সন ১৩২৭ খ্রিষ্টাব্দ। সুলতান তুঘলক এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিলেন। দিল্লি থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের দৌলতাবাদে সরিয়ে নেবেন রাজধানী। শুধু রাজদরবার নয়, রাজধানীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধিবাসীকেও যেতে হবে সেখানে। সাতশ বছর পর বাংলাদেশের গাজীপুরে একটি পরিবহন প্রকল্পের পরিণতি দেখে তুঘলকের কথা আবারও মনে পড়ছে।
তন্ময় ইমরান
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএমআপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
এ যেন এক ‘তুঘলকি কাণ্ড’! হঠকারী সিদ্ধান্তে বিরাট অথচ ফলাফলবিহীন কর্মকাণ্ডকে আমরা এভাবে ব্যাখ্যা করি। আমরা অনেকেই জানি, দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কর্মকাণ্ড থেকেই এ প্রবাদের উৎপত্তি।
১৩২৭ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান তুঘলক এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিলেন। দিল্লি থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের দৌলতাবাদে সরিয়ে নেবেন রাজধানী। শুধু রাজদরবার নয়, রাজধানীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধিবাসীকেও যেতে হবে সেখানে। সুলতানের যুক্তি ছিলো, দৌলতাবাদ তার সাম্রাজ্যের তুলনামূলক কেন্দ্রে অবস্থিত। দক্ষিণ ভারতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে।
কিন্তু শাসকের কাছে মানচিত্রে যা সুবিধাজনক মনে হয়েছিলো, সাধারণ মানুষের কাছে তা হয়ে উঠেছিলো দুর্ভোগের কারণ।
সমসাময়িক ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি এবং কবি ইসামির বিবরণে রাজধানী স্থানান্তরের কারণে মানুষের দুর্দশার কথা পাওয়া যায়। বিশেষ করে ইসামির বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও দিল্লি থেকে দাক্ষিণাত্যে যাত্রা করেছিলেন। সেই যাত্রাপথে তার দাদার মৃত্যু হয়েছিলো বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তুঘলক আবার দিল্লিকে রাজধানীর কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু তত দিনে মানুষের জীবনে যা ঘটে গেছে, তা আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিলো না।
সাতশ বছর পর বাংলাদেশের গাজীপুরে একটি পরিবহন প্রকল্পের পরিণতি দেখে তুঘলকের কথা আবারও মনে পড়ছে।
এখানে রাজধানী না বদলানো হলেও বদলে ফেলা হচ্ছে একটি সড়কের উদ্দেশ্য।
যে সড়কে দ্রুতগতির বিশেষ বাস চালানোর জন্য চৌদ্দ বছর ধরে নির্মাণকাজ চললো, সেই সড়কেই এখন আর বিআরটি বাস চালানো হবে না। বরং বিআরটির জন্য নির্মিত স্টেশন ও বিভাজক সরিয়ে সাধারণ ছয় লেনের সড়ক তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ পরিকল্পিত বিআরটি সেবায় একটি নতুন বাসও যাত্রী বহন শুরু করতে পারেনি।
প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি প্রকল্প বাতিল করা কি ভুল সিদ্ধান্ত? নাকি প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার মধ্যেই ছিলো ভুল? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই চৌদ্দ বছরের দুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের দায় কে নেবে?
পরিকল্পনার ইতিহাস আসলে তিন দশক পুরানো
গাজীপুরের বিআরটিকে বুঝতে হলে আমাদের অন্তত তিন দশক পেছনে যেতে হবে।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে পরিচালিত ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডি বা ডিআইটিএস ছিলো রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত গবেষণা। এর ধারাবাহিকতায় আসে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিলো সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো।
কিন্তু ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার মৌলিক সংকট থেকে যায়।
২০০৩ সালে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং নিয়ে গবেষণা হয়। ২০০৫ সালে প্রণীত হয় স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি। ২০০৮ সালে সরকার এটি অনুমোদন করে। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনায় ঢাকার জন্য বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি এবং ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট বা এমআরটির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিলো।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক আদিল মুহাম্মদ খান ও অধ্যাপক ড. মো. আক্তার মাহমুদ তাদের ‘ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং অব ঢাকা সিটি: সাম কনটেমপোরারি অবসারভেশনস’ গবেষণায় ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনার এই দীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষণাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। পুরোনো এসটিপি জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার চলাচলরত যানবাহনের মাত্র সাড়ে ১১ শতাংশ ছিলো বাস। অথচ যাত্রী পরিবহনের প্রায় ৭৭ শতাংশই সম্পন্ন হতো বাসে। যদিও এটি বর্তমান ঢাকার পরিসংখ্যান নয়। কিন্তু পরিবহন পরিকল্পনার মৌলিক একটি সত্য বোঝার জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সড়কে কত গাড়ি চলতে পারে, আর সেই গাড়িগুলো কত মানুষ পরিবহন করতে পারে, দুটি এক বিষয় নয়।
একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে একজন কিংবা দুজন মানুষ থাকতে পারেন। একই পরিমাণ সড়ক ব্যবহার করে বড় একটি বাস কয়েক ডজন মানুষ পরিবহন করতে পারে। ফলে সড়ক বাড়ানো এবং পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো সব সময় একই ফল দেয় না।
এসটিপির বিভিন্ন বিকল্প পরিকল্পনার মূল্যায়নেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিলো।
গবেষণায় পুনরুৎপাদিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিআরটিনির্ভর অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ের দুটি কৌশল প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিআরটি ও মেট্রোরেলের সমন্বিত একটি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। গবেষকেরা সেই সিদ্ধান্তের ব্যয় ও যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অর্থাৎ শুরু থেকেই ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় একটি দ্বন্দ্ব ছিলো। সীমিত সম্পদ দিয়ে বেশি মানুষকে পরিবহনের ব্যবস্থা গড়া হবে, নাকি বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে যানজট কমানোর চেষ্টা করা হবে?
গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প সেই দীর্ঘ পরিকল্পনার ইতিহাসেরই একটি অংশ।
শুরুতেই নকশা নিয়ে দ্বিধা
গাজীপুর–বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের ইতিহাসে ফিরে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় নজরে আসে। প্রকল্পের একেবারে শুরুতে বাস চলাচলের লেন কোথায় হবে, তা নিয়েই বিশেষজ্ঞদের মতভেদ ছিলো।
২০১২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তৎকালীন যোগাযোগসচিব এম এ এন সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, দুটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। বিআরটি বাস রাস্তার মাঝখানের দ্রুতগতির লেন দিয়ে চলবে, নাকি পাশের ধীরগতির লেন দিয়ে চলবে?
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মাঝের দ্রুতগতির লেন ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য বিশেষজ্ঞদের আপত্তিও ছিলো। বিশেষ করে বাস স্টেশনে থামা এবং অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে চলাচলের সমন্বয় নিয়ে উদ্বেগ উঠেছিলো।
তৎকালীন যোগাযোগসচিব জানিয়েছিলেন, পরীক্ষামূলক যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের শুরুতেই এমন দ্বিধা ছিলো, অথচ শেষ পর্যন্ত রাস্তার মাঝখানে বিআরটির জন্য বিশেষ লেন ও স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, প্রাথমিক আপত্তিগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিলো? কোন পরীক্ষার ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো?
২০১২ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ডিসেম্বরে এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তিও হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিলো প্রায় ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। অর্থাৎ ২০১৭ সাল থেকেই যাত্রীরা এই বিশেষ বাসব্যবস্থার সুবিধা পেতে পারতেন। বাস্তবে তা হয়নি।
ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ নকশায় পরিবর্তন, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তর, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা, ঠিকাদারি কাজের বিলম্ব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পটি আটকে যায়। বাড়তে থাকে ব্যয়। একের পর এক পিছিয়ে যায় নির্মাণ শেষ করার সময়।
২০১৮ সালের দিকে বড় আকারের জোড়া বাস চালানোর পরিকল্পনা সামনে আসে। পরে সিদ্ধান্ত হয় ইলেকট্রিক বাস কেনার। ২০২২ সালে ১৩০টি ইলেকট্রিক বাস সংগ্রহের উদ্যোগের কথা জানা যায়। এরপর আবার সিদ্ধান্ত বদলে ১৩৭টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ডিজেল বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়।
সেই বাসও কেনা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কয়েকটি উড়ালপথ ও সড়ক সাধারণ যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ডিসেম্বর থেকে বিআরটিসির ১০টি পুরোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস দিয়ে অস্থায়ী সেবা চালু হয়। কিন্তু প্রকল্পের পরিকল্পিত পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয়নি।
২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব আসে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
এরপর প্রকল্পটি পর্যালোচনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ দল।
তারা বিআরটির নকশা, সড়কের প্রস্থ, যানবাহনের ধরন, স্টেশন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জটিলতা নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানান। বিআরটি হিসেবে প্রকল্পটি চালু না করার সুপারিশও করেন।
অবশেষে ২০২৬ সালের অক্টোবরে সরকারের মন্ত্রীসভা বিআরটির পরিবর্তে সাধারণ ছয় লেনের সড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ফলে চৌদ্দ বছরের নির্মাণযজ্ঞ এভাবেই নতুন এক নির্মাণপর্বের সামনে এসে দাঁড়াল।
বিআরটি ও এমআরটি’র পার্থক্য
বিআরটি বা বাস র্যাপিড ট্রানজিট শুনে অনেকের মনে হতে পারে, এটি বিশেষ ধরনের কোনো বাস।
আসলে বিআরটি একটি পরিবহনব্যবস্থা।
এখানে বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন থাকে। নির্ধারিত স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা করেন। সাধারণ বাসের মতো যেখানে-সেখানে দাঁড়াতে হয় না। টিকিট সংগ্রহ, যাত্রী ওঠানামা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়।
বাসটি ডিজেলে চলতে পারে, বিদ্যুতেও চলতে পারে। মেট্রোরেলের মতো রেললাইনে কিংবা মাথার ওপর বিদ্যুতের তারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলার বাধ্যবাধকতা নেই।
অন্যদিকে মেট্রোরেল চলে রেললাইনে। ঢাকার মেট্রোরেল বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিচালিত হয়। এর স্টেশন, রেলপথ, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বিআরটি থেকে আলাদা।
বিআরটির বড় সুবিধা হলো, রেলভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা সম্ভব। পুরোনো একটি পরিবহন গবেষণায় ঢাকার জন্য প্রতি কিলোমিটার বিআরটি নির্মাণব্যয় প্রায় ৫০ লাখ ডলার এবং মেট্রোরেল নির্মাণব্যয় ৫ থেকে সাড়ে ৭ কোটি ডলার পর্যন্ত ধরা হয়েছিলো।
অবশ্য এগুলো পুরোনো পরিকল্পনার ব্যয়প্রাক্কলন, আজকের বাস্তব নির্মাণব্যয় নয়। উড়ালপথ, স্টেশন, জমি ও অন্যান্য অবকাঠামো যুক্ত হলে বিআরটির খরচও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে গাজীপুর প্রকল্পের আগে কোথাও পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয়নি। আর এই প্রকল্প বাতিলের ফলে দেশের প্রথম বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও আপাতত শেষ হয়ে গেল।
গাজীপুরের মানুষ কী পেত?
গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি করিডরের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ২০ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ১২ দশমিক ৭৪ মাইল। এর মধ্যে টঙ্গী এলাকায় প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার উড়াল অংশ রয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগার কথা ছিলো প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ মিনিট। নির্ধারিত সময়সূচিতে বড় বাস চলার কথা ছিলো। যাত্রীচাহিদার পূর্বাভাসে দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার থেকে ৩ লাখ যাত্রী পরিবহনের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।
তবে এই সংখ্যা নিশ্চিত যাত্রীর হিসাব নয়। এগুলো প্রকল্প চালু হলে কত মানুষ সেবা নিতে পারেন, তার পূর্বাভাস।
এই সড়কের গুরুত্ব বুঝতে হলে গাজীপুরের অর্থনীতির কথাও ভাবতে হবে।
গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। অসংখ্য পোশাক কারখানা, অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শ্রমজীবী মানুষের আবাস এবং ঢাকার সঙ্গে প্রতিদিনের যাতায়াত এই করিডরকে ব্যস্ত রাখে।
একজন শ্রমিক বা কর্মজীবী মানুষ যদি প্রতিদিন যাতায়াতে আধা ঘণ্টা সময় বাঁচাতে পারেন, বছরে ৩০০ কর্মদিবস হিসাবে তার সাশ্রয় হবে ১৫০ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রায় ছয় দিন ছয় ঘণ্টা।
এটি কেবল একটি উদাহরণ। সবাই একই পরিমাণ সময় বাঁচাতেন, এমন নয়।
কিন্তু হাজার হাজার মানুষের ক্ষেত্রে সময় সাশ্রয়ের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কত বড় হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।
বিআরটি চালু হলে বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন থাকায় যাত্রার সময় কিছুটা নির্ভরযোগ্য হওয়ার কথা ছিলো। বিদ্যুৎচালিত বাস ব্যবহার করা গেলে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমার সম্ভাবনাও ছিলো। যদিও ইলেকট্রিক বাসের প্রাথমিক দাম এবং চার্জিং অবকাঠামোর ব্যয় বেশি।
সুতরাং বিআরটির সম্ভাব্য লাভ কেবল দ্রুত যাতায়াত নয়। এর সঙ্গে শ্রমঘণ্টা, যানবাহনের পরিচালনব্যয়, সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত সুবিধার প্রশ্নও জড়িত।
দশ বছরে কত টাকার সুফল হারালো মানুষ?
২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে এডিবির অর্থনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দেওয়া হয়।
সেখানে বলা হয়, বিআরটি নির্ধারিত সময়ে চালু হলে বিভিন্ন খাতে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেত। অন্যদিকে দীর্ঘ নির্মাণকাজে যান চলাচলের বিঘ্নজনিত বার্ষিক ব্যয় অনুমান করা হয়েছিলো আরও ১ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার।
দুই হিসাব মিলিয়ে প্রতিবেদনে বছরে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, তৎকালীন বিনিময় হারে প্রায় ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছিলো।
সংখ্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে সতর্কতা প্রয়োজন।
এই ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা সরকারের কোষাগার থেকে প্রতি বছর সরাসরি হারিয়ে যাওয়া নগদ অর্থ নয়। এটি অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, যেখানে সম্ভাব্য সময় সাশ্রয়, যানবাহনের ব্যয়, দুর্ঘটনা, পরিবেশ ও নির্মাণজনিত দুর্ভোগের হিসাব রয়েছে।
তবু বোঝার সুবিধার জন্য একটি তুলনা করা যেতে পারে।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় দশ বছর। প্রতি বছর একই পরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব ছিলো বলে ধরে নিলে দশ বছরে সম্ভাব্য প্রভাব দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
কিন্তু এটিকে প্রমাণিত ক্ষতি হিসেবে লেখা যাবে না। কারণ প্রতিবছর যাত্রীসংখ্যা, যানবাহনের চলাচল, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্মাণকাজের মাত্রা এক ছিলো না। ফলে সঠিক ক্ষতি নির্ধারণে বছরভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কার: কোনো পরিবহন প্রকল্পের ক্ষতি শুধু নির্মাণে খরচ হওয়া টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে সেবা সময়মতো চালু হওয়ার কথা ছিলো, সেটি না পাওয়ারও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।
প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?
গাজীপুর বিআরটির সর্বশেষ অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার কিছু বেশি।
এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়ন প্রায় ২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডির প্রায় ৯০৩ কোটি এবং বাংলাদেশ সরকারের অংশ প্রায় ১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পে ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
এই ব্যয়ের মধ্যে সরকারি উৎস থেকে প্রায় ৭৪৯ কোটি এবং বৈদেশিক প্রকল্প সহায়তা থেকে প্রায় ২ হাজার ৬২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই টাকার কতটা অপচয়?
পুরো অর্থই গচ্চা গেছে বলা ঠিক হবে না। কারণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত কিছু সড়ক, সেতু, উড়ালপথ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ফুটপাত নতুন সড়কেও কাজে লাগতে পারে।
অন্যদিকে বিআরটির জন্য বিশেষভাবে নির্মিত স্টেশন, বিভাজক এবং কিছু যাত্রীসেবা অবকাঠামো সরিয়ে ফেলতে হবে। এগুলোর নির্মাণব্যয়, অপসারণব্যয় এবং উদ্ধারযোগ্য সরঞ্জামের মূল্য আলাদাভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।
আরও একটি বিভ্রান্তি রয়েছে।
কেউ কেউ বলছেন, প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিলো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ অবকাঠামোগত কাজের প্রায় ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিলো। কিন্তু পুরো প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তব অগ্রগতি ছিলো ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থাৎ অবকাঠামো প্রায় শেষ হওয়া এবং যাত্রী পরিবহনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হওয়া এক কথা নয়।
কোনো বিমানবন্দরের ভবন তৈরি হয়ে গেলেও বিমান, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছাড়া যাত্রীসেবা চালু করা যায় না। বিআরটির ক্ষেত্রেও একইভাবে স্টেশন ও রাস্তা তৈরি হওয়া মানেই পূর্ণাঙ্গ পরিবহনব্যবস্থা চালু হওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া নয়।
ভুলটা কোথায় হয়েছিলো?
এই প্রশ্নে এসে বিআরটির পক্ষে-বিপক্ষে সহজ সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নে গুরুতর দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে।
গাজীপুর–বিমানবন্দর সড়ক কেবল স্থানীয় যাত্রীবাহী বাসের জন্য ব্যবহৃত হয় না। এই পথে আন্তঃনগর বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। উত্তরাঞ্চল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ।
এমন একটি সড়কের মাঝখানে বিশেষ বাসের জন্য লেন ও স্টেশন নির্মাণের ফলে সাধারণ যানবাহনের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
২০২৩ সালে এডিবির মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকটি বিআরটি স্টেশন এলাকায় সাধারণ যানবাহনের জন্য মাত্র চার মিটার, অর্থাৎ প্রায় ১৩ ফুট জায়গা রাখা হয়েছিলো।
একটি বড় বাসের প্রস্থই প্রায় আট থেকে সাড়ে আট ফুট। ফলে সেখানে একটি বাস দাঁড়িয়ে পড়লে পাশ দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশারও নিরাপদে অতিক্রম করার জায়গা থাকে না।
বাস্তবে ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এমন সমস্যার কথা উঠে এসেছিলো।
আরেকটি সমস্যা ছিলো বিআরটি বাসের গন্তব্য। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে যাত্রীদের অনেককেই অন্য পরিবহনে বদল করতে হতো। বিমানবন্দর থেকে ঢাকার দক্ষিণ দিকে বিআরটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কের সুবিধা পাওয়া যেত না।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা সড়কের প্রস্থ, যানবাহনের বৈচিত্র্য, স্টেশনের নকশা, পরিচালনা ও সমন্বয়ের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার বিআরটি হিসেবে প্রকল্পটি চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এখানে তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত, ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্পটি কেন বাতিল করা হলো নয়। বরং, এত বড় নকশাগত ত্রুটি ২০১২ সালে অনুমোদনের সময় অথবা নির্মাণের প্রথম দিকে কেন ধরা পড়লো না?
একটি প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হলো। কিন্তু তার মূল পরিবহন ধারণাটি কার্যকর কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া গেল চৌদ্দ বছর পর!
