লাশের রাজনীতির বৃত্ত, এককালের ভিকটিম জামায়াত এখন শিকারী
“আমরা যে জিনিসটাকে ফ্যাসিজম বলি সেটার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে শুধু জীবিতকে অসম্মান করে না, সে মৃতকেও অসম্মান করে”। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একথা বলেছিলেন সলিমুল্লাহ খান। যে জামায়াত এতদিন লাশের রাজনীতি আর মৃতদেহের অবমাননার ভিকটিম ছিল, পিরোজপুরের ঘটনাপ্রবাহের পর বৃত্ত পূরণ করে তারাই আজ শিকারীর ভূমিকায়। সলিমুল্লাহ খান যাকে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ বলেছেন তা আজো চলমান এক অচ্ছেদ্য চক্রের মত।
শরীফ খিয়াম আহমেদ
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএমআপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
মানিক পশারীকে দাফনের উদ্দেশ্যে স্থানীয়ভাবে প্রথম যে কবরটি খোঁড়া হয়েছিল, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তা মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলে। সামাজিক বয়কটের ভয়ে পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য বা প্রতিবেশী এগিয়ে না আসায় গভীর রাতে টর্চের আলোয় দ্বিতীয়বার কবর খনন করতে বাধ্য হন তার নারী স্বজনরা। ছবি: রাহী নায়াব/আলাপ ইলাস্ট্রেশন
পিরোজপুরের মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন নাকি ভুয়া? পুরোনো এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে তার মৃত্যু। তবে সব ছাপিয়ে মানিকের দাফন নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে এখন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশোধপ্রবণতা। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কবর খোঁড়ার দৃশ্য থেকে শুরু হয়েছিল এই বিতর্ক। রাতের আঁধারে মুঠোফোনের টর্চলাইটের আলোয় মানিকের কবর খুঁড়ছিলেন তার মেয়ে সীমু আক্তার। দুই ফুপুর সাথে কবর খুঁড়ছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই দেশের বিপক্ষে, তথা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকা জামায়াতের ভয়ে এক নথিভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার শেষকৃত্যে নিজ পরিবার ও গ্রামের পুরুষদের অনুপস্থিতি জন্ম দিয়েছিল এমন বিষাদময় দৃশ্যের। যার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার। আর শেকড় প্রোথিত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সর্বশেষ শাসনামলে হওয়া লাশের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি; এবং পঁচাত্তর ও একাত্তরের নৃশংসতায়।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পিরোজপুরে তারই ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষ করল দেশবাসী। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে যে ধর্মভিত্তিক দলটি নিজেদের মৃতদেহের রাজনৈতিক অস্ত্রায়নের ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করত, প্রথমবারের মতো দেশের প্রধান বিরোধী দল হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে সেই জামায়াত সেখানে প্রতিপক্ষের ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধের শেষকৃত্যে বাধা দিল।
যারই প্রেক্ষিতে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকে লিখেছেন, “জানাজা পড়ার অধিকার, লাশ দাফনের অধিকার যেকোনো মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে এই ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এই দৃশ্য পুনরায় দেখতে চাই না।
“মুজিববাদী ফ্যাসিস্টরা শহিদ মিনারে পিয়াস করিম ও আল মাহমুদের লাশ আনতে দেয়নি, সাধারণ জনগণকে শ্রদ্ধা জানাতে দেয়নি। বিরোধী দলের অনেক নেতার জানাজা ঢাকায় করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরে ঢাকায় রক্ষীবাহিনীর নেতা ফ্যাসিস্ট তোফায়েলের জানাজা হয়েছে। আমার নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম রহমতুল্লাহর জানাজা হয়েছে। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী শোক প্রকাশও হয়েছে।”
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতা নাহিদ শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্টদের মানবাধিকারের পক্ষেও আমরা কথা বলেছি এবং বলব। কারণ শত্রুর সাথে আমাদের ইনসাফ করা শিখতে হবে।”
নির্বাচনের আগে এনসিপি জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোটে যাওয়ার পর দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগকারী ড. তাসনিম জারা একই দিন সকালে লিখেছেন, “মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।”
“স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে।”
“ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামায়াত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন,” যোগ করেন তিনি।
“একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে,” উল্লেখ করে জারা লিখেছেন, “নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ।”
জারা আরও লেখেন, “বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?”
আগের দিন, অর্থাৎ রবিবারই (২৫এ অক্টোবর) জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক নেতা আব্দুল কাদের লিখেছিলেন, “দেশে একটা মানুষ মারা গেছে, জামায়াতের নেতাকর্মীরা তার লাশ দাফন করতে দিচ্ছিল না, মব করে তার জন্য খোঁড়া কবর জোরপূর্বক ভরাট করে ফেলছে। ১৭ ঘণ্টা পরে তার বৃদ্ধা বোন আর মেয়ে রাতের আঁধারে মোবাইলের আলোতে প্লেট দিয়ে মাটি খুঁড়ে তাকে দাফন করেছে! এমন অমানবিক ঘটনার পরে এনসিপি সাংগঠনিকভাবে একেবারে নির্বিকার, নির্লিপ্ত ছিল। আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি তো দূরে থাক; কোনো একজন নেতার সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্যন্ত একটা টু শব্দ করে নাই।” কাদের আরও বলেন, “মৃত ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। এক্ষেত্রে এনসিপি তাদের শরিক দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের পক্ষ নিয়েছেন। মবকে নীরব সমর্থন দিয়েছেন। অথচ তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধকে ‘ওউন’ করেন। এই তাদের ‘ওউন’ করার নমুনা!”
