লামিন ইয়ামাল জিতেছেন বিশ্বকাপ, লিওনেল মেসি খেলেছেন ফাইনাল, এমবাপ্পে জিতেছেন গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল জিতেছেন রোদ্রি; এর মাঝে হ্যারি কেইন কোথা থেকে এলেন?
এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই আসতে পারে, হ্যারি কেইন নিজেও ভাবেননি।
ডিএজেডএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হ্যারি কেইন বলেন,“অনেকেই হয়তো ভাবেননি যে আমি এত দূর আসতে পারব। সত্যি বলতে, আমি নিজেও কখনো ভাবিনি এতটা পথ পাড়ি দেব।
“ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমাকে অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তখন আমি এমন কেউ ছিলাম না, যাকে মানুষ ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখত। এখনকার অনেক খেলোয়াড়ের মতো শুরু থেকেই আমার প্রতি মানুষের সেই প্রত্যাশা ছিল না।
“আমাকে ধৈর্য ধরতে হয়েছে, কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। অনেক সময় নিজের মনের সঙ্গে নিজেকেই লড়াই করতে হয়েছে। সেই লড়াইয়ে জিততে প্রয়োজন হয়েছে আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ় সংকল্পের।
“আমার মনে হয়, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের সেই কঠিন সময়গুলোই আমাকে মাটির কাছাকাছি থাকতে শিখিয়েছে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও যেন নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারি, সেই শিক্ষা আমি সেখান থেকেই পেয়েছি।
“আমি যত কিছুই অর্জন করি না কেন, যত গোলই করি না কেন, এমনকি ব্যালন ডি’অর জিতলেও আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেকে আরও ভালো খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলা। এই অর্জন তারই প্রমাণ।”
২০২৬ ব্যালন ডি’অর-এর শীর্ষ পাঁচ
১. হ্যারি কেইন
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে
৩. লামিনে ইয়ামাল
৪. রদ্রি
৫. লিওনেল মেসি
এর মধ্যে হ্যারি কেইনের নাম খুব কমই এসেছে বিশেষ করে, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে হারের পরে।
তাহলে আসলে কী করেছেন হ্যারি কেইন?
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৭৩টি গোল করেছেন।
ব্যালন ডি’অর-এর ভোটারদের খেলোয়াড়দের র্যাঙ্কিং করার সময় শুধু সর্বশেষ মৌসুমের পারফরম্যান্স বিবেচনায় নিতে বলা হয়। তবে বায়ার্ন মিউনিখে ২০২৩ সাল থেকে ১৫৮ ম্যাচে কেইনের ১৫৬ গোলও তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের প্রমাণ। এর সুবাদে ক্লাবটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় সপ্তম স্থানে উঠে এসেছেন তিনি।
টানা তিন মৌসুম ধরে বুন্দেসলিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা কেইন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলেও সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সর্বোচ্চ গোল করেছেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়েও দারুণ সাফল্য পেয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে ইংল্যান্ড ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর নিজেদের সেরা বিশ্বকাপ ফল অর্জন করেছে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ জিতে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছে দলটি। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে ছিলেন কেইন।
গত মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের অন্য যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে অন্তত ১৯টি গোল বেশি করেছেন কেইন। বায়ার্নের হয়ে তার ৬১ গোলের কীর্তি ইউরোপীয় ফুটবলে আরও একটি বড় অর্জন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ১১ বছর আগে রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে এক মৌসুমে ৬১ গোল করার পর আর কোনো খেলোয়াড় এত গোল করতে পারেননি।