নেতৃত্ব বদলায়, ব্যবসার প্রশ্ন থাকে
বিআরটির আরেকটি দিক নিয়ে প্রকাশ্যে তুলনামূলক কম আলোচনা হয়েছে। সেটি হলো পরিবহন ব্যবসার কাঠামো।
গাজীপুর–বিমানবন্দর করিডরে আগে থেকেই বেসরকারি বাস চলাচল করে। বিভিন্ন কোম্পানি ও মালিকের বাস, রুট পারমিট, চালক, শ্রমিক এবং যাত্রী সংগ্রহের প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এই ব্যবসা।
পূর্ণাঙ্গ বিআরটি চালু হলে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার কথা।
কারণ বিআরটি কেবল নতুন কিছু বাস রাস্তায় নামানোর প্রকল্প নয়। নির্দিষ্ট লেনে, নির্দিষ্ট সময়সূচিতে, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় বাস চালানোর একটি পদ্ধতি।
এখানে প্রচলিত বাসগুলোর মতো যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো কিংবা একই রুটে একাধিক বাসের যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা থাকার কথা নয়।
ফলে বিদ্যমান বাসমালিকদের ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি বড় প্রশ্ন।
এডিবির প্রকল্পসংক্রান্ত নথিতে বেসরকারি বাস পরিচালকদের ক্ষতিপূরণ এবং পুরোনো বাস বাতিলের কর্মসূচির কথাও ছিলো। অর্থাৎ বিদ্যমান পরিবহন ব্যবসার ওপর বিআরটির সম্ভাব্য প্রভাব প্রকল্পের প্রথম পর্যায় থেকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিলো।
এই ব্যবসার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কও নতুন নয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন মসিউর রহমান রাঙ্গা এবং মহাসচিব হন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন আসে।
২০২৪ সালের অগাস্টে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ও রুটের নিয়ন্ত্রণ নতুন নেতৃত্বের হাতে চলে যায়। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আগের কমিটি বিলুপ্ত করে এম এ বাতেনের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে বিএনপি সমর্থক পরিবহন নেতাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং খন্দকার এনায়েত উল্লাহর মালিকানাধীন এনা পরিবহনের কিছু রুট ও কাউন্টার নিয়ে বিরোধের কথাও উঠে আসে। এনায়েত উল্লাহ নিজেও তার বাস চলাচলে বাধা পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।
অন্যদিকে গাবতলী এলাকায় প্রভাবশালী পরিবহন ব্যবসায়ী কফিল উদ্দিন আহমেদের নাম সামনে আসে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে তাকে বিএনপিপন্থি পরিবহন ব্যবসায়ী এবং হানিফ পরিবহনের মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি হন এম এ বাতেন এবং সাধারণ সম্পাদক হন সাইফুল আলম। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন কফিল উদ্দিন আহমেদ, মহাসচিব হন সাইফুল আলম।
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবহন খাতের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্তের সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে বিআরটি নিয়ে বেসরকারি মালিকদের আগ্রহের প্রমাণ রয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আজকের পত্রিকা জানায়, বিআরটির বিশেষ লেনে অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বাস চলাচল করছিলো। আরও কয়েকটি কোম্পানি সেখানে বাস নামাতে আগ্রহী ছিলো। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের তখন জানিয়েছিলেন, বাসমালিকেরা রুট পারমিটের জন্য আবেদন করছেন।
এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
২০এ নভেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ই নভেম্বর বাসমালিকদের জাতীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিআরটি কোম্পানির চেয়ারম্যানকে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো।
সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলমের সেই প্রস্তাবে বিআরটি করিডরে ১০০টি বাস চালানোর কথা ছিলো। এর মধ্যে ৫০টি এসি এবং ৫০টি নন-এসি বাস। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে মতিঝিল কিংবা ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালাতে চেয়েছিলেন তারা।
প্রস্তুতির জন্য চাওয়া হয়েছিলো ছয় মাস। প্রস্তাবে কাউন্টার ও ইলেকট্রনিক টিকেটিংয়ের কথাও ছিলো।
সাইফুল আলম জানিয়েছিলেন, আগ্রহী বেসরকারি বাস পরিচালকদের নিয়ে কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।
এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বেসরকারি বাস মালিকেরা বিআরটি করিডরে ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। তাদের আগ্রহ শুধু পুরোনো বাস চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বিশেষ করিডর ব্যবহারের সুযোগও তারা চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, তারা গাজীপুর থেকে শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত নয়, ঢাকার ভেতরে মতিঝিল কিংবা ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত সেবা চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অথচ মূল বিআরটির অন্যতম সমালোচনা ছিলো বিমানবন্দরে এসে যাত্রীদের অন্য পরিবহনে বদল করতে হবে।
এখানেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।
বেসরকারি বাসমালিকদের প্রস্তাবের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয়েছিলো কি? সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলে যাত্রীরা কী সুবিধা পেতেন? মূল বিআরটির স্টেশন ও নির্দিষ্ট লেন ব্যবহার করা সম্ভব হতো কি? নাকি এর ফলে বিশেষ বিআরটি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সাধারণ বাসসেবায় পরিণত হতো?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় সরকার কী কী বিকল্প বিবেচনা করেছিলো?
২০২৬ সালের অক্টোবরে সরকারের সামনে চারটি বিকল্প ছিলো। এর মধ্যে বিদ্যমান করিডরে বিশেষ বাস ও প্রচলিত বেসরকারি বাস চালানোর সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয় লেনের সাধারণ সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিবহন মালিক সমিতি এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে, বিরোধিতা করেছে, নাকি নিরপেক্ষ থেকেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো স্পষ্ট নয়।
তাই পরিবহন মালিকদের লাভের জন্য বিআরটি বাতিল হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু পরিবহন ব্যবসার স্বার্থ যে আলোচনার বাইরে নয়, সেটিও পরিষ্কার। কারণ বিআরটি থেকে সাধারণ সড়কে রূপান্তরের ফলে শুধু রাস্তার নকশাই বদলাচ্ছে না। বদলানোর কথা ছিলো যে পরিবহন পরিচালনাব্যবস্থা, সেটিও আর আসছে না।
এক বছরে বাস, নাকি আরও পাঁচ বছরের নির্মাণ?
২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বা বিআইপি বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে সীমিত বিআরটি সেবা চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলো।
তাদের মূল্যায়নে উন্নত বাস দিয়ে প্রাথমিক সেবা চালু করতে অতিরিক্ত প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা এবং ইলেকট্রিক বাসসহ ব্যবস্থা গড়তে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে প্রকল্প বাতিল করে ছয় লেনের সড়কে রূপান্তরের ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ বছর সময় এবং প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রাথমিক ধারণাও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
বিআইপির প্রস্তাব ছিলো সীমিত পরিবহনসেবা চালুর। অন্যদিকে ছয় লেনের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ সড়ক রূপান্তরের কথা। কাজের পরিধি এক নয়। চার-পাঁচ বছর এবং চার হাজার কোটি টাকা এখনো সরকারের অনুমোদিত নির্মাণসূচি ও পূর্ণাঙ্গ বাজেট নয়।
এই পার্থক্য মাথায় রেখেও প্রশ্ন থেকে যায়।
একটি বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে সীমিত যাত্রীসেবা চালুর সুযোগ থাকলে সেটি কেন গ্রহণযোগ্য হলো না? বুয়েটের নকশাগত আপত্তির কারণে কি তা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যেত? নাকি সীমিত সেবা চালু রেখে ধাপে ধাপে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিলো?
সরকারের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক কি না, তা মূল্যায়নের জন্য এই বিকল্পগুলোর ব্যয় ও সুফলের তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আরেকটি প্রশ্ন রয়েছে। ছয় লেনের নতুন সড়ক করতে যে অর্থ লাগবে, তা কি ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার অতিরিক্ত? নাকি প্রকল্পের কিছু বিদ্যমান সম্পদ ও অব্যবহৃত বরাদ্দ সমন্বয় করে নতুন মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হবে?
এই হিসাব স্পষ্ট না হলে ‘ছয় লেন করতে চার হাজার কোটি টাকা’ কথাটিও বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে।
ছয় লেনের নকশাতেও কি নতুন বিপদ?
ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু নতুন সড়কের পূর্ণাঙ্গ নকশা, ব্যয় ও নির্মাণসূচি এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রতিটি দিকে তিনটি করে লেন থাকার কথা। সাধারণ মহাসড়কের একটি লেন ১২ ফুট প্রশস্ত ধরলে ছয়টি লেনের জন্যই প্রয়োজন হবে ৭২ ফুট জায়গা। এর বাইরে লাগবে মাঝের বিভাজক, ফুটপাত, পানি নিষ্কাশন ও অন্যান্য অবকাঠামো। সব মিলিয়ে সড়কটি কত ফুট প্রশস্ত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এখানেও বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
ধরুন, ঢাকামুখী তিনটি লেনের একটিতে একটি বাস বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে ওই দিকের এক-তৃতীয়াংশ লেন অচল হয়ে যাবে। পেছনের গাড়িগুলো পাশের দুটি লেনে ঢোকার চেষ্টা করবে। অন্য লেনগুলো ব্যস্ত থাকলে তৈরি হবে যানজট।
আর যদি লেনগুলো সরু কংক্রিটের বিভাজক দিয়ে আলাদা রাখা হয়, তাহলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। বিকল বাসের পেছনে আটকে থাকা গাড়িগুলো পাশের লেনে সরতেও পারবে না। একইভাবে দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী যানবাহনের ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অবশ্য সব লেনের মাঝখানে এমন বিভাজক বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। প্রশ্নটি তাই নতুন নকশার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে।
বিকল বাস বা ট্রাক সরানোর জন্য রাস্তার পাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে কি? জরুরি যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা কী হবে? বাসগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য কোথায় দাঁড়াবে? বাসস্টপে থামলে পেছনের যানবাহন কোন লেন ব্যবহার করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ছয় লেনের সড়ক যানজট দূর করবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। কারণ সড়কের লেনসংখ্যা বাড়ানো আর সড়কের কার্যকর পরিবহনক্ষমতা বাড়ানো সব সময় এক কথা নয়।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন ওঠে। ২০১২ সালে বিআরটির নকশা নিয়ে যে দ্বিধা ছিলো, চৌদ্দ বছর পর সেটি সমাধানের নামে আবার নতুন নকশা তৈরি হচ্ছে। এবারও কি নির্মাণ শুরুর আগে সব বিকল্প পরীক্ষা করা হবে, নাকি নতুন সড়কের সমস্যাগুলোও বোঝা যাবে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচের পর?