“জামায়াতে ইসলামীর যে ‘রাইজটা’ (উত্থান) এখন হয়েছে, এটা হওয়ার পেছনে তো আওয়ামী লীগ দায়ী,” প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে এভাবেই বলেছেন প্রবীণ কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। “আওয়ামী লীগের যে রাজনীতি, তাতে এটা তাদের কাছে খুব পরিষ্কার—জামায়াতকে রাখা মানে নিজেকেই শক্তিশালী করা।"
ফরহাদ মজহারের মতে, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা ও আদর্শ পরাজিত ও বাতিল হয়ে গেছে। সেই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয় অর্জন করেছে, সেখানে ‘জামায়াতে ইসলামী’ নাম ধরে রেখে রাজনীতি করা মানে সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সত্তাকে অস্বীকার করা।ফরহাদ বলেন, “আপনি জামায়াতে ইসলামী, যে নাম দিয়ে আপনি আমার রাজনৈতিক চেতনাকে অস্বীকার করেছেন। আমার যে রাজনৈতিক সত্তা—আমার বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এবং ইসলাম মিলে আমি যে একটা গঠিত হচ্ছি, ‘হিস্টোরিক্যালি’ (ঐতিহাসিকভাবে)—এই সত্তাটাকে অস্বীকার করে আপনি ওই নামে রাজনীতি করছেন।"
“ফলে যদি রিয়েলি আমরা ফ্যাসিজমকে অতিক্রম করে পলিটিক্স থেকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে অবশ্যই এক নম্বর—জামায়াতে ইসলামীকে তার জামায়াতে ইসলামী নামটা বন্ধ করতে হবে,” যোগ করেন এই তাত্ত্বিক।
মানিক ও সাঈদী: ঘটনাক্রম
পিরোজপুর সদরের শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন মানিক পশারী। ২০০৭ সালের এক-এগারো পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের কয়েক মাস পর ২০০৯ সালের ১২ই অগাস্ট পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন তিনি।
পরের বছর, অর্থাৎ ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সরকারপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে, ১৯৭৩ সালে পাস হওয়া ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’ ছিল হাসিনা সরকারের এই পদক্ষেপের ভিত্তি। এরপর পিরোজপুর ও আশপাশের মুক্তিযুদ্ধকালীন একাধিক অভিযোগকে সমন্বিত করে সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত চালায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মানিক পশারীর অভিযোগ ছিল যার অন্যতম ভিত্তি। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার দেওয়া সাক্ষ্য অভিযোগ গঠনে ও সাঈদীর সাজা নিশ্চিতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
যদিও মানিক পশারীর ছোট ভাই চান মিয়া পশারীর বেশ কিছু ভিডিও রয়েছে ইউটিউব ও ফেইসবুকে। যেখানে চান মিয়া দাবি করেন, তার ভাই মানিক পশারী মূলত অর্থের বিনিময়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাকেও টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নীতিগত কারণে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সেখান থেকে চলে এসেছিলেন।
চান মিয়ার দাবি অনুযায়ী, যারা সাক্ষ্য দেওয়ার বিনিময়ে টাকা গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তাদের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি ও ঘরবাড়ি হয়েছে, কিন্তু তিনি টাকা না নেওয়ায় দরিদ্রই থেকে গেছেন। সাংবাদিকদের সামনে তিনি দাবি করেন যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭১ সালে রাজাকার ছিলেন না।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো তার এই বক্তব্য প্রকাশ করলেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নথি, সাঈদীর মামলার রায় ও আইনি প্রমাণের বিপরীত এসব ব্যক্তিগত দাবি স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত নয়।
এ ছাড়া মানিক পশারীর ছোট বোন হেনা পশারীও সাক্ষাৎকারে সাঈদীকে ‘আল্লাহর ওলি’ অভিহিত করে বলেন, তার বড় ভাই মানিক পশারী কিসের জন্য বা কেন সাঈদীর বিরুদ্ধে এসব মামলা ও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তা তারা জানেন না।
আবার মানিক পশারীকে একটি ভিডিওতে বলতে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের বাড়ির সাতটি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। একাত্তরের ভূমিকার জন্য সাঈদীর তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
সেই সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী এলাকার সংসদ সদস্য হওয়ার বহু আগে, চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই এলাকা থেকে সরে গিয়েছিলেন মানিক পশারী।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়েজামাই ফারুক হোসেনের আশ্রয়ে ছিলেন। সেখানেই ২৪এ অক্টোবর সকাল ১০টায় মৃত্যু হয় তার। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিজ গ্রামে দাফনের উদ্দেশ্যে দুপুর ১২টার দিকে তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের তীব্র বাধার মুখে পড়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারটি।
সেখানে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, “মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, তাকে কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রীয় সম্মান বা ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া যাবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তার লাশ দাফন করতে দেওয়া হবে না।”
মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার এবং মেয়েজামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে মহড়া দিয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত এড়াতে পিরোজপুর জেলা পুলিশ তৎপর হয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। বিকেল পাঁচটার সেখানে তাকে ‘গোপনে’ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম সাংবাদিকদের জানান, ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর বিলম্বিত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে লাশটি পুলিশি হেফাজতে রাখতে হয়েছিল।
অবশেষে, রাত একটার দিকে পুলিশের বিশেষ প্রহরায় নিজ বাড়িতে পৌঁছায় মানিকের মরদেহ। নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে সামান্যসংখ্যক নিকটাত্মীয়ের অংশগ্রহণে রাত দুইটায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পরবর্তীতে কোনো প্রকার সহিংসতা বা কবর অবমাননা যাতে না ঘটে, সে জন্য দাফনের পরও সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রাখতে হয়েছিল।
তার আগে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে মানিকের নিজের পারিবারিক ভিটায়। তাকে দাফনের উদ্দেশ্যে স্থানীয়ভাবে প্রথম যে কবরটি খোঁড়া হয়েছিল, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তা মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলে। সামাজিক বয়কটের ভয়ে পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য বা প্রতিবেশী এগিয়ে না আসায় গভীর রাতে টর্চের আলোয় দ্বিতীয়বার কবর খনন করতে বাধ্য হন মানিক পশারীর নারী স্বজনরা। মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা সেই দৃশ্যের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশজুড়ে আলোচনায় চলে আসে এই ঘটনা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দাফনের পর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, তারা কোনো লাশের রাজনীতি করেন না এবং দাফনেও বাধা দেননি। বরং পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল হকের ভাষ্য ছিল, “জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। সাঈদীপ্রেমিক জনতা আবেগ ও ভালোবাসা থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন।”
সংসদ সদস্য ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে দাবি করেন যে, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে তাদের দলীয় কোনো আপত্তি বা বাধা ছিল না। তার মূল আপত্তি ছিল একজন ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা নিয়ে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জেরার উদ্ধৃতি দিয়ে মাসুদ সাঈদী যুক্তি দেখান যে, মানিক পশারী নিজেই আদালতে স্বীকার করেছিলেন তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেননি, বরং সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের দেওয়া একটি ডিও লেটারের মাধ্যমে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
