নতুন সরকার গঠনের একদিনেই দুই গণমাধ্যম নিয়ে আলোচনা, কী হয়েছিল
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আলোচনায় গণমাধ্যম। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় বিক্ষোভের মুখে এমডির অফিস ত্যাগ আর এখন টিভির চার সাংবাদিককে শোকজ ও ছুটি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাকি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রশ্নে সরব সাংবাদিক মহল।
মাহাদী হাসান
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএমআপডেট : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৯ পিএম
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই সামনে এলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক। একদিকে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদকে বিক্ষুব্ধ কর্মীদের মুখে অফিস ছাড়তে হয়, অন্যদিকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভির চার সাংবাদিককে ফেইসবুক পোস্টের জেরে শোকজ ও বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও প্রশ্ন একটাই, এটা কি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের বিস্ফোরণ?
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ নিজের ফেইসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, তাকে ‘মব’ তৈরি করে অফিস থেকে বের করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি লেখেন, নতুন সরকার চাইলে স্বীকৃত পদ্ধতিতে তাকে অপসারণ করতে পারত। তা না করে অফিসে হামলা ও তালা দেওয়ার পথ কেন নেওয়া হলো এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার ভাষ্য দ্রুতই রাজনৈতিক রঙ পায়। কারণ পোস্টের শুরুতেই তিনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনারা ক্ষমতায় আসছেন, আমি খুশি। আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগে বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে আছি। এখন আপনারা আমাকে এই পদে না রাখতে চাইতেই পারেন। চুক্তি বাতিল ও অপসারণের নানা স্বীকৃত পদ্ধতি আছে। সেসব দিকে না গিয়ে অফিসে মব সৃষ্টি করে, হামলা করে, তালা দিয়ে সরাতে চাইছেন কেন?”
একই দিন বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এখন টিভির নাটকীয়তার কথা জানা যায়। বুধবার চ্যানেলটির চার সাংবাদিক মাহমুদ রাকিব, মুজাহিদ শুভ, বেলায়েত হোসেন ও আজহার লিমন কারণ দর্শানোর নোটিশ পান।
সাত দিনের মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয় এবং এই সময় তাদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। অভিযোগ আছে, নিরাপত্তারক্ষীদের পর্যন্ত বলা হয়েছিল যেন তারা অফিসে ঢুকতে না পারেন।
আলাপকে তারা জানিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সাতদিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে জবাব দেওয়ার। আর এই সময়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকতে বলা হয়েছে তাদের।
বেলায়েত হোসেনের গল্পটা শুরু ফেইসবুক থেকে। এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আমি আর সাংবাদিকতা করবো না। কারণ আমি চাই না, আমার সন্তানকে কেউ দালালের বাচ্চা বলুক।” আরেক পোস্টে তিনি এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
তার দাবি, মত প্রকাশের অধিকার প্রয়োগ করেছেন মাত্র এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেটাকেই শোকজের কারণ হিসেবে দেখছে।
মাহমুদ রাকিবের ক্ষেত্রেও অভিযোগের তালিকায় আছে ফেইসবুক স্ট্যাটাস, নিউজরুমে উচ্চবাচ্য এবং রাজনৈতিক সংবাদ সম্প্রচার নিয়ে তর্ক।
তিনি বলছেন, এগুলো অফিসের ভেতরের বিষয়, কিন্তু বাইরে এমনভাবে ছড়ানো হচ্ছে যেন তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এতে সামাজিকভাবে হেয় হতে হচ্ছে।
বেলায়েত হোসেন ও মুজাহিদ শুভ দুজনই অভিযোগ করেছেন, নিরাপত্তা রক্ষীদের বলে দেওয়া হয়েছিল তাদের যেন অফিসে ঢুকতে না দেওয়া হয়।
বেলায়েত হোসেন জানান, ফেইসবুকে দেওয়া দুটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে তাকে শোকজ দেয় কর্তৃপক্ষ।