রাস্তা বদলালেই কি দায় বদলায়?
গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে এডিবির সঙ্গে প্রায় ১৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছিলো। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের বাড়তি ব্যয়ের জন্য ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আরও ১০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়।
এই অর্থ বিআরটি প্রকল্পের নির্দিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের জন্য দেওয়া হয়েছিলো।
এখন সেই বিআরটিই চালু হবে না।
তাহলে ইতিমধ্যে উত্তোলিত ঋণের কী হবে?
সাধারণ নিয়মে কোনো প্রকল্প বাতিল হলেই ঋণদাতার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় শেষ হয়ে যায় না। চুক্তি অনুযায়ী ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে অব্যবহৃত ঋণ নতুন কাজে ব্যবহার করতে হলেও অর্থায়নকারীর সম্মতি এবং প্রয়োজনীয় চুক্তি সংশোধনের প্রশ্ন রয়েছে।
অক্টোবরের সরকারি সিদ্ধান্তেও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির কথা রয়েছে।
এখানে সরকারের কয়েকটি তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এডিবি ও এএফডির ঋণের কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে? কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে? কত সুদ জমেছে? কত টাকা এখনো অব্যবহৃত? বিআরটি বাতিল করে নতুন সড়ক নির্মাণে দুই উন্নয়ন সহযোগী সম্মতি দিয়েছে কি না? আর ছয় লেনের অর্থায়ন শেষ পর্যন্ত করবে কে?
এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিআরটির জন্য নেওয়া ঋণ বাংলাদেশের জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে, যদিও পরিকল্পিত বাসসেবা তারা কখনো পাননি।
একটি সড়কের ব্যর্থতা, নাকি পরিকল্পনাব্যবস্থার?
গাজীপুর বিআরটির পরিণতি বুঝতে গেলে আমরা আবার আদিল মুহাম্মদ খান ও আক্তার মাহমুদের গবেষণায় ফিরে যেতে পারি।
তারা ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার সমস্যা তুলে ধরেছিলেন। নগর পরিকল্পনা, সড়ক নির্মাণ, যানবাহনের অনুমোদন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গণপরিবহন পরিচালনার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।
গাজীপুর বিআরটির নির্মাণ ও বাস্তবায়নেও একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিলো।
কিন্তু এতগুলো প্রতিষ্ঠান থাকার পরও যদি একটি প্রকল্পের মৌলিক নকশাগত সমস্যা শেষ পর্যায়ে এসে শনাক্ত করতে হয়, তাহলে শুধু ঠিকাদার বা নির্মাণকারী সংস্থার দায় নির্ধারণ যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন করতে হবে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কারা করেছিলেন? প্রকল্প অনুমোদনের সময় কোন বিশেষজ্ঞরা নকশা মূল্যায়ন করেছিলেন? এডিবি কীভাবে এই নকশায় অর্থায়নে সম্মত হয়েছিলো? প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রতিটি পর্যায়ে কী কী পরীক্ষা করা হয়েছিলো? আর পরিচালনব্যবস্থা প্রস্তুত না করেই অবকাঠামো নির্মাণ এত দূর এগিয়ে গেল কীভাবে?
পরিবহন পরিকল্পনার ভুলের আরও একটি বিপজ্জনক দিক রয়েছে।
একটি নতুন সড়ক তৈরি হলে প্রথম দিকে যানবাহনের চলাচল সহজ হতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বেশি গাড়ি সেই সড়ক ব্যবহার করতে শুরু করলে যানজট আবার ফিরে আসতে পারে। পরিবহন অর্থনীতিতে এই প্রবণতাকে ইনডিউসড ডিমান্ড বা নতুন সড়কসুবিধার কারণে অতিরিক্ত যাতায়াতের চাহিদা সৃষ্টি হওয়া বলা হয়।
অবশ্য গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও আন্তজেলা পরিবহন করিডরে ছয় লেনের প্রয়োজন একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখানে পণ্য পরিবহন, দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় যাতায়াতের চাহিদা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
কিন্তু শুধু গাড়ি চলাচলের জায়গা বাড়ালেই মানুষের যাতায়াতের সব সমস্যা সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ জন্য নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি গণপরিবহনের পরিকল্পনাও প্রয়োজন। কতটি বাস চলবে, কোন ব্যবস্থাপনায় চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবেন, শ্রমিকদের ভাড়া কত হবে এবং বাসমালিকদের প্রতিযোগিতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, এসবের উত্তরও থাকতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কার লাভ?
গাজীপুর বিআরটির সিদ্ধান্তকে দুটি সরল ভাগে ফেলা যায় না।
একদিকে আছে চৌদ্দ বছরের নির্মাণব্যয়, মানুষের দুর্ভোগ এবং একটি গণপরিবহনব্যবস্থা চালু করতে না পারার ব্যর্থতা।
অন্যদিকে আছে বিআরটির নকশাগত ত্রুটি ও সড়কের বাস্তব সীমাবদ্ধতা। ত্রুটিপূর্ণ একটি প্রকল্প চালু করে নতুন দুর্ভোগ তৈরি করা নিশ্চয়ই কাম্য নয়।
কিন্তু একটি ভুল প্রকল্প বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেই পুরোনো ভুলের দায় শেষ হয়ে যায় না।
বরং সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরও কয়েকটি দায় তৈরি হয়।
আগের ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ, উদ্ধারযোগ্য অবকাঠামোর মূল্য নির্ধারণ, নতুন নির্মাণের স্বচ্ছ বাজেট, বিদেশি ঋণের ভবিষ্যৎ, বিকল্প গণপরিবহনব্যবস্থা এবং প্রকল্পের ভুল পরিকল্পনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা।
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের সামনে দুটি বিকল্পের তুলনা তুলে ধরা দরকার ছিলো। বিআরটি চালু করলে কত খরচ, কত সুবিধা ও কত ঝুঁকি থাকত? ছয় লেন করলে কত খরচ, কত সময় এবং কত সুবিধা পাওয়া যাবে?
পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং প্রতিদিন এই সড়কে চলাচল করা সাধারণ মানুষের মতামতও সেই আলোচনায় থাকা উচিত।
কারণ পরিবহনব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু গাড়ি চালানোর জায়গা তৈরি নয়। এর উদ্দেশ্য মানুষকে নিরাপদে, সাশ্রয়ী খরচে এবং নির্ভরযোগ্য সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।
সাতশ বছর আগে মুহাম্মদ বিন তুঘলক তার সাম্রাজ্যের রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইতিহাসে তার পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নিয়ে মতভেদ আছে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে মানুষের দুর্ভোগের বিবরণ রয়ে গেছে।
গাজীপুরের বিআরটি হয়তো ইতিহাসে তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের মতো আলোচিত হবে না। কিন্তু এই সড়কে চৌদ্দ বছর ধরে চলাচল করা মানুষের কাছে সময়ের হিসাবটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ চলচ্চিত্রের সুবাদে হোমারের প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেই কাহিনিতে পেনেলোপি দিনের বেলা কাপড় বুনতেন, আর রাতের অন্ধকারে খুলে ফেলতেন সেই বুনন। এভাবে অপেক্ষার সময়কে দীর্ঘায়িত করেছিলেন তিনি।
গাজীপুরের বিআরটি প্রকল্পের সঙ্গে সেই কাহিনির অদ্ভুত মিল রয়েছে। চৌদ্দ বছর ধরে রাষ্ট্র একটি পরিবহনব্যবস্থা নির্মাণ করেছে। এখন সেই নির্মাণেরই কিছু অংশ ভেঙে আবার নতুন করে রাস্তা বানাবে।
পেনেলোপির বুনন আর খুলে ফেলার পেছনে ছিলো ভালোবাসা, প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমাদের পরিকল্পনাকারীদের বুনন আর খুলে ফেলার পেছনে কী আছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে এই গল্পে অপেক্ষারত প্রেমিক যেন গাজীপুরের সাধারণ মানুষ। পেনেলোপি হচ্ছে এখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থা- দিনে যা বুনছে, রাতে তা খুলে ফেলছে। আর মানুষ অপেক্ষা করছে, কবে শেষ হবে সেই বুনন, কবে শেষ হবে তার পথচলার দুর্ভোগ।
সবকিছু ছাপিয়ে যার জীবন থেকে চৌদ্দ বছর গেল- তার তো সবই গেল। চৌদ্দ বছর মানে যৌবন থেকে বৃদ্ধে পরিণত হওয়া। গালাগালি করে চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা যায় কিন্তু চৌদ্দ বছর নয়!
তুঘলকির বিআরটি: চৌদ্দ বছরের ভুলের মাশুল দেবে কে?