তবে তার এই রাজনৈতিক আত্মপক্ষ সমর্থনের বিপরীতে ভিন্ন ও প্রত্যক্ষ তথ্যপ্রমাণ উন্মোচিত হয়েছে 'দ্য ডিসেন্ট' নামে একটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে। তারা জানিয়েছে, দাফনে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি বলে জামায়াত নেতাদের দেওয়া দাবি সত্য নয়। মাঠপর্যায়ের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পিরোজপুরের মাটিতে দাফন প্রতিরোধের মিছিলে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন জিয়ানগর সদর ইউনিয়ন জামায়াতের যুব বিভাগের সভাপতি আহাদুল ইসলাম নাঈম এবং সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সাবেক সম্পাদক মো. মুইন উদ্দিন। তাছাড়া একটি ভিডিওতে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে অবস্থানরত কালো গেঞ্জি পরিহিত এক ব্যক্তিকে মাইকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে দেখা যায় যে, পিরোজপুরের মাটিতে সাঈদীর মামলার বাদীর দাফন হতে দেওয়া হবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা সংগঠিতভাবে এই দাফন প্রতিরোধের প্রচারণা চালিয়েছিলেন। পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সভাপতি রেদোয়ান তার ফেসবুক আইডিতে ভিডিও পোস্ট করে প্রচার করেন যে, পিরোজপুর সদর, জিয়ানগর কিংবা নাজিরপুরের কোথাও সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তির স্থান হবে না এবং সাঈদীপ্রেমীরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। একই ধরনের প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন আমিনুল বিন আজিজ ও মো. আসলাম শেখ নামের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।
ট্রাইব্যুনালের ২০১৩ সালের ২৮এ ফেব্রুয়ারির রায়ে প্রয়াত সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই রায় ঘোষণার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ও সংঘাতের সূচনা হয়। বিশেষ করে ৩রা মার্চ রাতে মসজিদের মাইক ও মোবাইল ফোনে ‘সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থকরা ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তারা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়। সে সময় কেবল বগুড়াতেই ৫০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হন। পরবর্তী কয়েক দিনে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সহিংসতায় দেশজুড়ে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা সাঈদীর দণ্ড কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সেই কারাদণ্ডভোগকালে ২০২৩ সালের ১৪ই অগাস্ট রাতে হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন ঢাকায় জানাজা পড়ার দাবিতে ঢাকার শাহবাগ এলাকায় হাজার হাজার সমর্থক মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ধরে বাধা সৃষ্টি করে, যা পরদিন ভোররাতে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সাঈদীর গায়েবানা জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের পেকুয়া ও চকোরিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস সংঘর্ষ ঘটে, যাতে অন্তত একজন নিহত এবং ৪৩ জন আহত হন।
জীবদ্দশায় সাঈদী খুলনার সোনাডাঙ্গা থানাধীন সিদ্দিকিয়া মহল্লার ‘দারুল কুরআন সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা’ প্রাঙ্গণে দাফনের অসিয়ত করেছিলেন বলেও তখন প্রচার করা হয়। তবে যিনি ওই জমি দান করেছিলেন তার ছেলে নজরুল ইসলাম তখন স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন। স্থানীয়দের একাংশ বিক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর মরদেহ ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে দাফন করতে দেওয়া হবে না। উদ্ভূত প্রশাসনিক জটিলতায় সাঈদীর মরদেহ খুলনায় না নিয়ে পিরোজপুরস্থ সাঈদী ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়।
পিরোজপুরের ঘটনাপ্রবাহে সরকারের অবস্থান
মানিক পশারীর শেষকৃত্য ও দাফন প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার ঘটনাটিকে অত্যন্ত ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
সচিবালয়ে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,“যারা এই কাজগুলো করেন, তারা কোনোভাবে এর পক্ষে সমর্থন পাবেন না।”
মৃত ব্যক্তির মরদেহের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষ কখনোই ভালোভাবে নেয়নি বলে উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। তার ভাষ্য, মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষের ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা উচিত এবং বিচারপ্রক্রিয়া বা কারো সম্পর্কে মূল্যায়ন সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দেওয়া বা আইন অনুযায়ী হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ক্ষমতাসীন বিএনপিরও লাশের রাজনীতির শিকার হওয়ার নজির রয়েছে। অনলাইন পোর্টাল ‘জবান’ প্রকাশিত “লাশেরা কেন সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠছে” শিরোনামের একটি লেখায় বাংলাদেশে মরদেহের রাজনৈতিক ব্যবহারের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেছে, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে অবস্থিত সমাধি নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বহুমুখী আক্রমণ ও বিতর্ক এর একটি বড় দৃষ্টান্ত।”
২০১৪ সালে সংসদ ভবনের মূল নকশার অজুহাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি, ২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে ওই কবরে জিয়ার মরদেহ নেই। এমনকি তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ডিএনএ পরীক্ষার প্রসঙ্গও তুলেছিলেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একজন মৃত রাষ্ট্রনায়কের শেষ ঠিকানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং মরদেহের মর্যাদাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের এক চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল সেই ঘটনা।
শেকড় কত দূরে?
বাংলাদেশে লাশের রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের পরিকল্পিত তাণ্ডবের ভেতরে।
সেই নয় মাসে কেবল ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা, বা দুই থেকে চার লাখ বীরাঙ্গনার ওপর বর্বর যৌন সহিংসতাই চালানো হয়নি, বরং বিকৃত কায়দায় নিহতদের মৃতদেহের অঙ্গচ্ছেদ করে শেয়াল-শকুনের খাদ্য হিসেবে খোলা মাঠে ফেলে রাখা, বা মিরপুর জল্লাদখানার মতো নির্যাতন কেন্দ্রগুলোতে তা স্তূপ করে রাখা হয়েছিল।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস ১৯৭১ সালের জুনে লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’-এ তার বিখ্যাত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে তার ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে তিনি বিশদ বিবরণ দেন কীভাবে সাধারণ বাঙালি ও নারীদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়ে তাদের অঙ্গচ্ছেদ করে হত্যা করা হতো।
ঢাকার গণহত্যা স্বচক্ষে দেখা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এবং রয়টার্স ও বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর তৎকালীন প্রতিবেদনে নিহত নারীদের স্তন কাটা ও বিকৃত মরদেহের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ প্রকাশিত হয়।
এই গণহত্যার ওপর সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস (আইসিজে) যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানেও পাকিস্তানি বাহিনীর নারী নির্যাতনকে কেবল ধর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘পৈশাচিক শারীরিক অঙ্গচ্ছেদ ও হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর পাকিস্তানি ৯৩ হাজার সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুরক্ষা এবং যুদ্ধবন্দী হিসেবে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নিরাপদ হেফাজতে চলে যায়। কিন্তু নয় মাসের নৃশংসতা, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং গণহত্যা চাক্ষুষ দেখা মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ মানুষের চরম ক্ষোভের মুখোমুখি হয় তাদের স্থানীয় সহযোগী—রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং অবাঙ্গালি (বিহারী) জনগোষ্ঠী।
১৮ই ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান সেকান্দার হায়াত খান ও স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্য গণহত্যায় অভিযুক্ত আলবদর বাহিনীর চারজন সদস্যকে প্রকাশ্যে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির আলোকচিত্রী হোরাশ ক্যারেট এবং মিশেল লরেন্ট এই ঘটনার ছবি তুলে ১৯৭২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তাদের ছবিতে কিংবা ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত তৎকালীন প্রতিবেদনগুলোতে এই নৃশংসতা ও লাশের ওপর ক্ষোভের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং খুলনা ও সৈয়দপুরেও রাজাকার ও বিহারীদের হত্যা করার পর লাশ ড্রেন, নদী বা খোলা মাঠে ফেলে রাখা হয় এবং জনসম্মুখে লাশের দিকে থুতু ফেলা বা লাথি মারার ঘটনা ঘটেছিল বলে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন দালিলিক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