একটি পোস্টে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি বক্তব্যের সমালোচনা করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “যেই আদেশের বলে গণভোট হইছে। সে আদেশে স্পষ্ট লেখা আছে- নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করবে। তাদের কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার থাকবে।”
এরপর আদেশের কথা উল্লেখ করে লেখেন, “সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদের কাছে অপব্যাখ্যা আশা করি নাই। মোটাদাগে বলা যায়, ফরমান ভাঙার মধ্য দিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলো।”
মূলত এই দুই স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতেই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয় বলে জানান বেলায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি না আমি এই দুইটা স্ট্যাটাস দিয়ে ভুল কিছু করেছি।”
“অফিস আমাকে শোকজ করেছে, আমরা জবাব দিবো। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। অফিসে ঢুকতে পর্যন্ত দিচ্ছে না। আমি এখনো সেখানকার কর্মী।”
একই অভিযোগ করেছেন মাহমুদ রাকিবও। তিনি জানান তাকে দেওয়া শোকজ লেটারেও ফেইসবুক স্ট্যাটাসের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পোস্টের কথা বলা হয়নি।
আলাপকে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে কোম্পানি পলিসি না মেনে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া, বিভিন্ন সময় নিউজরুমে উচ্চবাচ্য করা এবং বিভাগীয় প্রধানদের মিটিংয়ে রাজনৈতিক সংবাদ সম্প্রচার নিয়ে নিউজ এডিটরের সঙ্গে তর্ক করা।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টি অফিসের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু এটাকে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “গতকাল থেকে আমরা সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছি। ভুল বার্তা যাচ্ছে যে আমাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু তা তো হয়নি।”
এটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলছেন, “বলা হচ্ছে যে বিএনপির পক্ষ থেকে এই কাজ করানো হয়েছে। কিন্তু আমি তা মনে করি না।”
চ্যানেলটির এডিটরিয়াল চিফ তুষার আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি দাবি করেন, “তিনি (তুষার আব্দুল্লাহ ) আমাদের শোকজ করলেন, অফিসে ঢোকা বন্ধ করলেন এবং বিএনপির ওপরে দোষ দিলেন। আমার মনে হয় না বিএনপি এমন কাজ করবে।”
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তুষার আব্দুল্লাহকে একাধিকবার ফোন করলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এখন টিভির জনসম্পদ বিভাগের প্রধান কে এম আব্দুল্লাহ নয়ন বলেছেন, এই কারণ দর্শানোর নোটিস একদমই অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তিনি বলেন, “একেকজনকে একেক সময় শোকজ দেওয়া হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের, কারও বিরুদ্ধে হুমকির।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ নয়ন বলেন, “আমাদের প্রত্যেক কর্মীকে জয়েনের সময় যে চিঠি দেওয়া হয় সেখানে বলা আছে কি ধরনের পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় করা যাবে এবং যাবে না। সেটা জেনে তারা সাইন করেছে।”
কর্মীদের অফিসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি দাবি করেন, এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের চিঠিতে বলা হয়েছিল, কারণ দর্শন ব্যাখ্যা প্রদানের আগ পর্যন্ত অফিসের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে।
নতুন সরকার দায়িত্বগ্রহণের একদিনের মধ্যে দুইটি বড় প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রেসিডেন্ট সালেহ আকন মনে করেন কোনো ঘটনাতেই সরকারের সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে দুটি ঘটনা ভিন্ন বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
সালেহ আকন বলেন, মাহবুব মোর্শেদ দীর্ঘদিন ধরেই সাংবাদিকদের সাথে, তার কলিগদের সাথে এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে আসছিলেন।
তিনি মনে করেন, “অনেকদিন ধরে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সেই ক্ষোভের শিকার হয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “বাসসের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘সরকার দলীয়’ নিয়োগ হয়। অন্তবর্তী সরকারের ১৮ মাসে তারা কি করেছে সেই প্রশ্ন আছে। আগের সরকার যে মব কালচার তৈরি করেছে, সেই মবেরই শিকার হয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ।”
তবে এখন টিভির ঘটনায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করেন সালেহ আকন।
“ফেইসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে এই শোকজ দেওয়া হয়েছে যা দুঃখজনক।”
অতি উৎসাহের কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে বলে মত দিয়ে এই সাংবাদিক নেতা বলেন, “এখানে সরকারের কিছু করাই নেই। আমাদের মধ্যে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ আছে কাউকে খুশি করার জন্য এমন করে থাকে।”
“সরকারের সংস্থাগুলো চোখ-কান খোলা না রাখলে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “আমাদের দেশে কোনো গণমাধ্যমেই লিখিত সোশ্যাল মিডিয়া কোড অব কন্ডাক্ট নেই। বিবিসি-গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনে এগুলো খুবই স্ট্রিকলি ফলো করা হয়। এটা আমি অনেকদিন বলে আসছি।”
বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যেভাবে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে তা পেশাদার আচরণ না বলে মত দিয়েছেন এই সাংবাদিকতার শিক্ষক। তিনি বলেন, “আমি এখন টিভিকে সমর্থন দিচ্ছি না। তবে আমি মনে করি যেকোনো প্রতিষ্ঠান তার কর্মীর ব্যাপারে যেকোনো ডিসিশন নিতে পারে। এই অধিকার তাদের আছে।”
সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, চাকরিবিধিতে এমন কিছু আছে কি-না সেটা প্রশ্ন। যদি থাকে তাহলে সেটাও তো অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।
“এগুলো পাবলিক হওয়ার কথা না। কর্মীরা না মানলে শ্রম আইনে মামলা করবে। আদালত বিচার করবে।”
যতদিন সোশ্যাল মিডিয়া কোড অব কন্ডাক্ট হবে না এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন সরকার গঠনের একদিনেই দুই গণমাধ্যম নিয়ে আলোচনা, কী হয়েছিল
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আলোচনায় গণমাধ্যম। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় বিক্ষোভের মুখে এমডির অফিস ত্যাগ আর এখন টিভির চার সাংবাদিককে শোকজ ও ছুটি। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাকি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রশ্নে সরব সাংবাদিক মহল।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই সামনে এলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক। একদিকে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদকে বিক্ষুব্ধ কর্মীদের মুখে অফিস ছাড়তে হয়, অন্যদিকে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভির চার সাংবাদিককে ফেইসবুক পোস্টের জেরে শোকজ ও বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও প্রশ্ন একটাই, এটা কি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের বিস্ফোরণ?
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদ নিজের ফেইসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, তাকে ‘মব’ তৈরি করে অফিস থেকে বের করার চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি লেখেন, নতুন সরকার চাইলে স্বীকৃত পদ্ধতিতে তাকে অপসারণ করতে পারত। তা না করে অফিসে হামলা ও তালা দেওয়ার পথ কেন নেওয়া হলো এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তার ভাষ্য দ্রুতই রাজনৈতিক রঙ পায়। কারণ পোস্টের শুরুতেই তিনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনারা ক্ষমতায় আসছেন, আমি খুশি। আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগে বাসসের এমডি ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে আছি। এখন আপনারা আমাকে এই পদে না রাখতে চাইতেই পারেন। চুক্তি বাতিল ও অপসারণের নানা স্বীকৃত পদ্ধতি আছে। সেসব দিকে না গিয়ে অফিসে মব সৃষ্টি করে, হামলা করে, তালা দিয়ে সরাতে চাইছেন কেন?”