সন ১৩২৭ খ্রিষ্টাব্দ। সুলতান তুঘলক এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিলেন। দিল্লি থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের দৌলতাবাদে সরিয়ে নেবেন রাজধানী। শুধু রাজদরবার নয়, রাজধানীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধিবাসীকেও যেতে হবে সেখানে। সাতশ বছর পর বাংলাদেশের গাজীপুরে একটি পরিবহন প্রকল্পের পরিণতি দেখে তুঘলকের কথা আবারও মনে পড়ছে।
এ যেন এক ‘তুঘলকি কাণ্ড’! হঠকারী সিদ্ধান্তে বিরাট অথচ ফলাফলবিহীন কর্মকাণ্ডকে আমরা এভাবে ব্যাখ্যা করি। আমরা অনেকেই জানি, দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কর্মকাণ্ড থেকেই এ প্রবাদের উৎপত্তি।
১৩২৭ খ্রিস্টাব্দ। সুলতান তুঘলক এক অভিনব সিদ্ধান্ত নিলেন। দিল্লি থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের দৌলতাবাদে সরিয়ে নেবেন রাজধানী। শুধু রাজদরবার নয়, রাজধানীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অধিবাসীকেও যেতে হবে সেখানে। সুলতানের যুক্তি ছিলো, দৌলতাবাদ তার সাম্রাজ্যের তুলনামূলক কেন্দ্রে অবস্থিত। দক্ষিণ ভারতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাও সহজ হবে।
কিন্তু শাসকের কাছে মানচিত্রে যা সুবিধাজনক মনে হয়েছিলো, সাধারণ মানুষের কাছে তা হয়ে উঠেছিলো দুর্ভোগের কারণ।
সমসাময়িক ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি এবং কবি ইসামির বিবরণে রাজধানী স্থানান্তরের কারণে মানুষের দুর্দশার কথা পাওয়া যায়। বিশেষ করে ইসামির বর্ণনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজেও দিল্লি থেকে দাক্ষিণাত্যে যাত্রা করেছিলেন। সেই যাত্রাপথে তার দাদার মৃত্যু হয়েছিলো বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে তুঘলক আবার দিল্লিকে রাজধানীর কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু তত দিনে মানুষের জীবনে যা ঘটে গেছে, তা আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব ছিলো না।
সাতশ বছর পর বাংলাদেশের গাজীপুরে একটি পরিবহন প্রকল্পের পরিণতি দেখে তুঘলকের কথা আবারও মনে পড়ছে।
এখানে রাজধানী না বদলানো হলেও বদলে ফেলা হচ্ছে একটি সড়কের উদ্দেশ্য।
যে সড়কে দ্রুতগতির বিশেষ বাস চালানোর জন্য চৌদ্দ বছর ধরে নির্মাণকাজ চললো, সেই সড়কেই এখন আর বিআরটি বাস চালানো হবে না। বরং বিআরটির জন্য নির্মিত স্টেশন ও বিভাজক সরিয়ে সাধারণ ছয় লেনের সড়ক তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
ইতিমধ্যে খরচ হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ পরিকল্পিত বিআরটি সেবায় একটি নতুন বাসও যাত্রী বহন শুরু করতে পারেনি।
প্রশ্ন হচ্ছে, এমন একটি প্রকল্প বাতিল করা কি ভুল সিদ্ধান্ত? নাকি প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার মধ্যেই ছিলো ভুল? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এই চৌদ্দ বছরের দুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের দায় কে নেবে?
পরিকল্পনার ইতিহাস আসলে তিন দশক পুরানো
গাজীপুরের বিআরটিকে বুঝতে হলে আমাদের অন্তত তিন দশক পেছনে যেতে হবে।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে পরিচালিত ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড ট্রান্সপোর্ট স্টাডি বা ডিআইটিএস ছিলো রাজধানীর পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত গবেষণা। এর ধারাবাহিকতায় আসে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিলো সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো।
কিন্তু ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার মৌলিক সংকট থেকে যায়।
২০০৩ সালে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিং নিয়ে গবেষণা হয়। ২০০৫ সালে প্রণীত হয় স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপি। ২০০৮ সালে সরকার এটি অনুমোদন করে। দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনায় ঢাকার জন্য বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি এবং ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট বা এমআরটির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা ছিলো।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক আদিল মুহাম্মদ খান ও অধ্যাপক ড. মো. আক্তার মাহমুদ তাদের ‘ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানিং অব ঢাকা সিটি: সাম কনটেমপোরারি অবসারভেশনস’ গবেষণায় ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনার এই দীর্ঘ ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন।
গবেষণাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। পুরোনো এসটিপি জরিপ অনুযায়ী, ঢাকার চলাচলরত যানবাহনের মাত্র সাড়ে ১১ শতাংশ ছিলো বাস। অথচ যাত্রী পরিবহনের প্রায় ৭৭ শতাংশই সম্পন্ন হতো বাসে। যদিও এটি বর্তমান ঢাকার পরিসংখ্যান নয়। কিন্তু পরিবহন পরিকল্পনার মৌলিক একটি সত্য বোঝার জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সড়কে কত গাড়ি চলতে পারে, আর সেই গাড়িগুলো কত মানুষ পরিবহন করতে পারে, দুটি এক বিষয় নয়।
একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে একজন কিংবা দুজন মানুষ থাকতে পারেন। একই পরিমাণ সড়ক ব্যবহার করে বড় একটি বাস কয়েক ডজন মানুষ পরিবহন করতে পারে। ফলে সড়ক বাড়ানো এবং পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো সব সময় একই ফল দেয় না।
এসটিপির বিভিন্ন বিকল্প পরিকল্পনার মূল্যায়নেও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিলো।
গবেষণায় পুনরুৎপাদিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিআরটিনির্ভর অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ের দুটি কৌশল প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিআরটি ও মেট্রোরেলের সমন্বিত একটি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। গবেষকেরা সেই সিদ্ধান্তের ব্যয় ও যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
অর্থাৎ শুরু থেকেই ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় একটি দ্বন্দ্ব ছিলো। সীমিত সম্পদ দিয়ে বেশি মানুষকে পরিবহনের ব্যবস্থা গড়া হবে, নাকি বড় অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে যানজট কমানোর চেষ্টা করা হবে?
গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প সেই দীর্ঘ পরিকল্পনার ইতিহাসেরই একটি অংশ।
শুরুতেই নকশা নিয়ে দ্বিধা
গাজীপুর–বিমানবন্দর বিআরটি প্রকল্পের ইতিহাসে ফিরে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় নজরে আসে। প্রকল্পের একেবারে শুরুতে বাস চলাচলের লেন কোথায় হবে, তা নিয়েই বিশেষজ্ঞদের মতভেদ ছিলো।
২০১২ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তৎকালীন যোগাযোগসচিব এম এ এন সিদ্দিক জানিয়েছিলেন, দুটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। বিআরটি বাস রাস্তার মাঝখানের দ্রুতগতির লেন দিয়ে চলবে, নাকি পাশের ধীরগতির লেন দিয়ে চলবে?
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মাঝের দ্রুতগতির লেন ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য বিশেষজ্ঞদের আপত্তিও ছিলো। বিশেষ করে বাস স্টেশনে থামা এবং অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে চলাচলের সমন্বয় নিয়ে উদ্বেগ উঠেছিলো।
তৎকালীন যোগাযোগসচিব জানিয়েছিলেন, পরীক্ষামূলক যাচাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের শুরুতেই এমন দ্বিধা ছিলো, অথচ শেষ পর্যন্ত রাস্তার মাঝখানে বিআরটির জন্য বিশেষ লেন ও স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, প্রাথমিক আপত্তিগুলো কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছিলো? কোন পরীক্ষার ভিত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিলো?
২০১২ সালের নভেম্বরে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। ডিসেম্বরে এডিবির সঙ্গে ঋণচুক্তিও হয়। শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিলো প্রায় ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা।
প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিলো ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। অর্থাৎ ২০১৭ সাল থেকেই যাত্রীরা এই বিশেষ বাসব্যবস্থার সুবিধা পেতে পারতেন। বাস্তবে তা হয়নি।
ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ নকশায় পরিবর্তন, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন স্থানান্তর, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা, ঠিকাদারি কাজের বিলম্ব এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পটি আটকে যায়। বাড়তে থাকে ব্যয়। একের পর এক পিছিয়ে যায় নির্মাণ শেষ করার সময়।
২০১৮ সালের দিকে বড় আকারের জোড়া বাস চালানোর পরিকল্পনা সামনে আসে। পরে সিদ্ধান্ত হয় ইলেকট্রিক বাস কেনার। ২০২২ সালে ১৩০টি ইলেকট্রিক বাস সংগ্রহের উদ্যোগের কথা জানা যায়। এরপর আবার সিদ্ধান্ত বদলে ১৩৭টি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ডিজেল বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়।
সেই বাসও কেনা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কয়েকটি উড়ালপথ ও সড়ক সাধারণ যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ডিসেম্বর থেকে বিআরটিসির ১০টি পুরোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস দিয়ে অস্থায়ী সেবা চালু হয়। কিন্তু প্রকল্পের পরিকল্পিত পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয়নি।
২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব আসে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
এরপর প্রকল্পটি পর্যালোচনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ দল।
তারা বিআরটির নকশা, সড়কের প্রস্থ, যানবাহনের ধরন, স্টেশন ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জটিলতা নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানান। বিআরটি হিসেবে প্রকল্পটি চালু না করার সুপারিশও করেন।
অবশেষে ২০২৬ সালের অক্টোবরে সরকারের মন্ত্রীসভা বিআরটির পরিবর্তে সাধারণ ছয় লেনের সড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর ফলে চৌদ্দ বছরের নির্মাণযজ্ঞ এভাবেই নতুন এক নির্মাণপর্বের সামনে এসে দাঁড়াল।
বিআরটি ও এমআরটি’র পার্থক্য
বিআরটি বা বাস র্যাপিড ট্রানজিট শুনে অনেকের মনে হতে পারে, এটি বিশেষ ধরনের কোনো বাস।
আসলে বিআরটি একটি পরিবহনব্যবস্থা।
এখানে বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন থাকে। নির্ধারিত স্টেশনে যাত্রী ওঠানামা করেন। সাধারণ বাসের মতো যেখানে-সেখানে দাঁড়াতে হয় না। টিকিট সংগ্রহ, যাত্রী ওঠানামা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়।
বাসটি ডিজেলে চলতে পারে, বিদ্যুতেও চলতে পারে। মেট্রোরেলের মতো রেললাইনে কিংবা মাথার ওপর বিদ্যুতের তারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলার বাধ্যবাধকতা নেই।
অন্যদিকে মেট্রোরেল চলে রেললাইনে। ঢাকার মেট্রোরেল বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিচালিত হয়। এর স্টেশন, রেলপথ, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা বিআরটি থেকে আলাদা।
বিআরটির বড় সুবিধা হলো, রেলভিত্তিক গণপরিবহনব্যবস্থার তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে কম ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা সম্ভব। পুরোনো একটি পরিবহন গবেষণায় ঢাকার জন্য প্রতি কিলোমিটার বিআরটি নির্মাণব্যয় প্রায় ৫০ লাখ ডলার এবং মেট্রোরেল নির্মাণব্যয় ৫ থেকে সাড়ে ৭ কোটি ডলার পর্যন্ত ধরা হয়েছিলো।
অবশ্য এগুলো পুরোনো পরিকল্পনার ব্যয়প্রাক্কলন, আজকের বাস্তব নির্মাণব্যয় নয়। উড়ালপথ, স্টেশন, জমি ও অন্যান্য অবকাঠামো যুক্ত হলে বিআরটির খরচও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে গাজীপুর প্রকল্পের আগে কোথাও পূর্ণাঙ্গ বিআরটি ব্যবস্থা চালু হয়নি। আর এই প্রকল্প বাতিলের ফলে দেশের প্রথম বিআরটি চালুর সম্ভাবনাও আপাতত শেষ হয়ে গেল।
গাজীপুরের মানুষ কী পেত?
গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিআরটি করিডরের দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ২০ কিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ১২ দশমিক ৭৪ মাইল। এর মধ্যে টঙ্গী এলাকায় প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার উড়াল অংশ রয়েছে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত যাতায়াতে সময় লাগার কথা ছিলো প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ মিনিট। নির্ধারিত সময়সূচিতে বড় বাস চলার কথা ছিলো। যাত্রীচাহিদার পূর্বাভাসে দৈনিক প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার থেকে ৩ লাখ যাত্রী পরিবহনের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে।
তবে এই সংখ্যা নিশ্চিত যাত্রীর হিসাব নয়। এগুলো প্রকল্প চালু হলে কত মানুষ সেবা নিতে পারেন, তার পূর্বাভাস।
এই সড়কের গুরুত্ব বুঝতে হলে গাজীপুরের অর্থনীতির কথাও ভাবতে হবে।
গাজীপুর বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল। অসংখ্য পোশাক কারখানা, অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শ্রমজীবী মানুষের আবাস এবং ঢাকার সঙ্গে প্রতিদিনের যাতায়াত এই করিডরকে ব্যস্ত রাখে।
একজন শ্রমিক বা কর্মজীবী মানুষ যদি প্রতিদিন যাতায়াতে আধা ঘণ্টা সময় বাঁচাতে পারেন, বছরে ৩০০ কর্মদিবস হিসাবে তার সাশ্রয় হবে ১৫০ ঘণ্টা। অর্থাৎ প্রায় ছয় দিন ছয় ঘণ্টা।
এটি কেবল একটি উদাহরণ। সবাই একই পরিমাণ সময় বাঁচাতেন, এমন নয়।
কিন্তু হাজার হাজার মানুষের ক্ষেত্রে সময় সাশ্রয়ের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কত বড় হতে পারে, তা সহজেই বোঝা যায়।
বিআরটি চালু হলে বাসের জন্য নির্দিষ্ট লেন থাকায় যাত্রার সময় কিছুটা নির্ভরযোগ্য হওয়ার কথা ছিলো। বিদ্যুৎচালিত বাস ব্যবহার করা গেলে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমার সম্ভাবনাও ছিলো। যদিও ইলেকট্রিক বাসের প্রাথমিক দাম এবং চার্জিং অবকাঠামোর ব্যয় বেশি।
সুতরাং বিআরটির সম্ভাব্য লাভ কেবল দ্রুত যাতায়াত নয়। এর সঙ্গে শ্রমঘণ্টা, যানবাহনের পরিচালনব্যয়, সড়ক দুর্ঘটনা ও পরিবেশগত সুবিধার প্রশ্নও জড়িত।
দশ বছরে কত টাকার সুফল হারালো মানুষ?
২০২৩ সালের জুনে প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের একটি প্রতিবেদনে এডিবির অর্থনৈতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দেওয়া হয়।
সেখানে বলা হয়, বিআরটি নির্ধারিত সময়ে চালু হলে বিভিন্ন খাতে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেত। অন্যদিকে দীর্ঘ নির্মাণকাজে যান চলাচলের বিঘ্নজনিত বার্ষিক ব্যয় অনুমান করা হয়েছিলো আরও ১ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার।
দুই হিসাব মিলিয়ে প্রতিবেদনে বছরে প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার, তৎকালীন বিনিময় হারে প্রায় ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা বলা হয়েছিলো।
সংখ্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে সতর্কতা প্রয়োজন।
এই ১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা সরকারের কোষাগার থেকে প্রতি বছর সরাসরি হারিয়ে যাওয়া নগদ অর্থ নয়। এটি অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, যেখানে সম্ভাব্য সময় সাশ্রয়, যানবাহনের ব্যয়, দুর্ঘটনা, পরিবেশ ও নির্মাণজনিত দুর্ভোগের হিসাব রয়েছে।
তবু বোঝার সুবিধার জন্য একটি তুলনা করা যেতে পারে।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় দশ বছর। প্রতি বছর একই পরিমাণ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব ছিলো বলে ধরে নিলে দশ বছরে সম্ভাব্য প্রভাব দাঁড়ায় ১১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
কিন্তু এটিকে প্রমাণিত ক্ষতি হিসেবে লেখা যাবে না। কারণ প্রতিবছর যাত্রীসংখ্যা, যানবাহনের চলাচল, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্মাণকাজের মাত্রা এক ছিলো না। ফলে সঠিক ক্ষতি নির্ধারণে বছরভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কার: কোনো পরিবহন প্রকল্পের ক্ষতি শুধু নির্মাণে খরচ হওয়া টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে সেবা সময়মতো চালু হওয়ার কথা ছিলো, সেটি না পাওয়ারও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।
প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা গেল কোথায়?
গাজীপুর বিআরটির সর্বশেষ অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার কিছু বেশি।
এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়ন প্রায় ২ হাজার ১১৯ কোটি টাকা, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডির প্রায় ৯০৩ কোটি এবং বাংলাদেশ সরকারের অংশ প্রায় ১ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পে ইতিমধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
এই ব্যয়ের মধ্যে সরকারি উৎস থেকে প্রায় ৭৪৯ কোটি এবং বৈদেশিক প্রকল্প সহায়তা থেকে প্রায় ২ হাজার ৬২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই টাকার কতটা অপচয়?
পুরো অর্থই গচ্চা গেছে বলা ঠিক হবে না। কারণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত কিছু সড়ক, সেতু, উড়ালপথ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ফুটপাত নতুন সড়কেও কাজে লাগতে পারে।
অন্যদিকে বিআরটির জন্য বিশেষভাবে নির্মিত স্টেশন, বিভাজক এবং কিছু যাত্রীসেবা অবকাঠামো সরিয়ে ফেলতে হবে। এগুলোর নির্মাণব্যয়, অপসারণব্যয় এবং উদ্ধারযোগ্য সরঞ্জামের মূল্য আলাদাভাবে হিসাব করা প্রয়োজন।
আরও একটি বিভ্রান্তি রয়েছে।
কেউ কেউ বলছেন, প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিলো। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ অবকাঠামোগত কাজের প্রায় ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিলো। কিন্তু পুরো প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তব অগ্রগতি ছিলো ৭৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
অর্থাৎ অবকাঠামো প্রায় শেষ হওয়া এবং যাত্রী পরিবহনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হওয়া এক কথা নয়।
কোনো বিমানবন্দরের ভবন তৈরি হয়ে গেলেও বিমান, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ছাড়া যাত্রীসেবা চালু করা যায় না। বিআরটির ক্ষেত্রেও একইভাবে স্টেশন ও রাস্তা তৈরি হওয়া মানেই পূর্ণাঙ্গ পরিবহনব্যবস্থা চালু হওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া নয়।
ভুলটা কোথায় হয়েছিলো?
এই প্রশ্নে এসে বিআরটির পক্ষে-বিপক্ষে সহজ সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নে গুরুতর দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে।
গাজীপুর–বিমানবন্দর সড়ক কেবল স্থানীয় যাত্রীবাহী বাসের জন্য ব্যবহৃত হয় না। এই পথে আন্তঃনগর বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করে। উত্তরাঞ্চল ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ।
এমন একটি সড়কের মাঝখানে বিশেষ বাসের জন্য লেন ও স্টেশন নির্মাণের ফলে সাধারণ যানবাহনের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
২০২৩ সালে এডিবির মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েকটি বিআরটি স্টেশন এলাকায় সাধারণ যানবাহনের জন্য মাত্র চার মিটার, অর্থাৎ প্রায় ১৩ ফুট জায়গা রাখা হয়েছিলো।
একটি বড় বাসের প্রস্থই প্রায় আট থেকে সাড়ে আট ফুট। ফলে সেখানে একটি বাস দাঁড়িয়ে পড়লে পাশ দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশারও নিরাপদে অতিক্রম করার জায়গা থাকে না।
বাস্তবে ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে এমন সমস্যার কথা উঠে এসেছিলো।
আরেকটি সমস্যা ছিলো বিআরটি বাসের গন্তব্য। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এসে যাত্রীদের অনেককেই অন্য পরিবহনে বদল করতে হতো। বিমানবন্দর থেকে ঢাকার দক্ষিণ দিকে বিআরটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা থাকলেও সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।
ফলে পূর্ণাঙ্গ নেটওয়ার্কের সুবিধা পাওয়া যেত না।
বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা সড়কের প্রস্থ, যানবাহনের বৈচিত্র্য, স্টেশনের নকশা, পরিচালনা ও সমন্বয়ের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতেই সরকার বিআরটি হিসেবে প্রকল্পটি চালু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এখানে তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত, ত্রুটিপূর্ণ প্রকল্পটি কেন বাতিল করা হলো নয়। বরং, এত বড় নকশাগত ত্রুটি ২০১২ সালে অনুমোদনের সময় অথবা নির্মাণের প্রথম দিকে কেন ধরা পড়লো না?
একটি প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হলো। কিন্তু তার মূল পরিবহন ধারণাটি কার্যকর কি না, সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া গেল চৌদ্দ বছর পর!