মৃতদেহকে সম্পূর্ণরূপে বিকৃত ও অবমাননা করার এই প্রবৃত্তি মূলত শত্রু বা প্রতিপক্ষকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করার এক অমানবিক কৌশল, স্বাধীন বাংলাদেশেও যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাহন হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে।
অবমাননার শিকার হয়েছিল শেখ মুজিবের মৃতদেহও
১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নিহত শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজি জামাল এবং আত্মীয় শেখ নাসের ও কর্নেল জামিলের মরদেহ সারা দিন ধানমন্ডির বাড়িতেই পড়ে ছিল। ওই দিন গভীর রাতে ধর্মীয় কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সেনা প্রহরায় ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাদের সমাহিত করা হয়।
দেশজুড়ে কারফিউ জারি থাকায় সাধারণ মানুষকে তথ্যের আড়ালে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, ১৬ই অগাস্ট দুপুরে ডিজিএফআই ও সামরিক বাহিনীর তদারকিতে হেলিকপ্টারে করে শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো টুঙ্গিপাড়া গ্রাম সেনাসদস্য ও পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষকে জানাজায় অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় তড়িঘড়ি করে দাফনের চেষ্টা করা হলেও স্থানীয়দের দাবির মুখে শেষ গোসল করানো হয় এবং কাফন দেওয়া হয়। স্থানীয় মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমের ইমামতিতে মাত্র ২০-২৫ জন স্থানীয় লোকের উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপ্রধানের।
পরবর্তী বহু বছর এই কবরস্থানে প্রবেশ বা শ্রদ্ধা নিবেদন নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের শাসনামলেও বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর একই প্রতিশোধমূলক কৌশলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ দেখা যায়।
প্রতিশোধপরায়ণ হাসিনা
শেখ হাসিনার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনকালে বিরোধীদের মৃতদেহকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অবদমিত করার ঘটনা চরম মাত্রায় পৌঁছায়।
শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার দায়ে ২০১০ সালের ২৮এ জানুয়ারি রাতে পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসির পর গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে কড়া পুলিশ পাহারায় মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। গ্রামগুলোতে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে পরিবারের সদস্য ও সীমিত সংখ্যক আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।
২০২০ সালের এপ্রিলে পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের আরেক আসামি বরখাস্ত ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের ফাঁসি কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করার পর তার মরদেহ ভোলায় দৌলতখানে নিজ গ্রামে দাফনের পরিকল্পনা করা হয়। তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একজন দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিকে এলাকায় দাফন করতে না দেওয়ার জন্য তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ ও বিক্ষোভ গড়ে তোলে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসন ভোলায় লাশটি দাফন না করে গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে তাকে দাফন করতে হয়।
শেখ হাসিনার সর্বশেষ শাসনামলে ১৯৭১ সালের অপরাধ বিচারের ঘটনাকে ‘একতরফা নিপীড়ন’ ও ‘আওয়ামী দুঃশাসন’ বলে আসছে জামায়াত। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতেই বিচার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে দলটির ওয়েবসাইটে।
সেখানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের সাজা ভোগকালে গোলাম আযমের মৃত্যু হয় ঢাকার হাসপাতালে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে শীর্ষনেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, কিংবা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এই সবকটি মৃত্যুকেই ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখে তাদের দল।
ঢাকায় বা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে তাদের জানাজার নামাজ আয়োজন করতে দেওয়া হতো না তখন। গোয়েন্দা নজরদারিতে গভীর রাতে লাশ গ্রামে পাঠিয়ে সংকীর্ণ পরিসরে শেষকৃত্য আয়োজনে বাধ্য করা হতো।
কারাগার থেকে লাশবাহী গাড়ি বের হওয়ার সময় মৃতদেহের দিকে জুতা ও জুতার মালা নিক্ষেপ করার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে পুরস্কৃত ও উৎসাহিত করা হয়েছিল। তাদের কবরে গিয়ে ফলক ভেঙে ফেলাসহ নানা অবমাননাকর ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক বিজয়ের উল্লাস প্রকাশ করা হতো।
বিভিন্ন স্থানে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের কবর ভাঙচুর ও অবমাননার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক রূপ নিয়েছিল।
প্রায়শ্চিত্ত ও ফ্যাসিজম
“যেহেতু সামাজিকভাবে সেটা তখন প্রতিরোধ করতে পারিনি, আমরা তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করছি এখন, সেই প্রায়শ্চিত্তই হচ্ছে,” ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকায় এক রাজনৈতিক সংলাপে এভাবেই বলেছিলেন বাংলাদেশি চিন্তাবিদ ও লেখক সলিমুল্লাহ খান।
মানবাধিকার, রাষ্ট্রদর্শন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে মৃতদেহের অবমাননার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেদিন সলিমুল্লাহ খান বলেছিলেন, “আমরা যে জিনিসটাকে ফ্যাসিজম বলি সেটার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে শুধু জীবিতকে অসম্মান করে না, সে মৃতকেও অসম্মান করে।”
তার ভাষায়, “যখন একজন মানুষ প্রাণ ত্যাগ করে, তার দেহ পড়ে থাকে—তাকে উপযুক্ত সম্মানের সাথে সৎকারের করার পথেও যারা বাধা দেয়, তাদের তো মানুষ বলতে কষ্ট হয়, তাই না? এটাকে বলে ‘ইনহিউম্যান অ্যান্ড ডিগ্রেডিং’।
১৯৮৪ সনে জাতিসংঘ একটা কনভেনশন গ্রহণ করেছে, যেটা ‘এগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড ক্রুয়েলটি অ্যান্ড ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট’।” উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “মৃতদেহকে লাথি মারা, এটা চরম অশ্রদ্ধা। গোটা মানবজাতির প্রতি। মানে মানুষ, মানুষ হয়েছে তার একটা প্রমাণ—সে মৃতকে সৎকার করে।”
ইসলামী ধর্মতত্ত্বের বিচারে মৃতদেহের দ্রুত ও সম্মانه সাথে সৎকার করা কোনো একক পরিবারের কাজ নয়; সামষ্টিক সামাজিক দায়িত্ব।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী, এটা ‘ফরজে কিফায়’, অর্থাৎ সমাজের একাংশ যদি মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করে, তবে পুরো সমাজ দায়মুক্ত হয়।
কিন্তু যদি রাজনৈতিক ভীতি বা গোষ্ঠীগত শত্রুতার কারণে একজন মৃত মানুষের সৎকার বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং সমাজ সেখানে নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে “সেই সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি নৈতিকভাবে অপরাধী” হবেন, বলেছিলেন সলিমুল্লাহ খান।
একই আলোচনায় সলিমুল্লাহ খান বলেন, “পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জায়গায় দেখা যায়, জার্মানদের সাথে ফরাসিদের বহু যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তাদের এখানে দেখা যায় ‘ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট’-এর কোনো ব্যাপক উদাহরণ নাই। কিন্তু যখনই উপনিবেশ—কী আলজেরিয়ায়, কী বাংলাদেশে পাকিস্তানি ব্যবহার—তখন দেখা যায় কী, তারা মৃতদেহের ওপর অবমাননা করেছে এবং তারা নারী ধর্ষণ করেছে।”
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ মনে করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালের আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি প্রধান স্তম্ভ—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। এটা বিবেচনায় রাখলে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো নাগরিক, তিনি রাজনৈতিকভাবে যত বিতর্কিতই হন না কেন, তার মৃতদেহের অবমাননা করা কিংবা পরিবারকে দাফনে বাধা দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের এই তিন মূল স্তম্ভের সাথেই এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
যদিও বাংলাদেশে মৃত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃতদেহের অবমাননা, জানাজা নিয়ন্ত্রণ এবং দাফন প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয়। দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূখণ্ডে ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মরণোত্তর পর্যায়েও নিশ্চিহ্ন ও অমানবিকীকরণের যে চর্চা গড়ে উঠেছে, তা একটি দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক চক্রের রূপ নিয়েছে।
২০২৬ সালের শেষ সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহে এটা অন্তত স্পষ্ট, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বও পুরোনো প্রতিশোধের বৃত্তেই বন্দি হয়ে আছে। প্রতিপক্ষকে মতাদর্শিকভাবে পরাজিত করাই এখানে শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের অবমাননা ও শেষকৃত্যের অধিকার হরণও রাজনীতির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। যে জামায়াত এতদিন লাশের রাজনীতির আর অবমানার ভিকটিম ছিল, বৃত্ত পূরণ করে যেন তারাই চলে এসে টেবিলের উল্টো পাশে। ভিকটিম যেন পরিণত শিকারীতে। সলিমুল্লাহ খানের ভাষায় ‘প্রায়শ্চিত্ত’ চলমান রয়েছে এক অচ্ছেদ্য চক্রের মত।
লাশের রাজনীতির বৃত্ত, এককালের ভিকটিম জামায়াত এখন শিকারী
“আমরা যে জিনিসটাকে ফ্যাসিজম বলি সেটার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে শুধু জীবিতকে অসম্মান করে না, সে মৃতকেও অসম্মান করে”। ২০২৪ সালের নভেম্বরে একথা বলেছিলেন সলিমুল্লাহ খান। যে জামায়াত এতদিন লাশের রাজনীতি আর মৃতদেহের অবমাননার ভিকটিম ছিল, পিরোজপুরের ঘটনাপ্রবাহের পর বৃত্ত পূরণ করে তারাই আজ শিকারীর ভূমিকায়। সলিমুল্লাহ খান যাকে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ বলেছেন তা আজো চলমান এক অচ্ছেদ্য চক্রের মত।
পিরোজপুরের মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন নাকি ভুয়া? পুরোনো এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে তার মৃত্যু। তবে সব ছাপিয়ে মানিকের দাফন নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে এখন জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশোধপ্রবণতা। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কবর খোঁড়ার দৃশ্য থেকে শুরু হয়েছিল এই বিতর্ক। রাতের আঁধারে মুঠোফোনের টর্চলাইটের আলোয় মানিকের কবর খুঁড়ছিলেন তার মেয়ে সীমু আক্তার। দুই ফুপুর সাথে কবর খুঁড়ছিলেন তিনি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই দেশের বিপক্ষে, তথা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে থাকা জামায়াতের ভয়ে এক নথিভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার শেষকৃত্যে নিজ পরিবার ও গ্রামের পুরুষদের অনুপস্থিতি জন্ম দিয়েছিল এমন বিষাদময় দৃশ্যের। যার ঐতিহাসিক পটভূমির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার। আর শেকড় প্রোথিত মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের সর্বশেষ শাসনামলে হওয়া লাশের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার রাজনীতি; এবং পঁচাত্তর ও একাত্তরের নৃশংসতায়।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পিরোজপুরে তারই ধারাবাহিকতা প্রত্যক্ষ করল দেশবাসী। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে যে ধর্মভিত্তিক দলটি নিজেদের মৃতদেহের রাজনৈতিক অস্ত্রায়নের ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করত, প্রথমবারের মতো দেশের প্রধান বিরোধী দল হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে সেই জামায়াত সেখানে প্রতিপক্ষের ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধের শেষকৃত্যে বাধা দিল।
যারই প্রেক্ষিতে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে ফেসবুকে লিখেছেন, “জানাজা পড়ার অধিকার, লাশ দাফনের অধিকার যেকোনো মানুষের ন্যূনতম মানবিক অধিকার, ধর্মীয় অধিকার। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে এই ন্যূনতম অধিকারটুকুও কেড়ে নিয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা এই দৃশ্য পুনরায় দেখতে চাই না।
“মুজিববাদী ফ্যাসিস্টরা শহিদ মিনারে পিয়াস করিম ও আল মাহমুদের লাশ আনতে দেয়নি, সাধারণ জনগণকে শ্রদ্ধা জানাতে দেয়নি। বিরোধী দলের অনেক নেতার জানাজা ঢাকায় করতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পরে ঢাকায় রক্ষীবাহিনীর নেতা ফ্যাসিস্ট তোফায়েলের জানাজা হয়েছে। আমার নিজ এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা এ কে এম রহমতুল্লাহর জানাজা হয়েছে। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী শোক প্রকাশও হয়েছে।”
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ নেতা নাহিদ শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্টদের মানবাধিকারের পক্ষেও আমরা কথা বলেছি এবং বলব। কারণ শত্রুর সাথে আমাদের ইনসাফ করা শিখতে হবে।”
নির্বাচনের আগে এনসিপি জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোটে যাওয়ার পর দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগকারী ড. তাসনিম জারা একই দিন সকালে লিখেছেন, “মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।”
“স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ এই কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে।”
“ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামায়াত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথেই, বিরোধী দলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন,” যোগ করেন তিনি।
“একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে,” উল্লেখ করে জারা লিখেছেন, “নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ।”
জারা আরও লেখেন, “বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?”
আগের দিন, অর্থাৎ রবিবারই (২৫এ অক্টোবর) জুলাই অভ্যুত্থানের আরেক নেতা আব্দুল কাদের লিখেছিলেন, “দেশে একটা মানুষ মারা গেছে, জামায়াতের নেতাকর্মীরা তার লাশ দাফন করতে দিচ্ছিল না, মব করে তার জন্য খোঁড়া কবর জোরপূর্বক ভরাট করে ফেলছে। ১৭ ঘণ্টা পরে তার বৃদ্ধা বোন আর মেয়ে রাতের আঁধারে মোবাইলের আলোতে প্লেট দিয়ে মাটি খুঁড়ে তাকে দাফন করেছে! এমন অমানবিক ঘটনার পরে এনসিপি সাংগঠনিকভাবে একেবারে নির্বিকার, নির্লিপ্ত ছিল। আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি তো দূরে থাক; কোনো একজন নেতার সোশ্যাল মিডিয়ায় পর্যন্ত একটা টু শব্দ করে নাই।” কাদের আরও বলেন, “মৃত ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। এক্ষেত্রে এনসিপি তাদের শরিক দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের পক্ষ নিয়েছেন। মবকে নীরব সমর্থন দিয়েছেন। অথচ তারা নাকি মুক্তিযুদ্ধকে ‘ওউন’ করেন। এই তাদের ‘ওউন’ করার নমুনা!”
“জামায়াতে ইসলামীর যে ‘রাইজটা’ (উত্থান) এখন হয়েছে, এটা হওয়ার পেছনে তো আওয়ামী লীগ দায়ী,” প্রতিবেদকের এক প্রশ্নের জবাবে এভাবেই বলেছেন প্রবীণ কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার। “আওয়ামী লীগের যে রাজনীতি, তাতে এটা তাদের কাছে খুব পরিষ্কার—জামায়াতকে রাখা মানে নিজেকেই শক্তিশালী করা।"
ফরহাদ মজহারের মতে, মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা ও আদর্শ পরাজিত ও বাতিল হয়ে গেছে। সেই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয় অর্জন করেছে, সেখানে ‘জামায়াতে ইসলামী’ নাম ধরে রেখে রাজনীতি করা মানে সেই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সত্তাকে অস্বীকার করা।ফরহাদ বলেন, “আপনি জামায়াতে ইসলামী, যে নাম দিয়ে আপনি আমার রাজনৈতিক চেতনাকে অস্বীকার করেছেন। আমার যে রাজনৈতিক সত্তা—আমার বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এবং ইসলাম মিলে আমি যে একটা গঠিত হচ্ছি, ‘হিস্টোরিক্যালি’ (ঐতিহাসিকভাবে)—এই সত্তাটাকে অস্বীকার করে আপনি ওই নামে রাজনীতি করছেন।"
“ফলে যদি রিয়েলি আমরা ফ্যাসিজমকে অতিক্রম করে পলিটিক্স থেকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে অবশ্যই এক নম্বর—জামায়াতে ইসলামীকে তার জামায়াতে ইসলামী নামটা বন্ধ করতে হবে,” যোগ করেন এই তাত্ত্বিক।
মানিক ও সাঈদী: ঘটনাক্রম
পিরোজপুর সদরের শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন মানিক পশারী। ২০০৭ সালের এক-এগারো পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের কয়েক মাস পর ২০০৯ সালের ১২ই অগাস্ট পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন তিনি।