একই দিন বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এখন টিভির নাটকীয়তার কথা জানা যায়। বুধবার চ্যানেলটির চার সাংবাদিক মাহমুদ রাকিব, মুজাহিদ শুভ, বেলায়েত হোসেন ও আজহার লিমন কারণ দর্শানোর নোটিশ পান।
সাত দিনের মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয় এবং এই সময় তাদের বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। অভিযোগ আছে, নিরাপত্তারক্ষীদের পর্যন্ত বলা হয়েছিল যেন তারা অফিসে ঢুকতে না পারেন।
আলাপকে তারা জানিয়েছেন, তাদের প্রত্যেককেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সাতদিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে জবাব দেওয়ার। আর এই সময়ে বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকতে বলা হয়েছে তাদের।
বেলায়েত হোসেনের গল্পটা শুরু ফেইসবুক থেকে। এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আমি আর সাংবাদিকতা করবো না। কারণ আমি চাই না, আমার সন্তানকে কেউ দালালের বাচ্চা বলুক।” আরেক পোস্টে তিনি এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করেন।
তার দাবি, মত প্রকাশের অধিকার প্রয়োগ করেছেন মাত্র এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেটাকেই শোকজের কারণ হিসেবে দেখছে।
মাহমুদ রাকিবের ক্ষেত্রেও অভিযোগের তালিকায় আছে ফেইসবুক স্ট্যাটাস, নিউজরুমে উচ্চবাচ্য এবং রাজনৈতিক সংবাদ সম্প্রচার নিয়ে তর্ক।
তিনি বলছেন, এগুলো অফিসের ভেতরের বিষয়, কিন্তু বাইরে এমনভাবে ছড়ানো হচ্ছে যেন তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এতে সামাজিকভাবে হেয় হতে হচ্ছে।
বেলায়েত হোসেন ও মুজাহিদ শুভ দুজনই অভিযোগ করেছেন, নিরাপত্তা রক্ষীদের বলে দেওয়া হয়েছিল তাদের যেন অফিসে ঢুকতে না দেওয়া হয়।
বেলায়েত হোসেন জানান, ফেইসবুকে দেওয়া দুটি স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে তাকে শোকজ দেয় কর্তৃপক্ষ।
একটি পোস্টে তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের একটি বক্তব্যের সমালোচনা করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “যেই আদেশের বলে গণভোট হইছে। সে আদেশে স্পষ্ট লেখা আছে- নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করবে। তাদের কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার থাকবে।”
এরপর আদেশের কথা উল্লেখ করে লেখেন, “সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদের কাছে অপব্যাখ্যা আশা করি নাই। মোটাদাগে বলা যায়, ফরমান ভাঙার মধ্য দিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হলো।”
মূলত এই দুই স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতেই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয় বলে জানান বেলায়েত হোসেন।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি না আমি এই দুইটা স্ট্যাটাস দিয়ে ভুল কিছু করেছি।”
“অফিস আমাকে শোকজ করেছে, আমরা জবাব দিবো। কিন্তু আমাদের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। অফিসে ঢুকতে পর্যন্ত দিচ্ছে না। আমি এখনো সেখানকার কর্মী।”
একই অভিযোগ করেছেন মাহমুদ রাকিবও। তিনি জানান তাকে দেওয়া শোকজ লেটারেও ফেইসবুক স্ট্যাটাসের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট পোস্টের কথা বলা হয়নি।
আলাপকে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে কোম্পানি পলিসি না মেনে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া, বিভিন্ন সময় নিউজরুমে উচ্চবাচ্য করা এবং বিভাগীয় প্রধানদের মিটিংয়ে রাজনৈতিক সংবাদ সম্প্রচার নিয়ে নিউজ এডিটরের সঙ্গে তর্ক করা।”
তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টি অফিসের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু এটাকে বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “গতকাল থেকে আমরা সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছি। ভুল বার্তা যাচ্ছে যে আমাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কিন্তু তা তো হয়নি।”
এটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলছেন, “বলা হচ্ছে যে বিএনপির পক্ষ থেকে এই কাজ করানো হয়েছে। কিন্তু আমি তা মনে করি না।”
