উক্রেইনে বাংলাদেশি যুদ্ধবন্দিদের কি ফিরিয়ে আনা সম্ভব

প্রলোভন ও প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ অন্তত ২৯টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ নিয়ে তদন্ত করেছে জাতিসংঘ। ইউএন হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের ইউক্রেন বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এ নিয়ে জাতিসংঘে রিপোর্ট দাখিল করেছে। কমিশনের কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ভারতের আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার। আলাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। আলাপে উঠে এসেছে মানব পাচারের ধরন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ভূমিকা, দাপ্তরিক প্রমাণের সত্যতা, আন্তর্জাতিক আইন, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ এবং উক্রেইনে বন্দি থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার বিষয়।

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

আলাপ: শুরুতেই জানতে চাইব, আপনাদের কমিশন কীভাবে এই মানবপাচার নেটওয়ার্ক নিশ্চিত বা যাচাই করেছে? আপনারা কি কেবল ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, নাকি বিভিন্ন চুক্তিপত্র ও ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণও বিশ্লেষণ করেছেন।

বৃন্দা গ্রোভার: জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সম্প্রতি আমরা যে রিপোর্টটি উপস্থাপন করেছি, সেখানে মূলত প্রলোভন, প্রতারণা ও জোরজবরদস্তির মাধ্যমে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ২৯টি দেশের নাগরিক এতে আটকা পড়েছেন।

প্রথমত, আমরা ২৪৫ জনের সাক্ষাৎকার ও সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করেছি। এর মধ্যে আছেন উক্রেইনীয় কর্তৃপক্ষ, যেসব দেশ থেকে এসব নাগরিক গেছেন সেই সব দেশের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, কোনোমতে ফিরে আসতে পেরেছেন এমন কিছু রিক্রুট বা সদস্য, তাদের পরিবার, আইনজীবী, সাংবাদিক।

তবে শুধু মৌখিক সাক্ষ্য নয়, এখানে নথিপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আমরা চাকরির ভুয়া ইনভাইটেশন লেটার, ভ্রমণের বিস্তারিত তথ্য, বিমানের টিকিট, রাশিয়ান ফেডারেশনের ইস্যু করা ভিসা, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারি বক্তব্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চুক্তিপত্র ও দাপ্তরিক নথি পরীক্ষা করেছি। এসব নথি নিশ্চিত করে যে ওই ব্যক্তিরা রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতেই কর্মরত ছিলেন।

কমিশনের পক্ষ থেকে আমরা ২৯টি দেশে ৬৯টি চিঠি পাঠিয়েছিলাম, যেখান থেকে প্রতারণা বা বলপ্রয়োগ করে মানুষ নেওয়া হয়েছে।

আপনারা মাত্র ৬টি দেশ থেকে সাড়া পেয়েছেন।

হ্যাঁ, মাত্র ৬টি দেশ। তবে এটি একটি চলমান তদন্ত, আরও তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে আমরা অনুসন্ধানের কলেবর বাড়াবো।

আপনাদের রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকরা রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন। আপনারা একে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধও বলছেন। এজন্য আপনাদের কমিশন কি রাশিয়ান ফেডারেশনকে সরাসরি দায়ী বা জবাবদিহির আওতায় আনার মতো প্রমাণ পেয়েছে?

প্রমাণের ভিত্তিতে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো, রিক্রুটিং এজেন্ট-এজেন্সি এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে স্পষ্ট সমন্বয় ছিল। যেকোনো দেশে প্রবেশ করতে ভিসার প্রয়োজন হয়। এখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের দলগুলোর জন্য ভিসার ব্যবস্থা করা হয়েছে, টিকিট কাটা হয়েছে এবং প্রায়ই এজেন্সির লোকেরা তাদের সাথে ভ্রমণও করেছে।

যখন তারা রাশিয়ায় পৌঁছায়, সেখানে আলাদা এজেন্টরা বিমানবন্দরে তাদের রিসিভ করে। এরপর সরাসরি রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়ে গিয়ে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করায়। এই চুক্তিগুলো পুরোপুরি রুশ ভাষায় লেখা থাকে। তাই বিদেশ থেকে আসা সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারে না তারা কিসে সই করছে। এরপর তাদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সরাসরি ফ্রন্টলাইনে পাঠিয়ে বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ করে কার্যত শোষণ করা হয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশে রিক্রুট করার প্রাথমিক কাজ যে এজেন্ট করেছে, রাশিয়ার পৌঁছানোর পর সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার কাজেও সেই একই এজেন্ট জড়িত ছিল। এটি রাশিয়ান ফেডারেশনের সাথে সরাসরি সমন্বয় ও সংযোগ স্পষ্ট প্রমাণ করে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল যেমন ইউক্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিল গঠন করছে, ঠিক তেমনি এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি নাগরিকদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলাপ হওয়া উচিত।

এই পুরো চক্রে তিনটি ভৌগোলিক অবস্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উৎস দেশ বা সোর্স কান্ট্রি, বাহরাইন বা কুয়েতের মতো ট্রানজিট কান্ট্রি এবং ডেস্টিনেশন কান্ট্রি রাশিয়া। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিস্থিতির জন্য কোন দেশের দায় সবচেয়ে বেশি?

আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে, যা আমাদের কমিশনের প্রধান ভিত্তি, আমরা এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছি যে এটি পরিষ্কারভাবে 'মানবপাচার' বা 'ট্রাফিকিং ইন পারসন’-এর চরম লঙ্ঘন।

পাচারের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও হস্তান্তরপ্রক্রিয়া থাকে। এখানে এজেন্টরা বিভিন্ন দেশের হতে পারে, কিন্তু পাচারের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী বা তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য সদস্য সংগ্রহ করা। মানুষের অর্থনৈতিক দুর্বলতা, দারিদ্র্য ও বেকারত্বকে পুঁজি করে তাদের লোভ দেখানো হয়েছে। তবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বেসামরিক কাজের, যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনের নয়।

যেহেতু রাশিয়াতে পৌঁছানোর পর তারা সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাই এই পাচারের জন্য রাশিয়ান ফেডারেশন সরাসরি দায়ী। তবে ট্রানজিট ও উৎস দেশগুলোরও নিজস্ব নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার দায় রয়েছে। কোন রুট দিয়ে মানবপাচার হচ্ছে জানলে তা প্রতিরোধ করা ওই দেশের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। কিন্তু মূল দায় রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের, যারা জেনেশুনে ফ্রন্টলাইনে উক্রেইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মানুষকে পাচার করছে।

অনেকে বাংলাদেশ থেকে বৈধ ট্যুরিস্ট বা বিজনেস ভিসায় রাশিয়ায় যাচ্ছেন। বৈধ ভিসা থাকলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পক্ষেও তো সন্দেহ করা কঠিন। বাংলাদেশ বা সোর্স কান্ট্রিগুলোর নজরদারির কোন জায়গাগুলোতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে?

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনি বা প্রশাসনিক কাঠামোর নির্দিষ্ট দুর্বলতা নিয়ে বিস্তারিত বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ সেটি আমাদের কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত যে, এখন একটি স্পষ্ট ধরন সামনে এসেছে। মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বেসামরিক চাকরির কথা বলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত এজেন্টদের অবশ্যই কোনো না কোনো আইনি অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন আছে। বাংলাদেশ সরকারকে এখন এই এজেন্টদের কড়া নজরদারিতে আনতে হবে। তদন্ত করে যদি দেখা যায় তারা মানবপাচারের সাথে জড়িত, তবে দেশীয় আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের অনুমোদন বাতিল বা লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অভিবাসন বিভাগ এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মানুষকে বুঝতে হবে যে, বাইরে থেকে এই চাকরিগুলো যতটা আকর্ষণীয় মনে হয়, আদতে তা নয়। প্রশিক্ষিত সেনা না হয়ে উক্রেইন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার পরিণতি ভয়াবহ, সেখানে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তাই অভ্যন্তরীণভাবে মানবপাচারকারী এজেন্টদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন চালাতে হবে এবং বাংলাদেশ চাইলে ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাসের সাথেও বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা তুলতে পারে।

এটি একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। কেবল বাংলাদেশের পক্ষে কি এককভাবে এটি সমাধান সম্ভব, নাকি আন্তর্জাতিক কোনো আইন বা প্রক্রিয়া আছে যার মাধ্যমে একটি সমন্বিত সমাধান নিশ্চিত করা যায়?

এটা সত্য যে এই পুরো প্রক্রিয়াটির সাথে একাধিক দেশ জড়িত। মানবপাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সনদ এবং ২০০০ সালের পালারমো প্রোটোকল আছে। শ্রম শোষণ, যৌন শোষণ বা দাসত্বের জন্য মানবপাচার নতুন কিছু নয় এবং এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় আইন আছে।

এখন আমরা যা দেখছি তা হলো সামরিক বাহিনীতে যুদ্ধ করার জন্য প্রতারণামূলক রিক্রুটমেন্ট। এই মানবপাচারের আইনটির সাথে পরবর্তীতে তৃতীয় জেনেভা কনভেনশনও যোগ হয়। কারণ এদের অনেকে যদি বন্দি হন তবে তারা 'যুদ্ধবন্দি' বা প্রিজনারস অব ওয়ারের মর্যাদা পান।

আপনাদের তদন্তে কি মস্কো কোন জবাব দিয়েছে? যেহেতু আপনারা সরাসরি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে দায়ী করছেন, কমিশন কি তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ করেছে?