নেতৃত্ব বদলায়, ব্যবসার প্রশ্ন থাকে
বিআরটির আরেকটি দিক নিয়ে প্রকাশ্যে তুলনামূলক কম আলোচনা হয়েছে। সেটি হলো পরিবহন ব্যবসার কাঠামো।
গাজীপুর–বিমানবন্দর করিডরে আগে থেকেই বেসরকারি বাস চলাচল করে। বিভিন্ন কোম্পানি ও মালিকের বাস, রুট পারমিট, চালক, শ্রমিক এবং যাত্রী সংগ্রহের প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এই ব্যবসা।
পূর্ণাঙ্গ বিআরটি চালু হলে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার কথা।
কারণ বিআরটি কেবল নতুন কিছু বাস রাস্তায় নামানোর প্রকল্প নয়। নির্দিষ্ট লেনে, নির্দিষ্ট সময়সূচিতে, কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনার আওতায় বাস চালানোর একটি পদ্ধতি।
এখানে প্রচলিত বাসগুলোর মতো যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানো কিংবা একই রুটে একাধিক বাসের যাত্রী সংগ্রহের প্রতিযোগিতা থাকার কথা নয়।
ফলে বিদ্যমান বাসমালিকদের ব্যবসা কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি বড় প্রশ্ন।
এডিবির প্রকল্পসংক্রান্ত নথিতে বেসরকারি বাস পরিচালকদের ক্ষতিপূরণ এবং পুরোনো বাস বাতিলের কর্মসূচির কথাও ছিলো। অর্থাৎ বিদ্যমান পরিবহন ব্যবসার ওপর বিআরটির সম্ভাব্য প্রভাব প্রকল্পের প্রথম পর্যায় থেকেই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিলো।
এই ব্যবসার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কও নতুন নয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন মসিউর রহমান রাঙ্গা এবং মহাসচিব হন খন্দকার এনায়েত উল্লাহ। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণে বড় পরিবর্তন আসে।
২০২৪ সালের অগাস্টে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকার বিভিন্ন বাস টার্মিনাল ও রুটের নিয়ন্ত্রণ নতুন নেতৃত্বের হাতে চলে যায়। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আগের কমিটি বিলুপ্ত করে এম এ বাতেনের নেতৃত্বে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়।
প্রতিবেদনটিতে বিএনপি সমর্থক পরিবহন নেতাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং খন্দকার এনায়েত উল্লাহর মালিকানাধীন এনা পরিবহনের কিছু রুট ও কাউন্টার নিয়ে বিরোধের কথাও উঠে আসে। এনায়েত উল্লাহ নিজেও তার বাস চলাচলে বাধা পাওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।
অন্যদিকে গাবতলী এলাকায় প্রভাবশালী পরিবহন ব্যবসায়ী কফিল উদ্দিন আহমেদের নাম সামনে আসে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে তাকে বিএনপিপন্থি পরিবহন ব্যবসায়ী এবং হানিফ পরিবহনের মালিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি হন এম এ বাতেন এবং সাধারণ সম্পাদক হন সাইফুল আলম। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন কফিল উদ্দিন আহমেদ, মহাসচিব হন সাইফুল আলম।
অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবহন খাতের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিআরটি বাতিলের সিদ্ধান্তের সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে বিআরটি নিয়ে বেসরকারি মালিকদের আগ্রহের প্রমাণ রয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আজকের পত্রিকা জানায়, বিআরটির বিশেষ লেনে অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির বাস চলাচল করছিলো। আরও কয়েকটি কোম্পানি সেখানে বাস নামাতে আগ্রহী ছিলো। ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের তখন জানিয়েছিলেন, বাসমালিকেরা রুট পারমিটের জন্য আবেদন করছেন।
এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
২০এ নভেম্বর দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ই নভেম্বর বাসমালিকদের জাতীয় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিআরটি কোম্পানির চেয়ারম্যানকে লিখিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো।
সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলমের সেই প্রস্তাবে বিআরটি করিডরে ১০০টি বাস চালানোর কথা ছিলো। এর মধ্যে ৫০টি এসি এবং ৫০টি নন-এসি বাস। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর হয়ে মতিঝিল কিংবা ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত কোম্পানিভিত্তিক বাসসেবা চালাতে চেয়েছিলেন তারা।
প্রস্তুতির জন্য চাওয়া হয়েছিলো ছয় মাস। প্রস্তাবে কাউন্টার ও ইলেকট্রনিক টিকেটিংয়ের কথাও ছিলো।
সাইফুল আলম জানিয়েছিলেন, আগ্রহী বেসরকারি বাস পরিচালকদের নিয়ে কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে।
এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, বেসরকারি বাস মালিকেরা বিআরটি করিডরে ব্যবসা করতে চেয়েছিলেন। তাদের আগ্রহ শুধু পুরোনো বাস চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বিশেষ করিডর ব্যবহারের সুযোগও তারা চেয়েছিলেন।
দ্বিতীয়ত, তারা গাজীপুর থেকে শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত নয়, ঢাকার ভেতরে মতিঝিল কিংবা ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত সেবা চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অথচ মূল বিআরটির অন্যতম সমালোচনা ছিলো বিমানবন্দরে এসে যাত্রীদের অন্য পরিবহনে বদল করতে হবে।
এখানেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।
বেসরকারি বাসমালিকদের প্রস্তাবের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয়েছিলো কি? সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলে যাত্রীরা কী সুবিধা পেতেন? মূল বিআরটির স্টেশন ও নির্দিষ্ট লেন ব্যবহার করা সম্ভব হতো কি? নাকি এর ফলে বিশেষ বিআরটি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সাধারণ বাসসেবায় পরিণত হতো?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় সরকার কী কী বিকল্প বিবেচনা করেছিলো?
২০২৬ সালের অক্টোবরে সরকারের সামনে চারটি বিকল্প ছিলো। এর মধ্যে বিদ্যমান করিডরে বিশেষ বাস ও প্রচলিত বেসরকারি বাস চালানোর সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয় লেনের সাধারণ সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরিবহন মালিক সমিতি এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে, বিরোধিতা করেছে, নাকি নিরপেক্ষ থেকেছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো স্পষ্ট নয়।
তাই পরিবহন মালিকদের লাভের জন্য বিআরটি বাতিল হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু পরিবহন ব্যবসার স্বার্থ যে আলোচনার বাইরে নয়, সেটিও পরিষ্কার। কারণ বিআরটি থেকে সাধারণ সড়কে রূপান্তরের ফলে শুধু রাস্তার নকশাই বদলাচ্ছে না। বদলানোর কথা ছিলো যে পরিবহন পরিচালনাব্যবস্থা, সেটিও আর আসছে না।
এক বছরে বাস, নাকি আরও পাঁচ বছরের নির্মাণ?
২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বা বিআইপি বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে সীমিত বিআরটি সেবা চালুর প্রস্তাব দিয়েছিলো।
তাদের মূল্যায়নে উন্নত বাস দিয়ে প্রাথমিক সেবা চালু করতে অতিরিক্ত প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা এবং ইলেকট্রিক বাসসহ ব্যবস্থা গড়তে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে প্রকল্প বাতিল করে ছয় লেনের সড়কে রূপান্তরের ক্ষেত্রে চার থেকে পাঁচ বছর সময় এবং প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রাথমিক ধারণাও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।
বিআইপির প্রস্তাব ছিলো সীমিত পরিবহনসেবা চালুর। অন্যদিকে ছয় লেনের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ সড়ক রূপান্তরের কথা। কাজের পরিধি এক নয়। চার-পাঁচ বছর এবং চার হাজার কোটি টাকা এখনো সরকারের অনুমোদিত নির্মাণসূচি ও পূর্ণাঙ্গ বাজেট নয়।
এই পার্থক্য মাথায় রেখেও প্রশ্ন থেকে যায়।
একটি বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে সীমিত যাত্রীসেবা চালুর সুযোগ থাকলে সেটি কেন গ্রহণযোগ্য হলো না? বুয়েটের নকশাগত আপত্তির কারণে কি তা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে যেত? নাকি সীমিত সেবা চালু রেখে ধাপে ধাপে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিলো?
সরকারের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক কি না, তা মূল্যায়নের জন্য এই বিকল্পগুলোর ব্যয় ও সুফলের তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
আরেকটি প্রশ্ন রয়েছে। ছয় লেনের নতুন সড়ক করতে যে অর্থ লাগবে, তা কি ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার অতিরিক্ত? নাকি প্রকল্পের কিছু বিদ্যমান সম্পদ ও অব্যবহৃত বরাদ্দ সমন্বয় করে নতুন মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হবে?
এই হিসাব স্পষ্ট না হলে ‘ছয় লেন করতে চার হাজার কোটি টাকা’ কথাটিও বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে।
ছয় লেনের নকশাতেও কি নতুন বিপদ?
ছয় লেনের সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু নতুন সড়কের পূর্ণাঙ্গ নকশা, ব্যয় ও নির্মাণসূচি এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রতিটি দিকে তিনটি করে লেন থাকার কথা। সাধারণ মহাসড়কের একটি লেন ১২ ফুট প্রশস্ত ধরলে ছয়টি লেনের জন্যই প্রয়োজন হবে ৭২ ফুট জায়গা। এর বাইরে লাগবে মাঝের বিভাজক, ফুটপাত, পানি নিষ্কাশন ও অন্যান্য অবকাঠামো। সব মিলিয়ে সড়কটি কত ফুট প্রশস্ত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এখানেও বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
ধরুন, ঢাকামুখী তিনটি লেনের একটিতে একটি বাস বিকল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। সঙ্গে সঙ্গে ওই দিকের এক-তৃতীয়াংশ লেন অচল হয়ে যাবে। পেছনের গাড়িগুলো পাশের দুটি লেনে ঢোকার চেষ্টা করবে। অন্য লেনগুলো ব্যস্ত থাকলে তৈরি হবে যানজট।
আর যদি লেনগুলো সরু কংক্রিটের বিভাজক দিয়ে আলাদা রাখা হয়, তাহলে বিপদ আরও বাড়তে পারে। বিকল বাসের পেছনে আটকে থাকা গাড়িগুলো পাশের লেনে সরতেও পারবে না। একইভাবে দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধারকারী যানবাহনের ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অবশ্য সব লেনের মাঝখানে এমন বিভাজক বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। প্রশ্নটি তাই নতুন নকশার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে।
বিকল বাস বা ট্রাক সরানোর জন্য রাস্তার পাশে পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে কি? জরুরি যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা কী হবে? বাসগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য কোথায় দাঁড়াবে? বাসস্টপে থামলে পেছনের যানবাহন কোন লেন ব্যবহার করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া ছয় লেনের সড়ক যানজট দূর করবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। কারণ সড়কের লেনসংখ্যা বাড়ানো আর সড়কের কার্যকর পরিবহনক্ষমতা বাড়ানো সব সময় এক কথা নয়।
এখানে আরও একটি প্রশ্ন ওঠে। ২০১২ সালে বিআরটির নকশা নিয়ে যে দ্বিধা ছিলো, চৌদ্দ বছর পর সেটি সমাধানের নামে আবার নতুন নকশা তৈরি হচ্ছে। এবারও কি নির্মাণ শুরুর আগে সব বিকল্প পরীক্ষা করা হবে, নাকি নতুন সড়কের সমস্যাগুলোও বোঝা যাবে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা খরচের পর?