চ্যানেলটির এডিটরিয়াল চিফ তুষার আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি দাবি করেন, “তিনি (তুষার আব্দুল্লাহ ) আমাদের শোকজ করলেন, অফিসে ঢোকা বন্ধ করলেন এবং বিএনপির ওপরে দোষ দিলেন। আমার মনে হয় না বিএনপি এমন কাজ করবে।”
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তুষার আব্দুল্লাহকে একাধিকবার ফোন করলেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এখন টিভির জনসম্পদ বিভাগের প্রধান কে এম আব্দুল্লাহ নয়ন বলেছেন, এই কারণ দর্শানোর নোটিস একদমই অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তিনি বলেন, “একেকজনকে একেক সময় শোকজ দেওয়া হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের, কারও বিরুদ্ধে হুমকির।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টের ব্যাপারে আব্দুল্লাহ নয়ন বলেন, “আমাদের প্রত্যেক কর্মীকে জয়েনের সময় যে চিঠি দেওয়া হয় সেখানে বলা আছে কি ধরনের পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় করা যাবে এবং যাবে না। সেটা জেনে তারা সাইন করেছে।”
কর্মীদের অফিসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি দাবি করেন, এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের চিঠিতে বলা হয়েছিল, কারণ দর্শন ব্যাখ্যা প্রদানের আগ পর্যন্ত অফিসের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হচ্ছে।
নতুন সরকার দায়িত্বগ্রহণের একদিনের মধ্যে দুইটি বড় প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রেসিডেন্ট সালেহ আকন মনে করেন কোনো ঘটনাতেই সরকারের সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে দুটি ঘটনা ভিন্ন বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
সালেহ আকন বলেন, মাহবুব মোর্শেদ দীর্ঘদিন ধরেই সাংবাদিকদের সাথে, তার কলিগদের সাথে এবং বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে আসছিলেন।
তিনি মনে করেন, “অনেকদিন ধরে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। সেই ক্ষোভের শিকার হয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “বাসসের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘সরকার দলীয়’ নিয়োগ হয়। অন্তবর্তী সরকারের ১৮ মাসে তারা কি করেছে সেই প্রশ্ন আছে। আগের সরকার যে মব কালচার তৈরি করেছে, সেই মবেরই শিকার হয়েছেন মাহবুব মোর্শেদ।”
তবে এখন টিভির ঘটনায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়েছে বলে মনে করেন সালেহ আকন।
“ফেইসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে এই শোকজ দেওয়া হয়েছে যা দুঃখজনক।”
অতি উৎসাহের কারণে এমনটা হয়ে থাকতে পারে বলে মত দিয়ে এই সাংবাদিক নেতা বলেন, “এখানে সরকারের কিছু করাই নেই। আমাদের মধ্যে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ আছে কাউকে খুশি করার জন্য এমন করে থাকে।”
“সরকারের সংস্থাগুলো চোখ-কান খোলা না রাখলে এমন ঘটনা আরও বাড়বে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “আমাদের দেশে কোনো গণমাধ্যমেই লিখিত সোশ্যাল মিডিয়া কোড অব কন্ডাক্ট নেই। বিবিসি-গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনে এগুলো খুবই স্ট্রিকলি ফলো করা হয়। এটা আমি অনেকদিন বলে আসছি।”
বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যেভাবে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে তা পেশাদার আচরণ না বলে মত দিয়েছেন এই সাংবাদিকতার শিক্ষক। তিনি বলেন, “আমি এখন টিভিকে সমর্থন দিচ্ছি না। তবে আমি মনে করি যেকোনো প্রতিষ্ঠান তার কর্মীর ব্যাপারে যেকোনো ডিসিশন নিতে পারে। এই অধিকার তাদের আছে।”
সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, চাকরিবিধিতে এমন কিছু আছে কি-না সেটা প্রশ্ন। যদি থাকে তাহলে সেটাও তো অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।
“এগুলো পাবলিক হওয়ার কথা না। কর্মীরা না মানলে শ্রম আইনে মামলা করবে। আদালত বিচার করবে।”
যতদিন সোশ্যাল মিডিয়া কোড অব কন্ডাক্ট হবে না এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।