নিয়ম অনুযায়ী আমরা সবসময় রাশিয়া ও উক্রেইন, দুই পক্ষকেই প্রশ্ন পাঠাই এবং রিপোর্টের অগ্রিম কপিও দিই। দুঃখের বিষয় হলো, রাশিয়ান ফেডারেশন কমিশনের সাথে কোনো যোগাযোগ করতে বা কমিশনকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। এতে তারা নিজেরাই নিজেদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তবে আমাদের কাছে এমন সব নথি রয়েছে যা স্পষ্ট দেখায় যে চুক্তিগুলো সরাসরি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সাধারণত যুদ্ধবন্দিকে আটক হওয়ার স্থান বা যে দেশের বাহিনীর হয়ে লড়েছেন সেখানেই ফেরত পাঠানোর নিয়ম। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি আলাদা ও বেশ জটিল। কারণ, এই ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে যাননি। তারা প্রতারণা ও বলপ্রয়োগের শিকার হয়ে সেখানে পৌঁছেছেন।

আন্তর্জাতিক এমন কোনো বাধ্যবাধকতা বা আইনি উপায় কি নেই যার মাধ্যমে রাশিয়াকে জবাবদিহির জন্য বাধ্য করা যায়?

এই তদন্ত কমিশনটি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের একটি অনুসন্ধানী সংস্থা। আমাদের কাজ হচ্ছে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা, ঘটনা সত্যতা যাচাই করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা।

আমাদের প্রস্তুত করা এই তথ্যপ্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কিংবা কোনো দেশের জাতীয় বিচার ব্যবস্থা যেখানে সার্বজনীন এখতিয়ার আছে, তারা ব্যবহার করতে পারে অপরাধীদের বিচারের জন্য। আমাদের কাজ হলো অপরাধ শনাক্ত করা ও অপরাধীদের চিহ্নিত করা। আর রাশিয়াকে কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যান্য কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। এছাড়া ভবিষ্যতে যদি কোনো শান্তি আলোচনা বা 'পিস প্রসেস' শুরু হয়, তবে ভুক্তভোগীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি অবশ্যই সেই আলোচনার মূল শর্ত হওয়া উচিত।

কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো শান্তি আলোচনা টেবিল বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়, আর ফ্রন্টলাইনে মানুষ মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে ফিরিয়ে আনতে কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া বা আন্তর্জাতিক উপায় আছে?

যেসব বাংলাদেশি নাগরিক বর্তমানে উক্রেইনের হেফাজতে যুদ্ধবন্দি হিসাবে আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকার সরাসরি উক্রেইনীয় কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও তৃতীয় জেনেভা কনভেনশনের অধীনে যুদ্ধবন্দিরা পূর্ণ সুরক্ষা পান এবং নিজ রাষ্ট্র উদ্যোগ নিলে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই আন্তর্জাতিক আইনি সুযোগটি বাংলাদেশ বা অন্যান্য ভুক্তভোগী দেশের ব্যবহার করা উচিত।

একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। সাধারণ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধবন্দিকে সেই দেশেই ফেরত পাঠাতে হয় যে দেশের পক্ষ হয়ে সে লড়েছে। যেহেতু তারা রাশিয়ার ভূখণ্ড থেকে আটক হয়েছেন, সাধারণ নিয়মে তো তাদের রাশিয়ায় পাঠানোর কথা। সেই জায়গা থেকে উক্রেইন থেকে সরাসরি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা কি আইনিভাবে সম্ভব?

হ্যাঁ, সাধারণত যুদ্ধবন্দিকে আটক হওয়ার স্থান বা যে দেশের বাহিনীর হয়ে লড়েছেন সেখানেই ফেরত পাঠানোর নিয়ম। কিন্তু এখানে পরিস্থিতি আলাদা ও বেশ জটিল। কারণ, এই ব্যক্তিরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে যাননি। তারা প্রতারণা ও বলপ্রয়োগের শিকার হয়ে সেখানে পৌঁছেছেন।

আন্তর্জাতিক আইনে ননরিফাউলমেন্ট বা অপ্রত্যর্পণ নীতি আছে। যার অর্থ কোনো ব্যক্তিকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তার জীবন বা স্বাধীনতার ঝুঁকি আছে। যেমন মৃত্যুদণ্ড বা শাস্তির আশঙ্কা আছে। যেহেতু এখানে মানবপাচার ঘটেছে, তাই প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে বিশেষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। উক্রেইনীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশে ফেরানোর পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব।

তদন্তে যেসব ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, এমন কাউকে কি পেয়েছেন যারা কেবল বিপুল অর্থের প্রলোভন দেখে জেনেশুনে এই আর্থিক ঝুঁকিটি নিয়েছিলেন? আমি উক্রেইনের বন্দিশিবিরে কিছু বাংলাদেশি যুদ্ধবন্দির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় দুজনের কাছে শুনেছি, তারা বাংলাদেশে ফিরতে চান না, বরং রাশিয়াতেই ফেরত গিয়ে প্রতিশ্রুত বেতন মাসে ২ লাখ টাকা ও ২০ লাখ রুবল আদায় করতে চান। একে কি কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লোভ বা ঝুঁকি নেওয়া বলা যায়?

