জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় হাতে সময় চার বছর, বলছে জাতিসংঘ 

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪০ এএম

জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব সীমিত রাখতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে হবে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির মতে, আগামী চার বছরে বিশ্বের কার্বন নিঃসরণ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং এক দশকের মধ্যে প্রায় অর্ধেক কমাতে হবে।

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা সম্ভব না। তবে ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম বা ইউনেপ বলছে, এই সীমা অতিক্রম করার মাত্রা ও সময়কাল যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার সুযোগ এখনো আছে।

প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য ছিলো, প্রাক-শিল্প বিপ্লবের তুলনায় বর্তমান গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা। কিন্তু বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিপর্যয়কর মাত্রায় পৌঁছানো ঠেকাতে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ দেশগুলো।

ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম বা ইউনেপ-এর বার্ষিক ‘এমিশন গ্যাপ’ প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটি নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বনেতাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপের বড় ধরনের ঘাটতি আছে। 

ইউনেপের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ আগের বছরের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। তবে এটিকে নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায় বলতে নারাজ সংস্থাটির জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত বিস্তারের পরও বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি।

২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমানো গেলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব। এতে তীব্র দাবদাহসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন বিপর্যয়কর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে। 

সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, সরকারগুলোকে বহু বছর ধরে সতর্ক করা হয়েছে যে সময় ফুরিয়ে আসছে। তিনি বলেন, “আমরা আগে বলতাম, দেশগুলো ভালোভাবে চেষ্টা করলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে থাকার সুযোগ ছিল। এখন বোঝা যাচ্ছে যে, দেশগুলো তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা সময় নষ্ট করেছি, আর এখন সেই সময়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।” 

তবে তিনি দেশগুলোকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কেন্দ্রীয় লক্ষ্য এটি। তিনি বলেন, “এখন হাল ছেড়ে দেওয়ার সময় নয়। কীভাবে আমরা যত দ্রুত সম্ভব আবার সেই লক্ষ্যে ফিরে আসতে পারি, এখন সেটা নিয়েই কাজ করতে হবে।”

সরকারগুলোকে বহু বছর ধরে সতর্ক করা হয়েছে যে সময় ফুরিয়ে আসছে।

বিশ্বের বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ হলো চীন। তার পরেই যুক্তরাষ্ট্র। ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে এসেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। এমনকি দেশটির দীর্ঘদিন ধরে কমতে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রবণতাও উল্টে দেওয়ার হুমকি রয়েছে।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, “সব সরকারেরই দায়িত্ব আছে। তবে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর এখন রাজনীতি বন্ধ করে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়। বিশ্বে উৎপাদিত জীবাশ্ম জ্বালানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এসব দেশ উৎপাদন করে। এখন তারা আগুনের দিকে তাকিয়ে বলছে আগুন নেই এবং তাতে আরও পেট্রোল ঢালছে। অথচ তাদের নিজেদের নাগরিকেরাই ক্রমে তীব্র গরম, দাবানল ও অন্যান্য প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছেন।”

ইউনেপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনড় অবস্থানের প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়েছে। কোনো দেশই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারছে না। এমনকি এখন তারা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও গড়িমসি করছে। 

২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির আওতায় নিঃসরণ কমাতে সরকারগুলোর নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট ছিল না। 

ইউনেপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, হালনাগাদ এসব প্রতিশ্রুতির সবগুলো পূরণ করা হলেও শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়বে। এতে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে বাস্তবতা পূর্বাভাস থেকেও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ দেশগুলো তাদের দেওয়া স্বল্প প্রতিশ্রুতিও রাখতে পারছে না। বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এখন যেই হারে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে, তা যদি চলতে থাকে, তাহলে প্রতি ৫ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও ০ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়তে পারে। 

বিজ্ঞানীরা ‘টিপিং পয়েন্ট’ নামে আরেকটি আশঙ্কার কথা বলছেন। ‘টিপিং পয়েন্ট’ বলতে এমন কিছু পরিবর্তন বোঝাচ্ছে, যেগুলো একবার শুরু হলে থামানো কঠিন হয়ে পড়বে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা যত বেশি মাত্রায় ছাড়িয়ে যাবে, এসব টিপিং পয়েন্ট সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কাও তত বাড়বে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহামেদ অ্যাদো বলেন, “দুঃখজনক বিষয় হলো, সমাধানগুলো আমাদের হাতের নাগালেই রয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার দ্রুত গতিতে বাড়ছে। তবু সরকারগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে একই গতিতে সরে আসতে পারছে না। প্রযুক্তি দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্ব পিছিয়ে আছে।”

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা সম্ভব না।

দেশগুলোর প্রতিশ্রুতির এই ঘাটতি প্যারিস চুক্তির ‘গ্লোবাল স্টকটেক’ নামের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশোধন করার কথা। এ প্রক্রিয়ায় দেশগুলোর জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। পরবর্তী গ্লোবাল স্টকটেক হওয়ার কথা ২০২৮ সালে।

তবে সেটিও এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অক্টোবরের চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ বা আইপিসিসি তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন কবে প্রকাশ করবে, সে বিষয়ে কোনো সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারেনি। গ্লোবাল স্টকটেকের আগে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা না গেলে সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে নিজেদের অগ্রগতি তুলনা করে দেখার সুযোগ থেকে সরকারগুলো বঞ্চিত হবে।

পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জলবায়ুবিজ্ঞানী ইয়োহান রকস্ট্রম বলেন, আইপিসিসির প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নিয়ে বিরোধের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের সরকারের চেষ্টা থেমে গেলে চলবে না।  

তিনি বলেন, “বর্তমান সব জাতীয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হলেও ২০৩৫ সালে বিশ্বের মোট নিঃসরণ বছরে প্রায় ৫০ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। অথচ তা ৩৫ গিগাটনের নিচে থাকা উচিত। বিজ্ঞান এরই মধ্যে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করা রাজনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়, বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবের নয়।”

দ্রুত উষ্ণায়ন কমানোর একটি উপায় হিসেবে ইউনেপ মিথেন নিঃসরণ কমানোর কথাও বলেছে। মিথেন এমন একটি গ্রিনহাউস গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়ে ৮০ গুণ বেশি শক্তিশালী। তাই কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি মিথেন নিঃসরণ কমানোও দ্রুত উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং মিথেন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেও তা কাজে লাগাতে সরকারগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দ্রুত বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান