসব বিষয় সেখানে এসেছে।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় উদ্বেগ ছিল বিদেশি বাজারের নীতিগত বাধা।

অর্থাৎ, আজ আমরা যে আশঙ্কা শুনি, মজুরি বাড়লে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে পারেন, তার অনেক আগেই শিল্পটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও বাজার হারানোর ভয় নিয়ে আলোচনা করছিল।

অবশ্য ১৯৮৪ সালের বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২৬ সালের পরিস্থিতি এক নয়। তখন কোটা ব্যবস্থা এবং বাজারে প্রবেশাধিকার বড় নিয়ামক ছিল। এখন উৎপাদনশীলতা, সরবরাহের গতি, বাণিজ্যসুবিধা, মান, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শ্রমিকের অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।

তারপরও এই ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের গুরুত্ব কমে না। এটি থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে ঘিরে শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভাষ্য তৈরি হয়েছে। সেখানে দেশের রপ্তানি আয়ের সুযোগ, উদ্যোক্তার ঝুঁকি, বিদেশি বাজার এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু একটি শিল্পের সাফল্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শুধু কত ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, সেই হিসাব যথেষ্ট নয়। সেই ডলার অর্জনের জন্য কত শ্রমঘণ্টা ব্যয় হয়েছে এবং সেই শ্রমের বিনিময়ে কত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়েছে, সেটিও জানতে হয়।

অন্যথায়, অর্থনৈতিক ইতিহাসটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

যে শ্রমিকের মৃত্যু শহর উত্তাল করেছিল

সময়টা ২০০৩ সাল, পোশাকশিল্পের বয়স দুই দশকের বেশি। রপ্তানি বেড়েছে। কারখানা বেড়েছে। শ্রমিকের সংখ্যাও বহুগুণ হয়েছে।

কিন্তু মজুরি, কাজের সময় এবং শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বিরোধ-ক্ষোভ থামেনি।

সেই বছরের নভেম্বরের শুরুতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় প্যানটেক্স ড্রেসেস-এর শ্রমিকেরা ১৮ দফা দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল আট ঘণ্টা কর্মদিবস নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন শ্রম অধিকার।

তেসরা নভেম্বর পরিস্থিতির অবনতি হয়। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হন প্যানটেক্সের শ্রমিক আমজাদ হোসেন কামাল। তার মৃত্যুতে নারায়ণগঞ্জের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন। কারখানা, দোকান, যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আহত হন বহু মানুষ।

দ্য ডেইলি স্টার তাদের ৪ঠা নভেম্বর ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে কামালের মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জজুড়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার বিবরণ প্রকাশ করে।

২০১৩ সালে দৈনিক প্রথম আলো ‘শ্রমিক আমজাদ হত্যার বিচার হয়নি ১০ বছরে’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, পুলিশ গুলি চালানোর পর শ্রমিকেরা ব্যাপক বিক্ষোভে নামেন। একপর্যায়ে ফতুল্লা থানাহাজত থেকে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আটক এক শ্রমিকনেতাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

কামালের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রমাণ করে, একটি কারখানার শ্রমিকদের দাবি কীভাবে পুরো শিল্পাঞ্চলের বিক্ষোভে রূপ নিতে পারে। 

একজন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু তার পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়ে থাকেনি। সেটি হাজার হাজার শ্রমিকের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়েছিল।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়।

১৯৮৩ সালে দর্জিশ্রমিকেরা যে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবি করেছিলেন, ২০০৩ সালেও সেই দাবি শ্রমিক আন্দোলনের আলোচনায় ফিরে আসে।

কুড়ি বছরে শিল্প এগিয়েছে। কিন্তু শ্রমিকের সব দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।

কাপড়ের কাটিং, সেলাই, মাপ, ফিটিং এবং পোশাকের নকশা বোঝার জন্য অভিজ্ঞতা প্রয়োজন ছিল। একজন শিক্ষানবিশকে কাজ শিখতে হতো দীর্ঘ সময় ধরে। দক্ষতার সঙ্গে আয়ও বাড়ত।

ষড়যন্ত্র

২০০৬ সালের মে মাসে পোশাকশিল্পের শ্রমিক আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে। ২০ মে ঢাকার এফএস সোয়েটার কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের সূত্রপাত হয়। পরে তা অন্য কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে।

শ্রমিকদের দাবি ছিল মজুরি বৃদ্ধি, বকেয়া পাওনা এবং কর্মপরিবেশের উন্নতি। কিন্তু আন্দোলনের সঙ্গে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০০৭ সালের বিশ্ব প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ২০০৬ সালের মে ও জুন মাসে গাজীপুর ও সাভারের বিভিন্ন কারখানায় ধর্মঘটরত শ্রমিকেরা পুলিশের পাশাপাশি কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাড়া করা লোকজনের হামলার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জোট, এফআইডিএইচ। 

২০০৬ সালে প্রকাশিত বিবৃতিতে সংগঠনটি শিল্পমালিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি প্রবণতার সমালোচনা করে। সেটি হলো, শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অভিযোগ তোলা।

সংগঠনটি উল্লেখ করে, সে সময় পোশাকশিল্পের ন্যূনতম মজুরি ১৯৯৪ সালের পর আর পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি বিবেচনা করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায় তারা।

এই ঐতিহাসিক দলিলের গুরুত্ব বর্তমান সময়েও রয়েছে। কারণ, শ্রমিকের দাবি এবং আন্দোলনের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দুটি ভিন্ন বিষয়।

কোনো আন্দোলনে বাইরের গোষ্ঠী সুযোগ নিতে পারে। রাজনৈতিক পক্ষগুলো নিজেদের স্বার্থে শ্রমিক অসন্তোষ ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। সহিংসতার ঘটনায় প্রকৃত অপরাধীদেরও শনাক্ত করা প্রয়োজন। 

কিন্তু এসব সম্ভাবনার কোনোটিই শ্রমিকদের প্রকৃত অভিযোগকে অস্বীকার করার যথেষ্ট কারণ নয়।

মজুরি বাড়ার পরও সংঘর্ষ থামলো না

২০০৬ সালের আন্দোলনের পর পোশাকশিল্পের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারিত হয়। তারপর আসে ২০১০ সাল। ২৯এ জুলাই ২০১০ সালে সরকার শ্রমিক, মালিক ও সরকারি প্রতিনিধিদের আলোচনার পর ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১,৬৬২ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু ঘোষণার পরও শ্রমিক অসন্তোষ থামেনি। ৩০ ও ৩১এ জুলাই বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ১০ই অগাস্ট ২০১০ সালের বিবৃতিতে শ্রমিকনেতা কল্পনা আক্তার, বাবুল আক্তার ও আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনার ঘটনায় উদ্বেগ জানায়। একই সঙ্গে বিক্ষোভের সহিংসতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সম্ভাব্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগেরও সমালোচনা করে সংস্থাটি।

সেই বছরের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নতুন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়ন নিয়ে সংঘর্ষ ঘটে।

১২ই ডিসেম্বরের ঘটনায় অন্তত ৩ জন নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশ করে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা।  মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০১০ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে ওই দিনের সংঘর্ষে একজন রিকশাচালকসহ ৪ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ আছে। 

২০১৩ সালেও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হয়। ওই বছর ন্যূনতম মজুরি ৫,৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।তবে, ২০১৩ সাল বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে আরও ভয়াবহ একটি কারণে স্মরণীয়। চব্বিশে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে এগারোশর বেশি শ্রমিক নিহত হন।

রানা প্লাজা নিছক একটি দুর্ঘটনার নাম নয়। এটি ভবননিরাপত্তা, শ্রমিকের জীবন ও শিল্পমালিকের দায়বদ্ধতার প্রশ্নে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসকে নতুন করে দেখার উপলক্ষ তৈরি করে।

অবশ্য রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলনের সংঘর্ষে নিহত শ্রমিক হিসেবে গণনা করা যাবে না। তাদের মৃত্যু শিল্পকারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থার বিপর্যয়ের ঘটনা।

২০১৮ সালে আরেক দফা ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৮,০০০ টাকা করা হয়। কিন্তু নতুন মজুরি কাঠামোর বিভিন্ন গ্রেডের অসংগতি নিয়ে শ্রমিকেরা প্রতিবাদ শুরু করেন।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে সুমন মিয়া নামের ২২ বছর বয়সী এক শ্রমিক নিহত হন বলে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়।

৫ই মার্চ ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে সংস্থাটি শ্রমিক ছাঁটাই, কালো তালিকাভুক্ত করা এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানায়।

এখানেও পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে।

মজুরি বাড়ানোর ঘোষণা আসে। শ্রমিকেরা অসন্তোষ জানান। আন্দোলন হয়। সংঘর্ষ ঘটে। শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তারপর শুরু হয় মামলা, গ্রেপ্তার ও চাকরি হারানোর অভিযোগ।

একটি দেশের শিল্পের ইতিহাস সাধারণত সাফল্যের পরিসংখ্যান দিয়ে লেখা হয়। কতটি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কত ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, কত দেশে বাজার তৈরি হয়েছে, কত উদ্যোক্তা সফল হয়েছেন, এসব হিসাব সেই ইতিহাসে গুরুত্ব পায়।

২০২৩: রাসেল, আনজুয়ারা ও জালাল উদ্দিন

২০২৩ সালের মজুরি আন্দোলনের ঘটনাগুলো আরও কাছের। তাই এগুলোর অনেক তথ্য, ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ সংরক্ষিত রয়েছে।

৩০এ অক্টোবর ২০২৩ সালে গাজীপুরে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন রাসেল হাওলাদার।

তিনি ডিজাইন এক্সপ্রেস কারখানায় কাজ করতেন। মার্কিন শ্রম দপ্তর ৮ই নভেম্বর প্রকাশিত বিবৃতিতে তার মৃত্যুর ঘটনাকে উল্লেখ করে বাংলাদেশে শ্রমিক আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতার নিন্দা জানায়।

এরপর ৮ই নভেম্বর গাজীপুরে আন্দোলনের সময় নিহত হন আনজুয়ারা খাতুন।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের বিবরণ অনুযায়ী, তার বয়স ছিল ৩২ বছর। তিনি ইসলাম গার্মেন্টসের সেলাই মেশিন অপারেটর ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য উদ্ধৃত করে সংস্থাটি তার মাথায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করে।

একই কারখানার তত্ত্বাবধায়ক জালাল উদ্দিন ৮ই নভেম্বরের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১১ই নভেম্বর হাসপাতালে মারা যান বলে অ্যামনেস্টি জানায়।

২০২৩ সালের আন্দোলনে অন্তত চারজন শ্রমিক নিহত হন। তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় এবং একজনের মৃত্যু কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হয়েছে বলে পরবর্তী বিভিন্ন তদন্ত ও আন্তর্জাতিক শ্রম-অধিকারসংক্রান্ত নথিতে উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, আইএলও-এর অভিযোগ পর্যালোচনার নথিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও ২০২৩ সালের ন্যূনতম মজুরি আন্দোলনের সময় চারজন শ্রমিকের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়। তবে মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং পুলিশের ভূমিকার বিষয়ে অভিযোগকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে।

২০২৪ সালের মে মাসে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিবৃতিতে বলে, ২০২৩ সালের আন্দোলনে শ্রমিকদের মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সংস্থাটি একই বছরের জুনে শ্রমিকনেতা শহিদুল ইসলাম হত্যার ঘটনাও তুলে ধরে। শহিদুল ইসলাম গাজীপুরে একটি কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরির বিষয়ে কাজ করছিলেন।

এই ঘটনাগুলো আলাদা সময়ের। আলাদা কারখানার। আলাদা রাজনৈতিক সরকারের আমলের। কিন্তু একটি সাধারণ প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে। মজুরি নিয়ে বিরোধ হলে তার নিষ্পত্তির পথ কেন এতবার সংঘর্ষে গিয়ে শেষ হয়?

৪৩ বছর পরও মজুরির প্রশ্ন

এই বছরের নভেম্বরের প্রথম দুই দিনে ঢাকার মিরপুর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ এবং কারখানা বন্ধের ঘটনা ঘটে।

১লা নভেম্বর ২০২৬ সালে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্দোলনের সময় শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের দাবি ছিল বর্তমান ১২,৫০০ টাকা থেকে ন্যূনতম মজুরি ৩০,০০০ টাকায় উন্নীত করা।

এই দাবি বাস্তবসম্মত কি না, সেটি অর্থনৈতিক হিসাবের প্রশ্ন।

৩০ হাজার টাকা মজুরি দিলে পোশাকের উৎপাদন ব্যয় কত বাড়বে? আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সেই বাড়তি ব্যয়ের অংশ বহন করবেন কি-না? ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া কিংবা ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতায় কী পরিবর্তন আসবে? মজুরি বৃদ্ধির ফলে দেশের মূল্যস্ফীতি কতটা প্রভাবিত হতে পারে?

এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু নৈতিক অবস্থান থেকে মজুরি নির্ধারণের আলোচনা সম্পূর্ণ হয় না।

কিন্তু বিপরীত দিকের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর ভয়ে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির প্রয়োজন কত দিন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ১৯৮৪ সালের দিকে ফিরে তাকানো প্রয়োজন।

সে বছর বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের জন্য প্রথম ন্যূনতম মজুরিকাঠামো ঘোষিত হয়। ২৭এ ডিসেম্বর ১৯৮৪ সালের গেজেটে সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬২৭ টাকা। কাঠামোটি পরের বছর কার্যকর হয় বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

১৯৮৪ সালের সেই ৬২৭ টাকার ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে আজ কত টাকা প্রয়োজন, সেটি নির্ণয়ের জন্য ব্যবহার করতে হবে কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স বা ভোক্তা মূল্যসূচক।

এই সূচক দিয়ে বোঝা যায়, একটি নির্দিষ্ট পণ্য ও সেবার সমষ্টির দাম সময়ের সঙ্গে কতটা বেড়েছে। অর্থাৎ ১৯৮৪ সালে ৬২৭ টাকা দিয়ে যতটুকু প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনা যেত, আজ তার সমপরিমাণ কিনতে কত টাকা প্রয়োজন, সেই হিসাব করা সম্ভব।

কিন্তু এটিও শেষ কথা নয়। পুরোনো মজুরির ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখা আর একজন শ্রমিক ও তার পরিবারের সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।

প্রথমটি মূল্যস্ফীতির হিসাব, দ্বিতীয়টি জীবনধারণের উপযোগী মজুরির প্রশ্ন।

আবার মজুরি নির্ধারণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ব্যয়, মুনাফা, বিদেশি ক্রেতার দেওয়া মূল্য, সরকারি প্রণোদনা এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

এসব আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে মজুরি বোর্ড।

যে বোর্ড শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করে, সেই বোর্ড কতটা স্বাধীন? শ্রমিকের প্রয়োজন আর মালিকের ব্যবসায়িক সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে কীভাবে? মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি নিয়মিত সমন্বয় হয় না কেন?

আরেকটি প্রশ্নও রয়েছে।

রাষ্ট্র যখন দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে নানা ধরনের করসুবিধা, নগদ সহায়তা ও নীতিসমর্থন দিয়ে এগিয়ে নিতে পারে, তখন শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেই রাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

গর্বের ট্যাগে লুকানো প্রশ্ন

একটি দেশের শিল্পের ইতিহাস সাধারণত সাফল্যের পরিসংখ্যান দিয়ে লেখা হয়। কতটি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কত ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, কত দেশে বাজার তৈরি হয়েছে, কত উদ্যোক্তা সফল হয়েছেন, এসব হিসাব সেই ইতিহাসে গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অথচ এই ইতিহাসের আরেকটি অংশ রয়েছে। সেখানে ১৯৮৩ সালের অ্যারিস্টোক্র্যাটের আহত নারীশ্রমিকেরা আছেন। আছেন ১৯৮৩ সালের নিউমার্কেটের দর্জিশ্রমিকেরা, যারা আট ঘণ্টা কাজের দাবি তুলেছিলেন। আছেন ২০০৩ সালের নারায়ণগঞ্জের আমজাদ হোসেন কামাল। আছেন ২০১৯ সালের সুমন মিয়া। আছেন ২০২৩ সালের রাসেল হাওলাদার, আনজুয়ারা খাতুন ও জালাল উদ্দিন। এরকম মামলায় জর্জরিত হয়ে হাজার হাজার মুখের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া শঙ্কিত দিন।

তাদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা। কিন্তু তারা সবাই বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসের অংশ।

যে পোশাকের কলারে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা থাকে, যেটি গর্বিত করে প্রতিটি বাংলাদেশি মানুষকে, সেই পোশাকটি কোনো বিমূর্ত অর্থনীতি তৈরি করে না। তৈরি করেন একজন মানুষ।

তিনি হয়তো কোনো গ্রামের কৃষক পরিবারের মেয়ে। হয়তো শহরের ভাড়া বাসায় থাকা একজন শ্রমিক। হয়তো এমন একজন বাবা, যার মাসিক বেতনের ওপর পরিবারের কয়েকজন মানুষের জীবন নির্ভর করে। যাদের শ্রম ছাড়া এই শিল্পের সাফল্য সম্ভব হতো না।