পরের বছর, অর্থাৎ ২০১০ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের সরকারপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে, ১৯৭৩ সালে পাস হওয়া ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩’ ছিল হাসিনা সরকারের এই পদক্ষেপের ভিত্তি। এরপর পিরোজপুর ও আশপাশের মুক্তিযুদ্ধকালীন একাধিক অভিযোগকে সমন্বিত করে সাঈদীর বিরুদ্ধে তদন্ত চালায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মানিক পশারীর অভিযোগ ছিল যার অন্যতম ভিত্তি। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তার দেওয়া সাক্ষ্য অভিযোগ গঠনে ও সাঈদীর সাজা নিশ্চিতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
যদিও মানিক পশারীর ছোট ভাই চান মিয়া পশারীর বেশ কিছু ভিডিও রয়েছে ইউটিউব ও ফেইসবুকে। যেখানে চান মিয়া দাবি করেন, তার ভাই মানিক পশারী মূলত অর্থের বিনিময়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তাকেও টাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নীতিগত কারণে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সেখান থেকে চলে এসেছিলেন।
চান মিয়ার দাবি অনুযায়ী, যারা সাক্ষ্য দেওয়ার বিনিময়ে টাকা গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে তাদের আর্থিক পরিস্থিতির উন্নতি ও ঘরবাড়ি হয়েছে, কিন্তু তিনি টাকা না নেওয়ায় দরিদ্রই থেকে গেছেন। সাংবাদিকদের সামনে তিনি দাবি করেন যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৭১ সালে রাজাকার ছিলেন না।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো তার এই বক্তব্য প্রকাশ করলেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক নথি, সাঈদীর মামলার রায় ও আইনি প্রমাণের বিপরীত এসব ব্যক্তিগত দাবি স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত নয়।
এ ছাড়া মানিক পশারীর ছোট বোন হেনা পশারীও সাক্ষাৎকারে সাঈদীকে ‘আল্লাহর ওলি’ অভিহিত করে বলেন, তার বড় ভাই মানিক পশারী কিসের জন্য বা কেন সাঈদীর বিরুদ্ধে এসব মামলা ও সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তা তারা জানেন না।
আবার মানিক পশারীকে একটি ভিডিওতে বলতে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের বাড়ির সাতটি ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। একাত্তরের ভূমিকার জন্য সাঈদীর তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
সেই সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী এলাকার সংসদ সদস্য হওয়ার বহু আগে, চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরপরই এলাকা থেকে সরে গিয়েছিলেন মানিক পশারী।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়েজামাই ফারুক হোসেনের আশ্রয়ে ছিলেন। সেখানেই ২৪এ অক্টোবর সকাল ১০টায় মৃত্যু হয় তার। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিজ গ্রামে দাফনের উদ্দেশ্যে দুপুর ১২টার দিকে তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের তীব্র বাধার মুখে পড়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারটি।
সেখানে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন, “মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, তাকে কোনো অবস্থাতেই রাষ্ট্রীয় সম্মান বা ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া যাবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তার লাশ দাফন করতে দেওয়া হবে না।”
মানিক পশারীর বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার এবং মেয়েজামাই ফারুক হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে মহড়া দিয়ে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে।
বিশৃঙ্খলা ও সংঘাত এড়াতে পিরোজপুর জেলা পুলিশ তৎপর হয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ লাইনে নিয়ে যায়। বিকেল পাঁচটার সেখানে তাকে ‘গোপনে’ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম সাংবাদিকদের জানান, ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর বিলম্বিত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে লাশটি পুলিশি হেফাজতে রাখতে হয়েছিল।
অবশেষে, রাত একটার দিকে পুলিশের বিশেষ প্রহরায় নিজ বাড়িতে পৌঁছায় মানিকের মরদেহ। নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে সামান্যসংখ্যক নিকটাত্মীয়ের অংশগ্রহণে রাত দুইটায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পরবর্তীতে কোনো প্রকার সহিংসতা বা কবর অবমাননা যাতে না ঘটে, সে জন্য দাফনের পরও সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রাখতে হয়েছিল।
তার আগে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে মানিকের নিজের পারিবারিক ভিটায়। তাকে দাফনের উদ্দেশ্যে স্থানীয়ভাবে প্রথম যে কবরটি খোঁড়া হয়েছিল, জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তা মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলে। সামাজিক বয়কটের ভয়ে পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য বা প্রতিবেশী এগিয়ে না আসায় গভীর রাতে টর্চের আলোয় দ্বিতীয়বার কবর খনন করতে বাধ্য হন মানিক পশারীর নারী স্বজনরা। মুঠোফোনের ক্যামেরায় ধারণ করা সেই দৃশ্যের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই দেশজুড়ে আলোচনায় চলে আসে এই ঘটনা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দাফনের পর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, তারা কোনো লাশের রাজনীতি করেন না এবং দাফনেও বাধা দেননি। বরং পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহিরুল হকের ভাষ্য ছিল, “জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। সাঈদীপ্রেমিক জনতা আবেগ ও ভালোবাসা থেকে এমনটি করে থাকতে পারেন।”
সংসদ সদস্য ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক দীর্ঘ বিবৃতিতে দাবি করেন যে, মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে তাদের দলীয় কোনো আপত্তি বা বাধা ছিল না। তার মূল আপত্তি ছিল একজন ‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা নিয়ে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জেরার উদ্ধৃতি দিয়ে মাসুদ সাঈদী যুক্তি দেখান যে, মানিক পশারী নিজেই আদালতে স্বীকার করেছিলেন তিনি সরাসরি যুদ্ধ করেননি, বরং সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের দেওয়া একটি ডিও লেটারের মাধ্যমে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
তবে তার এই রাজনৈতিক আত্মপক্ষ সমর্থনের বিপরীতে ভিন্ন ও প্রত্যক্ষ তথ্যপ্রমাণ উন্মোচিত হয়েছে 'দ্য ডিসেন্ট' নামে একটি ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধানে। তারা জানিয়েছে, দাফনে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি বলে জামায়াত নেতাদের দেওয়া দাবি সত্য নয়। মাঠপর্যায়ের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পিরোজপুরের মাটিতে দাফন প্রতিরোধের মিছিলে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন জিয়ানগর সদর ইউনিয়ন জামায়াতের যুব বিভাগের সভাপতি আহাদুল ইসলাম নাঈম এবং সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সাবেক সম্পাদক মো. মুইন উদ্দিন। তাছাড়া একটি ভিডিওতে জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন তার পেছনে অবস্থানরত কালো গেঞ্জি পরিহিত এক ব্যক্তিকে মাইকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে দেখা যায় যে, পিরোজপুরের মাটিতে সাঈদীর মামলার বাদীর দাফন হতে দেওয়া হবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও স্থানীয় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা সংগঠিতভাবে এই দাফন প্রতিরোধের প্রচারণা চালিয়েছিলেন। পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ শিবিরের সভাপতি রেদোয়ান তার ফেসবুক আইডিতে ভিডিও পোস্ট করে প্রচার করেন যে, পিরোজপুর সদর, জিয়ানগর কিংবা নাজিরপুরের কোথাও সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তির স্থান হবে না এবং সাঈদীপ্রেমীরা রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। একই ধরনের প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন আমিনুল বিন আজিজ ও মো. আসলাম শেখ নামের অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।
