নেপালে প্রলয়ংকারী বন্যার জন্য জলবায়ু সংকট কতোটা দায়ী

যে দেশগুলোর বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কার্যত কোনো ভূমিকা নেই, জলবায়ু সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সেই দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সময় এখনই।

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৯ এএম

গত অগাস্ট মাসে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্ত অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং বন্যায় ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ যায়। নিখোঁজ হয় কয়েক হাজার মানুষ।

এ ঘটনা পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং 'ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন'-এর গবেষকরা এর কারণ খুঁজে দেখেছেন।

তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবীর তাপমাত্র বেড়ে যাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন এই প্রলয়ংকরী দুর্যোগের পেছনে দায়ী।

দুর্যোগের ভয়াবহতা

গত ২৬এ অগাস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের লাংতাং লিরুং পর্বত থেকে প্রায় ২ লাখ বর্গমিটার বা ২১লাখ ৫৩ হাজার বর্গফুট আয়তনের হিমবাহ ও পাথরের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে।

ইউএস জিওজিক্যাল সার্ভে ইউএসজিএসের গবেষকদের মতে, এই ধসের তীব্রতা এতোটাই বেশি ছিল যে এটি একটি ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কম্পন তৈরি করেছিল।

হিমবাহের এই অংশটি প্রায় ১,৪০০ মিটার বা ৪ হাজার ৬৬০ ফুট নিচে ভ্যালি বা উপত্যকার বুকে আছড়ে পড়ে বরফকে তরলে পরিণত করে। এতে ঘণ্টায় ১১০ মাইলের বেশি বেগে ধেয়ে চলা একটি হড়পা বান বা ফ্ল্যাশ ফ্লাড তৈরি হয়।

ত্রিশূলী নদী ও লেন্দে খোলা নদী অববাহিকার প্রায় ৬০ থেকে ৭২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই ধ্বংসলীলা চলে।

পানি, বরফ, পাথর ও কাঁদামাটির এই প্রলয়ংকরী ঢল রাস্তাঘাট, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সাত হাজারের বেশি বাড়িঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এতে গ্যালচিং বর্ডার পোর্ট ও এর আশপাশের এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর নেপাল সরকার জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষতিপূরণ তহবিলের কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন দলের গবেষক ড. বেন ক্লার্ক ও অধ্যাপক ড. ফ্রেডেরিক ওটো বলেছেন, এই দুর্যোগটি সরাসরি কোনো একক আবহাওয়ার কারণে ঘটেনি। বরং এটি ছিল কয়েক দশকের বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণায়নের ফলে তৈরি হওয়া একটি জটিল সংকটের ফল।

গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তনের কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়েছে গবেষণায়।

প্রাকশিল্পযুগের তুলনায় যে অঞ্চলে ধস নেমেছে সেখানে তাপমাত্রা প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। বিশেষ করে জুলাই ও অগাস্ট মাসে এই বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

২০২৬ সালের জুলাই ও অগাস্ট মাসে স্থানীয়ভাবে ইতিহাসের উষ্ণতম মাস হিসাবে রেকর্ড করা হয়। হিমবাহ ধসের আগের দিনগুলোতে তাপমাত্রা ৩০ বছরের গড়ের চেয়ে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিলো।

আশির দশক থেকে হিমালয় অঞ্চলে হিমরেখা প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার করে ওপরে উঠে গেছে। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে বরফ গলে যাওয়ায় পাহাড়ের ঢালগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।

অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে হিমবাহগুলো দ্রুত সংকুচিত হচ্ছিল, যা ধসের স্থান ও আশপাশ থেকে প্রাকৃতিক-স্থিতিশীল বরফ সরিয়ে নিয়েছিলো।

২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প পাহাড়ের গঠনকে প্রাকৃতিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিলো। যা পরবর্তীতে এই ধরনের ধসকে ত্বরান্বিত করে।

গত অগাস্ট মাসে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্ত অঞ্চলে হিমবাহ ধস এবং বন্যায় ১,৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণ যায়। নিখোঁজ হয় কয়েক হাজার মানুষ।

ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার

এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর নেপাল সরকার জাতিসংঘের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বা ক্ষতিপূরণ তহবিলের কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছে। তবে এই তহবিল পেতে হলে জলবায়ু সংকটের সাথে দুর্যোগের বৈজ্ঞানিক সংযোগ প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল চীন ও ভারতের মতো সর্বোচ্চ কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোকে অবিলম্বে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, হাজার মাইল দূরের জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমনের কারণে আজ নেপালের সাধারণ মানুষকে জীবন দিয়ে তার চড়া মূল্য চুকাতে হচ্ছে।

রেড ক্রস রেড ক্রিসেন্ট ক্লাইমেট সেন্টারের সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার মাধব উপ্রেতি সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন যদি দ্রুত ও কঠোরভাবে কমানো না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই মাত্রার বিপর্যয় বাড়তেই থাকবে।

যে দেশগুলোর বৈশ্বিক উষ্ণায়নে কার্যত কোনো ভূমিকা নেই, জলবায়ু সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সেই দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সময় এখনই।