বুন্দেসলিগায় ৩৬ গোল করে মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন কেইন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার চেয়ে তার গোল ছিল ১৭টি বেশি। চ্যাম্পিয়নস লিগে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া বায়ার্নের হয়ে করেছেন ১৪ গোল। জার্মান কাপেও তার গোলসংখ্যা ১০। এর মধ্যে ফাইনালে স্টুটগার্টের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। জার্মান সুপার কাপেও একটি গোল রয়েছে তার।
বায়ার্ন মিউনিখের ইতিহাসে এক মৌসুমে এত গোল আর কেউ করতে পারেননি। অথচ এই ক্লাবেই খেলেছেন গার্ড মুলার, কার্ল হাইনৎস রুমেনিগে ও রবার্ট লেভানডফস্কির মতো কিংবদন্তি গোলদাতারা।
মেসির পরেই কেইন
গত মৌসুমে ইংল্যান্ডের হয়ে ১২টি গোল করেছেন কেইন। এর মধ্যে বিশ্বকাপেই করেছেন ছয় গোল। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার মোট গোলসংখ্যা ৭৩।
ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে এক মৌসুমে এর চেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড রয়েছে কেবল লিওনেল মেসির। ২০১১-১২ মৌসুমে বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার হয়ে মোট ৮২ গোল করেছিলেন তিনি।
এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের তালিকায় এরপর রয়েছেন গার্ড মুলার (১৯৭২-৭৩ মৌসুমে ৭২ গোল), ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (২০১১-১২ ও ২০১৪-১৫ মৌসুমে ৬৬ গোল করে), ব্রাজিলের সাবেক স্ট্রাইকার রোনালদো (১৯৯৬-৯৭ মৌসুমে ৬৬ গোল), আর্লিং হালান্ড (২০২২-২৩ মৌসুমে ৬৪ গোল) এবং লুইস সুয়ারেজ (২০১৫-১৬ মৌসুমে ৬৪ গোল)।
ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারারও কেইনের ব্যালন ডি’অর জয়ের পক্ষে মত দিয়েছেন। সম্প্রতি বিবিসি স্পোর্টকে তিনি বলেন, “ব্যালন ডি’অর জেতা উচিত হ্যারি কেইনের। গত ১২ থেকে ১৮ মাসে বায়ার্ন ও ইংল্যান্ডের হয়ে তার পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য। এই কারণেই পুরস্কারটি তার প্রাপ্য।”
১৯৫৬ সালে ব্যালন ডি’অর চালু হওয়ার পর থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত শুধু ইউরোপের ফুটবলাররাই এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতেন। ১৯৯৫ সালে নিয়ম পরিবর্তন করে বিশ্বের সব দেশের ফুটবলারদের জন্য পুরস্কারটি উন্মুক্ত করা হয়।
এরপর বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়া সাতটি বছরের মধ্যে চারবারই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের কোনো খেলোয়াড় জিতেছেন ব্যালন ডি’অর। এই তালিকায় রয়েছেন লিওনেল মেসিও। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ শীতকালে অনুষ্ঠিত হওয়ায় ২০২৩ সালে ব্যালন ডি’অর জেতেন আর্জেন্টিনার এই তারকা।
তবে ২০০৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপজয়ী কোনো খেলোয়াড়ের হাতে উঠল না ব্যালন ডি’অর। এই সময়ে মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ পুরস্কারটি জিতেছেন, যদিও যে বছর তারা এটি পেয়েছেন, সে বছর বিশ্বকাপ জিততে পারেননি।
গত ২০ বছরে এবার নিয়ে মাত্র পঞ্চমবারের মতো এমন একজন ফুটবলার ব্যালন ডি’অর জিতলেন, যিনি ওই সময়ে বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ বা কোপা আমেরিকার কোনোটিই জেতেননি। এই বিরল তালিকায় হ্যারি কেইনের সঙ্গে রয়েছেন মেসি, যিনি এমন পরিস্থিতিতে তিনবার পুরস্কারটি জিতেছেন, এবং রোনালদো একবার।
বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালও ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম ফেভারিট ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কেইনের কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে।
গত বছর চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সাফল্য পিএসজি ও ফ্রান্সের ফুটবলার উসমান দেম্বেলেকে ব্যালন ডি’অর জিততে সাহায্য করেছিল।