রাস্তা বদলালেই কি দায় বদলায়?
গাজীপুর বিআরটি প্রকল্পের বড় অংশের অর্থায়ন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে এডিবির সঙ্গে প্রায় ১৬ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়েছিলো। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের বাড়তি ব্যয়ের জন্য ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আরও ১০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি হয়।
এই অর্থ বিআরটি প্রকল্পের নির্দিষ্ট কাজ বাস্তবায়নের জন্য দেওয়া হয়েছিলো।
এখন সেই বিআরটিই চালু হবে না।
তাহলে ইতিমধ্যে উত্তোলিত ঋণের কী হবে?
সাধারণ নিয়মে কোনো প্রকল্প বাতিল হলেই ঋণদাতার কাছ থেকে নেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার দায় শেষ হয়ে যায় না। চুক্তি অনুযায়ী ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে অব্যবহৃত ঋণ নতুন কাজে ব্যবহার করতে হলেও অর্থায়নকারীর সম্মতি এবং প্রয়োজনীয় চুক্তি সংশোধনের প্রশ্ন রয়েছে।
অক্টোবরের সরকারি সিদ্ধান্তেও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিদ্যমান আইনি জটিলতা নিষ্পত্তির কথা রয়েছে।
এখানে সরকারের কয়েকটি তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
এডিবি ও এএফডির ঋণের কত টাকা উত্তোলন করা হয়েছে? কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে? কত সুদ জমেছে? কত টাকা এখনো অব্যবহৃত? বিআরটি বাতিল করে নতুন সড়ক নির্মাণে দুই উন্নয়ন সহযোগী সম্মতি দিয়েছে কি না? আর ছয় লেনের অর্থায়ন শেষ পর্যন্ত করবে কে?
এই প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিআরটির জন্য নেওয়া ঋণ বাংলাদেশের জনগণকেই পরিশোধ করতে হবে, যদিও পরিকল্পিত বাসসেবা তারা কখনো পাননি।
একটি সড়কের ব্যর্থতা, নাকি পরিকল্পনাব্যবস্থার?
গাজীপুর বিআরটির পরিণতি বুঝতে গেলে আমরা আবার আদিল মুহাম্মদ খান ও আক্তার মাহমুদের গবেষণায় ফিরে যেতে পারি।
তারা ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতার সমস্যা তুলে ধরেছিলেন। নগর পরিকল্পনা, সড়ক নির্মাণ, যানবাহনের অনুমোদন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গণপরিবহন পরিচালনার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে।
গাজীপুর বিআরটির নির্মাণ ও বাস্তবায়নেও একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিলো।
কিন্তু এতগুলো প্রতিষ্ঠান থাকার পরও যদি একটি প্রকল্পের মৌলিক নকশাগত সমস্যা শেষ পর্যায়ে এসে শনাক্ত করতে হয়, তাহলে শুধু ঠিকাদার বা নির্মাণকারী সংস্থার দায় নির্ধারণ যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন করতে হবে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কারা করেছিলেন? প্রকল্প অনুমোদনের সময় কোন বিশেষজ্ঞরা নকশা মূল্যায়ন করেছিলেন? এডিবি কীভাবে এই নকশায় অর্থায়নে সম্মত হয়েছিলো? প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রতিটি পর্যায়ে কী কী পরীক্ষা করা হয়েছিলো? আর পরিচালনব্যবস্থা প্রস্তুত না করেই অবকাঠামো নির্মাণ এত দূর এগিয়ে গেল কীভাবে?
পরিবহন পরিকল্পনার ভুলের আরও একটি বিপজ্জনক দিক রয়েছে।
একটি নতুন সড়ক তৈরি হলে প্রথম দিকে যানবাহনের চলাচল সহজ হতে পারে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বেশি গাড়ি সেই সড়ক ব্যবহার করতে শুরু করলে যানজট আবার ফিরে আসতে পারে। পরিবহন অর্থনীতিতে এই প্রবণতাকে ইনডিউসড ডিমান্ড বা নতুন সড়কসুবিধার কারণে অতিরিক্ত যাতায়াতের চাহিদা সৃষ্টি হওয়া বলা হয়।
অবশ্য গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও আন্তজেলা পরিবহন করিডরে ছয় লেনের প্রয়োজন একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এখানে পণ্য পরিবহন, দূরপাল্লার বাস ও স্থানীয় যাতায়াতের চাহিদা একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
কিন্তু শুধু গাড়ি চলাচলের জায়গা বাড়ালেই মানুষের যাতায়াতের সব সমস্যা সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ জন্য নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি গণপরিবহনের পরিকল্পনাও প্রয়োজন। কতটি বাস চলবে, কোন ব্যবস্থাপনায় চলবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবেন, শ্রমিকদের ভাড়া কত হবে এবং বাসমালিকদের প্রতিযোগিতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, এসবের উত্তরও থাকতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কার লাভ?
গাজীপুর বিআরটির সিদ্ধান্তকে দুটি সরল ভাগে ফেলা যায় না।
একদিকে আছে চৌদ্দ বছরের নির্মাণব্যয়, মানুষের দুর্ভোগ এবং একটি গণপরিবহনব্যবস্থা চালু করতে না পারার ব্যর্থতা।
অন্যদিকে আছে বিআরটির নকশাগত ত্রুটি ও সড়কের বাস্তব সীমাবদ্ধতা। ত্রুটিপূর্ণ একটি প্রকল্প চালু করে নতুন দুর্ভোগ তৈরি করা নিশ্চয়ই কাম্য নয়।
কিন্তু একটি ভুল প্রকল্প বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেই পুরোনো ভুলের দায় শেষ হয়ে যায় না।
বরং সিদ্ধান্তের সঙ্গে আরও কয়েকটি দায় তৈরি হয়।
আগের ব্যয়ের পূর্ণ হিসাব প্রকাশ, উদ্ধারযোগ্য অবকাঠামোর মূল্য নির্ধারণ, নতুন নির্মাণের স্বচ্ছ বাজেট, বিদেশি ঋণের ভবিষ্যৎ, বিকল্প গণপরিবহনব্যবস্থা এবং প্রকল্পের ভুল পরিকল্পনার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করা।
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণের সামনে দুটি বিকল্পের তুলনা তুলে ধরা দরকার ছিলো। বিআরটি চালু করলে কত খরচ, কত সুবিধা ও কত ঝুঁকি থাকত? ছয় লেন করলে কত খরচ, কত সময় এবং কত সুবিধা পাওয়া যাবে?
পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং প্রতিদিন এই সড়কে চলাচল করা সাধারণ মানুষের মতামতও সেই আলোচনায় থাকা উচিত।
কারণ পরিবহনব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু গাড়ি চালানোর জায়গা তৈরি নয়। এর উদ্দেশ্য মানুষকে নিরাপদে, সাশ্রয়ী খরচে এবং নির্ভরযোগ্য সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া।
সাতশ বছর আগে মুহাম্মদ বিন তুঘলক তার সাম্রাজ্যের রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইতিহাসে তার পরিকল্পনার উদ্দেশ্য নিয়ে মতভেদ আছে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে মানুষের দুর্ভোগের বিবরণ রয়ে গেছে।
গাজীপুরের বিআরটি হয়তো ইতিহাসে তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের মতো আলোচিত হবে না। কিন্তু এই সড়কে চৌদ্দ বছর ধরে চলাচল করা মানুষের কাছে সময়ের হিসাবটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ চলচ্চিত্রের সুবাদে হোমারের প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্যটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেই কাহিনিতে পেনেলোপি দিনের বেলা কাপড় বুনতেন, আর রাতের অন্ধকারে খুলে ফেলতেন সেই বুনন। এভাবে অপেক্ষার সময়কে দীর্ঘায়িত করেছিলেন তিনি।
গাজীপুরের বিআরটি প্রকল্পের সঙ্গে সেই কাহিনির অদ্ভুত মিল রয়েছে। চৌদ্দ বছর ধরে রাষ্ট্র একটি পরিবহনব্যবস্থা নির্মাণ করেছে। এখন সেই নির্মাণেরই কিছু অংশ ভেঙে আবার নতুন করে রাস্তা বানাবে।
পেনেলোপির বুনন আর খুলে ফেলার পেছনে ছিলো ভালোবাসা, প্রিয় মানুষটিকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। আমাদের পরিকল্পনাকারীদের বুনন আর খুলে ফেলার পেছনে কী আছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে এই গল্পে অপেক্ষারত প্রেমিক যেন গাজীপুরের সাধারণ মানুষ। পেনেলোপি হচ্ছে এখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থা- দিনে যা বুনছে, রাতে তা খুলে ফেলছে। আর মানুষ অপেক্ষা করছে, কবে শেষ হবে সেই বুনন, কবে শেষ হবে তার পথচলার দুর্ভোগ।
সবকিছু ছাপিয়ে যার জীবন থেকে চৌদ্দ বছর গেল- তার তো সবই গেল। চৌদ্দ বছর মানে যৌবন থেকে বৃদ্ধে পরিণত হওয়া। গালাগালি করে চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করা যায় কিন্তু চৌদ্দ বছর নয়!