ট্রাইব্যুনালের ২০১৩ সালের ২৮এ ফেব্রুয়ারির রায়ে প্রয়াত সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই রায় ঘোষণার পরপরই দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ও সংঘাতের সূচনা হয়। বিশেষ করে ৩রা মার্চ রাতে মসজিদের মাইক ও মোবাইল ফোনে ‘সাঈদীকে চাঁদে দেখা গেছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থকরা ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। তারা অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালায়। সে সময় কেবল বগুড়াতেই ৫০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত হন। পরবর্তী কয়েক দিনে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সহিংসতায় দেশজুড়ে দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
পরবর্তীতে ২০১৪ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতিরা সাঈদীর দণ্ড কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সেই কারাদণ্ডভোগকালে ২০২৩ সালের ১৪ই অগাস্ট রাতে হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন ঢাকায় জানাজা পড়ার দাবিতে ঢাকার শাহবাগ এলাকায় হাজার হাজার সমর্থক মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে ধরে বাধা সৃষ্টি করে, যা পরদিন ভোররাতে পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সাঈদীর গায়েবানা জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের পেকুয়া ও চকোরিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস সংঘর্ষ ঘটে, যাতে অন্তত একজন নিহত এবং ৪৩ জন আহত হন।
জীবদ্দশায় সাঈদী খুলনার সোনাডাঙ্গা থানাধীন সিদ্দিকিয়া মহল্লার ‘দারুল কুরআন সিদ্দিকিয়া কামিল মাদ্রাসা’ প্রাঙ্গণে দাফনের অসিয়ত করেছিলেন বলেও তখন প্রচার করা হয়। তবে যিনি ওই জমি দান করেছিলেন তার ছেলে নজরুল ইসলাম তখন স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি দায়ের করেন। স্থানীয়দের একাংশ বিক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর মরদেহ ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে দাফন করতে দেওয়া হবে না। উদ্ভূত প্রশাসনিক জটিলতায় সাঈদীর মরদেহ খুলনায় না নিয়ে পিরোজপুরস্থ সাঈদী ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে দাফন করা হয়।
পিরোজপুরের ঘটনাপ্রবাহে সরকারের অবস্থান
মানিক পশারীর শেষকৃত্য ও দাফন প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার ঘটনাটিকে অত্যন্ত ‘দুঃখজনক’ বলে অভিহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
সচিবালয়ে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,“যারা এই কাজগুলো করেন, তারা কোনোভাবে এর পক্ষে সমর্থন পাবেন না।”
মৃত ব্যক্তির মরদেহের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ সাধারণ মানুষ কখনোই ভালোভাবে নেয়নি বলে উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। তার ভাষ্য, মৃত্যুর পর প্রতিটি মানুষের ন্যূনতম সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা উচিত এবং বিচারপ্রক্রিয়া বা কারো সম্পর্কে মূল্যায়ন সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দেওয়া বা আইন অনুযায়ী হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ক্ষমতাসীন বিএনপিরও লাশের রাজনীতির শিকার হওয়ার নজির রয়েছে। অনলাইন পোর্টাল ‘জবান’ প্রকাশিত “লাশেরা কেন সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠছে” শিরোনামের একটি লেখায় বাংলাদেশে মরদেহের রাজনৈতিক ব্যবহারের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেছে, “বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানে অবস্থিত সমাধি নিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বহুমুখী আক্রমণ ও বিতর্ক এর একটি বড় দৃষ্টান্ত।”
২০১৪ সালে সংসদ ভবনের মূল নকশার অজুহাতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি, ২০২১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে ওই কবরে জিয়ার মরদেহ নেই। এমনকি তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ডিএনএ পরীক্ষার প্রসঙ্গও তুলেছিলেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একজন মৃত রাষ্ট্রনায়কের শেষ ঠিকানাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং মরদেহের মর্যাদাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের এক চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল সেই ঘটনা।
শেকড় কত দূরে?
বাংলাদেশে লাশের রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক শেকড় গভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের পরিকল্পিত তাণ্ডবের ভেতরে।
সেই নয় মাসে কেবল ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা, বা দুই থেকে চার লাখ বীরাঙ্গনার ওপর বর্বর যৌন সহিংসতাই চালানো হয়নি, বরং বিকৃত কায়দায় নিহতদের মৃতদেহের অঙ্গচ্ছেদ করে শেয়াল-শকুনের খাদ্য হিসেবে খোলা মাঠে ফেলে রাখা, বা মিরপুর জল্লাদখানার মতো নির্যাতন কেন্দ্রগুলোতে তা স্তূপ করে রাখা হয়েছিল।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস ১৯৭১ সালের জুনে লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’-এ তার বিখ্যাত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে তার ‘দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থে তিনি বিশদ বিবরণ দেন কীভাবে সাধারণ বাঙালি ও নারীদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়ে তাদের অঙ্গচ্ছেদ করে হত্যা করা হতো।
ঢাকার গণহত্যা স্বচক্ষে দেখা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সাইমন ড্রিং এবং রয়টার্স ও বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর তৎকালীন প্রতিবেদনে নিহত নারীদের স্তন কাটা ও বিকৃত মরদেহের প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ প্রকাশিত হয়।
এই গণহত্যার ওপর সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস (আইসিজে) যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানেও পাকিস্তানি বাহিনীর নারী নির্যাতনকে কেবল ধর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ‘পৈশাচিক শারীরিক অঙ্গচ্ছেদ ও হত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর পাকিস্তানি ৯৩ হাজার সৈন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুরক্ষা এবং যুদ্ধবন্দী হিসেবে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী নিরাপদ হেফাজতে চলে যায়। কিন্তু নয় মাসের নৃশংসতা, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং গণহত্যা চাক্ষুষ দেখা মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ মানুষের চরম ক্ষোভের মুখোমুখি হয় তাদের স্থানীয় সহযোগী—রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং অবাঙ্গালি (বিহারী) জনগোষ্ঠী।
১৮ই ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান সেকান্দার হায়াত খান ও স্থানীয় মুক্তিবাহিনীর কিছু সদস্য গণহত্যায় অভিযুক্ত আলবদর বাহিনীর চারজন সদস্যকে প্রকাশ্যে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির আলোকচিত্রী হোরাশ ক্যারেট এবং মিশেল লরেন্ট এই ঘটনার ছবি তুলে ১৯৭২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তাদের ছবিতে কিংবা ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ ও ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এ প্রকাশিত তৎকালীন প্রতিবেদনগুলোতে এই নৃশংসতা ও লাশের ওপর ক্ষোভের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর এবং খুলনা ও সৈয়দপুরেও রাজাকার ও বিহারীদের হত্যা করার পর লাশ ড্রেন, নদী বা খোলা মাঠে ফেলে রাখা হয় এবং জনসম্মুখে লাশের দিকে থুতু ফেলা বা লাথি মারার ঘটনা ঘটেছিল বলে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন দালিলিক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।
মৃতদেহকে সম্পূর্ণরূপে বিকৃত ও অবমাননা করার এই প্রবৃত্তি মূলত শত্রু বা প্রতিপক্ষকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করার এক অমানবিক কৌশল, স্বাধীন বাংলাদেশেও যা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাহন হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে।
অবমাননার শিকার হয়েছিল শেখ মুজিবের মৃতদেহও
১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে নিহত শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজি জামাল এবং আত্মীয় শেখ নাসের ও কর্নেল জামিলের মরদেহ সারা দিন ধানমন্ডির বাড়িতেই পড়ে ছিল। ওই দিন গভীর রাতে ধর্মীয় কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই সেনা প্রহরায় ঢাকার বনানী কবরস্থানে তাদের সমাহিত করা হয়।