আমি এটিকে 'লোভ' বলব না। আপনি আমার চেয়েও ভালো জানেন যে, কাজের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ বিদেশে যান। বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের স্থানীয় পরিস্থিতির কারণেই মানুষ একটু ভালো উপার্জনের আশায় বাইরে যায়। ভালো কাজের সুযোগ এবং ভালো উপার্জনের আশা থাকাটা মানুষের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা।

তারা যদি বলেন যে রাশিয়ায় ফিরে টাকা ফেরত পেতে চান, তার কারণ হলো তারা চরম প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বেসামরিক কাজের কথা বলেই তাদের নেওয়া হয়েছিল। তারা কখনোই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে চুক্তিতে সই করেননি। প্রশিক্ষণ ছাড়া যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার মানে হলো, হয় খুব দ্রুত মৃত্যু, নয়তো বন্দি হওয়া অথবা গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করা। কেউ জেনে বুঝে এমন মৃত্যুর মুখে পা দেয় না। ভালো উপার্জনের চেষ্টা কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু চাকরি দেওয়ার নামে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়া চরম অপরাধ।

রাশিয়ার এত বড় সামরিক বাহিনী থাকা সত্ত্বেও কেন বিদেশি নাগরিকদের এভাবে তাদের সামরিক বাহিনীতে ফাঁদ ফেলে নিয়োগ করতে হচ্ছে?

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এই যুদ্ধ চলছে এবং এটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যেকোনো দেশের জন্যই এত দীর্ঘ সময় ধরে বারবার নিজস্ব জনসংখ্যাকে সামরিক বাহিনীতে সচল রাখা এবং বিপুল পরিমাণ সৈন্যের যোগান দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই যে বিদেশি নাগরিকদের আনা হচ্ছে, তাদের মূলত 'ক্যানন ফডার' বা যুদ্ধে বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বে মানবপাচারকে যুদ্ধের অস্ত্র বা সৈন্য সংগ্রহের উপায় হিসেবে ব্যবহার করার এই নজির অতীতে বিরল। এই যুদ্ধ শুধু উক্রেইন বা রাশিয়ার ওপর নয়, বিশ্বজুড়ে প্রভাব ফেলছে।

হাজার মাইল দূরে যুদ্ধে সন্তান বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে বাংলাদেশে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারের কি আন্তর্জাতিক কোনো আইনে বিচার বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ আছে?

হ্যাঁ, বিভিন্ন দেশের কিছু পরিবার ইতিমধ্যে আইনি উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। শুধু মানবপাচারকারী এজেন্টের বিচারের জন্য নয়, ক্ষতিপূরণের জন্যও। এখানে দায় দুই পক্ষেরই। দেশীয় রিক্রুটিং এজেন্ট এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, যারা এসব অবৈধ চুক্তিতে সই করেছে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল যেমন উক্রেইনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিল গঠন করছে, ঠিক তেমনি এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশি নাগরিকদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলাপ হওয়া উচিত। এই পরিবারগুলোকে আর্থিক ও আইনি ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করার জন্য রাশিয়ার ওপর কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে যে, কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় উক্রেইনীয় বাহিনীতেও যোগ দিয়েছেন, এটি কি সত্য?

যারা স্বেচ্ছায় বা ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, আমাদের কমিশন সেই বিষয় নিয়ে তদন্ত করেনি। আমাদের কাজের মূল মনোযোগ ছিল কেবল যারা প্রতারণা ও বলপ্রয়োগের শিকার হয়ে পাচার হয়েছেন তাদের ওপর।

 বিশ্বজুড়ে যখন প্রতিনিয়ত নানা যুদ্ধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, সেখানে মানবাধিকার সংস্থা ও কর্মীদের এই উদ্যোগগুলো কি আসলেই বাস্তবে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে? আপনার কি বিশ্বাস হয় যে একদিন পৃথিবী সম্পূর্ণ যুদ্ধ ও অপরাধমুক্ত হবে?

সভ্যতা মূলত আশা ও স্বপ্নের ওপর ভর করেই টিকে থাকে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে আমরা প্রচুর সহিংসতা ও অপরাধ দেখছি। তবে অপরাধীদের বিচারে বিচারিক এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তায় বিচারবহির্ভূত, দুই দিকই আমাদের শক্তিশালী করতে হবে। এই বর্তমান ব্যবস্থাগুলোই আমাদের হাতিয়ার এবং মানুষের যৌথ প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।