দেশজুড়ে কারফিউ জারি থাকায় সাধারণ মানুষকে তথ্যের আড়ালে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, ১৬ই অগাস্ট দুপুরে ডিজিএফআই ও সামরিক বাহিনীর তদারকিতে হেলিকপ্টারে করে শেখ মুজিবুর রহমানের মরদেহ জন্মস্থান গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো টুঙ্গিপাড়া গ্রাম সেনাসদস্য ও পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। গ্রামের সাধারণ মানুষকে জানাজায় অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় তড়িঘড়ি করে দাফনের চেষ্টা করা হলেও স্থানীয়দের দাবির মুখে শেষ গোসল করানো হয় এবং কাফন দেওয়া হয়। স্থানীয় মৌলভী শেখ আব্দুল হালিমের ইমামতিতে মাত্র ২০-২৫ জন স্থানীয় লোকের উপস্থিতিতে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপ্রধানের।
পরবর্তী বহু বছর এই কবরস্থানে প্রবেশ বা শ্রদ্ধা নিবেদন নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের শাসনামলেও বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর একই প্রতিশোধমূলক কৌশলের প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ দেখা যায়।
প্রতিশোধপরায়ণ হাসিনা
শেখ হাসিনার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনকালে বিরোধীদের মৃতদেহকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অবদমিত করার ঘটনা চরম মাত্রায় পৌঁছায়।
শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার দায়ে ২০১০ সালের ২৮এ জানুয়ারি রাতে পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা, এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ ও মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসির পর গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে কড়া পুলিশ পাহারায় মরদেহগুলো নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়। গ্রামগুলোতে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে পরিবারের সদস্য ও সীমিত সংখ্যক আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে তাদের দাফন করা হয়।
২০২০ সালের এপ্রিলে পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের আরেক আসামি বরখাস্ত ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদের ফাঁসি কেরাণীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর করার পর তার মরদেহ ভোলায় দৌলতখানে নিজ গ্রামে দাফনের পরিকল্পনা করা হয়। তখন আওয়ামী লীগ সমর্থক একজন দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিকে এলাকায় দাফন করতে না দেওয়ার জন্য তীব্র সামাজিক প্রতিরোধ ও বিক্ষোভ গড়ে তোলে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসন ভোলায় লাশটি দাফন না করে গভীর রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে তাকে দাফন করতে হয়।
শেখ হাসিনার সর্বশেষ শাসনামলে ১৯৭১ সালের অপরাধ বিচারের ঘটনাকে ‘একতরফা নিপীড়ন’ ও ‘আওয়ামী দুঃশাসন’ বলে আসছে জামায়াত। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দিতেই বিচার করা হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে দলটির ওয়েবসাইটে।
সেখানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের সাজা ভোগকালে গোলাম আযমের মৃত্যু হয় ঢাকার হাসপাতালে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে শীর্ষনেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, কিংবা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এই সবকটি মৃত্যুকেই ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে দেখে তাদের দল।
ঢাকায় বা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে তাদের জানাজার নামাজ আয়োজন করতে দেওয়া হতো না তখন। গোয়েন্দা নজরদারিতে গভীর রাতে লাশ গ্রামে পাঠিয়ে সংকীর্ণ পরিসরে শেষকৃত্য আয়োজনে বাধ্য করা হতো।
কারাগার থেকে লাশবাহী গাড়ি বের হওয়ার সময় মৃতদেহের দিকে জুতা ও জুতার মালা নিক্ষেপ করার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে পুরস্কৃত ও উৎসাহিত করা হয়েছিল। তাদের কবরে গিয়ে ফলক ভেঙে ফেলাসহ নানা অবমাননাকর ঘটনা ঘটিয়ে রাজনৈতিক বিজয়ের উল্লাস প্রকাশ করা হতো।
বিভিন্ন স্থানে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের কবর ভাঙচুর ও অবমাননার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক রূপ নিয়েছিল।
প্রায়শ্চিত্ত ও ফ্যাসিজম
“যেহেতু সামাজিকভাবে সেটা তখন প্রতিরোধ করতে পারিনি, আমরা তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করছি এখন, সেই প্রায়শ্চিত্তই হচ্ছে,” ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকায় এক রাজনৈতিক সংলাপে এভাবেই বলেছিলেন বাংলাদেশি চিন্তাবিদ ও লেখক সলিমুল্লাহ খান।
মানবাধিকার, রাষ্ট্রদর্শন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে মৃতদেহের অবমাননার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেদিন সলিমুল্লাহ খান বলেছিলেন, “আমরা যে জিনিসটাকে ফ্যাসিজম বলি সেটার একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সে শুধু জীবিতকে অসম্মান করে না, সে মৃতকেও অসম্মান করে।”
তার ভাষায়, “যখন একজন মানুষ প্রাণ ত্যাগ করে, তার দেহ পড়ে থাকে—তাকে উপযুক্ত সম্মানের সাথে সৎকারের করার পথেও যারা বাধা দেয়, তাদের তো মানুষ বলতে কষ্ট হয়, তাই না? এটাকে বলে ‘ইনহিউম্যান অ্যান্ড ডিগ্রেডিং’।
১৯৮৪ সনে জাতিসংঘ একটা কনভেনশন গ্রহণ করেছে, যেটা ‘এগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড ক্রুয়েলটি অ্যান্ড ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট’।” উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “মৃতদেহকে লাথি মারা, এটা চরম অশ্রদ্ধা। গোটা মানবজাতির প্রতি। মানে মানুষ, মানুষ হয়েছে তার একটা প্রমাণ—সে মৃতকে সৎকার করে।”
ইসলামী ধর্মতত্ত্বের বিচারে মৃতদেহের দ্রুত ও সম্মانه সাথে সৎকার করা কোনো একক পরিবারের কাজ নয়; সামষ্টিক সামাজিক দায়িত্ব।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী, এটা ‘ফরজে কিফায়’, অর্থাৎ সমাজের একাংশ যদি মৃত ব্যক্তির জানাজা ও দাফন সম্পন্ন করে, তবে পুরো সমাজ দায়মুক্ত হয়।
কিন্তু যদি রাজনৈতিক ভীতি বা গোষ্ঠীগত শত্রুতার কারণে একজন মৃত মানুষের সৎকার বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং সমাজ সেখানে নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে “সেই সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি নৈতিকভাবে অপরাধী” হবেন, বলেছিলেন সলিমুল্লাহ খান।
একই আলোচনায় সলিমুল্লাহ খান বলেন, “পৃথিবীর ইতিহাসে বহু জায়গায় দেখা যায়, জার্মানদের সাথে ফরাসিদের বহু যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তাদের এখানে দেখা যায় ‘ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট’-এর কোনো ব্যাপক উদাহরণ নাই। কিন্তু যখনই উপনিবেশ—কী আলজেরিয়ায়, কী বাংলাদেশে পাকিস্তানি ব্যবহার—তখন দেখা যায় কী, তারা মৃতদেহের ওপর অবমাননা করেছে এবং তারা নারী ধর্ষণ করেছে।”
অধ্যাপক সলিমুল্লাহ মনে করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালের আমাদের মুক্তি সংগ্রামের মূল ভিত্তি ছিল তিনটি প্রধান স্তম্ভ—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার। এটা বিবেচনায় রাখলে স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো নাগরিক, তিনি রাজনৈতিকভাবে যত বিতর্কিতই হন না কেন, তার মৃতদেহের অবমাননা করা কিংবা পরিবারকে দাফনে বাধা দেওয়া মুক্তিযুদ্ধের এই তিন মূল স্তম্ভের সাথেই এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
যদিও বাংলাদেশে মৃত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মৃতদেহের অবমাননা, জানাজা নিয়ন্ত্রণ এবং দাফন প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতি নয়। দক্ষিণ এশিয়ার এই ভূখণ্ডে ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মরণোত্তর পর্যায়েও নিশ্চিহ্ন ও অমানবিকীকরণের যে চর্চা গড়ে উঠেছে, তা একটি দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক চক্রের রূপ নিয়েছে।
২০২৬ সালের শেষ সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহে এটা অন্তত স্পষ্ট, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বও পুরোনো প্রতিশোধের বৃত্তেই বন্দি হয়ে আছে। প্রতিপক্ষকে মতাদর্শিকভাবে পরাজিত করাই এখানে শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পর তার মৃতদেহের অবমাননা ও শেষকৃত্যের অধিকার হরণও রাজনীতির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। যে জামায়াত এতদিন লাশের রাজনীতির আর অবমানার ভিকটিম ছিল, বৃত্ত পূরণ করে যেন তারাই চলে এসে টেবিলের উল্টো পাশে। ভিকটিম যেন পরিণত শিকারীতে। সলিমুল্লাহ খানের ভাষায় ‘প্রায়শ্চিত্ত’ চলমান রয়েছে এক অচ্ছেদ্য চক্রের মত।